কবিতার রূপকল্প : পর্ব- ৫ – গুপ্ত কবি” : ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত – সৌম্য ঘোষ

story and article

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ” সেকাল আর একাল এর সন্ধি স্থলে ঈশ্বরগুপ্তের প্রাদুর্ভাব ।” ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ( ১৮১২– ১৮৫৯) । চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চন পল্লীতে ( বর্তমান নাম , ” কাঁচরাপাড়া’ ) ঈশ্বর গুপ্তর জন্ম হয় এক সম্ভ্রান্ত বৈদ্যপরিবারে। বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র একটি পর্যায়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মূলত: কবিওয়ালা ও পাঁচালী দলের গান রচয়িতা। কবিওয়ালা ও পাঁচালীকারদের উত্তরাধিকার তাঁর কবিতায় মেলে । তাঁর কবিতা আবহমান পয়ার- ত্রিপদী তে লেখা, অনুপ্রাস ও যমকে চটকদার।

” বলীবলে আমি বলী বলে কভু নই বলী,
বলি কভু করিনে ভক্ষণ ।
হিত কথা সদি বলি রীতিমত দিই বলি
নাহি করি বলির বারণ ।।”

কবিওয়ালাদের ধরনে perpetual alliteration and play upon words যেমন তাঁর রচনায় লক্ষণীয়, তেমনি লক্ষণীয় রুচিহীনতা। এই রীতির পুরানো কাব্যধারার তিনি হলেন শেষ প্রতিনিধি। দেশপ্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত ইতিহাস-চেতনাও তাঁর মধ্যে ছিল । সাহিত্য সম্রাট যদিও তাঁকে রায়গুণাকর কবি ভারতচন্দ্রের অনুগামী বলে গণ্য করেছেন, কিন্তু পরবর্তীকালে অনেক গবেষকের মতে , ঈশ্বরগুপ্তের উপর রামপ্রসাদের প্রভাব বেশি ছিল। তাঁর জীবন আদর্শ ও দর্শন ছিল বেশ পুরনো পন্থী । ইংরেজি-শিক্ষিত নব- বঙ্গের যুবকদের আধুনিকতা তিনি বরদাস্ত করতে পারেন নি। রক্ষণশীল এই কবির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মূলতঃ রক্ষণশীল জমিদারগণ। পরের দিকে তত্ত্ববোধিনী সভা ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির উদারনৈতিক সংস্রবে এসে তাঁর গোঁড়ামি হ্রাস পায় । তৎকালীন সময়ে কৃষকদের উপর উৎপীড়ন, চাষীদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দেশ প্রেমিক এই কবি বেদনাবোধ করেছিলেন ,

“হায় হায় পরিতাপে পরিপূর্ণ দেশ।
দেশের ভাষার প্রতি সকলের দ্বেষ ।।”

আবার বিপরীত দিকে, অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায় তাঁর মধ্যে। তিনি সিপাহী বিদ্রোহের নিন্দা করেছিলেন এবং ইংরেজ রাজশক্তির তোষণ করেছিলেন,

” ভারতের প্রিয় পুত্র হিন্দু সমুদয়।
মুক্ত মুখে বল সবে ব্রিটিশের জয়।।।”

একজন দেশ প্রেমিক হওয়া সত্বেও তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্তসুলভ দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ছিল। যুগসন্ধিকালের এই কবির উপর সেই যুগের অন্তর্বিরোধ প্রতিফলিত হয়েছিল । তিনি মেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতেন, আবার তিনিই ” বালিকারা যাহাতে বিদ্যাবতী” হয়, উপায় বাৎলে ছিলেন । তিনি বিধবা-বিবাহ মেনে নিতে পারেননি । অথচ অদ্ভুত বিষয়, তিনিই আবার বালবিধবার বিবাহের বিরোধী ছিলেন না । এই ধরনের অন্তর্বিরোধ প্রতিনিয়তঃ তাঁর লেখনীতে ধরা পড়তো।

দশ বছর বয়সে মাতৃবিয়োগের পর ঈশ্বরচন্দ্র জোড়াসাঁকোয় মাতুলালয়ে আশ্রয় নেন। শৈশবে লেখাপড়ায় অমনোযোগী হওয়ার কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি, তবে অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী ঈশ্বরচন্দ্রনিজচেষ্টায়বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা শেখেন এবং বেদান্তদর্শনে পারদর্শিতা লাভ করেন। সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের প্রেরণায় এবং বন্ধু যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের আনুকূল্যে ১৮৩১ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি সাপ্তাহিক সংবাদ প্রভাকর প্রকাশ করেন। অর্থসংকটের কারণে মাঝে চার বছর বন্ধ থাকার পর ১৮৩৬ সালের ১০ আগস্ট সপ্তাহে তিন সংখ্যা হিসেবে পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় পত্রিকার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে ১৮৩৯ সালের ১৪ জুন থেকে এটি দৈনিক পত্রে রূপান্তরিত হয়।

আধুনিক বাংলার সমাজ গঠনে সংবাদ প্রভাকরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরচন্দ্র প্রথমে নব্যবঙ্গ আন্দোলনের বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের পক্ষভুক্ত ছিলেন। তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষাপদ্ধতিরও বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু নবপর্যায়ে সংবাদ প্রভাকর সম্পাদনার সময় থেকে তাঁর মনোভাবের পরিবর্তন হতে থাকে। তিনি দেশের প্রগতিশীল ভাবধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। হিন্দু থিয়ফিলানথ্রফিক সভা এবং তত্ত্ববোধিনী সভায় তিনি বক্তৃতাও করতেন। প্রথম দিকে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনের বিরোধিতা করে এ বিষয়ে নানা ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করলেও পরে স্ত্রীশিক্ষার সমর্থন, ধর্মসভার বিরোধিতা, দেশের বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন প্রচেষ্টা এবং দরিদ্র জনগণের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে উদার মনোভাবের পরিচয় দেন। এমনকি তিনি অক্ষতযোনি বিধবার বিবাহেও আর আপত্তি করেননি।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন মজলিশি স্বভাবের কবি, রঙ্গ-ব্যঙ্গেই তাঁর কবিতা ভালো খুলতো । কবি বিষ্ণু দে তাঁকে প্রশংসা করেন। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পারিপার্শ্বিক জীবন, নতুন কলকাতা শহরের জীবন ইত্যাদি নিয়ে কবিতা লিখতেন। অদম্য কৌতুকবোধের সরসতা মিশিয়ে । তাঁর লেখা অনেক ছত্র প্রবাদের মর্যাদা পেয়েছে । যেমন , ” এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরে “। তিনি “সংবাদ প্রভাকর “এর সম্পাদক ছিলেন । ব্যক্তিগতভাবে তিনি সাংবাদিকও ছিলেন। সমকালের সমাজ সম্পর্কে সচেতন সাংবাদিক ও কবি। ইংরেজ ললনার সম্পর্কে লিখেছিলেন,

” বিড়ালাক্ষী বিধুমুখী মুখে গন্ধ ছোটে।
আহা আয় রোজ রোজ কত রোজ ফোটে ।।”

বাঙালি ধনীদের সম্পর্কে লিখেছিলেন,

” কর্তাদের গালগপ্প গুড়ুক টানিয়া ।
কাঁঠালের গুড়ি প্রায় ভূড়ি এলাইয়া।।”

পুরানো পন্থী ও নব্য পন্থীদের সম্বন্ধে ,

” একদিকে কোশাকুশি আয়োজন নানা।
আর দিকে টেবিলে ডেভিল খায় খানা।।”

কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সমকালীন। সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ইংরেজীও জানতেন তিনিও পুরানো পন্থী কবি । সমাজ চিন্তায় প্রগতিশীল মনন ও চিন্তন ছিল মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মধ্যে। তিনি বিধবা বিবাহ, স্ত্রীশিক্ষা প্রভৃতির সমর্থক ছিলেন এবং জাতিভেদের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু কাব্য রচনার ক্ষেত্রে ছিলেন রক্ষণশীল তাঁর জনপ্রিয় পংক্তি :

” পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল ।। “

বাংলার লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখক রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭– ১৮৮৭ ) ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পন্থী এবং “সংবাদ-প্রভাকর” এর শিক্ষানবিশি। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বর গুপ্ত” সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকার সম্পাদনা নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে “সংবাদ রত্নাবলী “পত্রিকার সম্পাদক হন ।’ সংবাদ প্রভাকর’ ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। তিনি এটিকে দৈনিকে রূপান্তরিত করেন। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে “সাপ্তাহিক পাষণ্ড” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। “সংবাদ সাধুরঞ্জন” পত্রিকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন এবং কবিগান বাঁধতেন ।প্রায় বারো বছর গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাচীন কবিওয়ালাদের তথ্য সংগ্রহ করে জীবনী গ্রন্থ রচনা করেন ।

ইশ্বরচন্দ্র প্রথম জীবনে অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিলেন। তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষা পদ্ধতি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিরোধিতা করতেন । পরবর্তীকালে থিওফিলান্থ্রপিক সভা, তত্ত্ববোধিনী সভা ও জোড়াসাঁকোর সংস্পর্শে এসে তাঁর রক্ষণশীল পুরানো পন্থী মানসিক গোঁড়ামি মুক্ত হয় ।

ঈশ্বরচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগসন্ধির কবি হিসেবে পরিচিত, কারণ তিনি সমকালের সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে কবিতা রচনা করলেও তাঁর ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কার ছিল মধ্যযুগীয়। মঙ্গলকাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শ যখন লুপ্ত হয়ে আসছিল, তখন তিনি বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে খন্ডকবিতা রচনার আদর্শ প্রবর্তন করেন। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপই ছিল তাঁর রচনার বিশেষত্ব। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের এ ভঙ্গি তিনি আয়ত্ত করেছিলেন কবিয়ালদের নিকট থেকে। ব্যঙ্গের মাধ্যমে অনেক গুরু বিষয়ও তিনি সহজভাবে প্রকাশ করতেন।

স্বদেশ ও স্বসমাজের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্রের অনুরাগ ছিল অত্যন্ত নিবিড়। তিনি বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য যে আন্দোলন করেছেন তা আজ স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি সবসময় ইংরেজি প্রভাব বর্জিত খাঁটি বাংলা শব্দ ব্যবহার করতেন। ভাষা ও ছন্দের ওপর তাঁর বিস্ময়কর অধিকারের প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর বোধেন্দুবিকাশ (১৮৬৩) নাটকে।

ঈশ্বরচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ভারতচন্দ্র রায়, রামপ্রসাদ সেন, নিধুগুপ্ত, হরু ঠাকুর ও কয়েকজন কবিয়ালের লুপ্তপ্রায় জীবনী উদ্ধার করে প্রকাশ করা। পরবর্তীকালের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকের জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করার কৃতিত্বও তাঁর। যদিও ঈশ্বরচন্দ্রের কাব্যরীতি পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যে আর অনুসৃত হয়নি, তথাপি এ কথা স্বীকার্য যে, ভবিষ্যৎ বাংলা সাহিত্যের জন্য তাঁর গঠনমূলক চিন্তাভাবনা ও আদর্শ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর চিরস্থায়ী আসন লাভ হয়েছে। মধ্যযুগের দেবমাহাত্ম্য ব্যঞ্জক বিষয় থেকে বাংলা সাহিত্যকে তিনি মুক্ত করেন । এমনকি তৎকালীন কবিওয়ালাদের জিম্মা থেকে বাংলা কবিতাকে বৈদগ্ধ ও মার্জিত রুচির আলোয় আনেন । স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে ” গুরু” মানতেন।
২৩শে জানুয়ারি, ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতায় পরলোকগমন করেন।।

 Soumya Ghosh

লিখেছেন – অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
পোঃ চুঁচুড়া জেলা : হুগলী

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *