পৃথিবীর সব চেয়ে ছোট্ট রিয়েল এস্টেট, আয়তন মাত্র ৩৫০ বর্গ ইঞ্চি – সিদ্ধার্থ সিংহ

siddhartha-singha-41

পৃথিবীর অন্যতম বিলাসবহুল শহর নিউ ইয়র্ক। শহরের সমস্ত অট্টালিকাই যেন আকাশ ছুঁতে চায়। তবু এই আকাশচুম্বী অট্টালিকার মধ্যেই প্রায় ১০০ বছর ধরে টিকে আছে ছোট্ট একটুকরো জমি। রাস্তার উপরে একটি ত্রিকোন ফলক। আর এই ফলকটিই হল পৃথিবীর সব চেয়ে ছোট্ট রিয়েল এস্টেট।

কত ছোটো? সব মিলিয়ে জমির আয়তন মাত্র ৩৫০ বর্গ ইঞ্চি। হ্যাঁ, শুনতে অবাক লাগলেও সত্যিই এমন একটি রিয়েল এস্টেটের অস্তিত্ব আছে নিউ ইয়ার্কে। আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অবাক করা ইতিহাসও।

এই কাহিনির শুরু ১৯১০ সালে। সে বছর নিউ ইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, শহরের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে মানুষের শরীরের শিরা-উপশিরার মতো অসংখ্য রাস্তা যে ভাবে গোলকধাঁধা তৈরি করেছে, তা মোটেও আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থার উপযুক্ত নয়। আর সে জন্যই আপাদমস্তক বদলে ফেলতে হবে শহরের রাস্তাঘাটের এই মানচিত্র।

১৯১৩ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের সুপারিশ অনুযায়ী তৈরি হয় নতুন পরিকল্পনার খসড়া। প্রথমেই চওড়া করার কথা ভাবা হয় সেভেন্থ অ্যাভেনিউকে। ঠিক হয়, একটি সাবওয়েও করতে হবে। আর এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে বেশ কিছু নতুন ও পুরনো অট্টালিকা ভেঙে ফেলতে হবে।

নগর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে অবশ্য প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু সরকারি ফরমানের কাছে শেষ পর্যন্ত সেই আপত্তি আর ধোপে টেকেনি।

শুধু ডেভিড হেস নামে এক ব্যক্তি এই ফরমানের তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯১৮ সালে মামলা উঠল আদালতে। তাতে অবশ্য পরাজয় হল ডেভিড হেসের। অগত্যা শেষ পর্যন্ত ‘ভুরিজ’ নামে তাঁর ৫ তলা বাড়িটি দখল করে নেয় নগর উন্নয়ন সংস্থা।

কিছু দিনের মধ্যেই সেভেন্থ অ্যাভেনিউ পরিকল্পনা মতোই বেশ চওড়া হয়। আই-আর-টি ব্রডওয়েও তৈরি হয়। কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ একটা জিনিস লক্ষ করল নগর কর্তৃপক্ষ।

জমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র যখন তৈরি হয়েছিল, তখন একটা ছোট্ট ত্রিকোণ অংশ বাদ পড়ে গিয়েছিল। খাতায় কলমে সেটা তখনও ডেভিড হেসের সম্পত্তি।

তাই ওই জমিটুকু নতুন করে অধিগ্রহণের জন্য আবার কাগজপত্র তৈরি করতে থাকে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কার কাছ থেকে অধিগ্রহণ করবে? ডেভিড হেস তো তত দিনে পৃথিবী ছেড়ে চিরকালের মতো চলে গেছেন। অগত্যা তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে এই জমির জন্য আবেদন জানানো হয়।

কিন্তু তাঁরা সেই জমির মালিকানা ছাড়তে রাজি না হওয়ায় সেভেন্থ অ্যাভেনিউ আর ক্রিস্টোফার স্ট্রিটের মাঝখানে ওই ত্রিভুজাকৃতির একটুকরো জমিটি থেকে যায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে।

সেই ত্রিভুজের একটি বাহু ২৫.৫ ইঞ্চি আর বাকি দুটি ২৭.৫ ইঞ্চি। অত্যন্ত ছোট্ট জমি। কোনও কিছু করারই কোনও উপায় নেই। তখন ডেভিড হেসের উত্তরাধিকরীরা ঠিক করলেন, ওই জায়গায় তাঁরা ডেভিড হেসের স্মরণে একটি স্মৃতিফলক বসাবেন।

অবশেষে ১৯২২ সালে সেই ফলক বসানো হয় এবং আজও সেভেন্থ অ্যাভেনিউ আর ক্রিস্টোফার স্ট্রিটের ঠিক মাঝখানে দেখা যায় সেই স্মৃতিফলক। তার গায়ে বড় বড় করে লেখা— ‘প্রোপারটি অফ হেস এস্টেট হুইচ হ্যাজ নেভার বিন ডেডিকেটেড ফর পাবলিক পারপাস।’ আজও যত্ন করে রক্ষা করা হয় ওই ফলক।

এর মধ্যে ১৯৩৮ সালে একটি দোকানের মালিক এই জায়গাটি কিনে নেন। ১৯৯৫ সালে মালিকানা চলে যায় ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটির হাতে।

এখনও অবধি ৭০ বারেরও বেশি মালিকানা বদল হয়েছে ছোট্ট একচিলতে ওই জমিটির। তবু আজও অক্ষত আছে সেই ফলক। আর সেই সঙ্গে অক্ষত আছে ডেভিড হেসের স্মৃতি। যেটা পৃথিবীর সব চেয়ে ছোট্ট রিয়েল এস্টেট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *