ন্যূনতম দাম দেড় লাখ, ৯০০ বছর ধরে পাটোলা শাড়ি বুনে চলেছেন গুজরাতের এক পরিবার – সিদ্ধার্থ সিংহ

Siddhartha Singha

অনেক ভারতীয় না জানলেও সারা বিশ্বে পাটন পাটোলা শাড়ির জনপ্রিয়তা একেবারে আকাশছোঁয়া। এই শাড়িকে পৃথিবীর সব চেয়ে বিলাসবহুল পোশাকের সঙ্গে একই সারিতে বসানো হয়।

এই শাড়ির ইতিহাস শুরু হয় ৯০০ বছর আগে। বলা হয়, রাজা কুমারপালার হাত ধরেই এর আবির্ভাব।

গুজরাতের পাটন জেলা থেকেই সূত্রপাত এই শিল্পের। সে জন্যই এই শাড়ির নাম— পাটন পাটোলা।

পাটনের রাজা কুমারপালার অত্যন্ত পছন্দের ছিল এই ফ্যাব্রিকের পোশাক। মন্দিরে প্রার্থনা করার আগে তিনি রোজ সকালে একদম আনকোরা নতুন এক-একটি এই শাড়ি গায়ে জড়াতেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, পাটোলা শাড়ি শুদ্ধতার প্রতীক। ফলে এই শাড়ি পরে প্রার্থনা করলে সমস্ত অশুভ শক্তি দূর হয়ে যাবে।

তখন অবশ্য গুজরাতের পাটন জেলায় এই পাটোলা শিল্প গড়ে ওঠেনি। মূলত মহারাষ্ট্রের জালনার কারিগরদের কাছ থেকেই সেগুলো আমদানি করতেন তিনি।

পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর কাছে ওঁরা যে শাড়িগুলো বিক্রি করেন, সেগুলো আসলে মোটেও নতুন নয়। সেগুলো তৈরি হওয়া মাত্রই সোজা চলে যায় জালনার রাজপ্রাসাদে। ওখানকার রাজা সেগুলোকে পর পর তিন চারটে বিছিয়ে বিছানার চাদর হিসাবে ব্যবহার করেন।

একজনের ব্যবহার করা শাড়ি তিনি ব্যবহার করছেন! এটা জানার পরেই পাটনের রাজা কুমারপালা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন যে, তার ক’দিনের মধ্যেই মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটক থেকে গোটা পরিবার-সহ প্রায় ৭০০ পাটোলা শিল্পীকে তিনি তাঁর নিজের রাজ্যে নিয়ে আসেন।

পাটন জেলাতেই তাঁদের জমিটমি দিয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।‌ শর্ত একটাই— তাঁকে প্রতিদিন একটি করে শাড়ি বুনে দিতে হবে।

রাজার পছন্দ বলে কথা! ব্যস, তার পর থেকেই একটু একটু করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে গুজরাতের পাটন পাটোলা।

এই শাড়ি একটা বানাতেই সময় লেগে যায় কম করেও ৭ মাস। ঠিকঠাক ডিজাইনের করতে হলে সময় লাগে প্রায় দু’বছর। তবুও ওই রাজা এই শাড়ির প্রতি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি প্রতিদিনই প্রার্থনা করতে যাবার আগে একটা করে নতুন পাটোলা পরতেন।

এই শাড়ি বুননের পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। সিল্ক সুতোয় বোনাতে হয়। যে কোনও সাধারণ কারিগরের পক্ষে এই ধরনের শাড়ি বোনা প্রায় অসম্ভব।

এই শাড়ি নিয়ে গুজরাতে একটা কথা খুব চালু আছে— এই শাড়ি ছিঁড়ে যাবে, তবু রং উঠবে না। সে জন্যই আসল পাটোলা শাড়ির দাম এ রকম আকাশছোঁয়া। দাম শুরুই হয় দেড় লক্ষ টাকা থেকে।

যে ৭০০ পাটোলা শিল্পী-পরিবারকে রাজা কুমারপালা তাঁর রাজ্য পাটনে নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একটি পরিবার ছাড়া বাকিরা সবাই আস্তে আস্তে অন্যান্য পেশায় চলে গেছেন।

ফলে শুধু গুজরাত নয়, গোটা ভারতে এখন একমাত্র সালভি পরিবারই ৯০০ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এই শাড়ি বুনে আসছেন।

শুধু তাইই নয়, এই পরিবারই একমাত্র সাবেকি পদ্ধতিতে এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেই পাটোলা শাড়ি বানাচ্ছেন।

হলুদ, গাঁদা ফুল এবং বিভিন্ন ধরনের গাছের শিকড়বাকড়, টমাটো, বেদানা জাতীয় ফলফুলের রং দিয়েই শাড়ির মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন নানান নকশা।

হাতের সুক্ষ্ম কাজে ঠাসা এই শাড়ি দেখলে মনে হবে খুবই ভারী, কিন্তু আসলে তা খুবই হালকা। হাতে না নিলে বোঝাই যাবে না এক-একটা শাড়ির ওজন খুব বেশি হলে মাত্র ৪৫০ গ্রাম।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *