কল্প গল্প, পর্ব-১
shampasaha

কল্প গল্প, পর্ব-১

 

 

Print Friendly, PDF & Email

 

নতুন ভোর  –  শম্পা সাহা
                                             

জাম্বোসি নদীর ধারে মাম্বোসা রাজ্য। কয়েকটা ছোট ছোট গ্রাম নিয়ে খুবই ছোট্ট একটা রাজ্য । বেশিরভাগই এলাকার আদিবাসী উপজাতির বসবাস । নদীর দু’পাশে দু’ একটা বড় পাথর আর ছোট ছোট কয়েকটা টিলা।

নদীর তীরে অদ্ভুতভাবে গাছপালা নেই কারণ ওই লবণাক্ত নদীর জলে মিশে রয়েছে দুর্দান্ত রাসায়নিক লবণ ,যদিও গ্রামের লোকেরা ব্যবহার করে তবে খাওয়ার জন্য নয়, চাষবাসের জন্য। পানিয়র জন্য তাদের একমাত্র ভরসা নারকেল গাছগুলো।

এদিক-ওদিক মাটি খুঁড়েও যে জল পাওয়া যায় তাও লবণাক্ত ,বলা যেতে পারে সমগ্র এলাকাটাই একটা তীব্র লবণের স্তরের উপর ।মজার কথা এই যে এই জল এখানকার মানুষরা কেউ পানীয় হিসেবে গ্রহণ না করতে পারলেও গাছগাছালি ও প্রাণীরা কিন্তু এই গাছের উপরেই ভরসা করে বেঁচে থাকে। তবে নদীর দুই তীরে বালি থাকার জন্য গাছ জন্মায় না, বেশিরভাগ গাছ ই নদীর তীর ছেড়ে গ্রামের ভেতর দিকগুলোতে ।

     সেগুলো অদ্ভুত বেগুনি পাতায় সারা দিনরাত সব সময় খাবার তৈরি করতে পারে ,তাই বাড়েও প্রতিদিন।  তবে গাছ বলতে কিছু নারিকেল , গুলমোহর আর যশুয়া, প্রজাতিভেদ খুবই কম। যশুয়া যদিও মরুভূমির গাছ তবু এখানেও পাওয়া যায় প্রচুর। যশুয়া গাছের কান্ড থেকে তৈরি হয় এক ধরনের দানাশস্য, এখানকার ব্রুইন উপজাতির বাসিন্দাদের এটাই প্রধান খাদ্য।

     পাশাপাশি পাঁচটা গ্রাম একসাথে, এদের রাজা আরডেন আর রানী এলিনা।

তবে এই রাজ্যে রাজার ভুমিকা কিছুই না, সম্পূর্ণ মহিলা শাসিত রাজ্য এটি এখানে রানী এলিনার কথাই শেষ কথা। গ্রামের মানুষ  জমিতে কিছু ভুট্টা আর আখ ফলায়,নদীতে মাছ ধরে, পিরানহা, স্যাড, স্যাডিন। এছাড়া সবাই তাদের বাড়ির উঠোনে যশুয়া গাছ লাগায়। কৃষি বলতে শুধু আখ,ভুট্টা যা হাতে গোনা কয়েকজনের জমিতে হয় তবে তা ও রানী এলিনার নির্দেশে রাজ সম্পত্তি।

   রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষই নিতান্ত দরিদ্র তাদের খাদ্য বলতে যশুয়া সাবু আর জাম্বোসির মাছ ।

ভাগ্যবান কয়েকজন উৎসব-অনুষ্ঠানে একটু আখের গুড় আর ভুট্টার খই পেলেই বর্তে যায়, তাওবা কজনের ভাগ্যে জোটে? রানী এলিনা নিজের সর্বেসর্বা হলেও তার চোখ কান হিসেবে তিনি রাজাকে নন বরং মন্ত্রী কে বেশি বিশ্বাস করেন ।

মন্ত্রী স্যাডউইক আগের মন্ত্রীর ছেলে, তার সঙ্গে এক সাথেই এলিনার রাজপ্রাসাদে বড় হওয়া। কিন্তু প্রাক্তন ও প্রয়াত  রাজা চারম্যান এর নির্দেশে ও পছন্দে রাজা আরডেনের  সঙ্গে তার বিয়ে । কিন্তু ক্ষমতার সর্বেসর্বা এলিনা নিজেই।

স্যাডউইকের বহু দিনের ইচ্ছে এলিনা কে নিজের করে পাওয়া তাহলেই আর তার রাজ ক্ষমতা একেবারেই নিজস্ব করে পাওয়াতে কোনো বাধা থাকবে না।

   এলিনার মেয়ে ইসাবেলা ফুটফুটে ষোলো বছরের কিশোরী সে আবার মায়ের উল্টো, বলা যেতে পারে এক্কেবারে বাবার মতন। রাজা আরডেন সাধারণ কৃষকের পোশাকে ঘুরে বেড়ান, মনের আনন্দে বাঁশি বাজান, নদীর তীরে সোনালী বালিতে খুঁজে বেড়ান রঙীন নুড়িপাথর আর প্রাসাদের জানালা থেকে তাকিয়ে দেখেন কেমন গাছের বেগুনি পাতা রোদ পড়লে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কেমন বসন্তকালের ছোঁয়ায় গুলমোহর ফুলে ফুলে ঢেকে যায়!

কেমন বেগুনি আকাশ মেঘে কালো হয়ে যায়! কেমন বৃষ্টির রিমঝিমে আওয়াজ বেগুনি গাছের পাতাগুলোকে আরো বেগুনি আরো সতেজ করে তোলে । তার এসব ভালো লাগেনা ,এই রাজত্ব ,এই রাজার সম্মান আর তাছাড়া তিনি এসব চাইবেনই বা কেন ?

এতো আর তার নয়? ভূতপূর্ব রাজা এক সাধারন পরিবার থেকে তাকে জামাই করে আনেন, ভেবেছিলেন তার সুষ্ঠু ব্যবহার, সুন্দর আচরণ ,রোমান্টিক প্রেমিক মন যদি এলিনার মত জেদি ,একগুঁয়ে ,অহংকারী, বদরাগী মেয়েটাকে একটু মানুষ করে তুলতে পারে।কারণ রাজা চারম্যান ছিলেন সত্তিকারের রাজা ,তিনি তার প্রজাদের কষ্ট বুঝতেন, তাদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন, খরা বন্যায় রাজ কোষাগার খুলে অকাতরে বিলিয়ে দিতেন খাদ্যশস্য ।উনি জানতেন রাজ ধর্ম প্রজাপালন।

      কিন্তু এলিনা তার উল্টো ,খুব ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর রাজা রাজ কাজের ব্যস্ততায় মেয়েকে নীতিবোধ ,রাজ ধর্ম কিছুই শিক্ষা দিতে পারেননি ।

তাই এলিনার কাছে মৃত পিতা মূর্খ এবং বর্তমান স্বামী অপদার্থ এর বেশি কিছু নয়্। তাই আরডেন এলিনার চোখে ঘৃণার চেয়ে বেশি করুনার পাত্র। এলিনা যখন সুরার রঙিন নেশায় চুর তখন আরডেন হয়তো জাম্বোসি নদীর তীরে কোন টিলায় বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন ,গুলমোহর, যশুয়া ফুল চিপে তার পাপড়ি থেকে রং বানাবার ব্যর্থ চেষ্টায় মগ্ন ।

       চারম্যান যেদিন মারা যান সেদিন তিনি বারবার করে কি যেন বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার জিভ অসাড় হয়ে যাওয়ায় তার শেষ বলা কথাগুলো কেউ স্পষ্ট করে বুঝে উঠতে পারেনি ,তবে বেশিরভাগ লোকই ধারণা করেন তার পূর্বপুরুষদের সম্পদ ভান্ডার যা বংশপরম্পরায় হস্তান্তরিত হয়ে আসছে তার কথাই তিনি বলতে চেয়েছেন ।

কিন্তু যাকে বলবেন সেই এলিনা  তখন শিকারে তাই জামাই আরডেন কে বলতে চেয়েও শেষটা আর সম্পূর্ণ স্পষ্ট ভাষায় বলে উঠতে পারেননি,শুধু যেটুকু বলেছেন তাতে রাজা আরডেন আর উপস্থিত সবাই শুধু এই কথাটাই বুঝতে পেরেছেন জাম্বোসি নদী।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন এলিনার বিশ্বস্ত সহচর স্যাডউইক যাকে এলিনা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন তিনি শোনার বিশেষ চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রাজার মৃত্যুশয্যায় এত লোক উপস্থিত, তাই চট করে জামাইকে ডিঙিয়ে গিয়ে তো আর রাজার মুখের কাছে উপস্থিত হওয়া যায় না !শুধু জাম্বোসি নদী এইটুকুনি শুনেই তাকে ক্ষান্ত থাকতে হয়।

রাজা চোখ বোজা মাত্রই ঘোড়া ছুটিয়ে স্যাডউইক চলে গেলেন আদায়ুর জঙ্গলে, যেখানে হরিণ শিকারে ব্যস্ত এলিনা । তাকে রাজার মৃত্যু সংবাদ দিলেন কিন্ত পারিবারিক সম্পত্তির কথা উল্লেখ করলেন না মোটেই।

    এলিনা রাজার মৃত্যুর পর পূর্ববর্তী ঘোষণা মত রানী হলেন যদিও প্রজারা মোটেও ওকে মেনে নিতে রাজি ছিল না বরং তাদের পছন্দ ছিল আরডেন কিন্তু মৃত রাজার সম্মান রাখতে, তারা এলিনা কে রানী হিসেবে , রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নেয়।

এলিনা সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গে রাজার বহুদিনের প্রচলিত উৎসবের দান-খয়রাত ,দরিদ্রের সাহায্য বন্ধ হল। খুলে দেওয়া হলো রাজ কোষাগার তাদের জন্য, যারা কিচ্ছু করবেনা, শুধু রাজ কোষাগার থেকে যা ভাতা দেওয়া হবে তাতেই তাদের চালাতে হবে ।

এই শর্তে মাসে পাঁচশ দিনার করে দেওয়ার ঘোষণা হল, কিছু মানুষ নাম লেখালো, যারা লেখালো না তাদের চাবুকের ডগায় বাধ্য করা হল।

আপনার মতামত এর জন্য

Shampa saha

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply