ভুল রিপোর্টের পরিণাম   – নয়ন মালিক
Nayan Malik

ভুল রিপোর্টের পরিণাম – নয়ন মালিক

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:January 3, 2021
  • Reading time:1 mins read

.

ডিয়ার পাপু,

আজ তোর কৌতূহলের অনেকটাই মেটাব। তুই অদিতির সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলি , এতদিন কিছু বলিনি কিন্তু আজ বলবো । সত্যি বলছি আজ শুধু অদিতির কথায় বলবো ।

আজ না বলতে পারলে আর যে সময় হবে না । তাই আজ আর কিছু লুকাবো না।
জানিস পাপু আজ সারাদিন অদিতির জন্য মনটা কেমন করছে । বুকটা ভারাক্রান্ত বেদনায় মলিন । আজ আকাশটাও কেমন মেঘাচ্ছন্ন ।থমথমে । যেন আমার বুকের বেদনায় বিভোর । আমার সঞ্ছিত বেদনা প্রকাশ করার জন্য মেঘ তার সমস্ত শক্তি দিয়ে সূর্যের আলো রুদ্ধ করেছে।

আঃ… পাপু আমার বুকে ভীষণ পেন হচ্ছে , ভীষণ যন্ত্রণা । তা হোক যন্ত্রণায় হৃৎপিণ্ড খসে গেলেও আজ অদিতির কথায় বলবো । এই বেদনাঘন মেঘলা মেঘাচ্ছন্ন দিনে শুধু ……।

জানিস পাপু অদিতি খুব সুন্দর দেখতে , গুডলুকিং । যাকে বলে বিউটিফুল আর হ্যান্ডসাম । জয়ফুল আর দুষ্টু মিষ্টিতে ভরা । ফ্রড বলতে তার মাইন্ডে এত টুকু জায়গা নেই । সত্য আর প্রেমের জন্য সমাজকে কেয়ারই করেনা ।
জানিস পাপু ….একদিন অদিতি কি বলেছিল … বলেছিল…

–তোমাকে লাইফ পাটনার ইসাবে না পেলে আমি মরে যাব । আমি বাঁচতে পারব না .
ওর ঐ আবেগ ভরা কথা শুনে আমার ভীষণ হাসি পায় । আমার ভীষণ ফানি লেগেছিল । মজা করে বলেছিলাম ….
–এত ছেলে থাকতে আমায় ভালোবাসলে কেন …?
উত্তরে অদিতি তার আবেগ ভরা কণ্ঠে বলেছিল…।

–তা বলতে পারব না , আমি নিজেই জানি না।
তারপর দুরের ঐ কালো কালো খণ্ড খণ্ড মেঘ জমা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল …।
–ঐ যে দুরের আকাশটা দেখছ ওটা তোমার ভালো লাগে ?
আমি ভঙ্গিমা না করে সহজ স্বাভাবিক গলায় বলেছিলাম …

–আমার কবি মন , প্রকৃতির সব সৌন্দর্যই ভালো লাগে ।
অদিতি সরল সুন্দর মুখে একটা শান্তির শীতল ছায়া টেনে বলেছিল …
–ঠিক তাই ঐ আকাশটা যেমন তোমার ভালো লাগে , অনেক মানুষ কে দেখবে যাদের কাছে ঐ সৌন্দর্যের কোন মূল্যই নেই । নিরস ব্জ্র পদার্থ । দু নয়ন ভরে দেখা তো দুরের কথা একবার তাকাবেনা পর্যন্ত। সেই রকম এক অজানা কারনে তোমাকে আমার ভাললাগে , কাছে পেতে ইচ্ছা করে । অথচ অন্য পুরুষের প্রতি সেই অ্যাট্রাকশন নেই ।

পাপু শুনছিস … সেদিন ওর কথায় কৌতুক অনুভব করেছিলাম । তখন আমি অদিতিকে অত গভীর ভাবে ভালবাসতে পারিনি । কিন্তু পরে বুঝেছি ভালোবাসা কি জিনিস । এখন মনে হয় অদিতিকে না পেলে আমিই বাঁচতে পারব না । শুধু দুচোখ ভরে দেখার জন্য মন ছটফট করে, বুকের ভিতরটা বেদনায় শুকিয়ে যায় ।

ঘুম গেছে ছুটে । বিছানা জুড়ে এপাশ ওপাশ করি, কিছুতেই ঘুম আসেনা । এফ.এম.এ গান শুনি তবুও মনের চঞ্চলতা যায় না। মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাব । আমার জীবনে যে এ দিন আসবে ভাবা তো দুরের কথা কল্পনা করিনি ।
এই দেখ তখন থেকে আমার কথায় বক বক করছি । না আজ আমার কথা নয় । আজ শুধু অদিতির কথা বলব । শুধু অদিতির ….।

জানিস একদিন আমার কবিতা গুলো পরে অদিতি বলেছিল …
–তোমার কবিতা গুলো অপূর্ব , এক্সিলেন্ট…দারুন গাঁথুনি শক্তি আছে ।
আমি অবজ্ঞার সুরে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেছিলাম …।
–থ্যাঙ্কস !

–দেখবে একদিন তুমি কবি বলে সম্মান পাবেই
আমি একচিলতে তাচ্ছিলের হাসি হেসে বলেছিলাম …
–অলসো থাঙ্কস …!

আমার কথায় অদিতি রেগে যায় । করা স্বরে প্রতিবাদ করে বলেছিল …
–থ্যাংকস কেন ! প্রেমিকার সব কথায় বুজি থ্যাংকস জানাতে হয় । আমার সঙ্গে কি থ্যাংকসের সম্পর্ক ।
আমি মৃদু হেসে বলেছিলাম …
–আচ্ছা স্যরি… সেম ভুল আর সেকেন্ড টাইম হবে না ।

অদিতি আমার কথায় তার প্রশস্ত সুন্দর মুখে এক মনোরম হাসির ঝিলিক টেনে মধুর সুরে বলেছিল …
–বাবা..রে ..বাবা , তোমায় নিয়ে পারি না । ইংরাজিতে অনার্স করছ বলে কথায় কথায় ইংরাজি ঝারতে হবে ।
আমি কুরু হেসে বলেছিলাম …
–উপহাস করছ ।

তারপর অদিতি আমার আরও কাছে সরে এসে ওর ঝর্নার মত চুল ভর্তি মাথাটা আমার কাঁধের উপর আলত ভাবে নামিয়ে মোলায়েম স্বরে বলেছিল ।।
— জান দিপু .. একদিন তোমার মত কবির স্ত্রী হব । তোমার সঙ্গে আমারও কত নাম হবে ।
অদিতির আবেগ ভরা কথায় আমার ভীষণ হাসি পায় । থাকতে না পেরে হো হো করে হেসে উঠেছিলাম । ও রাগ করে বলেছিল …
–হাসছ কেন …আমি হাসির কি বললাম …।
আমি পুনরায় হেসে উত্তর দিয়েছিলাম

–আমি কোনদিন কবি হব কি না জানি না । তবে তুমি যে আমার মত ফেলিওর কবির স্ত্রী হবে এটা গ্যরান্টি ।
আঃ…. আঃ …পাপু যন্ত্রণায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে । ভীষণ যন্ত্রণা । সত্যি বলছি প্রচুর কষ্ট হচ্ছে । আর লিখতে পারছি না । আমার হাতটা কাঁপছে …দ্বারা..একটু রেস্ট নিই । না… না… রেস্ট নিলে অদিতির কথা আর বলা হবে না । এখনি হয়তো মৃত্যু…।

পাপু সত্যি করে বল , অদিতির কথা শুনতে তোর কেমন লাগছে । নিশ্চয় বোর হচ্ছিস । তবুও শেষ পর্যন্ত ফিনিশ করিস । আর একদিন অদিতির কথা বলছি শোন …সেদিন দুজনে বর্ধমানে গোলাপবাগ পার্কে বেড়াতে গেছি । দুজনে গল্প করছি । একসময় অদিতি তার আবেগ ভরা কণ্ঠে বলে ওঠে …

–জান দিপু …তোমার ভালোবাসা না পেলে বুঝতাম না জীবন কাকে বলে , জীবন কত সুন্দর ।
অদিতির কথা শুনে মনে হল একটু মজা করা যাক । আমি মজার ছলে বলেছিলাম …।
–তোমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসি কে বলল…।

অদিতি আমার কথা শুনে ভীষণ ভাবে চমকে ওঠে ।
–মানে..!!
আমি হালকা চালে বললাম
–মানে খুব সিম্পল..তুমি আমায় ভালোবাসো তাই , আমি কোন দিন ভালোবাসি নি ।
অদিতি আমার কথা শুনে ভয়ঙ্কর শিউরে ওঠে …তার সারা শরীর উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে , ধরা গলায় বলে
–একি বলছ দিপু …আমাদের এত দিনের মেলামেশা ।
আমি স্বাভাবিক হালকা চালে বলালাম

–ওটা স্রেফ অভিনয়….তোমার মত মেয়েকে কাছে পাবার জন্য ।
অদিতি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে …
–তুমি বল দিপু …যা বললে সব মিথ্যা….সত্যি নয় ।
–তা কেন , আমি যা বললাম সব সত্যি ।
অদিতি প্রচণ্ড রেগে যায় । লজ্জায় অভিমানে তার রাঙা গাল টকটকে লাল হয়ে ওঠে। হরিণের মত চোখ জোড়া জলে ছল ছল করে ওঠে । সে কম্পিত ধরা গলায় বলেছিলো …

–তুমি এত বড় নিচ জঘন্য প্রতারক …তোমার কবি মনের আড়ালে যে …ছি ছি দিপু …আছা বেশ …।
তারপর হঠাৎ তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা ট্যাবলেট বের করে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে ওঠে ।
–জান দিপু এটা সায়ানাইডের বড়ি…এটা খাবার কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত । সঙ্গে কেন রাখি যেন …যদি কোন কারনে তোমাকে হারাতে হয় তবে এ জীবন আর রাখবনা বলে । আর আজি যখন সেই দিন … আচমকা সে আমার বাঁধা দেবার পূর্বেই বড়িটা মুখে পুরে ফেলে ।

হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত রুদ্ধশ্বাস ঘটনায় আমি বিহল হয়ে পড়ি । মজাটা যে এই ভাবে সিরিয়াস হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি । আমার বাক্যশক্তি রোধ হয়ে যায় । এক অপ্রাত্যাশিত ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে থাকে । আমি পাগলের মত অদিতির শরীরটা আঁকড়ে বলি…
— অদিতি এ তুমি কি করলে …আমি মজা করছিলাম … তোমাকে সত্যি ভালোবাসি…আই লাভ ইউ । প্লিজ বড়িটা মুখ থেকে ফেলে দাও …আমি তোমাকে কিছুতেই মরতে দেব না …কিছুতেই না।
অকস্মাৎ অদিতি হো হো করে হেসে ওঠে । ওকে হাসতে দেখে আমার বুক থেকে কয়েক মন বোঝা নেমে গেল । আমি স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ি । অদিতি হাসতে হাসতে বললে…

–সায়ানাইডের বড়ি কোথায়…! যখন বোঝতে পারলাম তুমি মজা করছ , তখন আমিও …। কেমন বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছি তো । এই…দিপু কি হল …মুখটা গমরা করে …রাগ হয়েছে বুঝি …আচ্ছা বাবা , অন্যায় হয়েছে… এই রকম মজা আর করব না…। কথাটা বলেই অদিতি আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে তার সুন্দর পদ্মের মত কোমল ঠোঁট দিয়ে কিস এঁকে দিল ।
এই প্রথম অদিতি আমায় কিস করল আমি অদিতির তুলোর মত নরম শরীরটা আলিঙ্গন করে বলি…।
–প্রতিজ্ঞা কর …কখনো এ রকম মজা করবে না ।

অদিতি ওর তুল তুলে মাথাটা শুধু নাড়াল। আমি ওর কোমল শরীরটা আরও দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধরে অপলক নয়নে চেয়ে থাকি ।
অদিতি মায়াবী মুখে এক ঝলক হাসির বন্যা বয়ে বলেছিলো
–কি দেখছ অমন করে …?

— তোমাকে আজ নতুন দেখাছে …একেবারেই আলাদা । তারপর আমি আমার ঠোঁট জোড়া দিয়ে ওর মায়াবী লালা টুকটুকে ঠোঁটে কিস এঁকে দিই ।ওর গাল দুটো লজ্জায় আরও রাঙা হয়ে গেল । অদিতি লজ্জিত কণ্ঠে বলল …
–ছেড়ে দাও…কেউ দেখবে ।

–আঃ…আঃ পাপু …আর পারছি না …ভীষণ পেন হচ্ছে । যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে হৃৎপিণ্ড । এবার বোধহয় সময় হয়ে এল । আর ডিটেলসে বলার সময় নেই । তাই সংক্ষেপেই বলছি । তুই নিশ্চয় বুজতে পারছিস আমারা দুজন দুজন কে কতটা ভালোবাসি । অথচ এই ভালোবাসা আর অদিতিকে একদিন আমি হত্যা করলাম । বিশ্বাস হল না ? সত্যি বলছি আমি নিজের হাতে খুন করেছি ,যাকে বলে পরিকল্পিত মাডার । আমি খুনি ।

তার রক্তে রঞ্জিত করেছি আমার হাত । তার ভালোবাসার দিয়েছি কবর । তোদের মতে ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকে সে আমায় কোনদিন ক্ষমা করবে না । কোনদিন না । জানি তোর খুব জানতে ইচ্ছে করছে…বলছি শোন তবে ডিটেলসে নয় …আর হাতে বেশি সময় নেই।

অদিতির সঙ্গে দেখা করার কয়েকদিন পর , আমার শরীরটা ভালো বোধ করছিলাম না । ভেবেছিলাম ডাক্তার দেখাব না, এমনি সেরে যাবে । কিন্তু বাড়ির পেড়াপেরিতে দেখাতে হল । ডাক্তার বাবু ব্লাড টেস্ট করতে বললেন ।

কিন্তু যেদিন ব্লাড টেস্টের রিপোর্টটা আমার হাতে এল , আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল । এক লহমায় ওলটপালট হয়ে গেল আমার জীবন । একদিকে আমার ভালোবাসা অদিতি । অন্যদিকে ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট । রক্তে নাকি এইচ আই ভি পাওয়া গেছে । ডাক্তার বাবু বললেন আমার নাকি এডস হয়েছে । কেউ আমায় বিশ্বাসই করছে না । সবাই বলছে আমি নাকি খারাপ মেয়ের সঙ্গে মেলামিশা করেছি , শারিরিক সম্পর্ক করেছি । কোন মুখ নিয়ে অদিতির সামনে দাঁড়াব !

সেদিন সারা রাত আমার চোখে ঘুম এলনা । বিছানায় এপাশ ওপাশ করি । অদিতির জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল । বার বার বুকের ভিতরটা মচর দিয়ে উঠে । আমার জন্য ওর ফুলের মত জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে । কেন যে অদিতি আমায় ভালবাসল । সারারাত ভাবলাম কি করা যায় । শেষে ঠিক করলাম আমার জন্য ওর জীবনটা নষ্ট হতে দেব না । আমি ওর জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যাব ।

ঠিক করলাম আমার সম্পর্কে অদিতিকে ভুল বোঝাতে হবে । যাতে আমায় ঘৃণা করে । আমাকে ঘৃণা করতে পারলেই ওর মঙ্গল । আমার মত এক এডস আক্রান্ত রোগীর অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে ওকে জড়িয়ে লাভ নেই । অদিতির সুখই তো আমার কাম্য ।
আমার সম্পর্কে অদিতির ভুল ধারনা সৃষ্টি করার জন্য , আমি একটা মেয়ের নাম দিয়ে মিথ্যা বিয়ের কাড ছাপালাম । কাডের সঙ্গে দিলাম একটা চিঠি ।

“ অদিতি পারলে আমায় ভুলে যেও ,তোমার কথা রাখতে পারলাম না । আমি অন্য একটা মেয়ে বিয়ে করছি, তারা অনেক বড়লোক , অনেক টাকা পণ দিচ্ছে ।তোমাকে বিয়ে করলে তো কিছু পেতাম না তাই রাজি হয়ে গেলাম । তুমিও অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসার পেত । আর পারলে বিয়ের দিনে এসে আশীর্বাদ করে যেও”।

পাপু তুই বিশ্বাস করবি না , আমার এই প্রতারণা মূলক চিঠি পেয়ে অদিতির অবস্থা । সে কথা বলতেই আমার চোখ ফেটে জল আসে । অদিতি একেবারে পাথর হয়ে গিয়েছিল । শুনলাম দুদিন খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত করেনি । সবসময় চুপ চাপ পরে থাকে । কারুর সঙ্গে কথা বলে না । জানতে পারলাম ফাইনাল পরীক্ষাটাও দেয়নি ।

এর বেশ কয়েকদিন পর শুনলাম অদিতির অনিচ্ছা আর আপত্তি সত্ত্বেও ওর বিয়ের বন্দোবস্ত করেছে । সত্যি বলছি শুনে স্বস্তি পেলাম মনে । এবার অদিতি নিশ্চয় সুখি হবে ।

কিন্তু অদিতির বিয়ের দিন পৃথিবী যেন এক লহমায় শূন্য হয়ে গেল আমার কাছে । যেন গবীর তপ্ত মরুভূমির বুকে একা দণ্ডায়মান ক্লান্ত বিধ্বস্ত এক পথিক । গবীর তপ্ত বালি ঝলসে দিচ্ছে আমার দেহ । এই জ্বালা থেকে আর পরিত্রাণ নেই । আজ মৃত্যু ঘটে গেল দীপের । অদিতি আজ অন্যজনের হয়ে যাবে । ভাবতেই আমার বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে ওঠে । চুপ চাপ বসে বসে ব্লাড টেস্টের রিপোর্টটা দেখছিলাম । এই রিপোর্ট সব কিছু ওলট পালট করে দিল আমার জীবন ।

হঠাৎ রিপোর্টটা ভালো করে দেখতেই , চমকে উঠলাম । আমার নামের টাইটেলের জায়গায় অন্য টাইটেল । মনের মধ্যে একটা আশার দ্বীপ চোখে পড়ল। ছুটে গেলাম ডাক্তার বাবুর কাছে ।
হ্যাঁ আমার আশঙ্খায় সত্যি । ওটা আমার রিপোর্টই নয় । আমার রিপোর্টে দেখা গেল সামান্য ভাইরাস ঘটিত জ্বর ।
অ্যাকুল আনন্দে নেচে উঠল আমার মন । এখনও অদিতিকে পেলেও পেতে পারি । সত্যি কথা খুলে বললে অদিতি নিশ্চয় আমাকে ক্ষমা করে দেবে । সে নিশ্চয় অন্য কাউকে তাহলে বিয়ে করবে না ।

কিন্তু অদিতির বাড়ির কাছে গিয়েই আমি থমকে দাঁড়ালাম । বাড়িময় লোকজন উপছে পড়ছে । তার মধ্য থেকে একটা বেদনা মাখানো কান্নার সুর সব কিছু ছাপিয়ে যায় । আমি আর এগুতে পারছি না । আমার পা ভারি হয়ে আসে । কম্পিত ক্ষলিত পদে সামনে এগিয়ে গেলাম । দেখি সাদা থানের উপর শুয়ে আছে আমার অদিতি । ওড়নাটা গলায় ফাঁস দিয়ে চিরদিনের মত আমায় ছেড়ে চলে গেছে । পাশে পরে রয়েছে এক চিলতে চিরকুট “ দীপ ছাড়া আর কাউকে স্বামী হিসাবে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় । আমাকে ক্ষমা কর’’ ।

আমার অদিতি আর নেই , আমার পায়ের মাটি আসতে আসতে সরে যাচ্ছে । কোন রকমে টলতে টলতে আমি বাড়ি ফিরে আসি ।
তারপর হ্যাঁ … আমি গরল ঢেলেছি গলায় । সত্যি বলছি বিষ খেয়েছি । আমার অদিতি যখন আর বেঁচে নেই তখন আর আমার বেঁচে লাভ কি বল ।

তুই সত্যি করে বল পাপু …অদিতিকে আমি হত্যা করলাম না । আমি যদি মিথ্যা সেই চিঠি না দিতাম তাহলে এত অসময়ে আমার অদিতিকে আর চলে যেতে হত না ।
আমি একজন ঠক ,প্রতারক , বিশ্বাসঘাতক , শুধু আমার জন্যই অদিতিকে আজ চলে যেতে হল । আমি ঘাতক ,আমি মাডারার , আমি খুনি ।

আঃ …পাপু ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে বুকে , আমার সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে , লালা বের হচ্ছে মুখ দিয়ে । আর সময় নেই । তোর সঙ্গে দেখা করে যেতে পারলাম না , ক্ষমা করিস আমায় । তোর সঙ্গে দেখা করতে গেলে যে অনেকটা সময় চলে যেত । আমার অদিতি যে অনেক আগেই চলে গেছে , তাকে যে ধরতেই হবে আমায় ।

ইতি
দীপ

.

.

 

আপনার মতামত এর জন্য

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply