কিটকিটের অভিযান – শেষ পর্ব – সুব্রত মজুমদার

story and article

সুপ্রভা বলল, “সেটাও ঠিক। কিন্তু রাজকন্যার কাছে যেতে যে তুমি পারবে না।”
কিটকিট বলল,”কেন ?”
সুপ্রভা বলল,”আমার বাবা মকরাক্ষ বন্দি করে রেখেছে রাজকন্যাকে। এই পাহাড়ের উপরে মেঘের সারি। সেখানেই রয়েছে বারোহাত কাঁকুড়ের তেরোহাত বিচি। সেই বিচিত্র ভেতরেই রয়েছে রাজকন্যা । সেখানে যাওয়া তোমার সাধ্য নয়।”

কিটকিট বলল,”কিছু তো উপায় আছে ওখানে যাওয়ার। তুমি সাহায্য করো আমাকে। নইলে এত কষ্ট করে এখানে আসাটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে আমার।”
সুপ্রভা বলল,”ঠিক আছে, আজ রাতে বাবা যখন মন্দিরে যাবে পুজো দিতে তখন তোমাকে নিয়ে যাব সেখানে।”

রাত্রি হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল কিটকিট। এদিকে সকাল গড়িয়ে দুপুর আর দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। একসময় সূর্যও পাটে গেল। মকরাক্ষ তার দলবল নিয়ে গেল পুজো দিতে। সুপ্রভা গেল না। সে বলল,”আমার পেটে খুব ব্যাথা। কালকে যে লোকটাকে ধরে এনেছিলে ওকে খাওয়ার পর হতেই বদহজম আর পেটে ব্যাথা। আমি বরং শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিই।”
বৈদ্য এসে ওষুধ দিয়ে গেল। জলের শেকড়ের সঙ্গে আলোকলতার পাতা মিশিয়ে অশ্বডিম্বের কুসুম মিশিয়ে খেতে হবে।

বৈদ্য চলে যেতেই ওষুধগুলো ফেলে দিয়ে কিটকিটকে নিয়ে রাজকন্যার কাছে চলল সুপ্রভা। হেঁটে নয় উড়ে। সুপ্রভা রাক্ষসের মেয়ে, মায়াবিদ্যা তার জন্মগত। সে পারে না এমনকাজ নেই। যখন যেটুকু দরকার তার অতিরিক্ত অর্জনে কোনও সমস্যা নেই তার। শুধু মনে একটাই দুঃখ, মাকে কাছে পায় না। তার মা রাক্ষসী দীর্ঘদন্তী রয়েছে নির্জনাবাসে। কারোর সঙ্গে দেখা করে না। একমাত্র শিবরাত্রির রাতে আসে মন্দিরে। সেসময় রাক্ষসদেরও মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ।

-“জানো কিটকিট আমিও তোমার মতো একদিন বেরিয়ে পড়ব, আমার মায়ের খোঁজে। খুব মজা হবে সেদিন।” এই বলে হাসল সুপ্রভা।
কিটকিট বলল, “আমি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর সন্ধান পাই, তারপর আমি আর কঙ্কাবতী মিলে তোমার সঙ্গে বের হব।”
সুপ্রভা হেসে বলল, “খুব ভালো হবে।”

কিটকিটকে নিয়ে সুপ্রভা চলল পাহাড়ের উপরে মেঘের দেশে। সে দেশে কেবল সারি সারি মেঘ। কারোর মুখ গোমড়া তো কারোর নাক কান দিয়ে বেরোচ্ছে বিদ্যুতের ঝলক । রাগে ফুঁসছে সে। একটা পেঁজা তুলোর মতো মেঘের উপর।
মেঘটা ভারি মিষ্টি। ওর নাম কুমকুম। একটুও রাগ নেই, মুখে সবসময় হাসি। আর দেখতেও অবিকল কিটকিটের মতো। ওরকমই সাদা ধবধবে পেঁজা তুলোর মতো লোম। খুব অবাক হয়ে কিটকিট বলল, “তোমার তো চেহারা অবিকল আমার মতোই। যেন কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া দুই ভাই আমরা।”

শুনেই খিলখিল করে হেসে উঠল কুমকুম। সে বলল, “সবাই ছোটবেলায় এরকমই থাকে, কি জানি তারপরে কেন যে এত গম্ভীর হয়ে যায়। আর যত গম্ভীর হয়ে যায় তত রাগ যায় বেড়ে। নাক কান দিয়ে বিদ্যুতের ঝলক বের হয়।”
কিটকিট উদাস হয়ে বলল,”আমার যে আসল বাবা, ছোটবেলায় যার কাছ হতে আমাক আনা হয়েছে তার নাকি খুব রাগ। সবাইকে তেড়ে তেড়ে কামড়ে দেয়। আমার ভাইবোনেরা ভয়ে ভয়ে থাকত।”

-“কিন্তু তোমারা এখানে এসেছ কিসের জন্য ?” শুধাল কুমকুম ।
কিটকিট বলল,” আমি চলেছি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খোঁজে । তোমাদের এই মেঘের রাজ্যেই আছে বারোহাত কাঁকুড়ের তেরোহাত বিচি। সেই বিচিত্র ভেতরে নাকি রাজকন্যা বন্দিনী আছে। ওকে উদ্ধার করে নিয়ে যাব।”
কুমকুম তার চোখদুটো বড় বড় করে বলল,”সে তো খুব ভয়ানক জায়গা। ওখানে রাগী রাগী মেঘেদের পাহারা। গেলেই বিদ্যুৎ ছুঁড়ে মারে। সেই পাহারা পেরিয়ে গেলেই বারোহাত কাঁকুড়। আর সেই বারোহাত কাঁকুড়ের ভেতরেই রয়েছে তেরোহাত বিচি। কাঁকুড়ের একপাশে বিচিটার একহাত বেরিয়ে আছে। সেইখানেই আছে রাজকুমারী কঙ্কাবতী।”

সুপ্রভা বলল,”আমি এর এর চেয়ে বেশি আর যেতে পারব না। আমার মানা আছে। তোমাকে একজোড়া উড়ুক্কু জুতো দিচ্ছি, যেটা পরে হাওয়ায় ভেসে যেখানে খুশি যেতে পারবে।”
কিটকিট ভয় পায় না। সে বেরিয়ে পড়ল। সুপ্রভার দেওয়া উড়ুক্কু জুতোতে ভর করে চলল বারোহাত কাঁকুড়ের উদ্দেশ্যে ।

কিছুদূর উড়ে যেতেই কিটকিট দেখল গোল করে কালো কালো মেঘের জটলা। নিশ্চই ওই জটলার মাঝেই আছে বারোহাত সেই কাঁকুড়। সাবধানে এগিয়ে যেতে হবে। ওদের চোখে পড়লেই মুশকিল। কিন্তু যেতে তো হবে ওই মেঘেদের মাঝখান দিয়েই, সেক্ষেত্রে ওদের চোখ এড়ানো মুশকিল।

আর হলও তাই। কালো কালো রাগী রাগী মেঘেদের নজর পড়ল কিটকিটের উপর। মেঘেরা গর্জন করে উঠল। ওদের নাক কান দিয়ে বের হতে লাগল বিদ্যুতের শিখা। ওরা গর্জন করে বলল, “কেন মরতে এসেছিস এখানে ?”

কিটকিট হাত জোড় করে বলল, “আমি এসেছি অসুরদের সর্দার মকরাক্ষের কাছ হতে। তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন। রাজকন্যার মন খারাপ তাই নাচ দেখিয়ে রাজকন্যার মন ভালো করব।”
মেঘেরা বলল, “হুমমম্ ! কই আমাদের গানের তালে তালে নেচে দেখাও তো দেখি।”
মেঘেদের গানের তালে তালে নাচতে লাগল কিটকিট।

কড়্ কড়্ কড়্ হুঙ্কার ছেড়ে যাই ভেসে
দূরদেশে, মোরা যাই ভেসে।
বনস্পতির দর্প করি চূর্ণ, বিচূর্ণ, –
ক্ষণে ক্ষণে মোরা বিদারণ করি কর্ণ,
আমাদের দেখে ভীরু লোক সব মরে ত্রাসে।
মোরা দুর্জয় ঘন দুর্যোগ, মোরা ঘনঘটাময় সংযোগ,
দেখি আকুলি পরাণ বীণা ধরে তাণ কবির কলমে ঝড় আসে।।

নাচ শেষ হতেই মেঘেরা বলল,”বেশ বেশ, তুমি ভেতরে যেতে পার।”

কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে কিটকিট পৌঁছল বারোহাত কাঁকুড়ের কাছে। সেই কাঁকুড়ের একপাশে একটা দরজা। ওই দরজা দিয়ে ঢুকতেই কিটকিট বুঝতে পারল যে ও পৌঁছে গেছে তেরোহাত বিচির ভেতরে। এবার শেষপ্রান্তে পৌঁছলেই রাজকন্যার দেখা পাবে সে।
তেরোহাত বিচির একদম শেষপ্রান্তে একটা রক্তচন্দন কাঠের পালঙ্কের উপর শুয়ে রয়েছে কঙ্কাবতী। কিটকিটের মতোই ধবধবে সাদা রং তার। কিটকিট গিয়ে কাছে দাঁড়াতেই কঙ্কাবতী বলল, “আমি জানতাম তুমি আসবে।”

কিটকিট বলল, “আর দেরি নয়, চলো বেরিয়ে পড়ি। ঘরে বাবা চিন্তা করছেন।”
কঙ্কাবতী বলল, “কিন্তু যাবে কি করে ? বাইরে মেঘেদের পাহারা, তারপরেই রাক্ষসের দল।”
কিটকিট বলল, “তুমি এখানেই বসে থাক। আমি এই কাঁকুড়সহ তোমাকে নিয়ে যাব আকাশপথে। উড়ুক্কু জুতোতে ভর করে পালিয়ে যাব। মেঘের দল বা রাক্ষসেরা টিকিও পাবে না।

বাইরে এসে কাঁকুড়টার একটা অংশ জড়িয়ে ধরে খুব জোরে উড়তে লাগল কিটকিট। ব্যাপার দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মেঘ গুলো। তারা বুঝে ওঠার আগেই কাঁকুড়টা নিয়ে কিটকিট পালিয়েছে অনেক দূরে।

উড়তে উড়তে বন পাহাড় পর্বত নদী পারকরে কিটকিট এসে নামল ঘরের পাশের মাঠটাতে।
কঙ্কাবতীকে নিয়ে ঘরের ছেলে এল ঘরে। সে কি সমারোহ ! ইঁদুরের দল ড্রাম সাইড্রাম তাসা পিঁপড়ি মৃদঙ্গ নিয়ে হাজির। হয়েছে। সে কি উদ্দাম নাচ।

সকালবেলা কিটকিটকে নিয়ে মাঠে বসেছি রোদ পোহাতে। গিন্নি এসে বসলেন পাশে। বললেন, “খুব অত্যাচার বেড়েছে তোমার আদরের কিটকিটের। সারারাত খাটের তলায় আওয়াজ করেছে। বোধহয় খাটের প্লাইটা কেটে খাচ্ছে।”

কালকের অভিজ্ঞতার কথা গিন্নিকে বলার সাহস পেলাম না। ভাববে আমি স্বপ্ন দেখেছি। এগিয়ে গেলাম কিটকিটের কাছে। ও এখন ব্যস্ত একটা ফুট-কাঁকুড় নিয়ে। বিরাট একটা কাঁকুড়, ভেতরটা পচে খালি হয়ে গেছে। ওপরের অংশটা এখনও সবুজ। পাশের বাড়ির কেউ বোধহয় ফেলে গিয়েছে।

 Subrata Majumdar

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *