বল হরি – সুদীপ দাশ
সুদীপ দাশ

বল হরি – সুদীপ দাশ

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:January 10, 2021
  • Reading time:1 mins read
 

 

সকাল থেকে মেজাজটা বিগড়ে আছে রুমির। আসলে যত নষ্টের গোড়া হল ওর পুত্র বুম্বা।কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ কাল বিকেলে মোবাইল এ জানালো ওর বাড়ি ফিরতে রাত হবে অনেক।কার যেন জন্মদিনের পার্টিতে যাবে। সেখানেই খেয়ে আসবে। তাই ফিরতে ফিরতে রাত একটা হল।বাইক নিয়ে ওত রাতে ফেরা।রুমির সবসময় তো ভয় ভয় করে।তাঁর ওপর পার্টি করে ফেরা।আজকাল এই সব ছেলেদের বিশ্বাস আছে? পার্টিতে ড্রিঙ্কস করবে, হুল্লোড় করবে। তাই রুমি মাঝে মাঝেই বুম্বাকে কল করে খবর নেয়। ওর বাবার তো একটাই কথা। ছেলে নাকি মায়ের আস্কারাতেই উচ্ছন্নে যাচ্ছে।

এদিকে ছেলে রাত একটার পর ঢুকে সে কি মেজাজ।কেন বার বার ওকে ফোন করা হয়েছে। বন্ধুদের কাছে ওর লজ্জায় পড়তে হচ্ছে।ওই রাতে মেজাজ সপ্তমে করে কি চিৎকার।যত ওকে রুমি বোঝাতে চেষ্টা করে যে আসে পাসের লোকজন শুনতে পাবে,কে কার কথা শোনে।রুমি ও দাবড়ানি দিয়ে দেয় দু চার কথা শুনিয়ে।ও এই জীবনে বর, শাশুড়ি,ননদ কারুর কথার ধার ধারে নি,এখন ছেলের মেজাজ শুনতে হবে? রাতদুপুরে এই ধুম্ধুমারের পর রুমির ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না, বুম্বার স্বান্তনা,–এ সব এবাড়ির পরিচিত এক ঘটনা।বুম্বার বাবা শোভনকে আর আজকাল মা ছেলের এই রোজকার ড্রামায় তেমন ভাবায় না।

অনেক রাতে ঘুমোনোর পর আর রুমি বুম্বাকে সকালে তাড়াতাড়ি ডাকে নি। হঠাৎ ধড়মর করে উঠে সেই আবার মায়ের ওপর চোপপাট ছেলের।কেন ওকে আরো সকালে ঘুম থেকে তোলা হয়নি।ও যখন চেঁচামেচি করে তখন আর কারুর কোন অসুবিধা করছে কিনা সেকথা ওর মাথায়ই থাকে না। যাই হোক কোনমতে স্নান খাওয়া সেরে সে সাড়ে নটায় বেরিয়ে পড়ল অফিসের উদ্দেশ্যে।ও এক বেসরকারি অফিসের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনী।ও বেরিয়ে গেলে রুমি একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।শোভন তো কলেজে পড়ায়,আজ আট মাস আর বাইরে বেরোনো নেই, মাঝে মাঝে একটু অনলাইন ক্লাস নিতে হয়।অতিমারী মানুষ গুলোকে এমন অলস করে দিল,যে এরপর যদি আবার আগের ব্যস্ত অবস্থা আসে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে।

সকালের জলখাবার খাওয়ায় পর একটু মোবাইলটি নিয়ে বসে রুমি। ওদের পাড়ার মেয়েবউদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, সেখানে কে কি রাঁধল,কি খেল,কার জন্মদিন, কার বিবাহবার্ষিকী ,কারুর নাচ, কারুর আবৃত্তি,গান আপলোড করে। কিন্তু আজ ওই হোয়াটসঅ্যাপটি খুলতেই রুমির মেজাজটা টং হয়ে গেল। ওদের পাসের বাড়ির মিলিদি একটি পোস্ট দিয়েছেন গ্রুপে,–
Neighbor’s shouting at midnight ! Don’t bother.Have sleeping pill.Feel peace!!

রুমি বেশ বুঝতে পারল যে পোস্টটি ওদের বাড়ির গতরাতের সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা।মিলিদির আবার বাংলাটা ঠিক আসে না ,তাই ও যাবতীয় পোস্ট ইংরেজিতেই দেয়। কিন্তু এটা কি ওর গ্রুপে সকলকে জানিয়ে লেখা ঠিক হয়েছে? রুমির পার্সোনাল নম্বরে তো জানাতে পারত। তাছাড়া ওদের তো প্রতিবেশীদের সব কিছুতেই অসুবিধা হয়।রুমি দের বাসন মাজার লোক অনেক সকালে এসে মিলিদিদের দিকের কলের পাসে বাসন মাজে,বকবক করে, আওয়াজ করে — তাতে নাকি মিলিদির বরের সকালের কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়। আবার রুমিদের দোতলায় লাগানো এয়ারকন্ডিশন যন্ত্রর ফোঁটা ফোঁটা জল মিলিদিদের পাঁচিলে পড়ে পাঁচিলের নাকি ক্ষতি করছে।

রুমির তাই আজ বুম্বার ওপর খুব রাগ হচ্ছে।আজ আসুক,ওকে জিজ্ঞেস করবে ওর জন্য আর কত অপদস্ত হতে হবে। এরমধ্যে গ্রুপে মিলিদির মন্তব্যের ওপর আরো কত জিজ্ঞাসা,প্রতি মন্তব্য করা চলছে। কেউ বলছে,– এমন প্রতিবেশী কে উচিত শাস্তি দিতে হয় আবার কেউ বলছে ‘সামাজিক বয়কট’ করতে হয়।সব মন্তব্যই চলছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে।রুমির লজ্জায় মুখ দেখানোর জো নেই।মজার কথা হল রাস্তাঘাটে বা বাজার দোকান যাওয়ার সময় সেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা হলে কিন্তু ও ব্যাপারে কোন উক্তি করেনা কেউ।দেখা হলে শুধু মৃদু হাসি আর ‘হাই, হ্যাল্লো’। ভালো তো?’

এই আধা–মফস্সল জায়গায় অতীতের পুকুরঘাটে যেমন মেয়ে বৌদের দিন কাটত হর্ষ কলহে,আবেগে, খুনসুটিতে ,তেমনই আজকের এই আন্তর্জালের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।আজ আর কেউ কারুর মুখোমুখি নয়।সেই পুকুরঘাটের জায়গা নিয়েছে এই আন্তর্জালের বন্ধন।
|

সেদিন বুম্বা বাড়ি ফিরলে রুমি ওকে হোয়াটসঅ্যাপ এর সেই সব মন্তব্যের কথা বলল। বুম্বা তো সেই আবার চিৎকার করে বলল,’ আমি আমার ঘরে বসে কি করেছি,তার কৈফিয়ৎ আমি কাউকে দেব না।আমার এপাড়ার সব লোক চেনা আছে।সব শালা স্বার্থপর।’

রুমি ওকে চুপ করাতে পারে না। ঘরের জানালাগুলো তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দেয়।আসলে মিলিদিদের তো একটিই মেয়ে, পড়াশোনা করে।সে এমনই শান্ত যে বাড়িতে আছে কি নেই তাই বোঝার উপায় নেই।হত বুম্বার মতন একটা দামাল ছেলে বুঝত,– যেমন দশাসই তার চেহারা,তেমন বাঁজখাই তার গলার স্বর।

বুম্বা রাতে ঘুমোতে যায় খুব দেরি করে।এই টিভিতে এ চ্যানেল ও চ্যানেল ঘোরানো, আবার খেলা দেখা, মুভি দেখা এসব করতে করতে একটা দেড়টার আগে ঘুমোতে যাওয়া ওর হয় না। অনেক সময় ওর শোবার ঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে দূরে অন্ধকারে তাকিয়ে থাকতে ওর দারুন লাগে। চারিদিকে নিঃঝুম। মাঝে মাঝে পেঁচার ডাকে প্রহর গোনে ও।

সেদিন একটু বেশি রাতই হয়ে গিয়েছিল বুম্বার,তার দুটো আড়াইটা হবে। সিগারেট ধরিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছিল পাসের বাড়ির মিলিআন্টির বাড়ির লাইট তখনও জ্বলছে।কে জানে কেন? হঠাৎ ও দেখল সোমেশ আন্কল ওদের ওয়াগন আর গাড়ি বের করল।তার কিছুক্ষণ পর দেখল ওরা হুস করে গাড়ি নিয়ে কোথাও বেরিয়ে গেল।

অনেক রাত হয়েছে,তাই বুম্বা ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন ঘুম থেকে উঠে যথারীতি হুড়োহুড়ি পড়ে যায়, অফিস যাওয়ার জন্য। বুম্বা ভুলেও গেছে গত রাতের কথা।
এদিকে সোমেশ,মানে মিলির কত্তা সকাল বেলা এই আবাসনের সেক্রেটারি মশাইয়ের কাছে সকাল সকাল এসে হাজির। বক্তব্য হল মিলির মা কদিন আগে অসুস্থ অবস্থায় মেয়ের বাড়ি এসেছিলেন। কিন্তু গতকাল মাঝরাতে বুকে ব্যাথা হওয়ায় ,তখন ওরা স্থানীয় বাঙ্গুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অ্যাডমিশন হয় না ,বলা হয় আগেই মৃত্যু হয়েছে।,– ‘ব্রট ডেড।’মনে হয় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।’ তাই গাড়ি করে বডি ফেরত নিয়ে আসা হয়েছে।এখন একজন লোকাল ডাক্তারকে দিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট এর ব্যবস্থা করতে হবে।কোন ডাক্তার চেনা আছে কিনা সে জানতে চায়।

সেক্রেটারিমশাই সামনের পাড়ার একজন বৃদ্ধ পুরোনো ডাক্তারকে চেনেন।তার কাছে পাঠালেন। কিন্তু কাজ হল না। ডাক্তার বাবু পুরোনো প্রেসক্রিপশন দেখে বললেন,-‘এ তো কার্ডিয়াক অ্যজমার পেশেন্ট, আগে যাকে দেখাচ্ছিলেন,তাকে ডাকুন,আমি সার্টিফিকেট দিতে পারব না।’

এবার আর এক উঠতি ডাক্তারের কাছে যাওয়া হল।সে পরিষ্কার জানাল যে,– ‘ আমি সরকারী চাকরী করি তো। তাই কোন সার্টিফিকেট দেওয়ার আমাদের নিয়ম নেই।’

এরমধ্যে আত্মীয়-স্বজনরা খবর পেয়ে বাড়িতে আসতে শুরু করেছে। রুমিদের বাড়িতেও খবর এসেছে।রুমি একবার পাসের বাড়ির ঘুরেও এল, হাজার হোক একেবারে নিকটতম প্রতিবেশী তো। কিন্তু ও খবর পেল যে কোন ডাক্তারই মাসীমার ডেথ সার্টিফিকেট দিতে চাইছে না।কি আশ্চর্য একটা মুমূর্ষু রোগীর বাড়িতে মৃত্যু হলে কি ঝকমারি!যে ডাক্তার এর চিকিৎসায় ছিল তাকে কি সবসময় আনা যায়,বা পাওয়া যায়? রুমি এই সমস্যার কথা শোভনের সঙ্গে আলোচনা করছিল এমন সময় বুম্বা অফিসের জন্য বেরোনোর তোড়জোড় করছে।ও শুনে বলল,–‘ও তাই তো কাল মাঝরাতে দেখলাম গাড়ি নিয়ে আন্কল কোথাও বেরোচ্ছিল।কেন ডাক্তার পায় নি?’

–‘তাই তো শুনলাম।দুজন ডাক্তার রিফিউজ করেছেন?’
–‘ আমি দাঁড়াও দেখছি। আমার বন্ধু ঝিলাম এর বাবাকে একটু রিকোয়েস্ট করি।কাকু খুব ভালো। ঠিক শুনবেন। আগে ঝিলামকে বলি প্রবলেম টা।’
–‘ আরে তোর তো অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে,তাই না।’
— ‘মা,এরকম একটা সমস্যায় তো আমরা সবাই পড়তে পারি।একটু দেখি সাহায্য করা যায় কিনা।’

ও ঝিলামকে বোঝাল যে এই কেস এ কোন ‘ফাউল প্লে’ নেই।একজন প্রতিবেশী বিপদে পড়েছে। ঝিলাম ওর বাবাকে ধরিয়ে দিল মোবাইলে, বুম্বা অনুরোধ করল,–‘কাকু,আমি গ্যারান্টার থাকলাম। এখানে কোন ফাউল প্লে’ নেই। আমরা আপনাকে গাড়ি করে নিয়ে আসছি। আবার যেখানে বলবেন পৌঁছে দেব।’

এর মধ্যেই মিলির বর সোমেশও রুমিদের বাড়িতে হাজির হয়েছে। শেষমেষ ডঃ সেন, ঝিলাম এর বাবা সার্টিফিকেট দিতে রাজি হলেন।তবে‌ ওকে গল্ফগ্রীন থেকে নিয়ে আসতে হল।
রুমি অবাক হয়ে ওর ছেলের কান্ড দেখছিল।এই ছেলেই সেইদিন মিলিদিদের দেখতে পারত না।আজ অফিস চুলোয় গেছে, ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে একটা কাজে আটকে আছে, সেকেন্ড হাফে যাবে।
ঘন্টাখানেক এর মধ্যেই ডঃ সেনকে নিয়ে এল মিলির বর।

দেখতে দেখতে ডেথ সার্টিফিকেট লেখা হল। অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ডঃ সেন কে বিদায় জানান হল।মিলি আর সোমেশ এসে বুম্বাদের অনেক ধন্যবাদ জানাল। ততক্ষণে দেহ নিয়ে যাবার গাড়ি এসে পড়েছে। বুম্বা ঝিলামের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুব সুন্দর একটি ধন্যবাদ দেওয়ার ছবি পোস্ট করল। ঝিলামও সঙ্গে সঙ্গে লাইক জানালো।

মরদেহ রওনা দিল শ্মশানের গন্তব্যে।

রুমি-মিলিদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তখন মুহুর্মুহু শ্রদ্ধা আর ‘বিশ্রাম নাও শান্তিতে'(RIP) এর পোস্ট, যদিও গোটা চারেক প্রতিবেশী দাঁড়িয়েছিল যাত্রাপথে,–অবিশ্যি কিছুটা দূরত্বে —

বল হরি,হরি বোল॥

Sudip Das
Sudip Das

 

 

 

আপনার মতামতের জন্য

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply