মৃত মানুষের মগজ খাওয়াই এই উপজাতির রীতি – সিদ্ধার্থ সিংহ

Siddhartha Singha

আফ্রিকার এই জাতির লোকজনেরা ঠিক নরখাদক নন। তবে মানুষের মগজ খান। তাও আবার মৃত মানুষের।

এই কিছু দিন আগেও পৃথিবীতে যে আদিম নরখাদকেরা বসবাস করতেন এঁরা তাদেরই এক জ্ঞাতিভাই।

যাদের সব চেয়ে প্রিয় খাদ্যই হল মানুষের মগজ! আর এই মৃত মানুষের মগজের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল একটা মারণ রোগের প্রতিষেধক!

ওশিয়ানিয়ার এক ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনি। অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের মতো ওখানেও জায়গা বিশেষে বিভিন্ন গোষ্ঠীর আদিম মানুষেরা বসবাস করতেন। সেই রকমই একটি অঞ্চল ছিল— ফোর। ওখানকার বাসিন্দারাই ছিলেন নরখাদক।

তাঁরা মূলত মৃত আত্মীয়ের মগজ খেতেই বেশি ভালবাসেন। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, এঁরা আসলে নর-মগজ খাদক। তবে এঁরা যে, সুযোগ পেলেই যে কোনও লোকের মগজই খেয়ে নেবে, ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তা নয়।

এঁরা নিকট আত্মীয়ের মগজ ছাড়া সহজে খান না। যখনই এঁদের পরিবারের কেউ মারা যান, তখনই তাঁর ঘিলু তাঁরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে খান।

আদিম যুগে খাদ্য নিয়ে, নারী নিয়ে, ক্ষমতা দখল নিয়ে গোষ্ঠীবিবাদ লেগেই থাকত। এক গোষ্ঠী ‌অন্য গোষ্ঠীকে হারালে একমাত্র তবেই তাঁদের মৃতদেহগুলোর ঘিলু এঁরা খেতেন। আর এটাই ছিল এঁদের জয়োল্লাস এবং ধর্মীয় প্রথা।

পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত যখন বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটছে। চাঁদে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছে, তখনও এই প্রথা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার এবং সেটা রমরমিয়ে চলতও।

তবে সমস্যা শুরু হয় তার পরেই। সেই সময় হঠাৎই অজানা এক রোগ ছড়িয়ে পড়তে লাগল পাপুয়া নিউগিনিতে। বিশেষ করে মৃত মানুষের ঘিলু খাওয়া এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে। স্থানীয় ভাষায় ওই রোগটিকে বলা হত— কুরু।

এই অসুখটি হলে রুগি প্রথমে কথা বলার শক্তি হারায়ে ফেলেন। তার পর হারিয়ে ফেলেন চলাফেরার ক্ষমতা। শেষ পরিণতি হয় মৃত্যু। একটা সময় প্রায় মহামারির আকার ধারণ করে ওই রোগ।

শেষ পর্যন্ত রীতিমতো আইন করে নিউগিনি সরকার ঘিলু খাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং আশ্চর্যজনক ভাবে‌ তার পর থেকেই ওই রোগের প্রাদুর্ভাব কমতে থাকে। আর তখনই ওখানকার লোকেরা বুঝতে পারেন যে, ঘিলু খাওয়ার জন্যই ওই রোগটি হচ্ছিল।

চিকিৎসকেরাও অনুমান করেন, মানুষের মস্তিস্কের ভেতরের দূষিত অংশগুলো থেকেই এই রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।

ওই একই সময়ে আরও একটি রোগের সংক্রমণ শুরু হয়। তার নাম— ম্যাড কাউ। গরু থেকে মানুষের মধ্যে এই রোগ সংক্রমিত হত। এ জন্যই ওই রোগটির এ রকম একটা নাম দেওয়া হয়।

দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীরা তখন এর প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা করতে লাগলেন। এই সময় লন্ডন ইউনিভার্সিটির এক গবেষক এক অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করেন।

তাঁর মনে পড়ে যায়, মাত্র কয়েক দিন আগেই কুরু রোগের কথা। তখনই তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি দেখেন, কুরু রোগে মানুষ মারা গিয়েছিলেন ঠিকই। তবু এমন বেশ কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা কুরু আক্রান্তের মগজ খেয়েও দিব্যি বেঁচেছিলেন।

তিনি আরও দেখেন, ম্যাড কাউ আর কুরু রোগের লক্ষণও মোটামুটি ভাবে একই। তাই তিনি সেই সব লোকের ডিএনএ জোগাড় করে সেখান থেকেই তৈরি করেন ম্যাড কাউ রোগের প্রতিষেধক। আর তার ফলেই ওই উপজাতি এই রোগের কবল থেকে রেহাই পান।

এই গবেষক আরও প্রমাণ করেন, জাপানিদের বাদ দিলে পৃথিবীর প্রায় সব প্রজাতির মানুষের পূর্বপুরুষই কোনও না কোনও সময়ছ মানুষখেকো ছিলেন। কাজেই সবার মধ্যেই ওই বিশেষ জিনটি রয়েছে।

তিনি বলেন, আজও বহু উপজাতি শকুনকে মৃতদেহ উৎসর্গ করাটাকে পুণ্যি বলে মনে করেন, অনেকে আবার মৃতদেহ পুড়িয়ে স্যুপ বানিয়েও খান। কেউ কেউ তো আবার মৃতদেহকে দাহও করেন না, কবরও দেন না। তাদের উদ্দেশ্যই থাকে মৃত মানুষের মগজ চেটেপুটে খাওয়া।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *