কিটকিটের অভিযান – ২  –  সুব্রত মজুমদার

কিটকিটের অভিযান – ২ – সুব্রত মজুমদার

  –

 

কিন্তু কিটকিটের হাত হতে রক্ষা পাওয়া কি এতই সহজ ! দৌড়ে গিয়ে ধরল একটা শেয়ালের কান। শেয়াল তো জীবনের ভয়ে দৌড়তে লাগল। দিগ্বিদিক জ্ঞান নেই তার। জঙ্গল পেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে ছুটতে লাগল সেই শেয়াল।
 
একটা ধূধূ মরুভূমির কাছে এসে উল্টে পড়ল শেয়াল বাবাজী, কিটকিট ছিটকে পড়ল তার পিঠ হতে। শেয়াল তো মুক্তির আনন্দে আত্মহারা, মুখ ঘুরিয়ে দে দৌড়।
 
মরুভূমির পথ বড় কঠিন চারদিকে বালির পাহাড় আর ঘিলু গরমকরা রোদ। একটু দূরেই একটা মিশমিশে কালো কাঁকড়াবিছে একটা বড়সড় পাথরের তলায়  বসে ঝিমোচ্ছিল । কিটকিটের পায়ের আওয়াজ কানে আসতেই মাথা তুলে বলল, 
 
“কাঁইকটকট কাঁইকটকট
 কে বাছা তুমি যাও চটপট ?” 
 
কিটকিট বলল, “আমি কিটকিট, চলেছি রাজকন্যার খোঁজে। তুমি তার হদিস জানো ?”
 
কাঁকড়াবিছেটা বলল-
 “গরম বালি গরম ঠাঁই
রাজকন্যার খবর নাই।
গর্তে আমার ঢুকেছে বালি, 
মরছি রোদে, পুড়ছি খালি।” 
 
কিটকিট এগিয়ে গেল পাথরটার সামনে । পাথরের তলায় কাঁকড়াবিছের গর্ত। গর্তটা বালিতে ঢেকে গেছে। অনেক কষ্টে গর্ত হতে সমস্ত বালি বের করে আনল কিটকিট। তারপর পাথরের আড়ালের সামান্য ছায়াতে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,”তুমি শোনোনি তার কথা, অচিনপুরের রাজকন্যা কঙ্কাবতী নাম ?” 
 
কাঁকড়াবিছেটা তার একটা দাঁড়া দিয়ে মাথা চুলকে বললে-
“একটু দূরে বালুকাপুর বালির হাতি বালির শুঁড়, 
বালির দরজা বালির ঘর, বালির দৈত্য তার ভেতর। 
জানতে পারে হয়তো সে রাজকন্যা কোথায় যে, 
তবে সাবধান দৈত্য হতে, দৈত্যব্যাটা দুষ্ট বটে।
এই নিয়ে যাও বিষ আমার, লাগবে কাজে হরেকবার।”
 
কাঁকড়াবিছের কাছ হতে বিষের শিশিটা নিয়ে পুঁটলিতে ভরে নিল কিটকিট, তারপর সে তার দুহাত জড়ো করে বলল, “তোমাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাব ভাই….খুব উপকার করলে আমার।”
 
কাঁকড়াবিছে তার দুটো দাঁড়া তুলে গান করতে করতে গর্তে ঢুকে গেল। আর কিটকিট, সে চলল বালুদৈত্যের সন্ধানে ।
 
চারদিকে বালির পাহাড়। মাথার উপরে সূর্যের প্রখর তাপ আর পায়ের তলায় গরম বালি, গোটা শরীরটা ঝলসে যাচ্ছে। কোথাও বিন্দুমাত্র ছায়া নেই। এতটা রাস্তা শেয়ালের পিঠে চেপে বেশ আরামে এসেছে সে, কিন্তু আর তো সে উপাই নেই।
 
বেশ কিছুটা হাঁটার পর কিটকিটের নজরে পড়ল একটুকরো সবুজে ঘেরা জায়গা। একটা ছোট্ট পুকুরের চারপাশে অনেকগুলো খেজুরের গাছ আর সবুজ ঘাসের সমারোহ। ঘাসগুলো দেখে পেটের খিদেটা চাগার দিয়ে উঠল। কিটকিট তার কাঁধের লাঠিটা নামিয়ে শুরু করল পেটপুজো। একপেট ঘাস খেয়ে পুকুরে গেল জল খেতে। পেটভরে জল খেয়ে উঠে আসতেই দেখল এক হুলুস্থুল কান্ড। যেটা এতক্ষণ খেয়াল করেনি সে। দেখল একটা কাঁটাগাছ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘ভ্যা-ভ্যা’ করে কাঁদছে, একটা সাদা ধবধবে বক টিকিট নেড়ে নেড়ে তাকে শান্তনা দিচ্ছে। 
 
-“অমন কাঁদিসনি বাপ, কাঁদলে কি আর তোর ভাইকে ফেরৎ পাবি !” 
বকটার কথায় বিন্দুমাত্র আশ্বস্ত না হয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল কাঁটাগাছটি। “আমার ভাই…ই….ই….ও ভাই রে…… .
তুই কালকে ছিলিস আমার কাছে 
আজকে যে তুই নাই রে।
মনে কি পড়ে সেদিনের সে কথা, 
মোদের উপর বসতে গিয়ে ঘায়েল হল ক’টা ?
কত গাধা ঘোড়া মহিষ ভেড়া 
সবাইকে দিলাম ফুঁড়ে। 
ও আমার ভাই…ই….ই….ও ভাই রে…… .”  
 
কিটকিট এগিয়ে গিয়ে বকের সামনে দাঁড়াল। কিটকিটকে দেখে টিকিখানা একবার বাঁয়ে আর একেবার ডাইনে ঘুরিয়ে বকটা বলল,”তুমি কে হে ? এই তল্লাটে তো তোমাকে দেখিনি কখনো। পুলিশ ?” 
 
পুলিশের নাম শুনে কাঁটাগাছটির কান্নার সুর আরও চড়ে গেল। একটু দূরে একটা উঁট বালির উপর গলা পেতে শুয়েছিল, পুলিশের নাম শুনে সেও একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। 
বককে আশ্বস্ত করে কিটকিট বলল, “আরে না না, আমি পুলিশ টুলিশ নই, আমি কিটকিট। চলেছি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর সন্ধানে। কিন্তু ও অমন করে কাঁদছে কেন ? কি হয়েছে ওর ? আর তুমিই বা কে ?”
 
টিকিখানা আবার ডাইনে-বাঁয়ে নাড়িয়ে বকটা বলল, “আমি বকবক পন্ডিত। ব্যাকরনাচার্য্য, তর্করত্ন, সিদ্ধান্তবাগীশ। এই মরূদ্যানেই থাকি। এই তল্লাটে যত উঁট আর খচ্চর আমার ছাত্র। বড় জটিল কেসে ফেঁসে গেছি বাবা।”
 
-“কিরকম ? কিরকম ?” কৌতুহল প্রকাশ করল কিটকিট। 
বকবক পন্ডিত গম্ভীর স্বরে বলল, “আমার এক ছাত্রের গলায় চন্দ্রবিন্দু আঁটকে গেছে। মার্ডার কেস। ওই যে দেখছ না বালিতে গলা নামিয়ে পড়ে আছে।”
 
উঁটটিকে বহুক্ষণ আগেই দেখেছে কিটকিট। সে ছুটে গেল উঁটটার কাছে। ভালোমত পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বলল,”মরেনি তো ! মিছিমিছি ভয় পাচ্ছেন। আর ওই চন্দ্রবিন্দু না কি যেন, সেটা কি করে গলায় আটকাবে ?”
 
বকবক পন্ডিত বিরক্ত হয়ে বলল,”ব্যাকরন না জানলে যা হয় আরকি। খাও তো কাটা ঘাস, চন্দ্রবিন্দুর মর্ম কি বুঝবে। চিরকাল খরগোশ হয়েই থাকলে, মানুষ আর হলে না।”
 
কিটকিট রেগে গিয়ে বলল,”ওসব ব্যাকরন ফ্যাকরনের ধার আমি ধারি না। আমার দিদি সিক্সে উঠেছে, ওর পুরোনো ক্লাসের ব্যাকরন বইটা আমি চিবিয়ে দেখেছি। স্বাদ মন্দ নয়, তবে আহামরিও কিচ্ছু নয়। তা ব্যাকরনের সঙ্গে তোমার ছাত্রের গলায় চন্দ্রবিন্দু আটকানোর কি সম্পর্ক ?”
পন্ডিত টিকি নেড়ে বলল, “আছে আছে। তুমি খাও কাটা ঘাঁস আর ও খায় কাঁটাঘাস। ফারাক হলো চন্দ্রবিন্দুতে। তা ওই কাঁটাঘাস খেতে গিয়েই হল যত বিপত্তি। কাটাঘাস তো গলা বেয়ে নেমে গেল কিন্তু আটকে গেল ওই চন্দ্রবিন্দু।”
 
-“আর মার্ডার ?”
পন্ডিত কাঁটাঘাসের গাছটার দিকে দেখিয়ে বলল, “ওর ভাই। ওর ভাইকে খেতে গিয়েই আমার ছাত্র ঢুণ্ঢুলালের এই বিপত্তি। গলায় চন্দ্রবিন্দু।”
 
কিটকিট রেগে গিয়ে বলল,”এবার নামের আগেও বসবে। যেমন কর্ম তেমনি ফল। কাঁটাঘাসের উপর এত লোভ কেন বাপু ! তবে হ্যাঁ, ও যদি আমাকে বালিদৈত্যের কাছে পৌঁছে দেয় তবে আমি ওকে নিয়ে যাবো অচিনপুরে, সেখানে আছে একজটা বুড়ি। ওর কাছে কোনও না কোনও উপায় তো থাকবেই।”
 
 
  চলবে…. 
সুব্রত মজুমদার
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply