কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৩  – সুব্রত মজুমদার
Subrata Majumdar

কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৩ – সুব্রত মজুমদার

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email

 

লাঠিখানা তুলে নিয়ে একলাফে উটের উপর চেপে বসল কিটকিট। উটটা কিন্তু বিশেষ নড়াচড়া করল না। সেরকমই গলা নামিয়ে শুয়ে রইলো। কিটকিট তার ছোট্ট ছোট্ট পা দিয়ে কয়েক লাথ মারল উটের পিঠে। কোনও লাভ হল না।

সে দৃশ্য দেখে বিশ্রী গলায় হেসে উঠল বকবক পন্ডিত। বলল,”যাও তো বাপ পর্ণকন্টক, তোমার ভাইকে যে খেয়েছে তাকে এককামড় দিয়ে এসো।”

কাঁটাগাছটি দৌড়ে গিয়ে উটের লেজটাকে কামড়ে ধরল। উটটা লেজের এক বাড়িতে পর্ণকন্টককে ফেলে দিয়ে মারল দৌড়। কিটকিট শক্ত করে ধরে থাকল উটের পিঠ। বালির উপর অমন দৌড় টিভির জিওগ্রাফি চ্যানেলেও দেখেনি কিটকিট। সে বলল,”এরকম দৌড় তো টিভিতেও দেখায় না। কিরকম করে এমন দৌড়োও বাপু ?”

উট ঢুণ্ঢুলাল বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়েই বলল, “সবকিছুই কি তোমাদের যন্তরে দেখাতে পারে বাপু, এর চেয়েও জোরে দৌড়োতো আমার দাদু।”
-“সেও বুঝি কাঁটাগাছের কামড় খেয়েছিল ?” শুধাল কিটকিট ।

উটটি এবার রেগে গিয়ে বলল,”একবার ফিরি, তারপর দেখছি। থর হতে গোটা বেরাদরকে ডেকে আনবো। ওই টুলোপন্ডিত আর তার শাগরেদ পর্ণকন্টককে দেখে নেব। “

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল ঢুণ্ঢুলাল, কিন্তু তার আগেই একটা বালির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে উল্টে পড়ল। আর কিটকিট ছিটকে পড়ল ঢুণ্ঢুলালের পিঠ হতে। কিটকিটের ঝোলা হতে কাঁকড়াবিছের বিষের সেই শিশি উছলে পড়ল ঢুণ্ঢুলালের পিঠে। শিশির ঢাকনা খুলে একফোঁটা বিষ গিয়ে পড়ল ঢুণ্ঢুলালের গলায়, আর তৎক্ষণাৎ চন্দ্রবিন্দুটা গলা হতে বেরিয়ে পড়ল বালির উপর।

কিটকিট তড়িঘড়ি গিয়ে বিষের শিশি আর চন্দ্রবিন্দুটা কুড়িয়ে নিয়ে ঝোলায় ভরে ফেলল। কাঁকড়াবিছের বিষটা সত্যিই অনেক কাজের।
মাথাখানা আকাশের দিকে তুলে কিটকিটের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নিল ঢুণ্ঢুলাল। তার এখন অনেক কাজ। বকবক পন্ডিত আর পর্ণকন্টককে শায়েস্তা করতে হবে যে।

-বালিদৈত্য ও একজটা বুড়ি-

ঢুণ্ঢুলাল চলে যেতেই কিটকিট সামনের দিকে এগিয়ে গেল। বিশাল বালির দেওয়াল। এটাই সম্ভবত বালিদৈত্যের প্রাসাদ। ঢুণ্ঢুলালের পিঠে মাথা নিচু করে বসেছিল বলে বুঝতে পারেনি কিটকিট।

কিটকিটের কাছে এখন দুটো কাজ। এক, এই প্রাসাদের দরজা খুঁজে বের করা। দুই, বালিদৈত্যের কাছ হতে কঙ্কাবতীর হদিস জানা। কিন্তু বালিদৈত্য কেমন স্বভাবের তা না জানলে মুশকিল। হুট করে কাছে চলে গেলে যদি গিলে খেয়ে নেয়। বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে কিটকিটের।
একটু ঘোরাঘুরি করতেই প্রাসাদের দরজা পাওয়া গেল। ভয়ে ভয়ে দরজা দিয়ে ঢুকে ভেতরে এগিয়ে চলল সে।

চারদিকে শুধুই বালি আর বালি। তবে তার মধ্যেই নানান ভাস্কর্য। বালির সিংহ, বালির হাতি, বালির সেপাই সবাই দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ হয়ে। বিশাল বিশাল সব মূর্তি দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকল কিটকিট ।
কিন্তু যখনই মনে পড়ল যে বাবা শুয়ে শুয়ে সব দেখছে তখনই নিজের হাবভাব পাল্টে চেহারায় বীরত্ব আনার চেষ্টা করল। হাতের লাঠিটা মাথার উপর ঘুরিয়ে বলল, “হা রে রে রে রে রে….. ফেলব তোদের মেরে….”

উঁচু বালির দাওয়ার উপর একটা বালির ব্যাঙ মাথায় মুকুট পরে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল। হাবভাব এমন সে যেন এই প্রাসাদের সম্রাট। লাফাচ্ছিল আর মুখ দিয়ে ‘ঘ্যাঙর-ঘ্যাং’ করে চিৎকার করছিল।

কিটকিটের লাঠিতে লেগে বালির ব্যাঙটা ভেঙ্গে গেল। মিশে গেল বালির সঙ্গে। বন্ধ হয়ে গেল চিৎকার। আর ঠিক তখনই একটা খুনখুনে গলায় চিৎকার শোনা গেল-
“কে রে তুই অলপ্পেয়ে… ফেললি ভেঙ্গে লাঠির ঘায়ে আমার ঘ্যাঙরচাঁদে ?
জড়িয়ে তোরে এই সুতোতে বালির ওই থামের সাথে রাখব এবার বেঁধে।”

কিটকিট দেখল উল্টোদিকের দাওয়াতে একটা খুনখুনে বুড়ি বসে বসে সুতো কাটছে। পরনে সাদা থান। মাথায় একমাথা পাকা চুল। কেবল সামনের দিকে একটা কালো চুলের জটা। একটা ঝুড়িতে অনেকগুলো মাকড়সা। তাদের মুখ হতে সুতো বেরিয়ে জমা হচ্ছে বুড়ির চরকাতে। ওই বোধহয় একজটা বুড়ি।

কিটকিট বলল-
“রেগো না গো ঠাম্মা তুমি ওষুধ আছে আমার কাছে।
দেখবে কামাল ওষুধখানার, খেলে পরেই ঘ্যাঙর বাঁচে।”

কিটকিট তার ঝোলা হতে কাঁকড়াবিছের বিষের শিশিটা বের করে আনল। বিষের শিশিটা দেখেই দৌড়ে এল বুড়ি।
-“দে রে বাছা দে রে আমায় বিষের শিশি খান,
ওই শিশিতেই আছে ভরা বালির দেশের প্রাণ।”
কিটকিটের হাত হতে বিষের শিশিখানা নিয়ে ছিটিয়ে দিল গোটা প্রাসাদে। দেখতে দেখতে যেখানে যত জীবজন্তু গাছপালা ছিল সবাই নিজের রূপ ফিরে পেল। কোত্থাও বালির চিহ্নমাত্রও নেই। নিজের রূপে ফিরে এল ঘ্যাঙরচাঁদও ।

কিটকিট বলল,”সবই তো হল, কিন্তু বালিদৈত্য কই ? ওর কাছেই তো এসেছি কঙ্কাবতীর হদিস পাওয়ার জন্য।”

পায়ের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করতে থাকা ঘ্যাঙরচাঁদ গলাটাকে যথাসম্ভব চড়িয়ে বলল, “আমি গো আমি। আমিই তোমাদের বালিদৈত্য।”

বালিদৈত্যকে দেখার জন্য মাথা নিচু করল কিটকিট। বলল, “দৈত্য বটে একখান। তা তোমার নাম বালিদৈত্য কে রাখল গো ?”
ঘ্যাঙরচাঁদ সামনের একটা পা দিয়ে মাথা চুলকে বলল, “তা তো জানি না। তবে বাইরের সবাই আমাকে ওই নামেই ডাকে শুনেছি।”
একজটাবুড়ি এবার ঝাঁটা তুলে তেড়ে এল কিটকিটের দিকে। রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে আছে সে। ঝাঁটা নাড়তে নাড়তে বলল-
“কোন অলপ্পেয়ে ছিষ্টিছাড়া নাম রেখেছিস বাছার ?
জানতে পারলে খাওয়াবো তাকে উনিশ লক্ষ আছাড়।
ওরে পাজী তুই ? “

কিটকিট ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “না ঠাম্মা না। আমি তো এসেছি কঙ্কাবতী খোঁজে। তোমার ঘ্যাঙরচাঁদকেও চিনি না আর বালিদৈত্যকেও চিনি না। আমি তো শুনেছি কাঁকড়াবিছের কাছে।”

একজটা বুড়ি ঝাঁটাখানা নামিয়ে রেখে কিটকিটের রাগরাগ চোখে চেয়ে চলে গেল নিজের কাজে।
ঘ্যাঙরচাঁদ ঘ্যাঙর ঘ্যাং ডাক ছাড়তে ছাড়তে বলল-
“উত্তরেতে হিমের ঘর সেথায় আছে জাদুকর,
গেলে পাবে তুমি কঙ্কাবতীর সব খবর।”

কিটকিট পড়ল অতান্তরে। উত্তরে সেই জাদুকরের ঘরের কোনও ঠিকানা তার জানা নেই। সে মিনমিনে গলায় বলল, “ঘ্যাঙর ভাই, তুমি যাবে আমার সাথে ?”

ঘ্যাঙরচাঁদ ঘ্যাঙর-ঘ্যাং শব্দ করে বলল, “রাজি।”
কিন্তু যেতে যেই উদ্যত হয়েছে অমনি চশমাচোখে ছড়ি হাতে মস্ত একটা কোলাব্যাঙ এসে হাজির।

চলবে…..

সুব্রত মজুমদার

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply