নতুন ভোর  – শম্পা  সাহা
shampasaha.

নতুন ভোর – শম্পা সাহা

                                     
Print Friendly, PDF & Email
=====================================

 

মাসের প্রথমে কোষাগারে লাইন দিয়ে তারা পাঁচশ দিনার করে রাজ অনুগ্রহ তোলে আর সেই দিয়ে বসে বসে সারা মাস চালায়। যদিও এক্ষেত্রে সুযোগ তারাই বেশি পেত যারা রাজ কর্মচারীকে পারিতোষিক দিয়ে বা তৈল মর্দন করে সুযোগটা আদায় করত। এভাবে ধীরে ধীরে ওই রাজ্যের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষই নাম লেখালো ওই খাতায়।

তারা ওই রাজ অনুগ্রহের পাঁচশ দিনারেই রাজার ভান্ডার থেকেই তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিয়ে যেত ফলে অর্থ আবার রাজ কোষাগারেই ফিরে আসতো। বাকি দশ শতাংশ লোকের বেশিরভাগই ছিল রাজকর্মচারী যারা রানী এলিনার হয়ে কাজ করতো।তাদের পরিশ্রমের যাবতীয় ফসল তুলে দিতো এলিনার রাজকোষে  বিনিময়ে তাদের জুটতো মজুরি, যা দিয়ে তাদের নিজেদের হাতের ফলানো ফসল ই কিনে খেতে হত।

        এভাবে চলতে চলতে চাষী চাষ করতে ভুলে গেল, জেলে মাছ ধরতে ভুলে গেল, ছুতোর মিস্ত্রি রেঁদা ধরতে ভুলে গেল। তারা সারাদিন বসে বসে এখানে-ওখানে খোশগল্প করে বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে শুয়ে থাকে। যা পাচ্ছে তাতে তাদের চালাতে কষ্ট হয়, চলে না, কারণ রাজভান্ডারে দিনে দিনে জিনিসপত্রের মূল্য বাড়ছে কিন্তু রাজার অনুদান বাড়ছে না, তাদের পেটে টান পড়তে লাগল।

যা পায় তাতে পেট চলে না কিন্তু ততদিনে ভিক্ষে পেতে পেতে তাদের হাত আর লাঙ্গল ধরতে  পারেনা, মুষ্টিবদ্ধ হতে পারে না ,শুধু হাত পাততে পারে চাওয়ার জন্য। রাজার নিজস্ব খামার বাদে সব জমি অনাবাদি হয়ে গেল, জাম্বোসি নদীর বালি এসে গ্রাস করল ভুট্টার ক্ষেত ,আখের জমি।

কৃষক-শ্রমিক মজুরদের মেরুদন্ড ততদিনে গেছে বেঁকে, তারা কিছু দাবি করতে ভুলে গেছে, সোজা দাঁড়াতে ভুলে গেছে ,শুধু একটা জিনিস মনে রাখে ,মাসের প্রথমে গিয়ে দাঁড়াতে রাজ কোষাগারে অনুদানের জন্য ।

   বিদ্যালয়গুলো গেছে বন্ধ হয়ে ,কারণ কোন কিছু শেখার দরকার নেই ,কাজ করবারই তো দরকার নেই। রানী এলিনা রাজকোষ তাদের জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছেন, কি দরকার পড়াশোনার ঝামেলায় ?তাই ছেলেপেলে আর স্কুলে যায় না, তারা প্রথম প্রথম সারাদিন মাঠে ঘাটে হুল্লোড় করতো , জাম্বোসি নদীর জলে দাপিয়ে বেড়াতো, কালো শরীর লবণাক্ত জলে স্নান করে আরো কালো।

ধীরে ধীরে তা কমে গেল, আস্তে আস্তে রোজ আধপেটা খেতে খেতে ,তাদের প্রাণশক্তি কমে আসতে লাগল, শিশুরাও এখন ক্লান্তিতে খেলাধুলা করে না, বড়দের মতো বসে গল্প করে ,আর অপেক্ষায় থাকে কখন ওই অনুদানের টাকায় কেনা শস্যদানা সেদ্ধ তাদের সামনে এসে পড়বে ।

আজকাল আর তারা অর্থের অভাবে নুন কিনতেও পারে না, সেদ্ধ করে পাতা, ডাল কুড়িয়ে এনে জাম্বোসি নদীর জলে। চোখের জলে তাদের খাবার আরও নোনতা। স্ত্রীরা স্বামীদের বলে, “কিছু কর, কিছু কর ,কিছু অন্তত কর, কিছু ফসল ফলাও”,কিন্তু ফলাবে কি ?বহুদিনের অনাকর্ষণে জমি বাঁজা, ঘরে একদানা শস্য ও নেই, তা খাবেই কি আর বুনবেই কি ? যে বিদ্যে জানা ছিল গত দশ বছর বসে বসে খেয়ে তাদের সে পুরনো শিক্ষাও  ভুল হয়ে গেছে।

      সাজোয়ান ছেলে রেবেক ,বছর বাইশ বয়স। যখন ভূতপূর্ব রাজা চারম্যান মারা যান তখন তার বয়স বারো বছর। তার আগে পর্যন্ত ওদের নিকোনো উঠোন ছিল, বেগুনি সবজিতে ভরা। বাবার সঙ্গে রেবেক, সকালে যখন বেগুনি আকাশ ফ্যাকাসে হয়ে সূর্য উঠতো, সকাল-সকাল পাখির গানের সঙ্গে সঙ্গে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি খেয়ে মাঠে যেতো ভুট্টা আর আখের চারাগুলোকে জল দিতে।নদীর নোনতা জল খাওয়া যেত না কিন্ত মাছ পাওয়া যেত বিস্তর।

কাঠের গামলা করে মাছ ধরে নিয়ে আসতো , সামান্য মসলা ছড়িয়ে সেঁকা মাছ! আহা কি স্বাদ !তারপর কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল ?রাজা চারম্যান মারা গেলেন ,রানী হয়ে সব ক্ষমতার অধিকারী হলেন এলিনা। স্যাডউইক এর বুদ্ধিতে মোম্বাসা একেবারে মরুভূমিতে পরিণত । লোকের পেটে ভুট্টার দানা নেই, পরণে পোশাক নেই, আজকাল তো লোকে যা অনুদান পায় তা দিয়ে দানাশস্য কেনে না, তার বদলে কেনে মদ,ক্যানক্যান!আখের রস পচিয়ে ,যা তৈরি হয় ওই রাজার প্রাসাদের এক কোণে স্যাডউইক এর তত্ত্বাবধানেই।

ভুট্টার দানার চেয়ে ঢের বেশি দাম ,কিন্তু বাড়ির পুরুষগুলো খাবার কেনার বদলে ওই ক্যানক্যান খেয়ে নেশা করে পড়ে থাকে । চরানোর অভাবে ছাগল গরু আর বাড়িতে নেই, গাছগুলো আছে তবে সবই রাজার খামারে। রাজ্যের মানুষ ভিক্ষা নিতে গিয়ে ওই গাছের অযত্ন করায় তারা ঝাড়ে বংশে নির্মূল । যেদিকে চোখ যায় শুধু সোনালী বালি আর ঝুপড়ি, কাঠের কুঁড়েতে মানুষ ধুঁকছে,শিশুরা খিদের জ্বালায়  কাঁদছে আর পুরুষরা নেশা করে পড়ে আছে পথে ঘাটে।

     একদিন রাতে হঠাৎ রেবেক স্বপ্ন দেখে তার মৃত বাবার সঙ্গে সে যেন মাঠে যাচ্ছে জাম্বোসি নদী থেকে জল এনে ছড়াচ্ছে তাদের ভুট্টার জমিতে। কি পুষ্ট ভুট্টার দানা !যেন  এক একটা বসরাই মুক্ত !হলদে ,গোল, উজ্বল !হঠাৎ একটা কান্নার রোলে ঘুম ভেঙে গেল রেবেক এর, “কে কাঁদে?

মরিয়ম কাছেই বসে ছিল বলল, ” সুসান খুড়ো মারা গেলেন! “,”তুমি কি করে জানলে ?”,মরিয়ম কোমরের কাপরের খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে বলল ,”কদিন ধরে খায় নি ,একটু জল  ও পায়নি!

শেষে ওই জাম্বোসির  জলই দেওয়া হয়েছিল ,নোনতা জল খুড়ো সহ্য করতে পারেনি”, “কেন ডাবের কি আকাল পড়েছে? “,ফুঁসে ওঠে রেবেক।”কোথায় পাবে? সবই রাজার বাগানে “,”কেন কিনে আনতে পারেনি? “রেবেকঃ বিরক্তি প্রকাশ করে । “সেদিন কি আর  আছে?

মোটে পাঁচশ দিনার তাও ঐ বদমাইশ ছেলেটা ক্যানক্যান খেয়ে সব শেষ করে দিয়েছে। শেষে জলের অভাবে মরতে হলো খুড়ো কে”,ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মারিয়াম । রেবেক বাইরে বেরিয়ে পৌঁছায় সুসানের উঠোনে। কেউ কান্নাকাটি করছে না ,করবে কি? অত কান্নার জল চোখে কোথা থেকে আসবে ?

ক্রমশঃ

 

আপনার মতামত এর জন্য

Shampa saha

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply