কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৭   –  সুব্রত মজুমদার
Subrata Majumdar

কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৭ – সুব্রত মজুমদার

.

-“হ্যাঁ, ওরা খুবই চালাক আর বদমাশ, ওদের ঠিকানা আমি তোমাকে দিতে পারি কিন্তু বিনা স্বার্থে ওরা কারোর উপকার করবে বলে মনে হয় না।”
কিটকিট বলল,”সে আমি দেখে নেবো, আপনি ঠিকানা তো দিন।”

দাদু বললেন,”এখান থেকে সোজা উত্তরে গিয়ে মাইলখানেক পর একটা ধানের মাঠ পাবে। সেই মাঠের পাশে একটা পুকুর। পুকুরের ধারে ইঁদুরদের বাস। ওখানেই কোথাও আছে আপিসটা।”

দাদুর কাছে বিদায় নিয়ে কিটকিট চলল সোজা উত্তরমুখো হয়ে। মাইলখানেক পরেই একটা মাঠ। মাঠের পাশেই পুকুর। পুকুরের স্থির জলের উপর চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে।

পুকুরের পাড়ে ঘন ঝোপ। ঝোপের মধ্যে ইঁদুরদের গর্ত। গর্তগুলো কিটকিটের ঢোকার পক্ষে উপযুক্ত নয়। কিটকিট তখন পুকুরের পাড়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল কারোর বের হওয়ার। ইঁদুরদের কারোর না কারোর সঙ্গে তো দেখা হবেই।

কিটকিটের ভাগ্য ভালো, মিনিট দশকের মধ্যেই একটা বুড়ো ইঁদুর বের হয়ে এল চিৎকার করতে করতে।
-“না না না আমি তোমাদের কথা মানছি না মানবো না, হলে…”
-“কি মানবে না দাদু ?” শুধাল কিটকিট ।

বুড়ো ইঁদুর হাতের লাঠিখানা সজোরে মাটিতে ঠুকে বলল, “সব কাপুরুষের দল ভাই। চাল আর গমের দানা দিয়ে কি পিকনিক হয় রে ভাই। সে কাল ছিল আমাদের, গৃহস্থের আটার টিন হতে বিস্কুটের কৌটো কোনোকিছুই রেহাই পেত না। কেটেকুটে একসা করে দিতাম।”

-“সে আমিও কাটি বিস্তর। দিদির গায়ে দেওয়ার চাদর হতে শোয়ার গদি, সব কেটেকুটে একেক্কার করে দিয়েছি।” দাঁত বের করে বলল কিটকিট।
বুড়ো ইঁদুরটা কিটকিটের কথাকে গ্রাহ্য না দিয়ে চকচকে দাঁতগুলো দেখিয়ে বলল,”এই দাঁত দিয়ে কম জিনিস কেটেছি হে, চেখেছিও অনেক। যা বলবে বল ভাই, সবচেয়ে সুস্বাদু কিন্তু ওই ফুল আঁকা সাবানগুলো।”

কিটকিট ফিচ করে হেসে বলল,”আগে জানতাম ছাগলে কি না খায়, এখন দেখছি ইঁদুরদেরও বাছবিচার নেই। আমি বাপু ওসব সাবান টাবান খাই না। দেখলে পর্যন্ত গা গুলোয়।”
ইঁদুরবুড়ো রেগে গিয়ে বলল,”মস্ত ডেঁপো তো তুমি। তা ঘর কোথায় ?”

কিটকিট ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,”সে তো জানা নেই। ঘরের খবর জানে মা। সেই তো গোটা ঘর সংসার সামলায়। তবে ঠিকানাটা জানে দিদি। ও মোটামোটা অক্ষরে লেখে পোস্টাপিস….. ”
-“তারপর তারপর ?” উৎসাহিত হয় বুড়ো।
কিটকিট সব ভুলে গেছে। সে হতাশ হয়ে বলে,”আর জানি না।”
-“তাহলে এখানে এসেছ কি করতে ?”
এবার একটু খেই পায় কিটকিট। তার মনের আশা আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। বলে,”যাচ্ছি রাজকন্যা কঙ্কাবতীকে খুঁজতে। আচ্ছা দাদু তুমি জাঁতিকল পার্টির অফিসটা কোথায় জানো ?”
ইঁদুর বুড়ো এবার যেন সপ্তমে চড়ে গেল ।

লাঠিখানা মাটিতে ঠুকে বলল,”ওই সৃষ্টিছাড়াগুলো ? খবরদার ওদের কাছে যেও না ভাই, ওরা এক একটা জল বিছুতি।”
কিটকিট বলল, “খুব দরকার দাদু।”
ইঁদুর বুড়ো তখন একটা ঝোপের দিকে দেখিয়ে বলল,”ওই যে কুলের ঝোপ ওর নিচেই আছে কাঁটাখোঁচা শহর। সেখানে ঢুকে যাবে তেরো নম্বর ঝেঁটিয়েফেলা লেনে। সেখানকার তেইশের দুই ঘরটাই অনামুখোদের আপিস।”
ইঁদুর বুড়োর কাছে বিদায় নিয়ে কিটকিট চলল কাঁটাখোঁচা শহরের দিকে।

একটা মস্ত কুলঝোপের নিচে গোটা তিরিশেক গর্ত। আশেপাশে আরও বিস্তর গর্ত আছে, সবগুলোই কাঁটাখোঁচা শহরের প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ। সেগুলো দিয়ে ইঁদুরেরা ইচ্ছামত ঢুকছে ও বেরোচ্ছে।
গর্তের মুখগুলো বেশ বড়সড়, কিটকিট ঢুকে যেতে পারে অনায়াসে । সুতরাং সে দেরি না করে সুরুৎ করে ঢুকে পড়ল একটা গর্তে।

গর্তে ঢুকে কিছুটা গিয়েই সে অবাক। রীতিমত শহর। সারি সারি মাটির ঘর, রাস্তা, বাজার, পুকুর, কি নেই এখানে। যাকে দেখা যায় সবাই ব্যস্ত। কথা বলার ফুরসৎ নেই কারোর। অনেক কষ্টে এক এক মাশরুম বিক্রেতাকে পাকড়াও করল কিটকিট। ইঁদুরটা একটা শালপার ঠোঙাতে করে মাশরুম বিক্রি করছে।

কিটকিটকে দেখে মাশরুম বিক্রেতা বলল, “আপনাকে তো এই শহরে দেখিনি কোনোদিন। আর দেখেও তো ইঁদুর বলে মনে হচ্ছে না। আপনি কি জাদুকরের গুপ্তচর ?”

মাশরুম বিক্রেতাকে জাদুকরের ঠিকানা শুধানো যাবে না। ও এমনিতেই খুব ভয় পেয়ে আছে। জাদুকরের নাম করলে হয়তো চিৎকার জুড়ে দেবে। তাই কিটকিট ও প্রসঙ্গে না গিয়ে বলল, “আমি কিটকিট, পশ্চিমে থাকি তো, ওখানকার জল হাওয়ার গুনে এরকম চেহারা আমার।”

মাশরুম বিক্রেতা একটু ভেবে নিয়ে বলল, “হুমম্…. সেটা তো ভেবে দেখিনি। আমার এক পিসির ছেলে থাকে অনেক দূরে। আমি দৌড়েও যতদূর যেতে পারি না ততদূরে। রেললাইনের ফাঁকে ফোকরে থাকে আর রেলগাড়ি হতে পড়ে যাওয়া গম খায়। ওর চেহারাও তোমার মতই, তবে অত ধবধবে ফর্সা নয়।”

কিটকিট বলল, “রেললাইন তো আমার ঘর হতে একটু দূরেই। তোমার পিসির ছেলের দেখা পেলে তোমার কথা বলব। আমার মাসিও থাকে এই শহরেরই ঝেঁটিয়েফেলা লেনে। তুমি জানো সেটা কোনদিকে ?”

মাশরুম বিক্রেতা বলল,”জানব না কেন, ওখান হতে তো অনেক খদ্দেরই এখানে আসে। তবে ওই জাঁতিকল পার্টির ছোকরাদের হতে সাবধান। ওরা খুব বেয়াদব, জিনিস কিনে দাম দিতে চায় না।”

মাশরুম বিক্রেতা পথ বলে দিল কিটকিটকে। কিটকিট চলল ঝেঁটিয়েফেলা লেনের দিকে।

প্রায় অনেকটা হাঁটার পর কিটকিট পৌঁছল ঝেঁটিয়েফেলা লেনে। এক, দুই, তিন করে হাঁটতে হাঁটতে এল তেইশ নাম্বার বাড়ির সামনে। তেইশ নাম্বার বাড়ির তিনটে অংশ। তেইশের এক, তেইশের দুই আর তেইশের তিন। এর মধ্যে মাঝের ঘরটাই জাঁতিকল পার্টির অফিস।

তেইশের দুইয়ের মাথার উপর সাইনবোর্ড – ‘জাঁতিকল পার্টি’। ঘরে মিটমিট করে একটা আলো জ্বলছে। বেঞ্চে বসে ইঁদুর হাতা চামচা চপস্টিকরা সব নীরবতা পালন করছে।

আর পাশের ঘর তেইশের এক। দরজার মাথাতে সাইনবোর্ড – ‘খাঁচাকল পার্টি’। সম্ভবত এরা জাঁতিকল পার্টির অপোনেন্ট। এদের অফিসে আজ আনন্দোৎসব। চলছে বাজনা বাজিয়ে উদ্দাম নৃত্য। এক ছোকরা ইঁদুর আবার গান ধরেছে।

হল রে হল রে হল গন্ডগোল…..
জাঁতিকলে পড়ে গেল একটা পাগল।
আমরা খাঁচাকলে করি বাস,
দেশের যত দব্যি আমরা তো দিব্যি করি নাশ।
আমরা ঢুকি হাতির শুণ্ডে করাল বাঘের মুণ্ডে
কেটে কুঁচিকুঁচি করি যতেক আগল।।
যদি আসে রে দিতে বাধা, কোনো গাধা,
তবে আগেই বলে রাখি দাদা,
তার কেটে পিরাণ-জামা নাকে দেব ঝামা,
ভয়েতে হবে রে পরাণ বিকল।।

…চলবে

 

আপনার মতামত এর জন্য

সুব্রত মজুমদার

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply