রম‍্যরচনা -ঘায়েল -সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

ঘায়েল কলমে-সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

নিয়তি বড় সুন্দর করে ওর বাড়িটা সাজিয়েছে, যেই আসে সেই মুগ্ধ হয়ে যায়। পুরো বাড়ি ঘুরে দেখানোর ভার পরে স্বামী প্রবোধের ওপরে। বেচারা মালাইচাকির আর্তনাদ সয়ে বাড়ি দেখানোর কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে। ক্রমশ এই বাড়ি দেখানোর আনন্দ থিতু হয়ে যায়।

ছেলেমেয়েরাও সব কর্ম উপলক্ষ্যে দূরে চলে যায়। অগত‍্যা উপায় না দেখে দম্পতি তাদের সাধের বাড়ির নীচতলাটা ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একে একে অনেকেই আসে দেখতে, শেষে এক নববিবাহিত দম্পতিকে পছন্দ হয় নিয়তি আর প্রবোধের। কথোপকথনের শুরুতেই রিক মানে নতুন ভাড়াটে জানায়-“কাকিমা দুমাসের অ‍্যাডভান্স দিতে পারব না, ঐ একমাসেরই দেব।” নিয়তি প্রায় নিজের ছেলের বয়সী বলে রিকের কথাই মেনে নেয়, চুক্তি হয়ে যায়।

পরের মাসের এক তারিখে বউ দিয়াকে সঙ্গে করে আসে। নিয়তির পোষ‍্য সাধের লালু, ভুলুকে দেখে দিয়া বলে-” হাউ ন‍্যাস্টি, এরা কি এই বাড়িতেই থাকে?” নিয়তি আকাশ থেকে পড়ে, মনে মনে ভাবে লালু, ভুলু এ বাড়িতে পাঁচ বছর ধরে আছে আর মহারাণী একদিন এসেই ওদের আপদ ভাবছে। নিয়তিকে কোনো কথা বলতে না দিয়ে দিয়া রিকের দিকে ফিরে-“রিকু সোনা, এ বাড়ি ডিপ ক্লিন করতে হবে, তুমি জানো তো কুকুরের একটা লোম থাকলেও আমার হাঁচি থামতে চায় না, সেবার এক মেসোর বাড়ি গিয়ে কুকুরের লোম থেকে অ‍্যালার্জি হয়ে টানা দশদিন হাসপাতালে ছিলাম।

তুমি চাও আবার তেমনটাই হোক?” যাকে উদ্দেশ্য করা বলা সেই রিকু সোনা নিয়তির দিকে তাকিয়ে-” ডিপ ক্লিন কাকিমা।” নিয়তির ঘাড়টা পরিস্থিতিতেই কাত হয়ে যায়-“হবে বাবা।” ওপর থেকে কথাগুলো শুনে প্রবোধ স্বগোতোক্তি করে-” দশ হাজারের তিনহাজার খসে গেল।” এদিকে আশ্বাস পেয়ে দিয়া ঘরে ঢুকে-” এ বাবা ঘরের রঙটা যেন কেমন ম‍্যাড়ম‍্যাড় করছে, রিকু সোনা তুমি কি দেখে পছন্দ করে গেলে।”

অগত‍্যা রিকু সোনা কাকিমার দিকে-“কাকিমা রঙ” নিয়তি এবার ধাতস্থ হয়ে ময়দানে নামে-” রঙ তো নতুনই করানো হয়েছে মা।” দিয়া-” ও তাহলে একটু ক্লিন করিয়ে দেবেন।” ওপর থেকে হঠাৎ প্রবোধবাবুর টানা কাশির আওয়াজ পাওয়া গেল, গিন্নী ভাবলেন কর্তার আরও দুহাজারের খবরে বিষম লেগেছে।

যাহোক চুক্তি যখন হয়ে গেছে এটুকুও করিয়ে দিতে হবে। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে আজ যেন কোমর ভেঙে পড়ে আর মনে মনে ভাবে আর কি কি যে কপালে লেখা আছে। যাহোক ঐদিনটা কর্তার চোখের জলে রুমাল জুগিয়ে কাটল। পরদিন ভোর ভোর রিক আর দিয়া ট্রাকেতে মালপত্র নিয়ে হাজির। নিয়তি অবাক-” রিক, তোমরা বললে না নতুন বিয়ে হয়েছে তা এতো জিনিস কোত্থেকে এলো, এ তো বাড়ির ডবল জিনিস।” রিক সাথে সাথে-” আজ্ঞে আমার আর দিয়ার বাবা মায়ের সব জিনিস এখানে আছে।”

নিয়তি আরও অবাক হয়ে-” তারা সব কোথায়?” দিয়া আদুরে গলায়-” ওনারা আমাদের ছেড়ে গডের কাছে চলে গেছেন,এখন রিকু সোনা আর আমি দুজনেই অনাথ।” ” ও তাহলে এতসব জিনিস কোথায় ছিল এতদিন?”- নিয়তির প্রশ্ন পড়তে পেল না-“ভাড়া বাড়িতে, ওনারাও তো ভাড়া বাড়িতে থাকতেন, তাই ভাবলাম মানুষগুলো যখন নেই তখন জিনিসগুলোই আমাদের সঙ্গে চলুক, বড় মায়ার জিনিস, বাবা-মায়ের স্মৃতিচিহ্ন”- রিক সামলে নেয়। নিয়তি আর কি করে একটু সাবধানে সব করে যেন বলে দোতলায় চলে যায়।

তলায় জিনিপত্তরের দড়াম দড়াম শব্দ চলতে থাকে আর প্রবোধবাবু কেঁপে কেঁপে ওঠেন। সকালের জলখাবারটা খেয়ে সেরে উঠতে পারে নি নিয়তিরা, হঠাৎ করে দিয়া ওপরে এলো বাথরুমের দামী হ‍্যান্ডেল, যা কিনতে নিয়তি গোটা একদিন ঘুরেছিল সেটা হাতে করে। “একি এ হ‍্যান্ডেল কি করে খুলল?”- নিয়তি আঁতকে ওঠে।

প্রবোধ বলে-” ওগো তুমি ভাড়াটে রেখেছো না হারকিউলিস, এতে যাবে হাজার খানেক, আর পড়ে রইল মোটে চারহাজার, ওটাও অচিরেই শেষ হবে।” “হুঁ হুঁ- এ আমার কাজ নয়, এ আপনাদের ছেলের কাজ, আমি বাথরুমে স্নান করছিলাম, ও হঠাৎ দরজা ধরে টেনে এই হাল করেছে। এটা এখনই সারাতে হবে না কাকিমা, ও আমরা ম‍্যানেজ করে নেব।” দিয়ার এই দয়ার মাহাত্ম্য ঠিক বোধগম‍্য হল না নিয়তিদের, যাহোক শেষ অব্দি জলখাবারটা খাইয়ে বিদেয় করল। সুখ অবশ‍্য বেশীক্ষণ সইল না, প্রবোধবাবু নিশ্চিন্ত মনে স্নানে গেছিলেন হঠাৎ জল বন্ধ।

নিয়তি অনুসন্ধান করে দেখল নীচে দিয়াদের রান্নাঘরে বেসিনের কল খোলা, ওইতেই ট‍্যাঙ্ক খালি হয়ে গেছে। প্রবোধবাবু শৌচকর্ম করতে পারেন নি, শেষকালে পানীয় জল থেকে সে ব‍্যবস্থা হল। দুপুরে প্রবোধবাবুর নিদ্রাটা ঠিক জমল না, উসখুস করতে দেখে নিয়তি জিজ্ঞাসা করল-“কি হল তোমার?” ” শুরুতেই যা খেল দেখাচ্ছে তোমার ঐ আদরের রিক-দিয়া, শেষতক কি হবে কে জানে”- কর্তার হাহুতাশে নিয়তি-“ওরা আমার একলার হতে যাবে কেন, ওরা তোমার আর আমার দুজনেরই ভাড়াটে, একটু চঞ্চল এই যা।” প্রবোধবাবু মনে মনে ভাবেন একদিনের চঞ্চলতায় এই হাল, তিরিশ দিনের চঞ্চলতায় কি হবে। পরের দুদিন মোটামুটি ঠিকঠাক গেল, প্রবোধবাবু সামান‍্য নিশ্চিন্ত হবেন ভাবছেন।

এমনসময় নীচে ঠুকঠাক আওয়াজ। স্বামীর কুঞ্চিত ভ্রূ-যুগলের দিকে তাকিয়ে নিয়তি-“মনে হয় পেরেক পুঁতছে।” প্রবোধবাবু কাতরভাবে বললেন-” পুট্টি করা দেওয়ালে ঐভাবে হাতুড়ি ঠুকে তো পেরেক পোঁতা যায় না, দেখ না কি করছে-প্লিজ।” স্বামীর অনুরোধে একতলায় এসে তো নিয়তি থ। দিয়া ঘরের ভেতরে, রিক বাইরে, ইন্টারলক আটকে গেছে, সেই আটকানো লক স্ক্রু-ডাইভারে করে খুলছে রিক। ” আরে আরে চাবি দিয়ে খোল, ভেতরটা দেখে বন্ধ করবে তো।

তুমি এতক্ষণ ধরে লকটার যে অবস্থা করেছো তাতে আর চাবিতে হবে না, মিস্ত্রী ডাকতে হবে।”- নিয়তি হাল ছেড়ে মিস্ত্রীকে ফোন করে ডাকে। ভেতর থেকে তখন দিয়া পরিত্রাহী চিৎকার করছে-” ওরে বাবা গো, আটকে থেকে মরে যাব গো।” প্রবোধবাবুও নীচে নেমে এসে পুরো সিনটা দেখে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার দেখাতে প্রেসারের ওষুধ একটার জায়গায় দুটো হল।

নিয়তি মুম্বাইতে মেয়েকে ফোনে বললেন-” হ‍্যালো- ভাল তো রে, ভাবছি তোর ওখানে ঘুরতে যাব।” মেয়ে অবাক হয়ে-” হঠাৎ, এতো বলি আসো না, এখন নিজের থেকে বলছো।” ” আরে তোর বাবার একটু বদল হবে”- যাওয়া নিশ্চিত করে প্রবোধবাবুকে জানাতে উনিও রাজী হয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় রিক আর দিয়া থমথমে মুখে বিদায় জানালো।

দিয়া বলল-“ভাবলাম নতুন বাবা-মা পেলাম, তাও আপনারা চলে যাচ্ছেন।” দিয়ার কথাতে প্রবোধবাবু সুপ্রসন্ন হলেন না,তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লেন। মুম্বাই পৌঁছে গালে গপ্পে মেয়ে-“তা তোমাদের নতুন ভাড়াটে কেমন?” প্রবোধবাবুর সেই কাশিটা ফিরে এলো.. এখন যায় কি তখন যায়। নিয়তি স্বামীকে জল খাওয়াতে খাওয়াতে-” পুঁটি এ প্রসঙ্গ আর তুলিস না রে, তাহলে তোর বাবাকে আর বাঁচানো যাবে না।”- উত্তর শুনে বিগত দশবছর ধরে মুম্বাইনিবাসী পুঁটি পুরো হাঁ।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *