কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৯  –  সুব্রত মজুমদার
হাতি পেলেও মারি, করে দি চচ্চড়ি

কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৯ – সুব্রত মজুমদার

 

 

কিটকিটের কথায় ভয়ঙ্কর রেগে গেল কঙ্কটা। দাঁড়া উঁচিয়ে তেড়ে এল সে।
“কাঁই কটকট কিড়িং মিড়িং
আজকে তোকে না ছাড়িং !
এই দেখেছিস আমার দাঁড়া,
দাঁড়ার চাপে পড়বি মারা।”

কাঁকড়াটা দাঁড়া তুলে এগিয়ে আসতেই একটু পিছিয়েই আবার এগিয়ে এসে ক্যারাটের একটা দাওপ্যাঁচ লাগাল কিটকিট। উল্টে পড়ল কঙ্কটা। লাঠি তুলে কিটকিট বলল, “আর যদি আসিস তো মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব। রাস্তা ছাড়।”
ভয়ে ভয়ে পথ ছেড়ে দিল কঙ্কটা। কিটকিট ধরল তিরতির নদীর পথ।

তিরতির নদীর জল তিরতির করে বইছে। নদীতে জল একেবারেই কম। হেঁটে পেরিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু কিটকিটের জলকে খুব ভয়, ওর নরম লোম একবার ভিজে গেলে শুকানো মুশকিল। তাই সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। কিন্তু হাজার ভেবেও কোনও কুলকিনারা পেল না। বরং একটু ঘুম পেল।

ঘুম ভাঙ্গতেই খিদে পেল কিটকিটের। নদীর ধারে প্রচুর ঘাস। পেট ভরে ঘাস খেয়ে এল জল খেতে। দেখল একটা বিশাল বড় বোয়াল মাছ জলের উপরে পিঠটা তুলে মহানন্দে গান করছে।

“কি খাই কি খাই ?
হাতি পেলেও মারি, করে দি চচ্চড়ি,
আস্ত গোটা গিলে খাই।”

কিটকিটকে দেখে বোয়ালটার মুখ হতে লালা গড়িয়ে পড়ল। দৌড়ে এল কিটকিটের কাছে, টেনে ধরল একটা ঠ্যাং। প্রায় জলে টেনে নিয়ে গিয়েছিল আরকি। কিন্তু ঠিক তখনই একটা বড়সড় রুইমাছ এসে ধাক্কা মারল বোয়ালটিকে। কিটকিটের ঠ্যাং ছেড়ে ভুস করে জলে ডুবে গেল বোয়ালটা।

ডাঙ্গায় উঠে গায়ের জল ঝাড়তে লাগল কিটকিট। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে সে। কিন্তু যে তাকে বাঁচিয়েদিল তাকে একবার ধন্যবাদ জানানো দরকার।
-“তুমি কে গো আমার জীবন বাঁচালে ?” মাছটাকে শুধাল কিটকিট ।
মাছটা বলল, “আমি টিমটিম, সাগরে চলেছি । তুমি কে ?”
-“আমি কিটকিট, চলেছি জাদুকরেরের কাছে রাজকন্যা কঙ্কাবতীর সন্ধানে।”

টিমটিম বলল, “তা বেশ তা বেশ। আমরা দুজনেই বেরিয়েছি ঘর ছেড়ে। আমি যাব ওই দূর মহাসাগরের। আর ফিরব না। ওখানেই থেকে যাব।”
-“কেন গো, সেখানে কি বেশি বেশি ঘাস ?”
টিমটিম হেসে বলল,”আমি তোমার মতো শুধু ঘাসই খাই না, মহাসাগরে আমার জন্য প্রচুর খাবার। ছোটোমাছ, সমুদ্রের ঘাস, আরও কত কি ।”

কিটকিট মনে মনে ভাবার চেষ্টা করল সেই দৃশ্য। প্রচুর প্রচুর জল, সেই জলে ভাঁসছে অসংখ্য ছোটো ছোটো মাছ আর ঘাস, টিমটিম মনের আনন্দে খেয়ে যাচ্ছে সেসব। ঢেউয়ের পর ঢেউ টিমটিমের শরীরের উপর পার হয়ে যাচ্ছে। সে এক রোমহর্ষক ব্যাপার।

কিন্তু একটা কথা মনে পড়তেই ভয়ে শিউরে উঠল কিটকিট। সে টিমটিমকে বলল, “কিন্তু ওখানে তো তোমার চেয়েও বড় বড় মাছ থাকতে পারে, তখন কি হবে ?”
টিমটিম গম্ভীর হয়ে বলল, “তা তো ভেবে দেখিনি। তবে আমি কুংফু-ক্যারাটে জানি, কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।”
-“তাহলে ভাই আমাকে ওই জাদুকরের ঘরের কাছাকাছি নিয়ে চল। আমি তো জলে নামতে পারি না।”

টিমটিম এগিয়ে এল জলের একেবারে ধারে, টিমটিমের পিঠে চেপে বসল কিটকিট। টিমটিম চলল নদীবরাবর এগিয়ে । প্রায় মাইলটেক পরে একটা ঘন জঙ্গল চোখে পড়ল। নদীর দুধারে বিস্তৃত ঘন বন। বড় বড় গাছ আর লম্বা লম্বা লতা। কিছুদূর গিয়েই টিমটিম বলল,”এবার নেমে পড়। সামনের ওই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই পাবে শালের বন। শালের বনের পরে মহুলের আর তারপর পিয়ালের বন। পিয়ালের বনেই মাটির নিচে ঘর বানিয়ে থাকে জাদুকর। সাবধানে যেও।”
-“হ্যাঁ বন্ধু বিদায়।”

বনপথ ধরে এগিয়ে চলল কিটকিট। আকড় অর্জুন আর পলাশের জঙ্গল পেরিয়ে সে পৌঁছল শালের বনে । শালের বনের বিশাল বিশাল শালের গাছ, কোটরে কোটরে টিয়াপাখির বাসা। ডালে ডালে পাখিদের জটলা। আর গাছের কান্ড হতে ঝরছে ধুনো। তার ভারি সুগন্ধ।

শালের বনের পর মহুলের বন। গাছের তলায় মহুলের ফুল পড়ে আছে। খেতে বেশ মিষ্টি। খেলে মাথায় ঝিম ধরে, নেশা হয়। মহুলের শাখায় কোচড়া ফল। দেখতে দেখতে মহুলের বন পার হয়ে যায় কিটকিট। এসে পড়ে পিয়ালের বনে।

পিয়ালের ডালে রাশি রাশি পাকা পিয়াল। কি সুস্বাদু সে ফল, যেন অমৃত। একগাদা পিয়ালপাকা খেয়ে গাছের তলায় বসে জিরোতে থাকে কিটকিট। এ ফল খাওয়া তো দূর কোনোদিন এর নামও শোনেনি সে।

গাছের তলায় একটা কাঠবেড়ালি ঘুরঘুর করছিল, সে কিটকিটকে দেখে অবাক হল। এযাবৎ খরগোশ সে অনেক দেখেছে কিন্তু অমন সাদা ধবধবে খরগোশ সে জীবনেও দেখেনি। বনে যেসব খরগোশ আছে তাদের রং কালো বা লালচে। কিটকিটকে দেখে ও বলল, “তুমি কে গো ? কোথা হতে এসেছ ?”

কিটকিট বলল, “আমি কিটকিট এসেছি জাদুকরের খোঁজে। তুমি জানো তার ঠিকানা ?”
কাঠবেড়ালি বলল, “অবশ্যই পারি। ওই যে নদীর ধারেই পিয়ালের গাছ দেখছ ওর নিচেই থাকে জাদুকর। তবে এখন সে বের হবে না। কাল রাতে চাষীর হাতে বেদম মার খেয়ে শয্যা নিয়েছে।”

-“কেন, কি করেছিল ও ? ” শুধাল কিটকিট ।
কাঠবেড়ালিটি নিচতে নাচতে বলল, –
দুষ্টু ব্যাটা জাদুকর তাকে সবাই করে ডর,
সে ব্যাটা অতি চালাক নাইকো তার ভয় ডর ।
সন্ধ্যা হলে বেরিয়ে পড়ে গ্রামে গঞ্জে দূর শহরে,
ছাগল ভেড়া মুরগি ধরে, ব্যতিব্যস্ত গ্রাম-শহর।
একদিন সে পড়ল ধরা, চাষীর মারে আধমরা,
পালিয়ে এসে ঢুকল ঘরে, তার পরে আর খবর নেই ।

কিটকিট চলল জাদুকরের ঘরের দিকে। কাঠবেড়ালি দূরেই দাঁড়িয়ে রইল। জাদুকরের ঘরের কাছে যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। জাদুকরকে খুব ভয় পায়।

জাদুকরের দরজার সামনে এসে হাঁক দিল কিটকিট, “ও জাদুকর, বাড়িতে আছ ?”
কোনও উত্তর নেই। আবার হাঁক পাড়ল কিটকিট। এবারও কোনও উত্তর নেই। বারবার ডাকাডাকি করে বিরক্ত হয়ে কাঠবেড়ালির কাছে ফিরে এল সে।

-“জাদুকর তো ওর ঘর হতে বের হল না ! কি করি বল তো ভাই।”
কাঠবেড়ালি বলল, “আমার মনে হয় না ও বেরোবে। সুস্থ থাকতেও ওকে সূর্যাস্তের আগে বেরোতে দেখিনি কোনোদিন। তুমি আমার সঙ্গে চলো, তোমাকে এই বনটা ঘুরে দেখাই। সন্ধ্যা হলেই ফিরে আসব। তখন একটা বুদ্ধি করা যাবে।”

কিটকিট আর কি করে, কাঠবেড়ালির কথা মানা ছাড়া উপায় নেই ওর। তাই বেরিয়ে পড়ল কাঠবেড়ালির সঙ্গে।

চলবে…

 

আপনার মতামতের জন্য 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply