বিশ্বের বিলাসবহুল ১০টি কারাগার – সিদ্ধার্থ সিংহ

story and article

অপরাধের শাস্তি হিসেবে অপরাধীকে কারাগারে পাঠানো হয়। আর কারাগার বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গা ঘিনঘিন করা বন্দিদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সারি সারি সেল কিংবা আলো-বাতাস ঢোকে না খুপরির মতো ছোট্ট অন্ধকার ঘরে একসঙ্গে গাদাগাদি করে বন্দিদের থাকা।

কিন্তু এই বিশ্বেই এমন কিছু কারাগার আছে, যেটা দেখলে মনেই হবে না এটা কোনও কারাগার, থুড়ি সংশোধনাগার। মনে হবে এটা কোনও বিলাস বহুল পাঁচতারা হোটেল।

আজ এ রকমই ১০টি বিলাস বহুল জেলখানার গল্প বলব।

(১) বেস্টো কারাগার
বিলাস বহুল কারাগারের তালিকা তৈরি করতে গেলে প্রথমেই যে কারাগারের নামটি চোখের সামনে ভেসে উঠবে সেটা হল— বেস্টো কারাগার।

নরওয়ের এই কারাগারটি রয়েছে অসলোফোর্ডের বেস্টো দ্বীপে। এখানে একসঙ্গে মাত্র ১০০ জন বন্দিকে রাখার ব্যবস্থা আছে। প্রত্যেক বন্দির জন্য রয়েছে আলাদা ঘরের ব্যবস্থা। ঘরগুলোতে রয়েছে অত্যাধুনিক জীবনের সব রকম সরঞ্জাম।

প্রত্যেক বন্দিকে শাস্তিস্বরূপ কারাগারের ফার্মে কাজ করতে হয় ঠিকই, তবে তাঁদের অবসর সময় কাটানোর জন্য রয়েছে নানা রকম আমোদপ্রমোদ। এর মধ্যে রয়েছে টেনিস খেলা, মাছ ধরা, ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বোড়ানো-সহ নানান বন্দোবস্ত।

(২) এইচএমপি আদ্দিওয়েল কারাগার
এই কারাগারটি দক্ষিণ স্কটল্যান্ডের সোডেস্কো জাস্টিক সার্ভিসের অধীনে একটি বেসরকারি কারাগার। এই কারাগারটির পোষাকি নাম— হার মেজেস্ট্রি প্রিজন।

সরকারি কাগজপত্রে কারাগার হিসেবে চিহ্নিত হলেও এটা আসলে বন্দিদের জন্য একটি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের মতো।

এখানে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা বন্দিদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারাগার থেকে বের হয়ে যাতে তাঁরা চাকরির ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন এবং নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন। এটাই এই কারাগারের মূল লক্ষ্য।

(৩) ওটাগো সংশোধনাগার
এই জেলখানাটি নিউজিল্যান্ডে। এই জেলখানায় বন্দিদের দেখতে আসা প্রত্যেক অতিথিকে প্রথমে এক্সরে মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তার পর তাঁদের বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়।

পুরো কারাগারটি মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ দিয়ে সেন্সর করা। এখানে প্রত্যেক বন্দির জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা ঘর। এটাকে কারাগার না বলে একটি প্রশিক্ষণ শিবিরও বলা যেতে পারে।

কারণ এখানে বন্দিদের রান্না, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেয়ারি ফার্ম এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

খোঁজ করলে হয়তো দেখা যাবে আপনার হাতের সেলফোনটি ওটাগো সংশোধনাগারে থাকা কোনও কয়েদির বানানো।

এখানকার কারা-কর্তৃপক্ষ মনে করেন, কারাগারে অপরাধীদের পাঠানো হয় সংশোধিত হওয়ার জন্য এবং সংশোধিত হয়ে তাঁরা বের হওয়ার পরে যেন কোনও কাজকর্ম করে খেয়েপরে বাঁচতে পারেন। তাই তাঁদের এ রকম প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

(৪) জাস্টিস সেন্টার লিওবেন
এটি রয়েছে অস্ট্রিয়াতে। এখানকার কয়েদিরা মূলত ব্যাঙ্ক ডাকাতির মতো নন-ভায়োলেন্ট অপরাধের জন্য আসেন।

এই কারাগারে বন্দিদের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা সুসজ্জিত ঘর। সেই ঘরগুলোতে রয়েছে বাথরুম, রান্নাঘর আর সেই সঙ্গে বিনোদনের জন্য রয়েছে টেলিভিশন।

সঙ্গে আছে প্রশস্ত বারান্দাও। দেখে মনে হবে বিলাসবহুল কোনও কামরা। এ ছাড়াও অবসর সময় কাটানোর জন্য রয়েছে বাস্কেট বল কোর্ট এবং বিনোদনের অন্যান্য সব ব্যবস্থা।

(৫) আরানজুঝ কারাগার
স্পেনের এই কারাগারটি একেবারে অন্য রকমের।

কারণ, আমেরিকা ছাড়াও এই পৃথিবীতে এমন অনেক কারাগার আছে, যেখানে বন্দিরা বছরের পর বছর ধরে বন্দিদশার পুরোটা সময় পার করে দেন নিজের পরিবারের কাউকে না দেখেই। এমন অনেক সন্তান আছেন যাঁরা শেষ কবে তাঁর বাবা-মাকে দেখেছেন তাও বলতে পারবেন না।

কিন্তু স্পেনের এই আরানজুঝ কারাগারটি ওই সব কারাগারের একেবারে উল্টো। এখানকার বন্দিরা যখন খুশি তখন তাঁর পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। শুধু দেখাই নয়, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একসঙ্গে নিভৃতে সময়ও কাটাতে পারেন। কোনও ওয়ার্ডেন এসে বলবেন না সময় হয়ে গেছে।

(৬) চ্যাম্প ডোলন কারাগার
এই সংশোধনাগারটি রয়েছে সুইজারল্যান্ডে। এটাকে আগে বলা হত ইউরোপের সব থেকে জনবহুল কারাগার। অপরিচ্ছন্ন এই কারাগারের ভেতরে দাঙ্গা, মারপিট, রোগ-বালাই লেগেই থাকত। আর এই সবের জন্যই এই কারাগারটি ছিল অত্যন্ত নিন্দিত।

২০০৮ সালে ইউরোপীয় কাউন্সিলের রিভিউতে এই কারাগারের পরিবর্তন আনতে বলা হয়। তাই ২০১১ সালে এই কারাগারের পিছনে ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করা হয় উন্নয়নের জন্য।

এখন এটি কয়েদিদের জন্য সব রকম সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন অন্যতম ঝা চকচকে একটি কারাগার। এই কারাগারের ঘরগুলো বেশ বড় বড় এবং প্রতি তিনটি ঘরের মধ্যে একটি করে অত্যাধুনিক শৌচালয় রয়েছে।

(৭) পন্দোক ব্যম্বু কারাগার
ইন্দোনেশিয়ার এই কারাগারে কুখ্যাত অপরাধীদের বন্দি করে রাখা হয়। বিশেষ করে দেশটির কোনও নেতা বা উচ্চপর্যায়ের কোনও সরকারি কর্মকর্তা যদি অপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার হন, তা হলে তাঁদের এই কারাগারে রাখা হয়।

এখানে তাঁদের জন্য রয়েছে বিলাসবহুল জীবনযাপনের ব্যবস্থা। বন্দিদের প্রত্যেকটি ঘরই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।

(৮) সোলেনতুনা কারাগার
সুইডেনের এই কারাগারে বন্দিদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ও প্রাইভেট ওয়াশরুম রয়েছে এবং পাশাপাশি আছে রান্নাঘরও।

যেখানে বন্দিরা নিজেদের খাবার নিজেরাই তৈরি করে খেতে পারেন। আর রান্না করার যাবতীয় জিনিসপত্র বা উপকরণ কারা-কর্তৃপক্ষই সরবরাহ করেন।

এখানেই শেষ নয়, বন্দিদের প্রতিদিনের শরীরচর্চার জন্য এখানে রয়েছে সব রকম ইন্সট্রুমেন্ট-সহ একদম সাজানো-গোছানো অত্যাধুনিক জিমখানা এবং দেওয়াল জুড়ে বড় স্ক্রিনের টেলিভিশন। বিনোদনের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থাও।

(৯) হালডেন কারাগার
নরওয়ের এই কারাগারটিতে শুধুমাত্র খুনের আসামিদেরই রাখা হয়। এখানে রাখা বন্দিদের বহুমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানে রয়েছে প্রত্যেক বন্দির জন্য একক কক্ষ।

অবসর সময় কাটানোর জন্য রয়েছে পাঠাগার। সেই পাঠাগারে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের উপর অজস্র বই। এ ছাড়াও কারাজীবন থেকে বের হয়ে কীভাবে সভ্য-সুন্দর নতুন জীবন শুরু করা যায়, সে ব্যাপারেও তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

(১০) সেবু কারাগার
ফিলিপাইনের এই কারাগারটিতে বন্দিদের জন্য রয়েছে বিলাসবহুল জীবনের যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম। শুধু তাই-ই নয়, কারাগারের ভেতরে বন্দিদের জন্য রয়েছে নানা রকম বিনোদন এবং প্রতিযোগিতার আয়োজনও।

প্রতিদিন সকালে শরীরচর্চার অংশ হিসেবে তাঁদের নৃত্যের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাঁরা শারীরিক ভাবে অক্ষম বা বয়সে প্রবীণ তাঁদের জন্য রয়েছে গান শেখার ব্যবস্থাও।

Siddhartha Singha

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *