কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৫  –  সুব্রত মজুমদার
Subrata Majumdar

কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৫ – সুব্রত মজুমদার

                                     
Print Friendly, PDF & Email
============================================

হাবল বলল,”মিষ্টির রসটা ঠান্ডা ছিল। ওটা গরম থাকলেই দাদুকে আটকাতে পারত না কেউ। কিন্তু কিই বা করার, যা হবার তা তো হবেই। আর একটু জন্য দাদুর খেতাবটা আটকে গেল।”

              কিটকিট হাবল আর ক্যাবলকে আশ্বস্ত করে বলল, “কি করবে বল ভাই, যার কপালে যা আছে। এই তো সেদিন একটা বাঁদরের সঙ্গে ভাব হয়েছিল। পেয়ারা গাছে বসে দোল খাচ্ছিল। আমি নিচে বসে বসে একটা গাঁদার চারাকে উদরসাত করছিলাম। হঠাৎ আমার পায়ের কাছে একটা পেয়ারা

পড়তেই হকচকিয়ে গিয়ে ঢুকলাম এলাচের ঝোপে। তারপর সেখান হতে মুখটা একটু বাড়াতেই দেখলাম গাছের উপর একটা অদ্ভুতদর্শন প্রাণী। অনেকটা মানুষের মতো। ব্যাটা আমাকে দেখে দাঁত বের করে হাসছে।

সাহস করে বেরিয়ে এলাম। বেশ ভাবও জমে গেল। ও আমার লোম হতে মিছিমিছি উকুন বাছে আর আমি ওর মুখ দিই চেটে। বেশ চলছিল। হঠাৎ ওর নাকটাতে একটা আলতো কামড় দিতেই ব্যাটা আমার গালে মারল এক চড়। তারপর একলাফে উঠে গেল গাছে। প্রায় তিনদিন ব্যাথা ছিল।”

             কিটকিটের কথা শেষ হতেই দাঁড়িয়ে পড়ল দুই ভাই। হাবল ক্যাবলের পিঠে থাকা বোচকা হতে একটা মেডেল বের করে ঝুলিয়ে দিল কিটকিটের গলায় । কিটকিট অবাক হয়ে দেখল দুটো জুতোর ফিতে দিয়ে বাঁধা একটা পেল্লাই সাইজের ঘুঁটে, যার মাঝখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘গাধাশ্রেষ্ঠ’।

দেখেশুনে মুখ হতে কথা বের হল না কিটকিটের । সে একবার ঢোঁকগিলে চোখ বন্ধ করে বসে রইল।

             এদিকে ভোর হয়ে আসছে, পাখিরা নিজেদের বাসায় বসে বসে প্রভাতী কীর্তন করছে।

জাগো জাগো জাগো সবে হইল সকাল,
বাদুরেরা যায় উড়ে ফেলে পাকা তাল।
ঘটি হাতে সিধুজ্যাঠা হারুকাকা চলে,
পদ চলে দ্রুততর মোচড়ের বলে।
জেলেভুত চলে ফিরে বটের শাখায়,
আঁশগন্ধে তার পিছে যত মেছো ধায়।
ঘোষগিন্নি বাসনের ঝুড়ি নিয়ে চলে,
গোবরে লাগিয়া পা পড়ে ভূমিতলে।
আর্তনাদে বাসা ছাড়ে যত আছে পাখি,

সুব্রত জাগিয়ে দেখে বেলা নাই বাকি।।

একটা বটগাছের তলায় কিটকিটকে নামিয়ে হাবল বলল, “এখানেই বস। আমরা একটু প্রার্থনা করব।”
কিটকিট শুধাল, “কি প্রার্থনা ?”
-“একটু কালোয়াতি সুরে ভজন কেত্তন আরকি।” বলল ক্যাবল।

হাবল বলল, “তাহলে শুরু করি।”

হাবল আর ক্যাবল তাদের হেঁড়ে গলা নিয়ে ঘ্যাকো ঘ্যাকো শব্দে জুড়ল গান। ‘আ…. আ…’ করে সুর ধরতেই গাছ হতে একটা প্যাঁচা নেমে এসে টেনে ধরল হাবলের কান। বলল, “সারারাত খেটেখুটে যে একটু ঘুমুব তার জো নেই। এই কে রে তোরা ? তোদেরকে জেলে দেব।”

                 হাবল ফিচিক করে হেসে বলল, “সে জেল দাও আর ফাঁসি আমি গান করবই। গান না করলে দিন ভালো যাবে কি করে ? বাবার নির্দেশ।”
-“কোন বাবা ?” সুর চড়াল প্যাঁচা ।

হাবল আর ক্যাবল একযোগে বলল, “বাবা কাকেশ্বরানন্দ।”

                       প্যাঁচা যেন এবার একটু ঘাবড়ে গেল। সে হাবলের কান ছেড়ে বলল,”ব্যাটা মস্ত ধড়িবাজ। একবার হাটের মাঝে ওর হাঁড়ি ভেঙ্গেছিলাম বলে ও আমার উপর খেপে আছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাকে। দিনের বেলা দেখতে কম পাই বলে লড়াইয়ে পারব না রাত হোক তখন দেখছি।” এই বলে উড়ে গেল প্যাঁচা।

                               -কাকেশ্বরানন্দ-

                প্যাঁচাল চলে যেতেই একটা বিশাল দাঁড়াকাক এসে বসল বটের ডালে। হাবল আর ক্যাবলের আনন্দ ধরে না। তারা হাঁটুগেড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল,”প্রণাম হই বাবা।”
কাকটি ‘কা-কা’ রবে চিৎকার করে বলল, “ক্যা রে তোরা ? হাবলা আর ক্যাবল না ?”

ওরা তখন গদগদ হয়ে বলল, হ্যাঁ বাবা… ”

                 হাবল কিটকিটের দিকে ঈশারা করে কিছু একটা বলল। কিটকিট সেটা বুঝতে পারল না। তখন হাবল বিরক্ত হয়ে বলল,”ইনি বাবা কাকেশ্বরানন্দ, হিমালয় ফেরত। ইনি চাইলে তোমার কঙ্কাবতী হতে কণকধুতরো যা বলবে খুঁজে বের করে দেবে।”

                   কিটকিট তো আনন্দের আতিশয্যে অস্থির। সে ঢিপ করে প্রণাম ঠুকে বলল, “উত্তরে যাব বাবা। সেখানে যে জাদুকর থাকে, সেই জানে কঙ্কাবতীর খোঁজ।”

কাকেশ্বরানন্দ তার ঠোঁটখানা নামিয়ে বটের ডালখানা একবার খুঁটে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,”কা কা…. “

কিটকিট হকচকিয়ে গিয়ে বলল,”কি বাবা ?”

কাকেশ্বরানন্দ বলল, “আ মরণ, কিছু তো এখনও বললামই না। গলা ঝাড়লাম কেবল।”

-“কিছু তো বলুন বাবা।” বলল হাবল।

কাকেশ্বরানন্দ গম্ভীর স্বরে বলল, “সে একবার দেখেছিলাম বটে, মস্তবড় এক জাদুকর। পৌষসংক্রান্তির মেলাতে তাবু পড়েছিল তার। লাল নীল আলোর মাঝে টুপি হতে খরগোশ বের করে আনছিল। অনেকটা তোমার মতোই, – সাদা ধবধবে।”

               কোনোদিন সার্কাস দেখেনি কিটকিট। তার দিদি অবশ্য দু’একবার দেখেছে। তাই কৌতুহলী হয়ে বলল, “তারপর…. তারপর….”
কাকেশ্বরানন্দ বলল,”একটা লাঠি ছিল ওর… “

-“আমার এই লাঠিটার মতো ?” লাঠিটা সামনের দিকে ধরল কিটকিট।

    কাকেশ্বরানন্দ লাঠিটাকে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করে বলল, “হতেও পারে। অতটুকুই ছিল মনেহয় । কই আমাকে দাও তো একবার।”

কাকেশ্বরানন্দের নেমে এসে ঠোঁটে করে লাঠিখানা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। বলল,”কোথায় পেলে এটা ?”

কিটকিট বলল,”দিদির টিউশুনির দিদিমণি এই লাঠিখানা এনেছিল দিদিকে পেটানোর জন্য। আসার সময় আমি নিয়ে এসেছি।”

কাকেশ্বরানন্দ একবার পাখাদুটো ঝাপটে নিয়ে স্থির হয়ে বসল। এরপর লাঠিখানাকে নাড়াতে নাড়াতে চিৎকার করে আওড়াতে লাগল-

“গিলিগিলি ফটফট হুশফুশ ফাশ
ঝমঝম টমটম ঝড়াম ধপাস্।”

মন্ত্রখানা বারবার আওড়ানোর পরও কোনও কাজ হল না দেখে লাঠিখানা নামিয়ে রেখে বিজ্ঞের মতো বলল,”জাদুলাঠিটা কাজ করলে জাদুকরের খোঁজ পাওয়া যেত। তোমার দিদির দিদিমণি ঠিক কাজ করেনি হে। লাঠিটার জাদুগুণ নষ্ট করে দিয়েছে।”

 

চলবে……

 

 

আপনার মতামত এর জন্য

সুব্রত মজুমদার

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply