মন্দ বৌমা  – নিবেদিতা চক্রবর্তী
Nibedita Chakraborty

মন্দ বৌমা – নিবেদিতা চক্রবর্তী

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:January 1, 2021
  • Reading time:1 mins read

                                     
Print Friendly, PDF & Email

====================================

ভালোবেসে বিয়ে হয় আশিস আর অঙ্কিতার। আশিসের রক্ষণশীল পরিবার মেনে নিতে চায়নি প্রথমে এই বিয়ে।এই জন্য আশিসকে অনেক কাঠ খড় পুড়াতে হয়েছিল।অঙ্কিতা শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী মেয়ে।বৌভাতের দিন ই অঙ্কিতা বুঝতে পারে এ বাড়িতে বউদের কোনো সম্মান নেই।বাড়িতে মেয়েদের মতামতের কোনো দাম নেই।

আস্তে আস্তে সে বোঝে এবাড়িতে বউদের ক্ষিদে পেতে নেই,পছন্দ অপছন্দ থাকতে নেই আর অসুস্থ হওয়া তো ভীষণ রকমের অপরাধ।পরিবারে ছেলেরাই সর্বেসর্বা।বউরা শুধু তাদের যত্ন করে যাবে-এটাই তাদের এক মাত্ৰ কাজ।

খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার এটুকুই তাদের গতি বিধি।বাড়ির বাইরে তারা পা দিতে পারবেনা।একমাত্র দুর্গাপূজার সময় তারা ঠাকুর দেখতে বের হতে পারে।বিকেল চারটে তে ভাড়া গাড়ি করে তাদের ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়।ছটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে ই হবে ।প্যান্ডেলের আলোর রোশনাই তাদের তাই কোনোদিন ই তেমন করে দেখা হয়না।শাশুড়িমা জেঠিমা এই ভাবেই কাটিয়ে এসেছেন এ যাবৎ।অঙ্কিতার খুব খারাপ লাগে কিন্তু নতুন বউ মুখে কিছুই বলতে পারেনা।

দ্বিরাগমন থেকে যখন তারা ফিরেছিল শ্বশুর মশাই একটি কথাও বলেননি তার সাথে।ছেলেকে বলেছিলেন”শ্বশুর বাড়িতে থেকে বুঝি বাবা মা কে ভুলেই গেলে? নতুন বউ বুঝি সব ভুলিয়ে দিল?” অঙ্কিতা বুঝতে পারেনা নিয়ম পালন করতে আশিস কে তারাই তো শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়েছিলেন।তাহলে অঙ্কিতার দোষ কোথায়!দিন কাটতে থাকে আর অঙ্কিতার ভেতরে ভেতরে কষ্ট বাড়তে থাকে।আশিস আর অঙ্কিতা মিলে কত প্ল্যান করেছিল হানিমুনের।

কিন্তু শ্বশুর মশাই স্পষ্ট বলে দিলেন ,”বউ নিয়ে এসব আদিখ্যেতা এই বাড়িতে চলেনা।” আশিস খুব ভালো ছেলে।কিন্তু বাবা মার মুখের উপর সে কিছুই বলতে পারেনা।এভাবে দম বন্ধ করা পরিবেশে দিন কাটতে থাকে অঙ্কিতার।ও দেখে শাশুড়ি মা,জেঠিমা সারাটা দিন ধরে পরিশ্রম করেন কিন্তু কত অপমান ই না সহ্য করতে হয় তাদের ।গাছের থেকে ডাব পাড়া হলে গুনে গুনে রাখা হয় বাড়ির ছেলেদের জন্য। বাকিটা বিক্রি করে দেওয়া হয়। বাড়ির বউদের জন্য ভুলেও একটি ডাব ও রাখা হয়না। সন্ধ্যা বেলা কোনো মুখরোচক খাবার আনা হলে তাতেও বাড়ির বউদের থাকেনা

কোনো ভাগ অথচ তাদের ই খাবার সাজিয়ে মুখের সামনে ধরে দিতে হবে বাড়ির পুরুষ মানুষদের। বউদের যেন কোনো ইচ্ছে অনিচ্ছে কিছু থাকতে নেই।এভাবে প্রতিদিন আত্মসম্মানের মৃত্যু হচ্ছিল অঙ্কিতার।অপমানে ভিতরে ভিতরে মরছিল সে। আশিস বোঝে তার কষ্ট কিন্তু বাবা জ্যাঠার মুখের উপর কিছু বলার অভ্যাস নেই তার।থাকলে তার মা জেঠিমাকে এত বছর ধরে নির্যাতিত হতে হতনা।ও আস্তে আস্তে বুঝতে পারে নিজেকেই রুখে দাঁড়াতে হবে।এভাবে নিজের সত্ত্বা, নিজের অস্তিত্ব ,সম্মান বিসর্জন দিয়ে তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়।মুখ খুলতে থাকে ও ধীরে ধীরে।

সন্ধে বেলায় শ্বাশুড়িমা আর জেঠি শাশুড়িমাকে নিয়ে টি ভি খুলে বসে ড্রয়িং রুমে।শ্বশুর মশাই তা দেখে রেগে যান ভয়ানক।বলে ওঠেন,”তোমাদের কাজ কর্ম নেই কোনো?বসে বসে আয়েস করছ?”অঙ্কিতা এবার উত্তর দেয়,”সারাদিনের খাটুনির পরে এটুকু আয়েস তো করতেই হবে। একটু পরে তো আবার রাতের খাবার তৈরি করার জন্য উঠতে হবে আমাদের।”

মুখে মুখে কথা শুনতে অভ্যস্ত নন শ্বশুর মশাই। তিনি রাগে গজ গজ করতে থাকেন ।কিন্তু অঙ্কিতা ওঠেনা আর মা, জেঠিমাকে উঠতেও দেয়না। এরপর প্রতিদিন ই সন্ধে বেলা টিভি দেখে তারা।এক ঘেয়েমি থেকে একটু অন্য রকম হওয়ায় কিছুটা শান্তি পায় বয়স্ক দুই মহিলা।কিছুটা স্বস্তি পায় অঙ্কিতা।এরপরে একদিন সন্ধে বেলায় তারা টিভি দেখছে ,শ্বশুর মশাই আসলেন সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে এক ঠোঙা সিঙ্গারা হাতে নিয়ে।।

এসে তাকে ডেকে বললেন,”সিঙ্গারা গুলো ভাগ করে দাও তো বৌমা।শোনো,আমাকে,আমার দাদাকে দুটো করে দেবে, আর আমার ছেলের জন্য দুটো রেখে দেবে। ওর তো আসার সময় প্রায় হল।” অঙ্কিতা দেখলো শ্বশুর মশাই একদম গুনে গুনেই সিঙ্গারা এনেছেন। তাদের তিন জনের জন্য কিছুই আনেন নি। লোভে নয় ,অসম্মান আর অবহেলায় তার চোখে জল এসে গেল ।সে ভাবলো এর একটা বিহিত দরকার।

সে সবাইকে একটা করে সিঙ্গারা দিল।নিজেরাও শ্বশুর মশাইয়ের সামনেই একটা করে নিল।নিজের প্লেটে একটা সিঙ্গারা দেখে তো শ্বশুর মশাই রেগে আগুন।অঙ্কিতা বলে,”মা,জেঠিমা আমি, আমরা সবাই সারা দিন আপনাদের জন্য কত পরিশ্রম করি।তেতো থেকে টক পঞ্চ ব্যঞ্জনে রান্না করে আপনাদের খাবারের থালা সজিয়ে দি ।

সব সময়ে ভাবি কী করে দিলে আপনারা ভাল খাবেন আর আমাদের ই সামনে আমাদের না দিয়েআপনারা কি খেতে পারবেন?তাই আমি আপনার আনা সিঙ্গারা সবাইকে সমান ভাগ করে দিয়েছি ।ঠিক করেছি তো বলুন।”

শ্বশুর মশাই কথাটা পছন্দ না হলেও কিছু বলতে পারলেন না।এইভাবেই একটু একটু করে সংসারে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে অঙ্কিতা তার চারিত্রিক দৃঢ়তা দিয়ে।ও বুঝতে পারে মুখে কিছু না বললেও আশিসের এই ব্যাপারে সমর্থন আছে।কিন্তু শ্বশুর মশাই,জ্যাঠা শশুর মশাইয়ের কাছে সে অত্যন্তখারাপ, মুখরা,তর্কবাগীশ বৌমা।কিন্তু অঙ্কিতা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এই বাড়ির নিয়মের নামে প্রচলিত নিষ্ঠুরতা গুলোকে সে দূর করবেই।তাই তার চেষ্টা চলতে থাকে।

শাশুড়িমা আর জেঠি শাশুড়িমার বদ্ধ একঘেয়ে জীবনে একটু যেন খুশীর ছোঁয়া লাগে।অঙ্কিতাকে তারা আশীর্বাদ করে সে যেন সুখী হয়।তাদের মতো তাকে যেন প্রতি নিয়ত অপমানিত,অসম্মানিত হয়ে জীবন কাটাতে না হয়।

Print Friendly, PDF & Email

আপনার মতামত এর জন্য

নিবেদিতা চক্রবর্তী

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply