রাগী রাজা ও কল্পনা বিলাসী রাজপুত্রের গল্প  – শেখ আব্দুল্লাহ ইয়াছিন

রাগী রাজা ও কল্পনা বিলাসী রাজপুত্রের গল্প – শেখ আব্দুল্লাহ ইয়াছিন

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:January 14, 2021
  • Reading time:1 mins read

একদেশে এক রাজা ছিলো। রাজা ভীষণ রাগী স্বভাবের ছিলো। রাজার একমাত্র ছেলে ছিলো রাজপুত্র। রাজা তাকে খুব ভালোবাসত। রাজা চাইত তার পুত্র রাজ্যের ভবিষ্যৎ কর্ণধার হবে। তাই রাজা তাকে শিক্ষা দীক্ষা, যুদ্ধের কলা-কৌশল ইত্যাদি শিখানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাজপুত্রের এসবে কোন ইচ্ছে ছিলো না। সে স্বভাবগত ভাবে কল্পনাপ্রবণ ছিলো। সে অন্যকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প শুনাতে ভালোবাসত। এসব কারণে রাজা রাজপুত্রের উপর প্রচন্ড বিরক্ত হলেন। তাই একদিন রাজা তাকে খুব করে বকলেন। রাজপুত্র বাবার সাথে রাগ করে গভীর রাতে পাহারাদার কে ফাঁকি দিয়ে রাজপ্রাসাদ হতে পালিয়ে যায়।

রাজপ্রাসাদের একটু দূরেই এক নদী ছিলো। নদীর ওপারে ছিলো অন্য আরেকটি গ্রাম। নৌকা করে নদী পার হয়ে সে গ্রামে প্রবেশ করে রাজপুত্র। তারপর সোজা গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাটতে হাটতে পথ হারিয়ে অন্যগ্রামে চলে যায় সে।

দুপুরের প্রচন্ড রৌদ্রে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় সে এক বটগাছের নিচে আশ্রয় নেয়।সারাদিন না খেয়ে থাকায় সে খুব ক্ষুধার্ত ও ছিলো। সে একসময় গাছের নিচে অজ্ঞান হয়ে পরে। বটগাছের পাশেই গরু চড়াচ্ছিল এক রাখাল। সে রাজপুত্রকে দেখে দ্রুত ছুটে গেল। দেখতে পেল তার সমবয়সী সুদর্শন এক বালক জল জল করে কাতরাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে ধনী পরিবারের সন্তান। রাখাল পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাকে তার বাসায় নিয়ে আসল।

রাজপুত্রের জ্ঞান ফিরার পর সে নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন জায়গায় আবিষ্কার করলো। রাখাল তাকে খেতে দিয়ে বলল-
ভাই তুমি বটগাছের তলায় অজ্ঞান হয়ে পরে ছিলে পরে আমি তোমাকে আমার বাসায় নিয়ে এসেছি।
তুমি কে ভাই?

রাজপুত্র রাখালকে সব খুলে বললো এবং তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলো। রাখাল সব কথা শুনে তার বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে রাজপুত্রকে বললো সমস্যা নেই তুমি যেহেতু সমস্যায় পরেছ সেহেতু তুমি চাইলে আমার সাথে এখানে থাকতে পার। এখানে মা-বাবা আর আমি একসঙ্গে থাকি।

রাখালের বাবা ছিলেন একজন কৃষক। অন্যের জমিতে চাষ করে কোন ভাবে সংসার চালান তিনি। রাখালের খুব ইচ্ছা পড়ালেখা করে একদিন অনেক বড় হবে। একবার স্কুলে ভর্তি ও হয়েছিল তখন মায়ের টাকায় তার পড়াশোনার খরচ চলত কিন্তু মা অসুস্থ হয়ে যাওয়া অন্যের বাড়িতে এখন আর কাজ করতে পারেন না। তাই রাখালের পড়াশোনা ও বন্ধ হয়ে যায়। দারিদ্রতার কাছে তার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যায়।

রাখাল তার বাবা-মাকে যথেষ্ট সম্মান করে। বাবার মাঠের কাজে, মায়ের রান্নার সব কাজে সাহায্য করে সে। এমনকি মায়ের সঠিক সময়ে ঔষধ খাওয়ানোর দায়িত্বও তার। সে কখনো বাবা-মায়ের কথার অমান্য করে না। রাখালকে দেখে রাজপুত্র অবাক হয়। রাখালের বাবা-মাও রাখালকে অনেক স্নেহ করে। এসব দেখে পিতাকে খুব মনে পড়ে রাজপুত্রের।

রাখাল ও রাজপুত্রের মাঝে ইতোমধ্য একটা ভাব তৈরি হয়েছে। তারা একে অন্যের ভালো বন্ধু হয়ে গেছে। রাখাল প্রতিদিন মাঠে গরু চড়াতে গেলে তার সাথে রাজপুত্রও যায়। কাজের ফাঁকে রাজপুত্র রাখালকে বটগাছ তলায় বসে অনেক অনেক গল্প শোনায়।সে কত রকম গল্প, হাসির গল্প, ভূতের গল্প, বাঘ-ভাল্লুকের গল্প হরেক রকমের গল্প। গল্প শুনে রাখাল কখনো খিলখিল করে হাসে, কখনো বা ভূতের ভয়ে গা ছমছম করে ওঠে। রাখাল রাজপুত্রের এমন গল্প বলার ধরণ দেখে মুগ্ধ হয়। ভাবে এ ছেলেটা সত্যিই অনেক মেধাবী।

রাখাল একবার বটগাছ তলায় গল্প করতে করতে রাজপুত্রকে তার পড়াশোনা করার ইচ্ছের কথা জানায়।রাজপুত্র তাকে পড়ালেখা শেখানোর প্রতিজ্ঞা করে এবং সেও তার ইচ্ছের কথা রাখালকে জানায়।

দেখতে দেখতে এভাবে বহুবছর কেটে গেল। রাজা তার পুত্রের জন্য অধিক আগ্রহে পথ চেয়ে বসে থাকে কিন্তু রাজপুত্র আর ফিরে আসে না। রাজা বহু জায়গায় রাজপুত্রের সন্ধান করেছে কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মিলেনি।

রাজা রাতে ঠিক ভাবে ঘুমাতে পারেন না। পুত্রের চেহারা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠে।রাজপুত্রের প্রতি রাগ, অভিমান, অনেক ক্ষোভ। ছেলেকে একটু শাসন করল আর ছেলে বাবাকে এভাবে রেখে চলে গেল! এতগুলো বছরেও সে বাবার কথা স্মরণ করল না। তার এত অভিমান বাবার প্রতি। সেদিন ছেলে কে এমন ভাবে বকা দেওয়া মুটেও ঠিক হয়নি বরং বুঝিয়ে বলা উচিত ছিলো এসব ভেবে তিনি রাগ ও ক্ষোভ ভুলে গিয়ে নিজের প্রতি অনুতপ্ত হন। রাজা রাজপুত্র কে খুব করে মিস করেন।

একবার সে দেশের মেয়র একটি গল্প বলা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এতে দূর দুরান্ত হতে বহু গল্পকার অংশ নেন। রাখালের সাহায্যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় রাজপুত্রও।

মেয়রের দরবার মহলে যথারীতি সময় অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রতিযোগিরা একে একে গল্প বলা শুরু করেন। রাজপুত্রের গল্প শুনে সবাই মনোমুগ্ধ হয় এবং বিচারকের নির্বাচনে ‘গল্প বলা প্রতিযোগিতায়’ সে সেরা নির্বাচিত হয়।

সে প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজা। রাজা রাজপুত্রকে চিনতে পেরে অশ্রুসিক্ত হয়ে পরেন এবং ছেলের কৃতিত্ব দেখে গর্বিত হোন। রাজপুত্র ও রাজাকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেন। রাজা এতদিনের সকল রাগ অভিমান ভুলে গিয়ে পুত্রকে বুকে টেনে নেন।

উপস্থিত সকলে প্রথমে অবাক হলেও পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সকলে আবেগঘন মূহুর্তে পিতা পুত্রের মিলন কে হাত তালি দিয়ে স্বাগত জানায়।

রাজপুত্র তার ভুলের জন্য রাজার কাছে খুব করে ক্ষমা চাইল । রাজা ও রাজপুত্র উভয়ে ইতিমধ্যে তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। রাজা রাজপুত্র কে বলে হে আমার পুত্র আমায় আর কখনো ছেড়ে যেও না।

রাজপুত্র জবাবে বলল- আর কখনো এমন ভুল করব না, আমায় মাফ করে দাও পিতা।আমি তোমায় অনেক অনেক ভালোবাসি।

রাজা-রাজপুত্রের মধু মাখা ভালোবাসা দাড়িয়ে প্রত্যক্ষ করছিল রাখাল। রাজপুত্র রাজার সাথে তার বন্ধু রাখালের পরিচয় করিয়ে দেয় এবং রাখালকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি পূূর্ণ করে।

সে রাজাকে বলে রাখালকে তার সাথে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে। রাজা ছেলের কথা রাখেন। রাজপুত্র ও রাখাল এখন একসাথে স্কুলে যায়।

অনেকক্ষণ ধরে সানবিরকে পড়তে বসতে ডাকছে তার মামণি। সানবিরের সেদিকে খবরই নেই। সে সেই দুপুরে যেই রাগী রাজা ও কল্পনা বিলাসী রাজপুত্রের গল্পের বই নিয়ে বসেছিল গল্পের ভেতর ডুবে থাকার কারণে তার আর কোন কিছুর প্রতি খেয়ালই নেয়। এখন দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো সানবির ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসল এবং পণ করল আজ হতে বাবা-মায়ের সব কথা সে শুনবে, কখনো অমান্য করবে না। তার কিছু দরকার হলে বুঝিয়ে বলবে তবুও বাবা মায়ের মনে কষ্ট দিবে না।

Sheikh Abdullah Yeasin

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply