দেড় হাজার বছর ধরে হাত ধরাধরি করে একই কবরে শুয়ে আছেন তাঁরা – সিদ্ধার্থ সিংহ

আজ ১৫০তম পর্ব

আজ প্রকাশিত হল সিদ্ধার্থ সিংহের দৈনিক কলামের একশত পঞ্চাশতম পর্ব। এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটা শুরু হয়েছিল গত ২৭ আগস্ট, ২০২০ বৃহস্পতিবার থেকে।

স্টোরি অ্যান্ড আর্টিকেল-এর পাতায় যিনি এত দিন ধরে একটানা লিখে গেছেন এই বিচিত্র সংবাদ, সেই বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক সিদ্ধার্থ সিংহের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নীচে দেওয়া হল—

সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি
২০২০ সালে ‘সাহিত্য সম্রাট’ উপাধিতে সম্মানিত ষ্ট ২০১২ সালে ‘বঙ্গ শিরোমণি’ সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। ১৯৬৪ সালে। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা ক্ষঞষহয় ‘দেশ’ পত্রিকায়। প্রথম ছড়া ‘শুকতারা’য়। প্রথম গদ্য ‘আনন্দবাজার’-এ। প্রথম গল্প ‘সানন্দা’য়। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহল তোলপাড় হয়। মামলা হয় পাঁচ কোটি টাকার। পরে সত্যজিৎ কোটালের নাট্যরূপ এবং নির্দেশনায় প্রথম নাটক‌ মঞ্চস্থ হয় শিশিরমঞ্চে— বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল।

ছোটদের জন্য যেমন মৌচাক, শিশুমেলা, সন্দেশ, শুকতারা, আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, চিরসবুজ লেখা, ঝালাপালা, রঙবেরং, শিশুমহল ছাড়াও বর্তমান, গণশক্তি, রবিবাসরীয় আনন্দমেলা-সহ সমস্ত দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় লেখেন, তেমনি বড়দের জন্য লেখেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং মুক্তগদ্য।

লেখেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকায়। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে প্রকাশিত ‘প্রভাত ফেরী’ পত্রিকায় একটি লেখা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেয়ার হয়ে গিয়েছিল 3.6 K, মানে তিন হাজার ছশো। ভিউয়ার্স হয়েছিল 10,932।

‘রতিছন্দ’ নামে এক নতুন ছন্দের প্রবর্তন করেছেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুশো পঁতাল্লিশটি। তার বেশির ভাগই অনুদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। বেস্ট সেলারেও উঠেছে সে সব। ষোলোটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন এবং লিখতেও পারেন।

এ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একক এবং যৌথ ভাবে পাঁচশোর ওপর সংকলন সম্পাদনা করেছেন লীলা মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মহাশ্বেতা দেবী, শংকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, নবনীতা দেবসেন, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়দের সঙ্গে।

এই মুহূর্তে সম্পাদনা করছেন বেঙ্গল ওয়াচের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সাহিত্যের পাতা’। যেটি প্রকাশিত হয় প্রত্যেক রবিবার।

আমেরিকার উড়ালপুল পত্রিকার কলকাতার সম্পাদক।

অজস্র মুদ্রিত পত্র-পত্রিকা এবং ওয়েবজিনের উপদেষ্টা।

প্রত্যেক দিন দৈনিক কলাম লিখছেন তিনটি পত্রিকায়— (১) বেঙ্গল ওয়াচ (২) নিউজপিডিয়া এবং (৩) স্টোরি অ্যান্ড আর্টিকেল-এ। আজ সেখানে প্রকাশিত হল দেড়শো তম পর্ব।

তাঁর লেখা নাটক বেতারে তো হয়ই, মঞ্চস্থও হয় নিয়মিত। তাঁর কাহিনি নিয়ে ছায়াছবিও হয়েছে বেশ কয়েকটি। গান তো লেখেনই। মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে। তাঁর ইংরেজি এবং বাংলা কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কয়েকটি সিনেমায়। বানিয়েছেন দুটি তথ্যচিত্র। লিখেছেন বেশ কয়েকটি ছায়াছবির চিত্রনাট্য। বেশ কয়েক বার চ্যাম্পিয়ন হওয়া এই মুষ্টিযোদ্ধা এক সময় নিয়মিত মডেলিংয়ের কাজও করেছেন।

আশির দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই সব্যসাচীর লেখা পাঠ্য হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখ থেকে একত্রিশ তারিখের মধ্যে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, মুক্তগদ্য, প্রচ্ছদকাহিনি মিলিয়ে মোট তিনশো এগারোটি লেখা প্রকাশিত হওয়ায় ‘এক মাসে সর্বাধিক লেখা প্রকাশের বিশ্বরেকর্ড’ তিনি অর্জন করেছেন।

আনন্দবাজার পত্রিকার এই প্রাক্তনী ইতিমধ্যেই পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, সন্তোষকুমার ঘোষ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার, ড্রিম লাইট অ্যাওয়ার্ড, কমলকুমার মজুমদার জন্মশতবর্ষ স্মারক সম্মান, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের ‘শ্রেষ্ঠ কবি’ এবং ১৪১৮ সালের ‘শ্রেষ্ঠ গল্পকার’-এর শিরোপা।

আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘পঞ্চাশটি গল্প’ গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি ‘সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার’ প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।

Siddhartha Singha

আজ প্রকাশিত হল তাঁর দৈনিক কলাম-এর ১৫০তম পর্ব

দেড় হাজার বছর ধরে হাত ধরাধরি করে একই কবরে শুয়ে আছেন তাঁরা 

সিদ্ধার্থ সিংহ

ইতালির মোডেনা শহরের সিরো মেনোটি সমাধিস্থল থেকে দেড় হাজার বছরেরও পুরনো দু’টি কঙ্কাল আবিষ্কার করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।

না, দেড় হাজার বছরের পুরনো বলে নয়, বিস্ময়ের কথা হচ্ছে, আবিষ্কারের সময় তাঁরা দেখেন কঙ্কাল দু’টি একে অপরের হাত ধরে রয়েছে।

প্রাচীন এই কঙ্কাল দু’টিকে এই অবস্থায় দেখে বিস্মিত হন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।

কঙ্কাল দু’টি আবিষ্কারের পরে তাঁদের ‘লাভার্স অব মোডেনা’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। সবাই ভেবেছিলেন, এঁরা হয়তো কোনও দম্পতি।

যাঁদের একজন পুরুষ আর অন্য জন নারী। কারণ একটি কঙ্কালের তুলনায় অন্য কঙ্কালটি একটু ছোট ছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ভেবেছিলেন, এঁরা দু’জনে নিশ্চয়ই একই দিনে মারা গিয়েছিলেন অথবা যে কোনও কারণেই হোক দু’জনে হয়তো একই সঙ্গে আত্মহত্যা করেছিলেন।

স্বামী-স্ত্রী না হলেও এঁরা হয়তো প্রেমিক প্রেমিকা ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে গভীর প্রেম ছিল। সে কথা সবাই জানতেনও।

তাই দু’টি দেহকে তাঁদের পরিবারের লোকেরা কিংবা আশপাশের লোকেরা একই কবরে পাশাপাশি সমাধিস্থ করেছিলেন।

এবং সেই সব লোকেরাই হয়তো একজনের হাত আর একজনের হাতের উপরে এমন ভাবে রেখেছিলেন, যাতে মনে হয় একজন অন্য জনের হাত ধরে আছেন।

তবে না, এঁদের সম্পর্কটা নিশ্চয়ই অসমবর্ণ ছিল না। কিংবা তখনকার রীতি অনুযায়ী এঁদের সম্পর্কটা মেনে নিতে না পেরে সমাজপতিদের বিধানে ইট-পাথর ছুড়ে তাঁদের হত্যা করা হয়নি। হলে নিশ্চয়ই এই দু’টি দেহকে তাঁরা কিছুতেই পাশাপাশি সমাধিস্থ করতে দিতেন না।

পরবর্তিকালে অবশ্য বোলগনা এবং মোডেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় প্রত্নতত্ত্ববিদেরা পরীক্ষা করে দেখেন, দু’টি কঙ্কালই পুরুষের।

দেড় হাজার বছরের পুরনো কঙ্কাল হওয়ায় গবেষকদের লিঙ্গ নির্ধারণে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। পরে অবশ্য উভয় কঙ্কালের ডেন্টাল এনামেল থেকে প্রোটিন বের করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে অবশ্য গবেষকেরা নিশ্চিত হন যে, কঙ্কাল দু‘টি পুরুষেরই।

গবেষকেরা বলেন, যদিও মোডেনা প্রেমিকদের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্কটা ঠিক কী ছিল, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, তবু প্রাপ্তবয়স্ক দুই পুরুষকে কেন ওই ভাবে একসঙ্গে সমাধিস্থ করা হল বা কেনই বা তাঁরা একে অন্যের হাত ধরে আছেন; তা সত্যিই কৌতূহলের বিষয়।

খননকার্যের সময়, মোডেনা প্রেমিকদের সমাধিস্থ কবরের আশপাশ থেকে আরও ১১টি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। সেই সব কঙ্কালের শরীর পরীক্ষা করে গবেষকেরা আঘাতের চিহ্নও খুঁজে পেয়েছেন। এবং সেই সময়ের ইতিহাস ঘেঁটে তাঁদের মনে হয়েছে, সম্ভবত যুদ্ধের সময় ওঁদের কবর দেওয়া হয়েছিল।

গবেষণার প্রধান ফেদেরিকো লুগলির মতে, এ রকম কোনও সমাধি এর আগে আমরা কোথাও খুঁজে পাইনি। অতীতে কয়েকটি সমাধি থেকে দম্পতির হাত ধরা কঙ্কাল অবশ্য মিলেছে; তবে সেই জুটির সকলেই ছিলেন একজন নারী আর অন্য‌ জন পুরুষ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পুরুষ দু’টি হয়তো একই দেশের হয়ে যুদ্ধ করছিলেন এবং যুদ্ধ চলাকালীনই একসঙ্গে তাঁরা মারা গিয়েছিলেন, আর যেহেতু তাঁরা একেবারে হরিহর আত্মা ছিলেন, তাই একই সমাধিতে তাঁদের কবর দেওয়া হয়েছিল।

না, যুদ্ধের সময় যেমন হয়, নিহত সৈনিকদের দেহ এক জায়গায় জড়ো করে একই কবরে গাদাগাদি করে তড়িঘড়ি কবর দেওয়া হয়, এখানে সেই ভাবে দু’টি মৃতদেহকে কিন্তু একসঙ্গে কবর দেওয়া হয়নি। যদি হতো, তা হলে দেহ দু’টির অবস্থান দেখেই সেটা বোঝা যেত এবং একজনের হাত অন্য জনের হাতে ধরা থাকত না।

তাঁদের মধ্যে নিশ্চয়ই একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। আর তাঁদের সেই নিবিড় বন্ধন যাতে মৃত্যুর পরেও চির অটুট থাকে, সেই কথা ভেবেই হয়তো সমাধিস্থ করতে আসা লোকেরা তাঁদের কবরে শোয়ানোর পরেই একজনের হাত আরেক জনের হাতের উপরে রেখে দিয়েছিলেন।

কারও কারও মতে অবশ‌্য, দু’টি ব্যক্তি হয়তো নিকট আত্মীয় কিংবা খুড়তুতো বা জেঠতুতো ভাই। সহোদর ভাইও হতে পারেন। তাই পারিবারিক বন্ধনের কারণেই এই ভাবে একই সমাধিতে তাঁদের সমাধিস্থ করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *