কিটকিটের অভিযান – পর্ব ১২ – সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

বানরটি লেজ দিয়ে একটা তুলি তুলে নিয়ে সেটাকে রঙের উপর ঘঁষে ইজেলে একটা টান মারল। বলল,”এটা হল রাজকন্যা। ”
ইজেলে আরেকটা রেখা টেনে বলল, “এটা হল কিটকিট। আর মাঝখানে নদী।”

-“কিন্তু নদী কই ?” জিজ্ঞাসা করল কিটকিট।
বানরটা রেগে গিয়ে বলল,”শিল্পকলা না বোঝা লোকজনদের নিয়ে এই এক সমস্যা। যা বলছি এঁকে ফেলো তো। বেশি বেগড়বাই করলে কামড়েও দিতে পারি।”

ভয়ে ভয়ে একটা তুলি তুলে নিল কিটকিট। তারপর বানরটা যা যেমন যেমন বলল তাই এঁকে গেল। আর যেটা হল সেটা দেখে কিটকিটের চক্ষু স্থির।
-“এ কি ! এ তো একটা পেঁচো ভুত।”

বানরটা দাঁত খিঁচিয়ে বলল,”কঙ্কাবতীর চেহারা আর কত ভালো হবে ! নাও নাও পাঁচসিকে বের কর। গুরুদক্ষিনা। নইলে কামড়ে দেব।”
কিটকিট বলল, “কামড়ে দিলেও উপায় নেই। আমার কাছে একটা পয়সাও নেই। আর এই ছগরবগর আঁকার জন্য গুরুদক্ষিনা কেন ? না শিখেও এরকম দাগ টানা যায়।”

বানরটা তখন রেগে গিয়ে একগাদা কাগজকে ঢাকা নিয়ে শুয়ে পড়ল। কিটকিটও ঘুমিয়ে পড়ল ঘরের এক কোণায়।

-রাক্ষসের দেশে-

সকাল হতেই বানরটা বেরিয়ে পড়েছে খাবারের খোঁজে। যাবার সময় কিটকিটকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। পাহাড়ের ওপাশে একটা মন্দির। মহাদেবের মন্দির। মন্দিরে প্রচুর লোকের আনাগোনা। দুধ ফল আর মিষ্টিতে ভরে যায় মন্দির। বানরটা তার দলবলের সঙ্গে খেয়ে চলল সেইসব খাবার। কিটকিটের ওসবে রুচি নেই। ও খেল বিভিন্ন রকমের ফুল আর দূর্বাঘাস। পেট ভরে যেতেই মন্দিরের একপাশে শুয়ে পড়ল।
এদিকে রাতও হয়ে এসেছে। বানরটাও ঘুমিয়ে পড়েছে মন্দিরের খাঁজে। ওদের দলবল সব ফিরে গেছে নিজের ঘরে। ভুলে গেছে কিটকিট আর সেই বানরটার কথা।

রাত হওয়ার আগেই লোকজন ফিরে গেছে নিজেদের ঘরে। কারন রাতেরবেলা জায়গাটা নিরাপদ নয়। এসময় পুজো দিতে আসে দানব যক্ষ আর রাক্ষসেরা। মানুষকে পেলে চিবিয়ে খাবে।

ঘুম ভাঙ্গতেই কিটকিট দেখল একদল ঘোড়ামুখো লোক গান-বাজনা করতে করতে আসছে। বানরটা ঝপ্ করে লাফিয়ে এসে পড়ল কিটকিটের কাছে। ফিসফিসিয়ে বলল, “ওরা গন্ধর্ব। গান-বাজনায় খুব পটু ওরা সারারাত গান-বাজনা করে এখানে। কিন্তু গলা এত মিষ্টি হলেও মনের দিক হতে মোটেই সুবিধার নয়। মানুষজনকে দেখলেই পট করে আছড়ে মেরে ফেলবে। রাক্ষসরাও এদের ভয় করে। তবে এরা মানুষ খায় না।”

মন দিয়ে গান শুনতে লাগল কিটকিট। কি সুন্দর গান ওদের। গলা দিয়ে যেন অমৃত ঝরছে। আর তেমনি সুন্দর ওদের বাজনা।
কিছু পরেই এল ভীষণাকার রাক্ষসের দল। ওদের মুলোর মতো দাঁত আর কুলোর মতো কান দেখে সহজেই চেনা যায়।

রাক্ষসেরা এসে ভক্তিসহকারে পুজো করতে লাগল। এক রাক্ষসীর থালাতে টকটকে হলুদ রঙের পাকা কলা। দেখেই লোভে জিভ লকলক করে উঠল বানরটার। তবুও অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করল। নিজেই নিজেকে ধমক দিল-

“না না ওসব ভাবে না। ঠাকুর পাপ দেবে। তাছাড়া ওগুলো খেতে গেলেই তুমি রাক্ষসের পেটে যাবে। খবরদার লোভ করবে না তুমি।”
মানুষের মনই সংযত থাকতে চায় না তো বানরের মন। যে এক জায়গায় ঠিককরে সুস্থ হয়ে বসতে পারে না তার কাছে সংযমের প্রত্যাশা করাই বৃথা। তড়াক করে লাফিয়ে পড়ল বানরটা। একদম থালাটার উপর। আর যা হবার তাই হল। অতবড় রাক্ষসের হাতের অতবড় থালার উপর ছোট্ট মর্কট পড়ল ঝুপ করে। রাক্ষসেরা দেখেশুনে চটে লাল। ধরে বাঁধল একটা থামের সঙ্গে। গন্ধর্বরাও সূযোগ বুঝে রণউন্মাদনা বাড়ে এমন সুর ধরল। তাদের বীণা ঢোল মৃদঙ্গ আর মঞ্জীরা একসাথে ‘রণ জিতং জিতং’ সুরে বেজে উঠল।

রাক্ষসদের মধ্যে যে সর্দার মতো সে বলল-

“পেয়েছি পেয়েছি ব্যাটাকে,পেয়েছি পেয়েছি ব্যাটাকে….
আগুন লাগাও ল্যাজে কেরোসিনে করে ভিজে জড়াও কাপড়।
মেরে কর হনুটালা নখে ছিঁড়ে ফালাফালা, দাও ঘুষি চড়।
(সবাই )পেয়েছি পেয়েছি ব্যাটাকে,পেয়েছি পেয়েছি ব্যাটাকে….
কান জোরে মুলে দাও মুন্ডুটা ছিঁড়ে খাও চাটনির সাথে,
ল্যাজের ঘণ্ট কর, কাবাব কোর্মা কর, খাও শেষ পাতে।
(সবাই )পেয়েছি পেয়েছি ব্যাটাকে,পেয়েছি পেয়েছি ব্যাটাকে… “

ব্যাপার স্যাপার দেখে কিটকিট তো ভয়েই বাঁচে না। সে লুকিয়ে পড়ল থামের আড়ালে। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে লাগল সবকিছু। বানরটার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে তার। আহা রে, বেচারাকে পুড়িয়ে খাবে ওই রাক্ষসগুলো। হে ভগবান, যেন তেমন কোনও অঘটন না হয়।

ভগবান কিটকিটের প্রার্থনা শুনলেন। রাক্ষসদের মধ্যে একজন প্রতিবাদ করে বলল, “না না তা হবে না। এরকমই কান্ড করে লঙ্কাকান্ড হয়েছিল।”
সর্দার বলল, “সেজন্যই তো ওকে ধরা। ব্যাটা আবার এসেছে।”
বানরটার কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তিনি ছিলেন হনুমান। দেবতা। আর আমি সাধারণ একটা বানর। কার সাথে কার তুলনা করছেন বলুন তো ! আপনারা রাক্ষস বলে কি সবাই রাবণ ?”
সবাই মাথা নেড়ে বলল,”ঠিক ঠিক।”
গন্ধর্বরাও গান-বাজনা থামিয়ে বলল,”ঠিক ঠিক।”

বানরটাকে ছেড়ে দিল রাক্ষসেরা। ছাড়া পেতেই বানরের সে কি ফুর্তি। তিড়িং বিড়িং করে নাচতে নাচতে পালিয়ে গেল। কিটকিট এখন পুরোপুরি একা। কি করবে সে ?

ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়। রাক্ষসদেরই একটা ছোট্ট মেয়ের নজর পড়েছিল কিটকিটের উপর। সে ওকে তুলে নিয়ে নিজের পোষাকের ভেতর ভরে নিল। ফিসফিস করে বলল, “ভয় পেয়ো না, আমি তোমার বন্ধু।”

মেয়েটির নাম সুপ্রভা। ওর সারা শরীর হতে একটা মিষ্টি আলো বের হয় বলে এই নাম। মেয়েটি রাক্ষসদের দলপতি মকরাক্ষের মেয়ে।
পুজো শেষ হতেই রাক্ষসরা চলল নিজেদের ঘরে। পাহাড়ের নিচে পাতালপুরীর এর রাস্তা। আর সেই রাস্তা দিয়ে গেলেই অনেক নিচে রাক্ষসদের পাতালপুরী। সেখানে বিশাল বিশাল সব ঘর আর বড় বড় রাস্তা। সুপ্রভা কিটকিটকে নিয়ে গেল নিজের ঘরে। সুপ্রভার ঘরটাও বিরাট। থরে থরে সাজানো বইপত্তর আর খেলনা।

ফলের ঝুড়ির উপর কিটকিটকে বসিয়ে দিয়ে সুপ্রভা বলল, “যত খুশি খাও।”
প্রাণভরে ফল খেল কিটকিট সঙ্গে আরও কত কি। কত রকমের ঘাস। খেয়েদেয়ে সুপ্রভাকে ডেকে কিটকিট বলল, “আমি কিন্তু বরাবরের জন্য তোমার কাছে থাকতে পারব না। একজায়গায় বসে থাকলে চলবে না আমার।”
সুপ্রভা বলল, “কেন ?”

-“আমি চলেছি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খোঁজে । এখানে বসে থাকলে ওর খোঁজ পাব কিভাবে ?”

চলবে…..

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *