বনাম   –  মুক্তি দাশ
বনাম মুক্তি দাশ

বনাম – মুক্তি দাশ

 

 

(এক)

দেশজুড়ে লকডাউন। প্রাণান্তকর অবস্থা। বিশেষত বিভাসের মতো মধ্যবিত্তদের। ইদানীং আবার মধ্যবিত্ত থেকে আরও একটা শ্রেণী গজিয়ে গেছে। নিম্নমধ্যবিত্ত। বিভাসরা কি সেই নিম্নমধ্যবিত্ত ক্যাটাগরিতে পড়ে? বোধহয়।

কী করবে ভেবে পায়না বিভাস। নিজের শেষ সম্বলটুকুও এখন তলানিতে। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কুড়িহাজার টাকা মাসমাইনের চাকুরে সে। সেই অফিস এখন বন্ধ। পুরোপুরি। দেশের পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। এপ্রিল থেকে মাইনেও বন্ধ। কি যে হবে ভাবলেও শিউরে ওঠে বিভাস। রাতে ঘুমটা পর্যন্ত ঠিকঠাক হয় না। অদূর ভবিষ্যতে আসন্ন দিনের এই ভয়াবহ অন্ধকার হয়তো বা কেটে যাবে। কিন্তু ততদিন টিকে থাকতে পারবে তো বিভাসরা?

পাড়ার মোড়ে ক্লাবের ছেলেরা উদ্যোগ নিয়ে হৈ হৈ করে রান্না করা খাবার বিতরণ করছে। জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে আছে বিভাস। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সবচেয়ে বেশি বিপদ বোধহয় তাদের মতো নিম্নমধ্যবিত্তদের। না পারছে খাবারের লাইনে দাঁড়াতে, না পারছে উপোস থাকতে।

“কী দেখছো?” বিভাস খেয়াল করেনি, কখন মলিনা এসে তার পেছনে দাঁড়িয়েছে। ক্লাবের ছেলেরা মুখে মাস্ক লাগিয়ে সাধ্যমতো লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের খাবার বিতরণ করে চলেছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে বিভাস বলল – “কই,কিছু না…এমনি…”

“শোনো…” যুক্তি দেওয়ার মতো করে মলিনা বলল, “তোমার বন্ধুবান্ধবদের একবার ফোন-টোন করে দেখতে পারো তো…সারাদিন বাড়ি বসে থাকলে পেট চলবে?”

“কাকেই বা ফোন করবো?” বিভাস বলল, “সবারই তো একই অবস্থা!”

“বাসুদেববাবুকে ফোন করেছিলে?” মনে করিয়ে দিল মলিনা।

বিভাস বিষণ্ণ হাসলো। বাসুদেব তার বাল্যবন্ধু। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার পথে রোজ তাদের বাড়ি এসে তার মায়ের হাতে বানানো আচারের তেল দিয়ে মুড়ি-মাখা খেয়ে তবেই বাড়ি ফিরতো। এখন সে মস্ত বড় ব্যবসাদার। তাকে চিনতে যাবে কেন? সেবার মলিনার অসুখের সময় হাসপাতালের খরচ মেটাতে হাজার পাঁচেক টাকা ধার চেয়েছিল বিভাস। বাসুদেব কৌশলে এড়িয়ে গেছে। মলিনাকে সেকথা বলা হয়নি, বলবেও না। কী লাভ মলিনার বিশ্বাসে আঘাত হেনে, তাকে অহেতুক কষ্ট দিয়ে?

সেই বাসুদেব কিনা তার এই দুর্দিনে দেবে টাকা! বিষণ্ণ হেসে বিভাস বলল – “কী যে বলো…এখন সবাই নিজেকে বাঁচাতেই ব্যস্ত…”

“তা হোক…ওর তো অঢেল টাকা…তার ওপর তোমার প্রাণের বন্ধু” মলিনার দু’চোখে আশার ঝিলিক, “একবার ফোন করে দ্যাখোই না…”

(দুই)

দামী মার্বেলপাথরের সাজানো-গোছানো ঝকঝকে ড্রইংরুমে তখন পানপর্ব চলছিল। গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বাসুদেব বলল, “খুব ঝামেলায় পড়ে গেছি, বুঝলে ডার্লিং…কিচ্ছু ভালো লাগছে না…মোর দ্যান সিক্স মান্থস মাই ফ্যাক্টরি ইজ টোট্যালি ক্লোজড…ক্যান য়্যু ইমাজিন? লেবাররা ভুখা কুকুরের মতো ধুঁকছে…প্রোডাকশন বন্ধ…বিনা রিটার্নে কত আর হেল্প করা যায় বলো তো? যত সব হা-ভাতের দল! তারপর আছে বন্ধুবান্ধবদের হুজ্জোতি। কিছু একটা ছুতো পেলেই হাত পেতে দাঁড়িয়ে যাবে। বিভাসকে মনে আছে তো ? সেই যে গো আমার স্কুলের বন্ধু…যত্তোসব পাতি সেন্টিমেন্ট…সেবার দেখলে না বউয়ের চিকিচ্ছের জন্যে টাকা চেয়েছিল…”

গ্লাসে আর একপেগ ঢালতে ঢালতে সোমদত্তা বলল, “তুমি দিয়েছিলে নাকি? তোমার আবার যা বন্ধুপ্রীতি!”

বাসুদেব বলল, “পাগল নাকি? সেই বান্দা আমাকে পেয়েছ? এটা-ওটা বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।”

একটু থেমে বাসুদেব বলল, “কিন্তু জানো, আমার মন বলছে এই পরিস্থিতিতে বিভাস হয়তো ফোন করতে পারে, করবেই। আজ নয়, কাল। হাত-পাতা ওদের অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে…দাঁড়াও, তার আগেই একটা ব্যবস্থা করছি…”

বলে সে সোজাজুজি বিভাসের নাম্বারে ডায়াল করল। অপরদিকে বিভাসও ঠিক সেইমুহূর্তে বাসুদেবের কাছে টাকা ধার নেবে বলে ফোন করতে যাচ্ছিল। অথচ বাসুদেব নিজেই ফোন করছে দেখে অবাক হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে একূ বুঝি আনন্দও হলো। ফোন তুলে বলল, “হ্যালো বাসু, আমি তো তোকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম রে…ভীষণ দরকার..”

পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই বাসুদেব প্রায় হাহাকার করে উঠলো, “ওরে বিভাস, আমার বোধহয় সর্বনাশ হয়ে গেল রে…আমার কী হবে রে…”

থতমত খেয়ে বিভাস বলল, “কেন? কী হয়েছে বলবি তো…”

কোনোরকমে হাঁপাতে হাঁপাতে বাসুদেব বলল, আমার গিন্নি এখন নার্সিংহোমে…খুব তাড়াতাড়ি বিরাট অপারেশন করাতে হবে, নইলে ওকে বাঁচানো যাবে না, ডাক্তার বলে দিয়েছে দশলাখ টাকা লাগবে…আমাকে চব্বিশঘন্টা টাইমও দিয়েছে…এরমধ্যে টাকাটা জোগাড় করে ফেলতে হবে, নইলে…”

এই পর্যন্ত বলেই ফুঁপিয়ে উঠল বাসুদেব।

তারপর ধীরেসুস্থে ফোন কেটে দিয়ে সোমদত্তার দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসল। এবং ডান হাতের বুড়ো আঙুলের ডগায় তর্জনীর ডগা ছুঁইয়ে একটা মুদ্রা দেখাল। যার একটাই অর্থ : কেমন দিলাম!

 

 

 

আপনার মতামতের জন্য

 

মুক্তি দাশ
১৩৫, অঘোর সরণী,
রাজপুর
কলকাতা-৭০০১৪৯

 

আপনার মতামতের জন্য

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply