আমার প্রিয় নদ অজয় –  সুদীপ ঘোষাল
Sudip Ghoshal

আমার প্রিয় নদ অজয় – সুদীপ ঘোষাল

  • Post category:গদ্য
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:January 1, 2021
  • Reading time:1 mins read

                                     
Print Friendly, PDF & Email

====================================

 

বিহারের জামুই জেলা চাকাই ব্লকের বাটপার অঞ্চলের ৩০০ মিটার উচু পাহাড় থেকে উৎসারিত হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে এটি দেবীপুরের নিকটে ঝাড়খন্ডে প্রবেশ করে (দেওঘরের প্রস্তাবিত শিল্প অঞ্চল) দিয়ে গিয়ে অজয় নদ ঝাড়খণ্ডের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের নিকট শিমজুড়িতে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে এবং এটি প্রথম বর্ধমানে এবং ঝাড়খণ্ড হয়ে এবং পরে পশ্চিম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া ঘাট, বীরকুলটি ঘাট, দরবারডাঙা ঘাট ও সিদ্ধপুর ঘাট হয়ে এবং বীরভূম জেলার বড়কোলা, তামড়া, বিনুই ও নবসন গ্রামের সীমানা হয়ে পূর্বে প্রবাহিত হয়ে পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার নারেং গ্রামে প্রবেশ করে কাটোয়া শহরের কাছে ভাগীরথির সংগে মিলিত হয়েছে।

অজয় নদের মোট দৈর্ঘ্য ২৮৮ কিলোমিটার তার মধ্যে শেষ ১৫২ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে। অজয়ের প্রধান উপনদীগুলি হল ঝাড়খণ্ডের পাথরো ও জয়ন্তী এবং বর্ধমানের তুমুনি ও কুনুর।

অজয় নদের ধারা থেকে অনেকদুর অবধি পার্বত্য অঞ্চলের ল্যাটেরাইট মাটির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বর্ধমানের আউশগ্রামে এসে সমভূমিতে প্রবেশ করে। অজয় নদের উপত্যকায় জঙ্গল ছিল। কিন্তু অধুনা খনিজ নিষ্কাষণ ও অন্যান্য মনুষ্যজনিত উপদ্রবে বেশিরভাগ জঙ্গল সাফ হয়ে গেছে।সম্প্রতি, ভারত সরকার (নৌ পরিবহন মন্ত্রক) অজয় নদকে জাতীয় নৌপথ আইন, এর আওতায় জাতীয় জলপথ – ৭ হিসাবে ঘোষণা করেছে।অজয় নদ, নদী নয়। অজয় নদে বাণ এলে ভয়ংকর তার রূপ হয়। কবি লিখেছেন, ” অজয় নদে বাণ এসেছে, ঘরবাড়ি সব তলিয়ে গেছে “।

গ্রীষ্মকালে অজয় নদীতে হাঁটুজল থাকে। হেঁটে নদী পারাপার করা যায়। গরুর গাড়ি জলের উপর দিয়ে পার হয়ে ওপাড়ে যায়। গরুর গাড়ি করে বালি নেয় অনেকে। তারপর বর্ষাকালে ভরা নদীর যৌবন। তখন নদী ভরে যায় জলে।বন্যায় অনেকবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাটির বাড়ি গুলো পড়ে যায়। বর্ষাকালে নদী দিয়ে অনেক নৌকা যায়।

নৌকায় মাছ ধরে এবং মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। নদীর গোপন পান্ডুলিপি খুঁজতে নিত্য আমার আনাগোনা তার পাশে পাশে। গ্রীষ্মে দেখি শুকনো বালির বৈশাখী কালো রূপে আলো ঘেরা অভয় বাণী ।বর্ষায় পরিপূর্ণ গর্ভবতী নারীরূপ । এই রূপে জলবতী নদীতে অতি বড় সাঁতারু ভুলে যায় কৌশল । আমি তখন নদীর বুকে দুধসাদা ফেনা হয়ে ভাসতে ভাসতে চলি বাক্যহারা হয়ে ।

এবার শরতে কাশ ফুলের কারসাজি। শরৎকালের নদীর দুই ধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা হয়ে যায়। একদম দুইপাড় ভরে থাকে কাশফুলের সাদা রঙে। একবার অজয়ের নদের বন্যার সময় স্কুল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের নেতা। কোথাও সাঁতার জল কোথাও বুক অবধি জল। একটা সাপ বিশুর হাতে জড়িয়ে ধরেছে। বিশু এক ঝটকায় ঝেরে ফেলে দিলো সাপটা।

স্কুল আমাদের যেতেই হবে। সাঁতার কাটতে কাটতে আমাদের সে কি উল্লাস। যে কোনো কঠিন কাজের সামনাসামনি বুক চিতিয়ে সমাধান করার মতো মানসিকতা বিশুর ছিলো। সে সামনে আর আমরা চলেছি তার পিছুপিছু। শেষ অবধি পৌঁছে গেলাম স্কুল। হেড মাষ্টারমশাই খুব বাহবা দিলেন স্কুলে আসার জন্য। তিনি বললেন, ইচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।

আমরা ছোটবেলা থেকেই অজয় নদীর ধারে এসে বর্ষাকালে জলের স্রোত দেখতাম। অজয় নদীর পাড়ে একটি গ্রাম আছে। তার নাম যতীনপুর।যতীনপুরের ছেলে। সকলে আমরা ছোট ছেলেমেয়ে।আমাদের সকলের আট দশ বছর বয়স। তখন সবাই একত্রে এসে নদীর পাড়ে এসে জলের মজা দেখতাম। হঠাৎ কি হল নদীর পাড় ভেঙে একটি ছেলে পড়ে গেল। কোথায় যে চলে গেল তার কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না। এখনোও আমাদের দুঃখের সেইসব স্মৃতি মনে আছে।

অজয় নদে দেখেছি গ্রীষ্মকালে নদের মাঝখানে জমির মত ধান চাষ হয়। কিন্তু বর্ষাকালে সেই নদ আর চেনা যায় না। কী ভয়ংকর সে নদ তখন। বন্যায় মাটির ঘর বাড়ি ভেঙে যায়। আর কত শত ছাগল, গরু যে জলে ভেসে চলে যায় তার ইয়ত্তা নেই। অজয় নদের দুই ধারে যে লোক গুলো বাস করে তাদের প্রধান জীবিকা হল মাছধরা।

তারা নৌকা নিয়ে বর্ষাকালে মাছ ধরে এবং গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে। বর্ষাকালে ভরা নদে আমরা সকলে মিলে স্নান করতে ভালোবাসি। আর গামছায় করে ছেঁকে মাছ ধরি। ছোট ছোট কত রংবেরঙের মাছ ধরে যে আনন্দ হয় তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। এই অজয় নদীর সঙ্গে যুক্ত আমাদের একটা কাঁদর আছে। সেই কাঁদরের নাম ঈশানি নদী। এই ঈশানি নদী আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে। বর্ষাকালে অজয়ের বন্যা সাথে সাথে ঈশানী কাঁদর বা ছোট নদী ও ভরে ওঠে। সেখানেও মাঝিরা জাল ফেলে মাছ ধরে। তারপর অনেকে নৌকা নিয়েও এই ছোট নদীতে মাছ ধরে।

একবার বন্যার সময় আমরা বন্ধুরা মিলে অজয় নদে নৌকা করে আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম। আমাদের দলের নেতা ছিল দিলীপ। সে খুব সাহসী ছেলে। সে নৌকা নিয়ে লগি ঠেলে যেতে লাগল মাঝ নদীতে। একদম চলে গেছিলাম অনেক দূর পর্যন্ত।

তারপর নদে মাছ ধরেছিলাম। তারপর সন্ধ্যেবেলায় ফিরে এসে বাড়িতে সেই মাছ ভেজে খাওয়া হয়েছিল। আজ অজয় নদীর পাশ দিয়ে গেলে সেই সব স্মৃতি মনে ভেসে ওঠে।

 

Print Friendly, PDF & Email

 

 

আপনার মতামত এর জন্য

সুদীপ ঘোষাল

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply