রূপকথার গল্প – বন্ধু – অপালা মুখার্জী

story and article

বিজয়নগরের প্রজারা বেশ কিছুদিন ধরেই সন্ধ্যে হলেই যে যার ঘরে ফিরে যায় । অত বড় যে রাজপুরী – একেবারে নিঝুম হয়ে পড়ে ।রাত হওয়ার আগেই সবাই খাওয়া – দাওয়া সেরে তেলের বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে । এমন যে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাজামশাই – তিনিও তো মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন, রাজ্য আর সিংহাসন বাঁচাতে পারবেন তো ? ভীষণ ভয়ে তিনি রাণীমা আর রাজকুমারী মনিমালাকে অন্ধকার হলে জানলার পাশে দাঁড়াতেও মানা করে দিয়েছেন ।

কেন বলো তো এত সাবধানতা ? বুঝলে না তো কিছু ? আচ্ছা দাঁড়াও – আগে তো গল্পটা বলি !

ভালোই তো রাজ্য শাসন করছিলেন রাজামশাই। তাঁর প্রতাপে রাজ্যের প্রজারা তো মহা সুখে বসবাস করছিল । কিন্তু শান্তিতে কি চিরকাল থাকার উপায় আছে ?

গত কিছুদিন হলো, সূয্যি ঠাকুর যেই না অস্ত গেলেন – রাজ্যের পশ্চিমে যে জঙ্গল, সেখানে কোথা থেকে উড়ে এসে নামে মস্ত দুটো পাখির আকারের রথ । আর রাতের অন্ধকারে সেই রথ থেকে নেমে আসে মানুষের আকৃতির কতগুলো ছোটবড় ছায়ামূর্তি – উচ্চতায় তারা মানুষের চাইতে ঢের বড়ো । সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে তারা । কেন তারা এসেছে – কি ক্ষতি তারা করতে পারে , তার কোনো হদিশ রাজ্যের লোক পায়নি, কিন্তু ভূতের মত লোকগুলোকে দেখে এক অজানা ভয়ে তারা কেঁপে কেঁপে সারা ।

রাজকুমারীর মনে কিন্তু দারুণ কৌতূহল ।তার ইচ্ছে – ওই লোকগুলোকে সে একবার দেখবে। কিন্তু রাজামশাই যে তাকে রাতে জানলা দিয়ে দেখতেও মানা করেছেন !

সেদিন রাতে রাজকুমারীর দাসী যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো – চুপিচুপি তার ঘরের জানলায় গিয়ে দাঁড়ালো মনিমালা । অন্ধকারের মধ্যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইলো বাইরের দিকে । ও কি ! বাগানের মধ্যে একটা ছোট্ট ছায়া নড়াচড়া করছে না ! ওটা আবার কি ! একটু ভয় ভয় করতে লাগলো মনিমালার । একবার ভাবলো – ছুটে ঘরের মধ্যে চলে যায় । তারপরে ভাবলো -‘ দেখিই না কি হয় !’

ছায়ামূর্তি তার জানলার নীচে এসে ওপরে তাকালো ।মনিমালা দেখলো – প্রায় তারই মত দেখতে একটা ছোট্ট মেয়ে – শুধু মাথার ওপরে দুটো শুঁড় আছে । হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকলো রাজকুমারী । ওমা ! চোখের পলকে মেয়েটার পিঠের দুদিকে প্রজাপতির ডানায় মত দুটো রঙীন ডানা বেরিয়ে এলো । শুঁড় দিয়ে সাবধানে একবার চারপাশটা দেখে নিলো সে – তারপরে উড়ে এসে ঢুকলো মনিমালার ঘরে। চোখের পলকে আবার কোথায় মিলিয়ে গেলো তার ডানা দুটো ।

ছোট্ট মেয়েটা এসে খপ করে চেপে ধরলো রাজকুমারীর হাত দুটো । রাজকুমারীর মনে হলো – তার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো । ও মা ! মেয়েটা রিনরিনে কেমন একটা অদ্ভুত আওয়াজে জিজ্ঞাসা করলো -‘ তুমি কে ? তুমি কি রাজকুমারী ?’

মনিমালা বললো -‘ আগে বলো, তুমি কে ? কোথা থেকে এসেছ তোমরা ? আমার ভাষা তুমি শিখলে কি করে ?’

-‘ আমি রাজকুমারী সু । তোমাদের রাজ্য থেকে অনেক দূরে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে আমাদের প্রজাপতি রাজ্য । বহু, বহু যুগ আগে আমরাও তোমাদেরই মত মানুষ ছিলাম – এক লাল পরীর অভিশাপে প্রজাপতি হয়ে গেছি । আমরা সবাই নির্বাক – কথা বলতে পারি না ।লাল পরী তো ভালোবাসার পরী ! তখন আমরা খুব ঝগড়া আর মারামারি করতাম, তাই সে আমাদের অমন অভিশাপ দিয়েছিল । তবে পরী আমাদের এইটুকু বলেছিল – কোনো মানুষকে ছুঁয়ে থাকলে তখনকার মত আমরা তার ভাষা শিখতে পারবো । তাই তো আমি কথা বলবো বলে এসেই তোমাকে ছুঁয়ে দিলাম । পরী আর একটা কথাও বলেছিল – যার মনে পাপ আর হিংসে নেই, এমন কোনো মানুষ যদি আমাদের একজনকেও ভালোবাসে – আমরা আবার গলায় স্বর খুঁজে পাবো । তাই আমি আমাদের রাজ্যের কয়েকজন সেনাপতিকে নিয়ে এমন মানুষ খুঁজতে বেরিয়েছি । কিন্তু তোমাদের রাজ্যে কোনো মানুষ তো ঘর ছেড়ে বেরোচ্ছেই না ।’

-‘ ওরা তো ভয় পাচ্ছে ! আমার কিন্তু তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে । কি মিষ্টি মেয়ে তুমি । কেমন সুন্দর দুটো রঙীন ডানা আছে তোমার ! জানো – আমারও না, খুব উড়তে ইচ্ছে করে ।কিন্তু আমার তো ডানা নেই, তাই উড়তেও পারি না ।’

-‘ যাবে, তুমি আমার পিঠে চেপে তারাদের দেশে? চলো না, আমরা ঘুরে আসি !’

-‘ তুমি তো আমার বন্ধু হয়েই গেছো ।বন্ধুর সাথে তো যাওয়াই যায় । কিন্তু, আমার বাবা যদি জেনে ফেলেন ?’

-‘ আমি এমন জাদু জানি, আমরা যতক্ষণ না আবার প্রাসাদে ফিরবো, কারুর ঘুমই ততক্ষণ ভাঙবে না । চলো না বন্ধু, আমার সাথে আকাশে বেড়াতে !’

মনিমালা সুয়ের গলা জড়িয়ে ধরে চেপে বসলো তার পিঠে । পলকে সু – এর পিঠে বেরিয়ে এলো তার রঙীন দুটো ডানা ।জানলা দিয়ে উড়ে বেরিয়ে এলো তারা । উড়তে উড়তে অনেক উঁচুতে পৌঁছে গেলো । নীচে রাজপ্রাসাদ আস্তে আস্তে আর দেখাই গেলো না । কত নদী – সাগর – পাহাড় পেরিয়ে তারা গিয়ে পৌঁছল চাঁদ – তারাদের রাজ্যে । কি সুন্দর সেখানে সবকিছু ! মনিমালার তো ফিরে আসতেই মন চাইছিলো না। কিন্তু সু বললো – ভোর হবার আগেই তাকে নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে । অগত্যা, কি আর করা – ওরা আবার ফিরে এলো মনিমালার শোবার ঘরে ।

এবার সু – এর ফেরার পালা । মনিমালার বড্ড মন কেমন করতে লাগলো তার নতুন পাওয়া এই বন্ধুটির জন্য ।তার বড়ো বড়ো চোখ দুটি জলে ভরে এলো । বন্ধুর গলা জড়িয়ে ধরে সে কেঁদে ফেললো ।

চকিতে যেন চারপাশে জাদুর ছোঁয়া লাগলো ! অবিকল মানুষের স্বরে কথা বলে উঠলো সু -‘ ধন্যবাদ, বন্ধু ! তোমার এই ভালোবাসা চিরতরে ফিরিয়ে দিল প্রজাপতি রাজ্যের সবার গলার স্বর । আবার আমরা মানুষের মতো কথা বলতে পারবো । তোমার এই উপকার আমরা কোনোদিনও ভুলবো না । ওই যে, ভোরের আলো উঁকি দেওয়ার সময় হলো ।এবার যে আমায় যেতে হবে বন্ধু ! ভালো থেকো তুমি ।হয়তো কোনদিনই আর আমাদের দেখা হবে না । কিন্তু আমি চিরদিন তোমায় মনে রাখবো । একটা কথা সব সময়ে মনে রেখো বন্ধু – পৃথিবীতে সবচাইতে প্রয়োজনীয় জিনিস হলো ভালোবাসা – জিততে হলে এটা চাই – ই – চাই।হিংসে দিয়ে জয়লাভ করা যায় না।’

রঙীন ডানা মেলে জানলা দিয়ে উড়ে গেলো সু।

জানলার গরাদে গাল চেপে ধরে ভোররাতের আকাশে তাকিয়ে মনিমালা দেখলো – তারাদের রাজ্যে বিন্দুর মত হারিয়ে যাচ্ছে দুটো মস্তবড় রথ । দুহাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে সে আবার গিয়ে বিছানায় শুলো ।সে এখন জানে , যারা এত ভালোবাসার কাঙাল – তারা কারুর ক্ষতি করতেই পারে না !

 

 

APALA MUKHERJEE

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *