“বুড়িটা বোঝেনি সে কথাগুলো!” –  তন্ময় সিংহ রায়
Tanmoy Sinha Roy

“বুড়িটা বোঝেনি সে কথাগুলো!” – তন্ময় সিংহ রায়

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:January 5, 2021
  • Reading time:1 mins read


.

এ গ্রহের উদ্ভিদ গুনে গুনে বড়জোর আর ক’টা দিন দেবে অক্সিজেন তাঁকে! বিভিন্ন প্রসাধনীতে যে ত্বক একদিন ধরে রাখতো তাঁর লাবণ্য ও কোমলতা , বেশ বহু বছর অতিতে শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করেছে সে!

ববলাবাহুল্য , অসংখ্য ভাঁজে সে (ত্বক)  চিরতরে হারিয়েছে তাঁর স্বাভাবিক রূপ!  শিরা ধমনীগুলোও যেন প্রতি মুহুর্তে উপেক্ষা করে তাঁকে! যে স্নিগ্ধ ও শান্ত দৃষ্টিতে ছিল পরম মমতার কোমল স্পর্শ , সে ঝাপসা দৃষ্টি আজ চরম অনাদরে ও অবহেলায় ভাসে নোনাজলে!   দুর্বল পা’দুটোও যেন টেনে-হিঁচড়ে কোনোরকমে পালন করে ভারসাম্যহীন একটা শরীরের কর্তব্য!

আজ প্রায় বছর দেড়েক হল ,  প্রতিদিন বিকেল চারটে বাজলেই বুড়িটা জানালাটার লোহার রডগুলোকে ধরে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দূরে ওই মাঠটার দিকে!  কৌতুহলদীপ্ত জনা-তিনেক বৃদ্ধা’র মনের জানার প্রবল ইচ্ছেকে লুকোতে না পেরে  অবশেষে একদিন বুড়িটা বলে বসে ,  তাঁর একমাত্র আদরের সোনার টুকরো জীবন , ছোট্ট ছেলেটা নাকি ভীষণ চঞ্চল!

কোথায় খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে বিষম চোট পায় , রক্ত বের হয় কেটে গিয়ে , কি যে করে বসে ,   তাই প্রতিদিন খেলার সময় তিনি ছেলেকে অস্পষ্ট কিন্তু নিষ্পলক দৃষ্টিতেও , দুর্বল রেটিনায় বসিয়ে নাকি করে রাখেন নজরবন্দী! পরম মমতার এরূপ মর্মান্তিক প্রতিফলনে বিষ্ময়ে হতবাক চশমাবৃত ছ’টা চোখের ভাঙাচোরা অশ্রুগ্রন্থি , নিঃসৃত করেছিল কিছু পরিচিত বেদনাশ্রু!  বোঝানোর সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম সত্বেও সে বুড়ি বোঝেনি যে তাঁর সোনার টুকরো ছেলে আজ প্রাপ্তবয়স্ক।

 বিয়ে করে সে একটা বউও এনেছে ঘরে ,   আর বউয়ের অপছন্দটা ছেলের কাছে আজ তাঁর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান!মূল্যটাকে হীন করে অব্যবহৃত প্রাণহীন  আসবাবপত্রের মতন তাঁকে রেখে দিয়ে গেছে এই ঘরেই তাঁদের (অন্যান্য বৃদ্ধাদের) সাথে!  তাঁর শেষ জীবনের ছোট্ট ছোট্ট চাওয়া-পাওয়া , আশা , স্বপ্ন , ভরসা সব’ই তাচ্ছিল্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে এই আবদ্ধ ও প্রাণহীন ইঁটের খাঁচায়! বুড়িটা বোঝেনি , যে আজ আর তাঁর হৃদপিন্ড ছেলেটা রাতে দুধের জন্যে ডুকরে ওঠেনা কেঁদে!

তাঁকে আজ আর পরাতে হয়না পরম ভালোবেসে কাজল টিপ! ছোট্ট আঙুলটা ধরে অতি যত্নে গুটি গুটি পায়ে সে আর হাঁটেনা মায়ের সাথে! স্কুল থেকে এসেই ঝপাস করে ব্যাগটা ফেলে অভুক্ত মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে আজ আর বলে ওঠে না ,  ‘মা গো খিদে পেয়েছে , ভাতটা মেখে খাইয়ে দাও মা!’ এ পৃথিবীর অনেক কিছুই ছেলে বোঝে আজ , আর তাইতো সে (বুড়ি) এখানে! বুড়িটা বোঝেনি সে বোঝানো কথাগুলো!

একদিন গহীন রাতে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে বুড়িটা চিৎকার করে বলে উঠলো , ‘সোনা আমার , ওদিকে যাসনা বাবা… ওদিকে পুকুর আছে!’

সেই জানালাটা তেমনি আছে , আছে দিগন্ত বিস্তৃত সেই খোলা মাঠটাও। কিন্তু শুষ্ক ত্বকের মমতা জড়ানো সেই দুটো হাত , বিকেল চারটে-তে আর কোনোদিনও ধরেনি লোহার রডগুলোকে সেদিন রাতের পর!!

আপনার মতামত এর জন্য


Tanmoy Sinha Roy

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply