চষির পায়েস – শম্পা সাহা

story and article

আজ পৌষ সংক্রান্তি, সকাল থেকেই ঘরে ঘরে পিঠেপুলির গন্ধ ম ম করছে । মিনি আর রিণি দুই বোন। দুজনের বয়স আট আর দশ। পিঠোপিঠি দুই বোন, তাদের ভাড়াবাড়ির এঘর-ওঘরের পাশে ঘুরঘুর করছে।

পায়েসের গন্ধ যে কি ভালো লাগে ! সে বার মা গরুর দুধের পায়েস করেছিল, তাতে গুড় দিয়ে লাল লাল দেখতে। আর খেতে যেন অমৃত! রাতে করে, পরদিন সকালে খেতে তো আরো ভালো।

যখন ওদের বাবার কারখানাটা বন্ধ হয়নি, মাসে মাসে বাবার ঠিকঠাক মাইনে হতো। তখন এইসব দিনগুলোতে ওদের বাড়িতেও পিঠে হত, পায়েস হতো, চষির পায়েস, সিদ্ধ পিঠে,ভাজা পিঠে, পাটিসাপটা। এই তো গত বছরেও হয়েছে, কিন্তু এ বছর! মনে মনে মিনির একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়।

বুল্টির মা বারান্দার কাছে দুই বোনকে ঘুরঘুর করতে দেখে দরজাটা একটু ভেজিয়ে দেয় । কে জানে বাবা, পিঠেপুলিতে আবার নজর লাগলে নাকি ভালো হয় না!

বুল্টি ওদের দেখে এগিয়ে আসে।সমবয়সী বন্ধুকে হালকা ধাক্কা মেরে একটু সরিয়ে বলে, “এই হ্যাংলার মতো আমাদের পিঠের গন্ধ শুঁকছিস কেন রে? “

দুই বোন লজ্জা পায়, ওরা গরীব হলেও ভিখিরি নয়। নিজেদের আচরণে ওরা নিজেরাই বিরক্ত। ছোটটাকে টানতে টানতে ওদের ঘরের দিকে নিয়ে যায় মিনি।

“দিদি আমাদের পিঠে হবে না?”, রিণির প্রশ্নে মিনি ঠোঁট উল্টে বলে, “কি জানি? “,” চল না, মাকে বলি।” রিণি মার কাছে দরবার করতে যায়।

রিণিটা এখনো কিছুই তেমন বোঝে না । অভাব থাকলেও একদিন যে পিঠে খেতে পারবে না ওরা, যখন বাড়ির সবাই খেতে পারছে, এটা আট বছরের রিণির মাথায় ঢোকে না।

ওদের বাড়িতে ওদের নিয়ে মোট বারো তেরো ঘর বাসিন্দা।বেশিরভাগই চটি কারখানা, ব্যাগ কারখানার লেবার। দুই একজন রিক্সাও চালায়, তবে সবার অবস্থাই মোটামুটি এক।

বছরকার দিন, একটু ভাল মন্দ খেতে ইচ্ছে করে। সবারই ঘরে বাচ্চা আছে, তাদের কথা তো ভাবতে হয়?

এই বস্তি বাড়ির প্রতিটি ঘর বাড়িওয়ালা একেবারে হিসেব কষে করেছেন। আট ফুট বাই আট ফুট এর একটুও বেশি কারোর ভাগে পড়েনি । সামনে এক ফালি বারান্দা তা আবার কেউ কেউ চট দিয়ে ঘিরে নিয়েছে। উঠোনের দু’পাশের সারি সারি ঘর, টালির চাল আর উঠোনে বলতে দুহাত চলাচলের রাস্তা। তার দুপাশে আবার সরু সরু জল যাবার নালা।

এবাড়ির সবাই মিলেমিশে থাকতো ,একে অপরের দুঃখে শরিক হতো, কিন্তু এই মারণব্যাধি এসে সবাইকে যেন স্বার্থপর করে দিয়েছে। আসলে অভাব অতি বিষম বস্তু। অভাবের সময় একটু বাড়তি দিয়ে প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ইচ্ছে থাকলেও উপায় হয়তো নেই, অথবা হয়তো ওইটুকুও রেখে দেয়, পরে নিজেদের লাগবে ভেবে, আগে যেটা ভাবতো না ।

ঘরে এসে দেখে সীমা তখন সবে রান্না সেরে ঘর মুছছে।”আমাদের পিঠে হবে না মা? “,রিনির কথায় মাথা তোলে সীমা। উসকোখুসকো চুল,মাথায় তেল দেয়নি দু-তিনদিন। ন্যাতানো বহু পুরনো পরণের ছাপা শাড়িটা কোনরকমে গায়ে জড়ানো। সরু সরু লিকলিকে শিরা ওঠা হাতে দারিদ্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট।

মেয়ের কথা শুনে হঠাৎ চোখের সামনে কূয়াশা নামে,সীমা মাথা তুলে আবার নামিয়ে নেয়, “এ বছর হবে না মা”।
“জানো মা বুলটি আমাদের হ্যাংলা বলেছে”,
রিণি অভিযোগ জানায়।
” কেন? “,সীমা জানতে চায় মেয়েদের এই লাঞ্ছনার কারণ। কষ্ট পায়, বুঝতে পারে, চারিদিকের এই উৎসবের আবহে নিশ্চয়ই এই অবুঝ বাচ্চা দুটো কোন ইচ্ছার অনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়ে ফেলেছে।

মিনি এড়িয়ে যেতে চায় কিন্তু রিণি নিজের অপমান মায়ের কাছে উগরে দেয়। “জানো, একটু ওদের বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম তাই !”,
“দাঁড়িয়ে ছিলি কেন, ওদের দরজার সামনে ?কেন দাঁড়িয়েছিলি? “

মুহুর্তে রিণির মুখ ঝলমল করে ওঠে,”কি সুন্দর গন্ধ ছাড়ছে ওদের ঘর থেকে ,জানো মা !বোধহয় পায়েস হচ্ছে! “

সীমা মেয়েদের বকতে উঠেও কি ভেবে আবার মাথা নিচু করে ঘর মুছতে লাগে। মায়ের মুহূর্তে অভিব্যক্তি বদল ওরা দুই বোন বুঝতে পারে না।

রাতে খেতে বসে দুই বোন চমকে যায়। এই তো! চষির পায়েস!

“কখন করেছে? কখন করেছ? বলো না কখন করেছ?”,
খুশিতে কলকল করে ওঠে ওরা।

দুই বোন বিকেলে খেলতে গিয়েছিল, ওই ফাঁকে সীমা একটা মাদার ডেয়ারি দুধের প্যাকেট এনে, একটু এলাচ গুঁড়ো আর চিনি দিয়ে বানিয়েছে। আজ বছরকার দিন!

যতীন তখনো বাড়ি ফেরেনি,ফিরল এই সন্ধ্যায়। সামনে পায়েসের বাটি দেখে যতীন ও খুশি । একটু মুখে তুলে সীমার মুখের দিকে তাকায় ।

ততক্ষণে দুই বোন ভাত ফেলে আগে পায়েসের বাটিতে খাবলা দেয় । রিণি একটু মুখে দিয়ে বলে, “এমন আটা আটা গন্ধ কেন মা? “, “ভালো হয়নি? ” মেয়েদের মুখের দিকে অসীম আগ্রহ, অসহায় উৎকণ্ঠায় তাকায় সীমা।

মিনি আঙ্গুল চাটতে চাটতে বলে, “খুব ভালো হয়েছে মা, বেশ মিষ্টি। খুব ভালো! “,
বড় মেয়েকে চেটেপুটে খেতে দেখে যতীনও তার পায়েসের বাটি শেষ করে ফেলে নিঃশব্দে ।

রিণি ভাবে,” ওই বোধ হয় স্বাদটা ভালো বুঝতে পারছে না, ” তিনজনকে তৃপ্তি করে আটার পায়েস খেতে দেখে সীমার বুকটা টনটন করে ওঠে।

shampa saha

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *