“হতভাগিনী মা!” – তন্ময় সিংহ রায়

Tanmoy Sinha Roy

আমার দশ বছরের জন্মদিনে একবুক আশা নিয়ে তুমি বাবাকে বলেছিলে..
‘কি গো শুনছো? এবারে পুজোয় আমি তোমার কাছে কিছুই চাইবোনা, তুমি আমার সোনা-মা’কে শুধু একটা সাইকেল কিনে দিও!’

আমার স্বাধীনচেতা ও সহজ-সরল বাবার কাছে চাকরীটা ছিল হুকুমের গোলাম-এর মতন, স্বভাবতই বাবার ইচ্ছেটা প্রায় সারাটা জীবন’ই ছিল চাকরীর বিপক্ষে বলাটাই এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিম্ন মধ্যবিত্তের যে কত যন্ত্রণা প্রতিনিয়ত বয়ে চলে শিরা-ধমনীতে, বাবা সেটা কেমন যেন বুঝেও চাইতেন না বুঝতে, তায় আবার যদি সেখানে সু-প্রতিষ্ঠিত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে আদর্শ!
বাবা বলতেন ‘তোমরা কি একদম’ই কিছু না খেয়ে-পরে আছো?
প্রয়োজনগুলো কি খুব বেশি কষ্ট দিচ্ছে তোমাদের ?’
মনে হত পরোক্ষভাবে বাবা যেন বোঝাতে চাইতেন,
গ্রামের রবীন খুড়ো, দিপু’র মা, শুক্লা’দি, ঝুনু মাসি ওদের ছায়ায় বসে তাহলে অনুপ্রেরণা কুড়োও গভীর মনোযোগে!

বিশেষত অর্ধাহারে, অনাহারে থাকা এবং দারিদ্রতার করাল গ্রাসে পড়ে, টেনে-হিঁচড়ে পড়াশুনা করা পাড়ার যত্ত ছেলে-মেয়ে,
প্রায় সিংহভাগের’ই উপকরণসহ যথাসম্ভব শিক্ষা সরবরাহের একমাত্র অফিস ছিল যেন বাবার ওই প্রাচীন আধখাওয়া ফ্যাকাসে লাল উন্মুক্ত ইঁটগুলোর ঘরটা!
কেউ সারামাস পড়ে একটা লাউ, কেউ দু-কৌটো চাল আবার কেউ বা তাঁর পুকুরের মাঝারি সাইজের দুটো পোনা মাছ নিয়ে হাজির হত এসে।
এক্ষেত্রে বাবার অপছন্দটা বিশেষ গুরুত্ব পেতো যে নাই, তা আমি আর মা বুঝতাম বেশ ভালোই।
একসময় দেখলাম, একনিষ্ঠভাবে সারাটা জীবন পাড়ার ছেলেমেয়ে মানুষের দায়িত্বেই বাবা হয়ে গেলেন বার্ধক্যের বাহাত্তর!
এভাবেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে লাগলো আমাদের অতি সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের আদর্শপূর্ণ এবং ব্যাসযুক্ত দুর্বল চাকা!

আমার তখন সাতাশ বছর তিন মাস দু-তিন
দিন বোধ হয় হবে, হঠাৎ-ই একদিন গহীন রাতের নিস্তব্ধতায় অসম্ভব বুকের যন্ত্রণায় কাটা মাছের মতন ছটফট করে উঠলেন!
চোখের সামনে দেখছি, যে আদর্শের বিশুদ্ধ
দেহখানা বিছানায় ছটফট করছেন,
তিনি আর কেউ নন, আমার ঈশ্বরতুল্য ও জন্মদাতা বাবা!

বুকের সমগ্র অঞ্চল জুড়ে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দেখলাম অত্যন্ত প্রিয়জনকে যে কোন প্রকারে বাঁচাবার জন্যে আমার জন্মদাত্রী মায়ের চোখে-মুখে সে কি অসম্ভব আকুতি ও ব্যাকুলতা!
প্রজন্মের পর প্রজন্মের মতই মনুষ্যত্বের গলা টিপে হত্যা করে, উঁচু মানের জীবনযাত্রার একান্ত আশায় স্বাভাবিকভাবেই সে সময়েও আমাদের গ্রামে ছিলনা কোনো এম বি বি এস ডাক্তার!
আর মন্দের ভালো হিসেবে যাঁকে চেষ্টা করা হল, তিনি সে সময়ে ছিলেন বিছানাগ্রস্ত!

নিঃশব্দ আর্তনাদ, হাহাকার, তীব্র যন্ত্রণা, দুঃখকে মনে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নানাবিধ চেষ্টা….!
নাঃ, সবকিছুকে হারিয়ে দিয়ে ও একেবারে স্তব্ধ করে মুহুর্তেই যেন সব হয়ে গেল একেবারে শেষ!
একটা জমকালো নিস্তব্ধ গহীন রাত, নির্মম হয়ে হিংস্রভাবে যেন উপড়ে নিয়ে চলে গেল আমার বাবার হৃদপিন্ডটা!
কারো অনুরোধ-উপরোধ, প্রার্থনা, প্রাণ ভিক্ষা, কিছুতে আদৌ কোনো কর্ণপাত করলো না সে!

যে মানুষটা আমাদের জন্যে, গ্রামের অসহায়, যত্ন ও পথপ্রদর্শনহীন ছেলে-মেয়েদের জন্যে প্রায় সারাটা জীবন এত কিছু করলেন যথাসাধ্য নিঃস্বার্থভাবে,
প্রতিদিন গলা টিপে হত্যা করলেন নিজের ছোট ছোট স্বপ্ন-আশাগুলোকে নিজের হাতে, সুযোগ-ই দিলেন না তিনি তাঁর জন্যে শেষ সময়-ও কিছু করার!
চোখের সামনে জীবন্ত দেখলাম ওই কালো রঙা প্যাঁচাটার সাথে আমার ‘বাবা’ শব্দটা উড়ে বেরিয়ে চলে গেল বহু দূরে!
জীবন থেকে, অতলস্পর্শী ও নিকষ কালো অন্ধকার গর্ভে তলিয়ে গেল আমার ‘বাবা’ ডাকটা সারাজীবনের মতন!
পরের দিনটার জন্মের পরপর’ই, অসহনীয় বুকের যন্ত্রণাসহ, জল ভরা দু-চোখ নিয়ে সেই আদর্শবান নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবা নামক মানুষটার চিতার হলদে-লাল আগুনকে আমি প্রথম দেখলাম পাথর দৃষ্টিতে!

সেই থেকে ভগ্নহৃদয়ের অসহায়া মা-এর একমাত্র দুশ্চিন্তার কারণ হলাম আমি!
আর্থিক সামর্থ্য আমার বাবার ছিল তো নাই
একটা উচ্চমধ্যবিত্ত স্বামী কেনার,
তায় আবার দেখতে আমি মন্দ!
বেশ ভালোই বুঝতে পারতাম আমার মায়ের প্রতিমুহূর্তের ঢাকা দিয়ে রাখা সেই বিশেষ যন্ত্রণাগুলোর অভিব্যক্তি!
সেই প্রবাদ বাক্যটার স্মৃতিচারণে (মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা!) কাটতে লাগলো আমার মা-এর স্বামীহারা, ভাঙা-চোরা ও দোমড়ানো-মোচড়ানো বাকি জীবনটুকু!
অর্থাৎ বাবার মৃত্যু শোকে মা ছিলেন মর্মাহত, তার উপরে আবার আমাকে কেন্দ্র করে দুশ্চিন্তা’র এক কালো ছায়া যেন প্রতিদিন ও প্রতিমুহূর্তে একটু একটু করে গ্রাস করে নিত আমার মায়ের সমগ্র সত্তাকে!

বেশ কিছুদিন গ্রামের কিছু আপনজনের শোক, অনুতাপ, তারপর স্বাভাবিক, ব্যাস!
শুরু হয়ে গেল গ্রামের কানাঘুষো..
‘বুড়ি মেয়েটা ঘরে বসে আছে, আর কতদিন এভাবে চলবে কে জানে!
বিয়ে হবেনা ওর, কে নেবে ওকে!’
মনে হতে লাগলো বাবার আদর্শের প্রতিফলন এ সমাজে বুঝি এমন-ই হয়!
মনের মধ্যে শুরু হল সন্দেহ’র কালবৈশাখী!
‘বাবা কি তাহলে এতদিন অন্যায়/পাপ কিছু করে গেছেন?
না হলে তার ফল তো কথা নয় এমন হওয়ার!’
পাড়ায় বেরোলেই নানা লোকের নানান ফিসফাস ও নেতিবাচক মন্তব্যে বৃদ্ধা অসহায়া মা-টা আমার প্রায় বাড়িতে ফিরতো যন্ত্রণাকে দ্বি-গুণ করে!
বেশ কয়েকবার’ই লুকিয়ে দেখেছি,
রাতে না ঘুমিয়ে মায়ের ডুকরে কান্নার শব্দ!

সহ্য একদিন লঙ্ঘন করলো তার সীমা, আর সইতে পারলাম না আমার মায়ের এ কষ্টের ওজন!
বারে বারেই আমায় রেটিনায় গঠন হতে থাকলো, শুধু আমার বাবার জীবনটা বেরিয়ে যাওয়ার আগের মুহুর্ত ও আমার বৃদ্ধা মায়ের কষ্টের প্রতিবিম্বগুলো!
একদিন গভীর রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম সোজা চলে পাশের গ্রামের প্রধানের চরিত্রহীন, মোদো-মাতাল ও বখাটে একমাত্র
ছেলেটার দামি নরম গদি’র বিছানায়।
ক্ষুধার্ত নেকড়ের সহজপাচ্য খাদ্য হয়ে বললাম, ‘সিঁথিতে আমায় সিঁদুরটা অন্তত টেনে দিস, একটা স্থায়ী ভোগ্য বস্তু পাবি, আর পাবি সেবা দাসী!’
সেদিন ভোরে সকলের অজান্তেই সিঁথি রাঙিয়ে আমি হলাম একজন চরিত্রহীনা, কলঙ্কিতা, অবহেলিত ও রক্ষিতা-স্ত্রী!
এভাবেই চলতে থাকলো আমার সস্তা জীবন!

ইচ্ছেগুলোকে প্রতিমুহুর্তে বিষে নীল করে,
বহুদিন আর ফিরিনি গ্রামে!
দিন গেছে, রাতের পর রাত পেরিয়ে আবার নতুন ভোরের আলোয় আলোকিত হয়েছে প্রকৃতি।
বারে বারেই মনে পড়েছে আমার বৃদ্ধা মা-টাকে!
কেমন আছে আমার মা-টা? কি খাচ্ছে? কে করে দিচ্ছে ঘরের কাজগুলো, নিশ্চই বুড়ি হয়ে গেছে অনেক?
নিদারুণ শ্বাসকষ্টে প্রশ্নগুলো
কেবল’ই অসহায়ভাবে ছটফট করেছে আমার সমগ্র মন জুড়ে!
যন্ত্রণার তিক্ষ্ণ ফলায় রক্তাক্ত হয়েছি বারে বারে, তবুও যেতে পারিনি আমার গ্রামটায়, আমার মায়ের কাছে!
কখনও চিৎকার করে হাউ হাউ করে কেঁদে জানতে ইচ্ছে করতো ‘মা গো, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে না? আমি তোমার যোগ্য সন্তান হয়ে তোমার কোলে ফিরতে পারিনি মা!
কেনো?..
তার উত্তর খোঁজেনি কেউ গো মা!’

হঠাৎ’ই আগুনের একটা হলকা শরীর স্পর্শ করতেই, ধড়ফড়িয়ে বাস্তবে জেগে উঠলাম আমি!
চারিদিকে লোকজন, কারো হাতে বাঁশ,
কারো হাতে মাটির কলসী আর মাঝে মধ্যেই উচ্চারিত হচ্ছে ধ্বনি.. ‘বল হরি, হরি বল!’ দেখলাম দাউ দাউ করে জ্বলছে আমার হতভাগিনী মায়ের কর্তব্যপরায়ণ ও আত্মত্যাগী দেহ’টা!
আজ বহুদিন পরে, সেই কলঙ্কিতা আমি আমার মায়ের ঝলসে যাওয়া দেহের সামনে বসে!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *