বশির উদ্দিনের বোধোদয়  – কামরুল হাসান
kamrul hasan

বশির উদ্দিনের বোধোদয় – কামরুল হাসান

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:January 7, 2021
  • Reading time:1 mins read

.

মরণেই বুঝি সকল শান্তি বশির উদ্দিনের। তাই তো মনে-প্রাণে সেই শান্তির মরণকে ডেকে যাচ্ছেন পাঁচ-পাঁচটি বছর। অর্থ-বিত্ত-ব্যতীত পার্থিব পৃথিবীতে আর কিছুকে এমনভাবে কখনো চান নি বশির উদ্দীন।

অর্থ-বিত্ত পদতলে লুটে পড়ে গড়াগড়ি খেলেও মৃত্যু কিন্তু বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘেঁষছে না আশেপাশে। জীবনের এত জটিল-কুটিল বিষয় জলের মতো হিসাব করলেও মৃত্যুর এমন মুখ ভেচকি ভেদ কি অধরাই রয়ে যাবে-ভাবতে ভাবতে বেসামাল হয়ে পড়েন বশির উদ্দিন।

সকালের নাস্তা তৈরি করে স্ত্রী রাহেলা বেগম বশির উদ্দিনকে বিছানা-বাথরুম কোথাও খুঁজে পায় না। অসুস্থ বয়স্ক মানুষটি গেল কোথায়? তাও আবার কনকনে এই শীতের সকালে। স্বাভাবিকভাবে সবাই চিন্তিত, অস্থির। একমাত্র ছেলে সাগর মহল্লার বন্ধুদের নিয়ে খুঁজতে বের হল। অজানা আশঙ্কায় রাহেলা বেগমের চোখে জল। হন্যে হয়ে অলিগলি সন্ধান করতে লাগল সাগর আর ওর বন্ধুরা।

পাশের মহল্লার ডোবার ধারে লোকজনের জটলা হঠাৎ চোখে পড়ে যায় ওদের। সবাই হন্তদন্ত ছুটে যায় জটলার কাছে। সাগর দেখে একটা লোক কচুরিপানা মাথায় নিয়ে গলা জাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর বাবার মতো লাগছে কিন্তু পৌষের কুয়াশায় মুখটা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে না। ভিড়ের মাঝ থেকে একজন চেঁচিয়ে বারবার বলছে, “বশির আঙ্কেল, বশির আঙ্কেল উঠে আসেন”।

নিজ নামের ডাকাডাকি শুনে বশির উদ্দিনের সাহস বোধহয় বেড়ে গেল। পানিতে ডুব দিয়ে আর উঠতে চাচ্ছেন না- পাগলকে নৌকা ডুবানোর কথা মনে করিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা আর কী।

অবস্থা বেগতিক বুঝে সাগর ডোবাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবাকে তীরে টেনে তুলে। সবাই ধরাধরি করে নিয়ে যায় বাসায়। ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা বশির উদ্দিনের। শরীরে কাঁপন উঠে গেছে। ধবধবে গায়ের সাদা রঙ কালো হয়ে গেছে। বুকে-পিঠে-পায়ে গরম সরিষের তেল মাখতে মাখতে রাহেলা বেগম রাগতকণ্ঠে বলেন, “মাঝে মাঝে তোমার এগুলো কীসের পাগলামি, বুঝতে পারি না। একটা অঘটন ঘটে গেলে কী হতো বুঝতে পারো”। বশির উদ্দিন কাঁপা কাঁপা তোতলা গলায় বলেন, “আমার জীবনে আর অঘটন ঘটবে না।

তাই তো শত চেষ্টাতেও আযরাইলকে আমার জানটা চিনাতে পারছি না”। রাহেলা বেগম বশির উদ্দিনের মুখে গরম স্যুপ তুলে দিতে দিতে নরম গলায় বলেন, “মরার যখন এতই সাধ তখন একলা কেন, আমাকে সাথে নিয়ে গেলে না”। বশির উদ্দিন ধীর-স্থির কণ্ঠে বলেন, “আমার পাপের সাজা তুমি ভোগ করবে কেন, যার বোঝা তাকেই বইতে দাও”। “আজে-বাজে কথা বলবে না, পাপ, পাপ, পাপ!

মানুষ ফেরেস্তা না যে ভুল হবে না। ভালো-মন্দ কাজকর্ম কম-বেশি সবাই করে”-অগ্নিচোখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাহেলা বেগম। সলিল সমাধিতে আত্মহনের প্রচেষ্টা পর্বের আগেও বিষ খেয়ে পৃথিবী হতে চিরবিদায় নিতে চেয়েছিলেন বশির উদ্দীন। এবারের মতো সেবারও সবার তৎপরতায় বেঁচে যান মরণপাগল বশির উদ্দীন।

রাহেলা বেগম ঘর-কন্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বশির উদ্দিন শুয়ে শুয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলায়। “যে খারাপ তার মধ্যে খারাপ হওয়ার যন্ত্রণাও আছে”- এই প্রবাদবাক্যটিতে চোখ আটকে যায়। “খারাপ হওয়ার যন্ত্রণা যদি খারাপ হওয়ার আগে বুঝতে পারতাম তাহলে আজ বেঁচে থেকেও মরণযন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না”-অতীত কর্মকাণ্ডে মনে মনে অনুশোচনা-অনুতপ্ত হন এক সময়ের মহা প্রতাপশালী বশির উদ্দিন।

বশির উদ্দিনের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। বয়স কম না হলেও রোগ-ব্যাধি বাসা বেঁধেছে তার চেয়ে বেশি। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগের মতো জটিল জটিল রোগে জীবনটা দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। কিছুদিন আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মরতেই বসেছিলেন তিনি। প্রাণে বেঁচে গেলেও ক্ষতি কম করেনি সেই রক্তক্ষরণ। মুখের বাম পাশটা বাঁকা হয়ে গেছে। ঠিক মতো কথা বলাই কঠিন কাজ বশির উদ্দিনের। তবে শারীরিক অসুস্থতার চেয়ে মনের ব্যথাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য।

বশির উদ্দিন ছিলেন টাঙ্গাইল জিলা এমনকি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী। এটা বেশি দিন আগের গল্প নয়। আজ থেকে বছর চারেক আগের কথা। মাত্র চার বছরে ব্যবসায় লোকসান গুণতে গুণতে দেউলিয়া হওয়ার দশা। বর্তমানে সম্পদ বলতে উত্তরার এই সাততলা বাড়িটি।

একটা সময় বশির উদ্দিন আর অর্থ সমার্থক শব্দ হয়ে গিয়েছিল। টাঙ্গাইলে তাকে বস ম্যানেজার নামে সবাই চিনত। জুট মিলের ম্যানেজার পদে চাকরি করার সুবাদে সিনেমার ভিলেনদের মতো এমন অদ্ভুত নাম “বস ম্যানেজার”। বশির উদ্দিন যেদিন নিজ জিলাতে আসতেন সেদিন রাস্তার দুই ধারে শোভা পেত রঙ-বেরঙের নানা আকৃতির তোড়ণ। স্বাগত জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসত হাজারো মানুষ। ট্রাকে দাঁড়িয়ে ফুল-ফল ছিটিয়ে সে অভিবাদনের জবাব দিতেন বশির উদ্দিন। বটবৃক্ষের মতো ছায়া হয়ে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করতেন না তিনি।

আজ দিন বদলের খেলায় বড়ই হেলার পাত্র বশির উদ্দিন। এক সময়ের সেই অতি কাঙ্খিত মুখখানি ভুলেও একবারের জন্য দর্শন করতে আসে না উপকৃত সেই এলাকাবাসী। নানা দ্বন্দ্ব আর মারপ্যাচে স্বজনেরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে। কথায় বলে না, সবাই তেলের মাথায় তেল ঢালতে পছন্দ করে। তেল কমে গেলে কদরও কমে যায়। বশির উদ্দিনের অবস্থা ওই তেলহীন মস্তকের মতো।

স্বজনদের প্রায় সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও একজন কিন্তু কাছে কাছেই আছে। সুখ-দুঃখ দুই সময়েই নানা পাশে পায় তার প্রিয় নাতি ফয়সালকে। ফয়সাল বশির উদ্দিনের ভাগ্নি ফরিদার ছেলে। চাকরিসূত্রে ফয়সালের বসবাস ঢাকাতেই। ফয়সাল বাদে ওর পরিবারের অন্য কেউ বশির উদ্দিনের পরিবারের সাথে উঠাবসা করে না। ফয়সালের বাবা বোরহানের সাথে বশির উদ্দিনের দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য। সে গল্প শুনাব একটু পরে। নানার আত্মহনের চেষ্টার খবরে ছুটে যাওয়া ফয়সালের সাথে বশির উদ্দিনের কথোপকথন শুনি তার আগে।

বশির উদ্দিন আরাম কেদারায় বসে শীতের মধ্য বিকেলের মিষ্টি রোদ উপভোগ করছিলেন। এমন সময় হাজির হয় ফয়সাল। নানার মাথা ম্যাসেজ করতে করতে ফয়সাল জানতে চায়, “নানা এসব কী শুনলাম, বিষয়টি কী”? মেসেজে আরামবোধ করায় চোখ বুজে আসে বশির উদ্দিনের। চোখ বুজেই বলেন, “এই অচল জীবনের কী আর বিষয়রে, যে জীবনে অবশিষ্ট শুধু একটু বাতাস, সেই বাতাস রেখে আর লাভ কী”? ফয়সাল মুচকি হাসিতে বলে, “সাততলার ছাদ থেকে তোমাকে নিচে ফেলে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়”। বশির উদ্দিন এবার চোখ খুলে বলেন, “এটা করতে পারলে তুই আমার সত্যিকার উপকার করবি”। ফয়সাল মনে মনে বলে, “আমি চাই ধুকে ধুকে তুমি অনেকদিন বেঁচে থাক। বিবেকের আয়নায় অতীত দেখে যন্ত্রণাকাতর হও”।

বশির উদ্দিনের ঘুম খুব কম। শুয়ে-বসে থাকতে থাকতে চোখজোড়াও বিরক্ত। কতই আর ঘুমানো যায়! “বিবেকর আয়নায় অতীত দেখে যন্ত্রণাকাতর হও”-ফয়সালের এই কথাটি বারবার প্রতিধ্বনি হয়ে আঘাত করতে লাগল বশির উদ্দিনের মনের গভীরে। ফয়সালের কথাটির অর্থ খুঁজতে গিয়ে স্মৃতির পাতা ঝাপসা হয়ে উঠে। রোগাগ্রস্ত শরীরের মতো স্মৃতিশক্তি প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। বশির উদ্দিনের মস্তিষ্ক মূলত ফয়সালের পরিবার তার চাকরিজীবনের ঘটনাবলী স্মরণ করতে ব্যর্থ হয়ে এই মুহূর্তে ঘুমের জগতে টলিয়ে পড়েছে।

ফয়সালের বাবা বোরহান দরিদ্র পরিবারের মেধাবি ছাত্র। ফয়সালের মা ফরিদা অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। পড়ালেখা শেষ করে চাকরিটা ওর ভীষণ দরকার। জুট মিলে চাকরির আশ্বাসে ফরিদাকে বোরহান বিয়ে করতে রাজি হয়। বউকে বোরহান ঢাকায় নিয়ে আসে। বশির উদ্দিনের অধীনেই চাকরি করতে থাকে। মেধাবি বোরহান অল্পদিনের মধ্যেই নিজের যোগ্যতাবলে পেশাগত উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়। বোরহান দ্রুত উন্নতি লাভ করায় বশির উদ্দিন চিন্তিত হয়ে পড়েন। বোরহান বড় পদ পেলে এলাকায় তিনি ছোট হয়ে যাবেন, গুরুত্ব কমে যাবে-এই ভাবনা ঘুরপাক খেতে থাকে বশির উদ্দিনের মাথায়। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবীতে খুব মানুষ আছে যারা অপরকে নিজের উপর স্থানে দেখে খুশি হয়। সবাই নিজেকে উপরে রাখতে চায়।

ওদিকে, বোরহান আপন মনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। একদিন একজন ৩০/৩২ বছর বয়সী মহিলা বোরহানের সাথে দেখা করতে আসে। সেদিন বশির উদ্দিন অফিসে ছিলেন না। বোরহান মহিলাটিকে চেয়ারে বসতে বলেন। বোরহান আসার কারণ ও পরিচয় জানতে চায়। মহিলাটা কোন কথা বলতে পারে না। কেবল অঝোরে কাঁদতে থাকে। বোরহান বলেন, “কী মুশকিল আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনি কে, কেন এসেছেন আর কাঁদছেনই বা কেন”। মহিলাটি একটু স্থির হয়ে বলে, “আমার নাম শিউলি। আমার বাবা এক সময় এই মিলে পিয়নের চাকরি করত। হঠাৎ একটি সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার দুটি পা কেটে ফেলতে হয়।

বাবাই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আমরা দুই বোন। আমিই বড়। তখন পড়ি কলেজে। আমরা মহা বিপদে পড়ে যাই। আপনার মামা শ্বশুর বশির উদ্দিন সেসময় বিপদে এগিয়ে আসেন। টাকা-পয়সা সাহায্য থেকে শুরু করে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ-খবরও নিতে থাকেন। আমার এবং আমার বোনের জন্যও জামা-কাপড় কিনে দেন। আামাকে জুট মিলে চাকরিরও আশ্বাস দেন। বাবা বয়সী বলে খুব স্বাভাবিকভাবে এবং খুশি মনেই সবকিছু গ্রহণ করি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে খেয়াল করি উনি আমার দিকে ভিন্ন

দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে এবং ইঙ্গিতবহ কথাবার্তা বলছে। একদিন বাইরে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। মনে মনে রাজি না হলেও পরে যাই। বুঝতে পারি, উনি নাখোশ হল আমরা বড় বিপদে পড়ে যাব”। শিউলি বলতে বলতে চুপ হয়ে যায়। দরজার দিকে বারবার তাকাতে থাকে। বোরহান বলে, মামা আজ অফিসে নেই। গ্রামের বাড়ি গেছে। আপনি বলুন। বোরহান পানির গ্লাস এগিয়ে দেয় শিউলিকে। ঘামতে দেখে এসি আরো কুল করে দেয়।

বোরহান জানতে চায় তারপর…? শিউলি আতঙ্কগ্রস্ত চোখে আবার বলতে থাকে, “বেড়ানোর কথা বলে নিয়ে যায় বিশাল এক হোটেলে। আমি জানতে চাই এখানে কেন? উনি বলেন, আসো কত সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই তোমাকে। হোটেলের ভিতরের চাকচিক্য দেখে আমি চমকে উঠি। অবাক হয়ে চারপাশ তাকাই। সেই সাথে অজানা ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। উনি আমার পিঠে হাত রেখে সোফায় বসায়। টেবিলে রাখা ফলমূল খেতে বলে। আমি অস্বস্তিবোধ করি। উনি আমার মুখে খাবার তুলে দিয়ে বলে, তুমি ভয় পাচ্ছো কেন? আমি আরো অস্বস্তিবোধ করি। উনি আমার সাথে আরো ঘনিষ্ঠভাবে পাশে বসে। উনি বলে, আমি তোমাকে আমি বিয়ে করব।

তুমি রাজরানি হয়ে থাকবে। তোমাদের কোন অভাব থাকবে না। আমার গলা শুকিয়ে যায়। কথা বলতে পারি না। এক পর্যায়ে জোরপূর্বক…”। শিউলি ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে। বোরহান স্তব্ধ হয়ে যায়। মাথা নিচু করে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ মুছে শিউলি আবার বলে, “দিন দিন উনার সাথে আমার মেলামেশা বাড়তে থাকে। সময়ের ব্যবধানে সংসার সরব হলেও আমি নীরব হয়ে যাই। আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে সুখ খুঁজি, নিরাপত্তা খুঁজি”। বিয়ের প্রসঙ্গ উঠালে এই ঝামেলা-সেই ঝামেলার কথা বলে ধৈর্য ধরতে বলেন।

একটা সময় এড়িয়ে চলতে শুরু করে। আরো কিছু বলতে চাইলে বোরহান উত্তেজিত গলায় বাধা দেয়। বলে, “আমি আর শুনতে চাচ্ছি না। আপনি এখন যান। আমি পরে আপনার সাথে যোগাযোগ করব”। শিউলি মুখে ওড়না ঢেকে চলে যায়।

শিউলি যাওয়ার পর বোরহান বড়ই অস্থির হয়ে পড়ে। “মামাকে আমরা , এলকাবাসী কত ভালো জানি, সেই মামা এমন ঘটনা ঘটাতে পারে?”-কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না বোরহানের। পায়চারি করতে করতে ও ভাবে, “মেয়েটা যেভাবে বর্ণনা দিল তাতে অবিশ্বাস করাও কঠিন”। বোরহান মনস্থির করে যে, “ঘটনা যাই ঘটুক এসব বিষয়ে কারও সাথে এমনকি ফরিদার সাথেও আলাপ করা যাবে না। তাছাড়া গোপন কথা মেয়েদের বলা আর হাটে ঢোল পেটানো একই কথা”।

বশির উদ্দিন পরেরদিন অফিসে আসার সাথে সাথে তার অনুসারীরা শিউলির আগমনের আদ্যপ্রান্ত উপস্থাপন করে তার সামনে। বশির উদ্দিন তার পিয়ন বা অধঃস্তন কর্মচারী মারফত বিভিন্ন কিছু পাঠাতেন শিউলিদের বাড়িতে। একারণে শিউলি অনেকের কাছে পরিচিত। মুখ ঢেকে আসলেও তাই কেউ কেউ ঠিকই চিনে ফেলেছে।

শিউলির আগমনকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না বশির উদ্দিন। রাগে ফুসছেন। চোয়াল-মুখ শক্ত করে ভাবছেন, “বোরহান অফিসে উপরে উঠছে। আবার শিউলির ব্যাপারটা জেনে গেল। ও যদি এলাকায় জানিয়ে দেয়, তাহলে মানসম্মান আর থাকবে না”। বশির উদ্দিন পিয়নকে ধমুকের সুরে ডেকে কফি চায়। কফির কাপে চুমুক দেয় আর লম্বা টানে সিগারেটের বড় বড় ধুয়া তুলে। বশির উদ্দিন বিড়বিড় করে নিজে নিজেই বলেন, “ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে হবে। বোরহান আমাকে শ্রদ্ধা আর অন্ধের মতো বিশ্বাস করে, এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে হবে”। এমন সময় একজন অফিসার ফাইল সই করাতে রুমে প্রবেশ করলে বশির উদ্দিন ধমুক দিয়ে বের করে দেন।

পরেরদিন বশির উদ্দিন তার কক্ষে বোরহানকে ডেকে পাঠান। বোরহান অন্যান্য দিনের তুলনায় এদিন মাথাটা বেশি নিচু করে প্রবেশ করে। বশির উদ্দিন হেসে হেসে কথা বলেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে সিগারেট টানতে টানতে বলেন, “বোরহান বলতো আমার কী কী ব্যবসা আছে”? প্রশ্ন শুনে বোরহান একটু ভরকে যায়, অবাক দৃষ্টিতে বশির উদ্দিনের তাকায়। বশির উদ্দিন বলেন, প্রশ্ন শুনে অবাক হলে? “আচ্ছা আমিই বলি, গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, টেণ্ডার এমনকি জাহাজের ব্যবসাও আমার আছে”-তুমি হয়তো সবটা জানো না। বোরহান বলে, জ্বি। “আমি কি এসব করেছি এই জিএম এর বেতনের টাকায়? না। তোমাকে সত্যটা বলতে দ্বিধা নেই, আমি যদি সিবিএ নেতা না হতাম তাহলে টাকা কামাইও হতো না, দেশের একজন শীর্ষ ব্যবসায়ীও হতে পারতাম না”।

বোরহান মাথা খানিকটা নিচু করে জ্বি-হ্যাঁ ধরে শুনে যাচ্ছে। বশির উদ্দিন পটে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ ডলে-মুচরে রাখতে রাখতে বলেন, “আমি তোমাকে একটা ভালো পরামর্শ দিই”। বোরহান বলে, জ্বি মামা। এমন সময় পিয়ন কফি দিয়ে যায়। দুজনেই কফি হাতে নেয়। বশির উদ্দিন বলেন, “ফরিদা তো বাচ্চা নিয়ে একা একা সংসার সামাল দিতে পারে না। তাছাড়া ওর মনও এখানে টিকে না। তাই বলি তুমি এলাকায় গিয়ে ব্যবসা করো। টাকা-পয়সা যা লাগে আমি দেব। তুমি এলাকা হতে তুলা, পাট সরবরাহ করবে।

আর টাঙ্গাইল শহরে বড় করে গার্মেন্টেসের একটা পাইকারী দোকান দিবে। সব সহযোগিতা আমি করব। ওখানে আমার ছোট ভাই আছে ও তোমার সাথে থাকবে। দেখবে রাতারাতি টাকার মানুষ হয়ে গেছো”। সাদাসিধে বোরহান বলে, “জ্বি মামা আপনি আমার অভিভাবক যেটা বলবেন তাই করব”।

এলাকায় স্থায়ী হওয়ার কথা শুনে ফরিদা মহা খুশি। কিন্তু বোরহান দ্বিধাগ্রস্ত। ভাবে, “চাকরিতে তো ভালো করছিলাম। ব্যবসা কি ভালো করতে পারব”? মনে আত্মবিশ্বাস জোগায়। ভাবে, মামা তো আছেই। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে বোরহান শিউলির সাথে দেখা করে। বশির উদ্দিনের পরামর্শে চাকরি ছেড়ে বোরহানের ব্যবসা করার সিদ্ধান্তে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায় শিউলি। অনাধিকার চর্চা হবে বলে চুপ থাকে। শিউলিকে কথার কথা সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে বিদায় নেয় বোরহান।

বোরহানকে সরিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বশির উদ্দিন। ওদিকে এলাকায় গিয়ে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী বনে গেছে বোরহান। কয়েক মাসের মধ্যে চাকরির মতো ব্যবসাতেও সফলতার মুখ দেখে। ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে টাকা-পয়সা সুনামও বাড়তে থাকে বোরহানের। বোরহানের সফলতা বশির উদ্দিনের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভাবে, বোরহান বড় হলে এলাকায় তার মূল্য কমে যাবে। বোরহানের সাথে ব্যবসায় থাকা ছোট ভাইকে সবকিছু হাতিয়ে নেয়ার জন্য কুপরামর্শ দেন বশির উদ্দিন।

বড় ভাইয়ের আসকারা পেয়ে ছোট ভাই বেপরোয়া হয়ে উঠে। হিসাব-নিকাশ না দিয়ে অর্থ আত্মসাতে আত্মনিয়োগ করে। বোরহান হিসাব চাইলে এই খরচ-সেই খরচের কথা বলে এড়িয়ে চলে। যত দ্রুত ব্যবসা বড় হয়েছিল তত দ্রুতই ছোট হতে থাকে। বোরহান সব বুঝতে পারলেও কোন প্রতিবাদ করতে পারে না। নির্লিপ্ততার প্রধান কারণ ব্যবসায় বশির উদ্দিনের বড় অর্থ বিনিয়োগ।

তাছাড়া নিরীহ, নির্ভেজাল লোকজন চাপা কষ্টে মরে গেলেও প্রতিবাদের ভাষা তাদের মুখে প্রকাশ পায় না। আসলে বোরহানদের মতো লোকদের প্রতিবাদ শব্দটি ধাঁচেই নেই। ফলে যাওয়ার তাই হলো, বশির উদ্দিনের ভাই আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হলো। নিজেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসল। আর বোরহান সব হারিয়ে হলো পথের ফকির, নিঃস্ব।

দিশেহারা বোরহান সাহায্যের জন্য হাজির হলো বশির উদ্দিনের সামনে। ব্যবসা করতে না পারায় মৃদু ভর্ৎসনা করেন। সংসার চালানোর জন্য দশ হাজার টাকা ধার দেন। দেয়ার সময় দ্রুত পরিশোধ করার তাগাদাও দেন। বোরহান টাকাটা নিয়ে অসহায়ের মতো বেরিয়ে পড়ে। চাকরি-ব্যবসা হারিয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি বোরহান। সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে না পারায় চরম অপমান-অপদস্ত করেন বশির উদ্দিন। ফরাসি কবি রুশোর মতে, “আত্মা কলুষিত হতে আরম্ভ করলে মনও আকারে সংকীর্ণ হতে শুরু করে”। বশির উদ্দিনের মনের অবস্থা এই প্রবাদ বাক্যটির মতোই।

একদিকে সামান্য দশ হাজার টাকার জন্য এত অপমান-গঞ্জণা অন্যদিকে বউ-বাচ্চা নিয়ে আশাহীন জীবনে বেঁচে থাকার স্বাদই মরে যায় বোরহানের। বারান্দায় বসে বসে অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ে ওর। শ্বশুর একদিন বলেছিলেন, “আমার সম্বন্ধি লোক হিসেবে সুবিধার নয়, তাই বিশ্বাস করো, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস নয়”। মনে পড়ে শিউলিকে। এলাকায় আসার কথা শুনে কী যেন বলতে চেয়েছিল।

“কিন্তু আমি কারও কথা গায়ে না লাগিয়ে বশির উদ্দিনের সব আদেশকে আশীর্বাদ হিসেবে নিয়েছি”-বড়ই আফসোস বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বোরহান। এমন সময় উঠান মায়ের সাথে আনন্দে ঘুরে বেড়ানো একটি মুরগির বাচ্চা ছো মেরে চিলে নিয়ে যায়। মা মুরগিটা কাঁদতে কাঁদতে উড়তে উড়তে পিছে পিছে গিয়ে আছরে পড়ে যায়। বোরহান ভাবে, “বশির উদ্দিন ওই চিলের মতো আমার সুখ-শান্তি ছো মেরে নিয়ে গেছে”। চরম ঘৃণা জন্মে মামা শ্বশুরের প্রতি।

বোরহানের অন্ধকার জীবনে একটু আশার আলো হয়ে আসে ওর ছোটবেলার এক বন্ধু। ওর বন্ধুটি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার। ওই বন্ধুর সহাকারী হিসেবে একটা কর্ম জোটে বোরহানের। ধীরে ধীরে ঠিকাদারির হাল হকিকত বুঝার চেষ্টা করে। মাস ছয়কের মধ্যে নিজের নামে একটা ঠিকাদারি লাইসেন্স জোগাড় করতে সক্ষম হয়। অর্থকষ্ট কাটিয়ে উঠে মোটামুটি স্বচ্ছল জীবন-যাপন করতে থাকে বোরহান। দুই ছেলেও পড়ে কলেজে।

ওদিকে চাকরির মেয়াদ শেষে অবসরে বশির উদ্দিন। পদ না থাকায় কদরও কমে যায় তার। শরীরে নানা অসুখ বাসা বাঁধায় ব্যবসার কাজেও সময় দিতে পারেন না। ব্যবসায়ী সহযোগীরা আখের গুছিয়ে আস্তে আস্তে সটকে পড়ে। কথায় বলে, তুমি আজ কারো সাথে যে অন্যায় বা খারাপ আচরণ করলে সেই আচরণ কোন না কোনভাবে একদিন ফেরত পাবে। বশির উদ্দিন তার কর্মের ফল ভোগ করতে শুরু করলেন।

সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লোকসানে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম। ব্যাংক ঋণের সুদে-আসলের বোঝাও হু হু করে বাড়তে লাগল। উপায়ান্তর না পেয়ে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করলেন। বশির উদ্দিন তার নিজের পতন ঠেকাতে না পারলেও বোরহান কিন্তু সব ষড়যন্ত্র-অপমানকে অগ্রাহ্য এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। বশির উদ্দিন যে বোরহানকে নানাভাবে কোণঠাসা করতে চেয়েছিলেন, যার উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হতেন সেই বোরহানের এখন কেবল উত্থানের গল্প। দুই ছেলেও পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা থেকেই বশির উদ্দিন চেঁচামেচি শুরু করেন। ফয়সালকে ডেকে আনার জন্য বললেও সবাই ব্যস্ততার অজুহাতে অপরাগতা প্রকাশ করে। রাহেলা বেগম বলেন, “বলতো ঘুমের মাঝে কী স্বপ্ন দেখে তুমি ফয়সালকে ডাকতে বলছো”? বশির উদ্দিন মাথা দোলায় আর বলেন, “সাগরের মা জীবনে তো অনেক পাপ করেছি তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না?

স্বপ্নে দেখলাম বোরহানের কাছে ক্ষমা না চাইলে আযরাইল আমার কাছে ভিড়বে না”। রাহেলা বেগম বিরক্তসহকারে বলেন, “সবসময় মরতে চাও বলেই স্বপ্নেও এসব আজেবাজে জিনিস দেখো”। বশির উদ্দিন বলেন, “আজেবাজে নয় সাগরের মা, এটা মহা সত্য। সত্যকে অস্বীকার করেই আজ এই হাল আমার”। রাহেলা বেগম বলেন, “ঠিক আছে আমি ফয়সালকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করছি। এবার নাস্তা করে আমাকে রক্ষা করো”।

বশির উদ্দিনের মেয়ে সুমি ফয়সালকে বাসায় ডেকে নিয়ে আসে। বশির উদ্দিনকে ওষুধ খাওয়াচ্ছিলেন রাহেলা বেগম। ফয়সালকে দেখে বলেন, “ওষুধ পরে খাব। ফয়সাল আয় কাছে বস”। রাহেলা বেগম বলেন, “আরে ও কি তোমার কথা না শুনেই যাবে যে, এত অস্থির হয়ে যাচ্ছো”। বশির উদ্দিন ফয়সালের হাত ধরে। কাছে বসাতে বসাতে বলেন, “সময়-সম্পদ ফুরিয়ে গেলে মানুষ অস্থিরই হয়ে পড়ে। আমার সময় বড্ড কম”।

ফয়সালের দুহাত জড়িয়ে ধরে বশির উদ্দিন বলেন, “ভাই এটাই হয়তো তোর নানার জীবনের শেষ আবদার, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের আবদার ফেলতে হয় না”। ফয়সাল বলে, “আরে এভাবে বলছো কেন, কী আবদার সেটাই শুনি। তোমার আবদার আমার জন্য আদেশ হতে পারে”। “আদেশ করার মুখ আর আমার নেই। ওটা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি”-বলেন বশির উদ্দিন। “আচ্ছা শোন, যে করেই হোক তোর বাবাকে আমার কাছে এনে দিবি। তোর বাবা ক্ষমা না করলে আমি মরেও শান্তি পাবো না”-আবার ফয়সালের হাত জড়িয়ে ধরে বশির উদ্দিন।

ফয়সাল চুপ হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, “এই দিনটার জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম। বাবার সাথে যে অন্যায় করেছো, ক্ষমা না চেয়ে মরে গেলে আমিও শান্তি পাব না”। বশির উদ্দিন বলেন, “কিছু বলছিস না যে”। ফয়সাল বলে, “বাবা আসবে কি না জানি না। তবে নিয়ে আসতে সাধ্যমতো চেষ্টা করব”। “হ্যাঁ ভাই তুই ভালো করে বুঝালেই আসবে, তুই যা কালকেই নিয়ে আসিস। আমি অপেক্ষায় থাকব”।

ফয়সাল চলে যাওয়ার পর বশির উদ্দিন বিছানায় শুতে চায়। কিন্তু পিঠের নিচে একটা কিছু পড়ে। উঠে পেছন ফিরে তাকাতে চাইলেও বাকা মুখ ঘুরাতে পারে না। ভালো করছেন নাকি মন্দ করছেন জীবনে কোনদিন পেছনে ফিরে দেখার প্রয়োজনবোধ করেন নি। আজ শত চেষ্টা করলেও পেছন ফিরতে পারছেন না বশির উদ্দিন!

মামা শ্বশুরের নাম শুনে ছ্যাৎ করে উঠে বোরহান। চৈত্রের খরতাপে মাঠে হালচাষ শেষে বাড়িতে আসার পর বউয়ের ঠ্যাস মারা কথায় কৃষকের চোখ যেমন অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বশির উদ্দিনের নাম শুনে বোরহানের চোখ তেমন রক্তলাল হয়ে যায়। লোকটা যেকোন সময় মারা যাবে। তোমার কাছে ক্ষমা চাইবে-ফয়সাল ওর বাবাকে বুঝানোর চেষ্টা করে।

বোরহান বড় বড় চোখ করে বলে, আরে ও তো কোনদিন মানুষই ছিল না যে এখন মারা যাবে। ও তো সবসময়ই একটা লাশ। সেই লাশের এখন গোসল করানো বাকী। এখন সেই লাশ জাহান্নামে নাকি জান্নাতে যাবে-এটা সৃষ্টিকর্তা জানে। আমার কাছে ওর নাম উচ্চারণ করবে না। আসলে অপমানের আগুনের চেয়ে বড় আগুন আর নেই। এই আগুন দেখা যায় না। মনের ভিতর সারাক্ষণ দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।

বোরহানকে বোঝাতে পরিবারের সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বুদ্ধি আটে। শেষে শ্বশুরের কথায় রাজি হয় বোরহান। বোরহান বশির উদ্দিনের বাসায় গিয়ে বেশ খানিকটা দূরে বসে। কথা না বললেও মাথা নিচু করে বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে বশির উদ্দিন। রাহেলা বেগম বোরহানের হাত ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, “বাবা জানি তোমার প্রতি অনেক অন্যায় করা হয়েছে।

সে তার ভুল বুঝতে পারছে। তাকে ক্ষমা কর বাবা”। বোরহানকে হাত ধরে বশির উদ্দিনের কাছে নিয়ে যায় রাহেলা বেগম। বশির উদ্দিন বোরহানের হাত ধরতে উদ্যত হলে বোরহান বাধা দেয়। ও বলে, “না, মুরব্বি হয়ে আমার হাত ধরলে আমি আবার কার কাছে ক্ষমা চাইব”? বোরহানের এই উদার মানসিকতায় আবেগভরা জলে ভরে যায় সবার চোখ।

এ প্রসঙ্গে কবিগুরু যথার্থই বলেছেন, “মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা, আর সমস্তটাই তার অধীন”।

বোরহান রুম থেকে সবাইকে যেতে বলে। বশির উদ্দিনের কাছে বসে বোরহান বলেন, “যাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছেন তার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন”? বাবার কথা শুনে ফয়সাল হতচকিত হয়। ও ভাবে, বাবা কার কথা বলছে? বশির উদ্দিন মাথাটা নিচু করে লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে বলেন, “তার কাছে ক্ষমা চাইব বলেই তো তোমাকে ডেকে আনা। আমাকে নিয়ে চলো তার কাছে”। পরিচিত একজন ভালো ডাক্তার দেখানোর কথা বলে বোরহান বশির উদ্দিনকে সাথে নিয়ে বের হয়।

ব্যক্তিগত গাড়িতে ওরা তিনজন বসা। সামানে বশির উদ্দিন। পেছনে বোরহান ও ফয়সাল। ফয়সাল জানতে চায়, “আমরা কোথায় যাচ্ছি”? ওর বাবা ইশারা দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে না বলে। বাবা-নানার লুকোচুরিতে ফয়সাল বেশ আশ্চর্য! বশির উদ্দনি সিটের সাথে মাথাটা হেলান দিয়ে ওই যে চোখ বন্ধ করেছেন আর খোলার নাম নেই। চোখ বন্ধ রাখাটা হতে পারে তার অতীত কর্মের এক ধরনের অনুশোচনার প্রতীক। “চোখ বন্ধ রেখে হয়তো তিনি বুঝাতে চাইছেন, এই চোখ দিয়ে অনেক কিছু দেখেছি, অনেক পাপ করেছি, আর দেখতেও চাই না, পাপও বাড়াতে চাই না”।

মহাখালীর চেয়ারম্যান বাড়ির কাছে ওদের দ্রুতগতির প্রাইভেট কারের সামানে একটি কুকুর পড়ে যায়। ড্রাইভার হার্ডব্রেক করলে কুকুরটি প্রাণে বাঁচে। নতুন জীবন পেয়ে কুকুরটি সামনে বসা বশির উদ্দিনের দিকে ঘেউ ঘেউ করতে করতে তেড়ে আসে। অবুঝ প্রাণীটির হিংস্র চোখজোড়াও হয়তো আজ বশির উদ্দিনকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে, ধিক্কার জানাচ্ছে!

গাড়ি আবার চলছে। বশির উদ্দিন কুকুরের আগ্রাসি চোখ-মুখকে অশনি সংকেত কি না-ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন। ভাবেন, “তবে কি শিউলি আমাকে ক্ষমা করবে না? কারও চরম ঘৃণার পাত্র হয়ে তবে কি দুনিয়া ছাড়তে হবে”? ভাবতে ভাবতে অসু্স্থবোধ করেন বশির উদ্দিন। গাড়ি থামিয়ে ফার্মেসি থেকে ডায়াবেটিস ও প্রেশারের কিছু ওষুধ কিনতে বলে ফয়সালকে। ফয়সাল ওষুধ এনে ওর নানাকে খাওয়ার পরামর্শ দেয়। বশির উদ্দিন না সূচক মাথা নেড়ে আবার চোখ বন্ধ করে।

মগবাজারে পৌঁছে গাড়ি এক জায়গায় পার্ক করে রাখা হয়। বশির উদ্দিনকে গাড়িতে রেখে বোরহান ফয়সালকে সাথে নিয়ে শিউলিদের বাসার গলিতে প্রবেশ করে। কিন্তু হতাশ হতে হয় ওদের। প্রতিবেশী একজন বৃদ্ধা জানায়, “শিউলির বাবা-মা মারা যাওয়ার পর হেরা এলাকা ছাইর্যা চইল্যা গ্যাছে”। বোরহান অস্থির হয়ে জানতে চায়, “খালা ওরা কোথায় গেছে”? বৃ্দ্ধা অনেকক্ষণ চিন্তা করেও বলতে পারে না। ডাকে তার ছেলে বউকে। ছেলে বউ শাড়ির আঁচলে গলার ঘাম মুছতে মুছতে ছাপড়ার মধ্য থেকে এসে বলে, “মা হেরা কারে খুঁজে”?

বৃদ্ধা বলে, “বউ মা শিউলরা কোনহানে থাকে, তুমি জানোনি কিছু? ছেলে বউ বিরক্তচোখে বলেন, “কোন শিউলির কতা কইতেছেন, লেংরার বেটি শিউলি”? বৃদ্ধা বলেন, “হ হ”। ছেলের বউ কাজে ব্যস্ত হতে মাজায় কাপড় জড়াতে জড়াতে বলে, “ওই যে বাড্ডার বেরাইদে থাকে”। বোরহান আরো কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করলে, মহিলাটি বিরক্ত হয়ে বলে, “আমার মেলা কাম, দুপুরের নিজের রান্দন শ্যাষে যামু বেটাগো মেসের রানবার। আপনারে পেচাল শোনার সময় আমার নাই। শিউলি ওই গ্রামে ওর খালার বাড়িত থাকে হুনছি। অহন জান তো”। গলির ভিতর হতে বের হতে হতে বোরহান ঘটনার সারাংশ বলে ফয়সালকে। ফয়সাল সারাংশ শুনে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।

বেরাইদ গ্রামে শিউলি থাকে-এই টুকু তথ্য নিয়ে ওরা রওনা হয়। বশির উদ্দিন বিমর্ষ হয়ে পড়েন। গাড়িতে কী কাগজ দেখছিলেন সেটা ব্যাগ ঢুকান এবং আবার সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজেন। ফয়সাল অবাক দৃষ্টিতে নানার মুখপানে চেয়ে থাকে।

বাড্ডা গিয়ে জানতে পারেন সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বেরাইদ গ্রাম। বালু নদের তীরে অবস্থিত গ্রামটিতে যাওয়ার একমাত্র বাহন নৌকা। বর্ষাকাল হওয়ায় বেরাইদ এখন জলমগ্ন গ্রাম। চারদিকে থৈ থৈ করছে বানের পানি।

একটি ছইওয়ালা নৌকা ভাড়া নিয়ে ওরা রওনা হয় বেরাইদের উদ্দেশে। নৌকা ছাড়ার সময় মাঝি জানতে চায়, “ছোডো বেরাইদ না বড় বেরাইদ”? মাঝির প্রশ্ন বোরহান-ফয়সাল মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। উত্তর দিতে না পেরে বলে, “যেটা আগে পাওয়া সেটাতে আগে চলো”। মাঝি বলে, “বড়ডা কাছে”।

লগি-বৈঠাতে নৌকা আর কত জোরে যায়? ওদিকে ভ্যাপসা গরম আর অনিশ্চয়তার চিন্তায় বশির উদ্দিনের রক্তচাপ বেড়ে গেছে। ওষুধ খাবে। পানি নেই। মাঝি বলে, “বানের পানি পবিত্র, খান সমস্যা হইবো না, আমরা হগল সময় এই পানিই খাই”। বশির উদ্দিন মাঝির দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে শেষমেষ বানের পানিতেই ওষুধ খেতে বাধ্য হলেন।

সূর্যের আলোর তেজ কমে গেছে। নদীর তীরে কেউ মাছ ধরছে, কেউ কেউ বাতাসে বসে গা জুড়িয়ে নিচ্ছে। তবে বশির উদ্দিনের গা কিছুতেই শীতল হচ্ছে না। অস্থিরতায় আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বোরহান-ফয়সালের চোখে-মুখের দুশ্চিন্তার ছাপ। বশির উদ্দিন বলেন, “নৌকা আরো জোরে চালাও”। মাঝি বলে, “হাতে আর কত কুলায়”? ফয়সাল নিজেও একটা বৈঠা ধরে।

বড় বেরাইদ পৌঁছে বোরহান শিউলির সব বর্ণনা দেয়। কিন্তু কেউ চিনতে পারে না। নৌকা আবার চলতে থাকে। ছোট বেরাইদের দিকে। বশির উদ্দীন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছেন। ডায়াবেটিসের ওষুধও খাওয়ানো হয়। কিন্তু শরীরের উন্নতি হয় না। সবাই আল্লাহর নাম ডাকতে থাকে। বোরহান মনে মনে প্রার্থনা করে, মরণকালে অনন্ত ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটা দাও খোদা।

ফয়সাল ওর পায়ের উপর নানার মাথা রেখে আস্তে আস্তে নদীর পানি ঢালতে থাকে। বশির উদ্দিন ধরাকণ্ঠে বলেন, “নানু ভাই যে করেই হোক শিউলির সাথে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা কর”। ফয়সাল বলে, “আল্লাহ আল্লাহ করো, তোমার কিছু হবে না, ইনশাল্লাহ সুস্থ হয়ে উঠবে”। হঠাৎ বোরহান ব্যাগের ভিতর দলিলের মতো একটা কাগজ দেখতে পায়। টান দিয়ে বের করে চোখ বুলিয়ে দেখে। কাগজটা পড়ে বোরহানের চোখজোড়া ছল ছল হয়ে উঠে। পশ্চিম আকাশে সূর্য লাল আভা ছড়িয়ে ডুবো ডুবো অবস্থা। সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগেই শিউলির দেখা না পেয়ে বশির উদ্দিনের জীবনাবসান ঘটে কি না-সেটাই এখন বড় প্রশ্ন!

ছোট বেরাইদের বাজার ঘাটে নৌকা ভিড়ায় মাঝি। বোরহান দাড়ি-টুপিওয়ালা একজন মুরব্বিকে শিউলির বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই বলে, “আপনারা কোথায় হতে এসেছেন”? বোরহান জানায়, ঢাকার উত্তরা হতে। মুরব্বি নিচে নামতে ইশারা করেন। বোরহান পড়ি-মরি করে নিচে নেমে শিউলিকে চিনে কিনা জানতে চায়? মুরব্বি কিছু না বলে পিছে পিছে আসতে বলে। কাদা-পানি মাড়িয়ে বোরহান মুরব্বির সাথে হাঁটা দেয়। খানিক বাদেই বোরহান জানতে চায়, আর কতদূর? মুরব্বি নিশ্চুপ। মিনিট পাঁচেক হেঁটে দুই ঘরের চিপার ভিতর দিয়ে ঢুকেই দেখে শিউলি উঠান ঝাড়ু দিচ্ছে। জোড়াতালির একটা শাড়ি পরা। জীর্ণ দেহের সাথে মুখটাও মলিন শিউলির।

দুজন দুজনকে দেখে থমকে যায়। বোরহান শিউলিকে সাথে আসতে বলে। শিউলি কিছু একটা প্রশ্ন করতে চাইলে বোরহান বলে, “কোন কথা নয় আসেন সাথে”। নৌকাতে বশির উদ্দিনকে দেখেই চমকে যায় শিউলি। সঙ্গে সঙ্গে মুখটি ঘুরিয়ে ফেলে। বশির উদ্দিন শোয়া অবস্থা থেকে মুখ তুলতে পারে না। শুধু আস্তে করে জিজ্ঞেস করে শিউলি এসেছে? বোরহান বলে, হ্যাঁ মামা। বশির উদ্দিন বলে ওকে থাকতে বলো আর তুমি কাছে এসো। বোরহানের কানে কিছু বলেন বশির উদ্দিন। মুরব্বিকে সব খুলে বলে বোরহান। মুরব্বি কিছুক্ষণের মধ্যে রেজিস্টার বই নিয়ে হাজির। মুরব্বি শিউলির মামা। পেশায় কাজী। কাজী সাহেব তার ভাগ্নিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে নৌকার ছইয়ের ভিতরে নিয়ে যান। বশির উদ্দনি অস্ফুট শব্দে শিউলির কাছে মাফ চায়। শিউলি চুপচাপ বসে থাকে।

ইতোমধ্যে বশির উদ্দিনের সাথে শিউলির বিয়ে পরানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন কাজী সাহেব। নদীর তীরে, নৌকার উপর উৎসুক বহু লোকের সমাগম ঘটেছে। কানে-মুখে নানাজন ফিসফিস করে নানা কথা বলছে। কবুল বলতে বললে শিউলি মূর্তির মতো বসে থাকে। ওদিকে বশির উদ্দিন চোখ বড় বড় করে লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছেন। কাজী সাহেব একজনকে পানি আনতে বলে। বশির উদ্দিনের মুখে গ্লাস ধরলে এক চইলের মতো পানি খায়। সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। বোরহান শিউলির হাত চেপে ধরে বলে, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে কষ্ট দিতে নেই।

একটু সদয় হও। শিউলি চোখ-মুখ শক্ত করে বসে আছে। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এক পর্যায়ে শিউলিকে কবুল বলাতে সক্ষম হন সবাই। বশির উদ্দিন ঠোঁটের কোণে স্বস্তির হাসিতে শিউলিকে একটি দলিল ধরিয়ে দিতে চান। শিউলি হাত না বাড়ালে বোরহান হাতে নিয়ে শিউলির হাঁটুর উপর রাখে। বোরহান জানায়, মামা তার দুই স্ত্রীর নামে উত্তরার সাত তলা বাড়িটি লিখে দিয়েছেন।

এমন সময় মা মা করে একটা সাত-আট বছর বয়সী ছেলে নৌকার ভিতর প্রবেশ করে। কাজী সাহেব জানান, বশিরের ছেলে এটা। ছেলেকে কাছে আসতে বলেন বশির উদ্দিন। ফয়সাল বশির উদ্দিনকে উঠিয়ে বসায়। আমার সন্তান, “আমার সোনা বাবা বলে কাঁদতে কাঁদতে বুকে জড়িয়ে ধরে ছেলেকে”। সন্তানের কপালে চুমু দিয়েই শিউলির কোলে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়েন বশির উদ্দিন।

সমাপ্ত

আপনার মতামত এর জন্য

কামরুল হাসান

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply