রেজাল্ট – শম্পা সাহা

story and article

দুই বোন পিঠোপিঠি, বড়টা বছর দশেক, ছোটটা আট সাড়ে আট। খেলতে যায় রোজই সামনের মাঠে। ওখানে আরো অনেক ছেলেমেয়েই খেলতে আসে।

গরীব বড়লোক অতোটা বাছবিচার তখনো ছিল না।
বড়টা বেশ ঠোঁট কাটা প্রতিবাদী টাইপের আর ছোটোটা নরমসরম ভালোমানুষ। বড়টা যে মন্দ মানুষ তা নয় তবে সব কিছু মেনে নেবার মধ্যে বাহাদুরি আছে বলে মনে করে না।

রোজই খেলতে যায় আর দেখে কয়েকজন ছেলে মেয়ের বাবা মা ওদের সঙ্গে নিজের ছেলে মেয়েদের মিশতে দিতে চায় না। প্রথম প্রথম ওরা বুঝতো না, কেন? কিন্তু ওরা মাঠে গেলেই বাবলীর মা ডাকতো, “বাবু চলে এসো, আর খেলতে হবে না”, পম্পার মা চ্যাঁচাতো, ” পম্পি,এই পম্পি, বাড়ি আয়”।

ওরা ভাবতো, বোধহয় ওদের কোনো কাজ আছে তাই ওদের মা ওদের ডাকছে। কিন্তু একদিন মেঘলা, দুই বোন একসাথে একটু আগে থাকতে উপস্থিত, “মান্তু  মাঠে ঢুকতে গিয়েও ওদের দেখে আবার বাড়ির পথে হাঁটা দেয়। কি হল ব্যাপার টা? খেলতে এসে ও চলে যাচ্ছে কেন?

বড়জন ছুটে গিয়ে ধরলো মান্তুর হাত, “কি  রে, খেলবি না? “, ” না, রে”, মান্তু এড়িয়ে যেতে চায়। ছোট জন গোবেচারা মুখ করে দাঁড়িয়ে।

“একটু খেল না, কি হবে? “, বড় বোন একটু জোর করে। মান্তু ও এদিক ওদিক দেখে রাজী। ব্যস শুরু হল ন ঘর কেটে কিৎ কিৎ খেলা।

মান্তুর মা বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে মেয়েকে ওদের দুই বোনের সঙ্গে খেলতে দেখে মেয়েকে উদ্দেশ্যে করে গলা ছাড়ে, ” মান্তু, কতো বার বইলিছি না, ঐ ডির লগে খেলবা না, ঐডি ছুডোলোগ! ”

“ছুডোলোগ”, মানে তো ছোটোলোগ! স্তম্ভিত দুই বোন ই। কিন্তু কেন?  ওদের বাবার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ওদের বাবা টাকার বিনিময়ে লোকের বাড়ির জল তুলে দেয়, আর মা ফুল গাঁথে, ওরা গরীব, তাই ওরা ছোটলোক!

না ওরা আর খেলেনি, খেলতে যায়নি আর। ওদের বন্ধুদের কাছে, তাদের মায়েদের কাছে নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যায়। মান্তু ওদের প্রায় সমবয়সী হলেও, তখন মান্তু থ্রি, ছোটটার সঙ্গে, বড়টা ফোর।

এর বছর ছয়েক পরের ঘটনা, মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেড়িয়েছে, বড় মেয়েটা এবছর মাধ্যমিক দিয়েছিল। মান্তু , বাবলীর মতো ভালো স্কুল নয়, ওদের এলাকার সবচেয়ে ওঁচা  স্কুল। যে স্কুলে লাস্ট ফার্স্ট ডিভিশন গেছিলো সাত বছর আগে। হ্যাঁ, 1995-96 সালে এতো ঘন ঘন, গাদা গাদা স্টার আর ফার্স্ট ডিভিশন ছিল না। বড়টা ফার্স্ট ডিভিশন, স্টার তো পেয়েছে, মাধ্যমিক মূল তালিকায় পজিশন 120.

বিকেল বেলা, আজ দুই বোন মা এর সঙ্গে যাচ্ছে এক আত্মীয়ার বাড়ি প্রনাম করতে। রাস্তায় যেতে যেতে শুনলো মান্তুর মা মান্তুকে ওকে দেখিয়ে বলছে, “ওই দিদিটার মতো রেজাল্ট করতে হবে, মনে থাকবে? ”

 

না ওরা আর খেলেনি খেলতে যায়নি আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *