কবিতার রূপকল্প — পর্ব ৬ – সৌম্য ঘোষ

story and article

 বিদ্রোহী কবি : মধুসূদন দত্ত 

মধুসূদন দত্ত

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ( ১৮২৪–১৮৭৩) উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার এবং প্রহসন রচয়িতা। তাঁকে বাংলার নবজাগরণে সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব গণ্য করা হয় ।আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি। ২৫শে জানুয়ারি, ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ বংশ তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত এবং মাতা জাহ্নবীদেবী। তিনিই প্রথম জীবনে টিমোথি পেনপোয়েম ছদ্মনামে লিখতেন। যৌবনে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন । ফলে তাঁর পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। জীবনের দ্বিতীয় পর্বে তিনি মাতৃভাষার প্রতি আকৃষ্ট হন। বাংলা কবিতায় তিনি সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক । হিন্দু কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন সর্বশ্রী ভূদেব মুখোপাধ্যায় ,রাজনারায়ণ বসু ,গৌরদাস বসাক, প্যারীচরণ সরকার প্রভৃতি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র । তিনি বহু ভাষাবিদ। মাতৃভাষা ও ইংরেজি ছাড়াও ফারসি, ল্যাটিন, গ্রিক ,তেলেগু ,তামিল সহ মোট 12 টি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী ——- দ্য ক্যাপটিভ লেডি ,মেঘনাদবধ, শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী (নাটক) ,পদ্মাবতী (নাটক), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (প্রহসন), একেই বলে সভ্যতা (প্রহসন), তিলোত্তমাসম্ভব, বীরাঙ্গনা, ব্রজাঙ্গনা, চতুর্দশপদী কবিতাবলী, হেক্টর বধ ইত্যাদি ইত্যাদি।

উনিশ শতকে ইংরেজ শাসন ব্যবস্থা ও ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের ফলে বাঙালি জীবনে এক আলোড়ন দেখা দেয় এই আলোড়ন কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের সীমাবদ্ধ ছিল এই আলোড়ন এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ সুফল—– মাইকেল মধুসূদন দত্ত । তাঁর কাব্যে ছিল সেক্যুলার মনোভাব । তিনি ইহবাদী, যুক্তিবাদী এবং মানবতাবাদি । এই জীবন রসিক কবি ভোগবাদীও ছিলেন । মাইকেল মধুসূদন উনবিংশ শতাব্দীর গতিশীলতার প্রথম পূর্ণতম বিকাশ।

মিল্টন ভক্ত এই কবি শুরুতে ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন । ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজে অবস্থানকালীন তিনি রচনা করেন ” the captive ladie” , ” visions of the past”. ভারত হিতৈষী ড্রিংকওয়াটার বীটনের মাতৃ ভাষায় লেখা, “something higher and better” পড়ার পর তাঁর মধ্যে আত্ম অনুসন্ধান জাগায় । মধুকবি বুঝেছিলেন, মাতৃভাষায় চর্চা ও শ্রীবৃদ্ধি সাধন এর চেয়ে মহত্তর কিছু হয় না। বাংলায় তিনি প্রথম লিখেছিলেন নাটক । পদ্মাবতী নাটকের তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন করেন । সমগ্র পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় পরিচয় ছিল। হোমর, ভার্জিল,মিল্টন ,দান্তে ,টাসো প্রভৃতির রচনার সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয় ছিল। মধুকবি ভারতীয় ঐতিহ্য “grand mythology” – কে প্রাণবন্ত ভাবে উপস্থাপিত করেছিলেন।

আখ্যানকাব্য তিলোত্তমাসম্ভব তাঁর কবি জীবনের সূত্রপাত। তিলোত্তমা সৌন্দর্যের প্রতিমা আর এই রোমান্টিক কাব্যের ভাষা লালিত্য ও পেলব । তিনি বাংলা কাব্যজগতে প্রবর্তন করেন সাহিত্যিক মহাকাব্য ধারা। তাঁর মহৎ সৃষ্টি মেঘনাদবধ কাব্য রচনায় । উপাদান আহরণ করেছিলেন বাল্মিকী-কৃত্তিবাস থেকে। আর সামনে আদর্শ হিসেবে ছিল মিল্টনের ” The paradise lost” . সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত মন্থন করে মধুকবি মেঘনাদবধ কাব্য রচনায় হাত দিয়েছিলেন কিন্তু তাঁর অন্তঃশীল বাঙালি মনটি এই কাব্যে উজ্জ্বল ভাবে উপস্থিত । কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, এই কাব্যে একটা বিদ্রোহ আছে। তিনি মাইকেলকে বিদ্রোহী কবি আখ্যা দেন।

তাঁর পরবর্তী কাব্য ব্রজাঙ্গনা । ব্রজ নারী রাধা এখানে মানবী। Mrs. Radha. এই কাব্যে তিনি মিশিয়েছেন নিধুবাবু ,রাম বসু, হরি ঠাকুরের গানের ভাব ।

” কি কহিলি কহ , সই শুনি লো আবার–
মধুর বচন।
সহসা হইনু কালা, জু্ড়া এ প্রাণের জ্বালা
আর কি পোড়া প্রাণ পাবে সে রতন।
মধু যার মধু ধ্বনি কহে কেন কাঁদ, ধনি,
ভুলিতে কি পারো তোমা শ্রীমধুসূদন।”

তাঁর অসামান্য রচনা আত্মবিলাপ এবং জন্মভূমির প্রতি।

” সেই ধন্য নরকুলে,
লোকে যারে নাহি ভুলে,
মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন,—
কিন্তু কোন গুণ আছে,
যাচিব যে তব কাছে,
হেন অমরতা আমি কহ,গো , শ্যামা জন্মদে!

 Soumya Ghosh

এটি তাঁর প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত উচ্চারণ। তিনি মনে করতেন অমিত্রাক্ষর ছন্দে নাটক না লিখলে বাংলা নাটকের শ্রীবৃদ্ধি হবে না । পরবর্তীকালে তিনি লিখেছিলেন চতুর্দশপদী কবিতাবলী । সনেটের বাংলা নাম তিনি দিয়েছেন চতুর্দশপদী কবিতা। বাংলা সনেটের প্রবর্তক তিনি স্বয়ং। পেত্রার্ক ও মিল্টনের গঠনশৈলী কে আশ্রয় করে রচিত হয়েছে এইসব সনেট ।

” বিসর্জিব আজি, মাগো, বিস্মৃতির জলে
( হৃদয়-মন্ডপ, হায়, অন্ধকার করি !)
ও প্রতিমা! নিবাইল , দেখ , হোমানলে
মন:কুন্ডে অশ্রুধারা মনোদুঃখে ঝরি !…
এই বর, হে বরদে, মাগি শেষবারে,—-
জ্যোতির্ময় কর বঙ্গ ——- ভারত-রতনে !”

ফরাসি দেশে বসে মধুসূদন দুটি অনুবাদ করেছিলেন ঈশপের হিতোপদেশ অবলম্বনে ফরাসি লেখক লা ফঁতেনের কবিতার স্বাধীন অনুবাদ । এই নীতি গর্ভ কবিতা গুলি কোন কোনটির সঙ্গে লা ফঁতেনের সাদৃশ্য খুব ঘনিষ্ঠ। তাঁর “হেক্টর বধ ” Iliad কাব্যের অনুবাদ । এটি গ্রিক থেকে অনূদিত কিন্তু তরজমা নয় ।

মধুসূদনের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি যাকিছু রচনা করেছেন তাতেই নতুনত্ব এনেছেন। তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ বাংলা সাহিত্যে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেন। তখনকার বাংলা সাহিত্যে রচনার শৈলীগত এবং বিষয়ভাবনাগত যে আড়ষ্টতা ছিল, মধুসূদন তা অসাধারণ প্রতিভা ও দক্ষতাগুণে দূরীভূত করেন। ১৮৬০ সালে তিনি গ্রিক পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন পদ্মাবতী নাটক। এ নাটকেই তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার বরেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার এটাই প্রথম এবং এর ফলে তিনি বাংলা কাব্যকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারে এই সফলতা তাঁকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করে এবং এই ছন্দে একই বছর তিনি রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। পরের বছর ১৮৬১ সালে রামায়ণের কাহিনী নিয়ে একই ছন্দে তিনি রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি । এটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক মহাকাব্য। আর কোন রচনা না থাকলেও মধুসূদন এই একটি কাব্য লিখেই অমর হয়ে থাকতে পারতেন। এই কাব্যের মাধ্যমেই তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন এবং তাঁর নব আবিষ্কৃত অমিত্রাক্ষর ছন্দও বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। রামায়ণে বর্ণিত অধর্মাচারী, অত্যাচারী ও পাপী রাবণকে একজন দেশপ্রেমিক, বীর যোদ্ধা ও বিশাল শক্তির আধাররূপে চিত্রিত করে মধুসূদন উনিশ শতকের বাঙালির নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদা লাভ করেন। এক্ষেত্রে তিনি ভারতবাসীর চিরাচরিত বিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনে প্রকৃত সত্য সন্ধান ও দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বাংলা সাহিত্যে তা তুলনাহীন।

মধুসূদনের কাব্যে এক ধরনের নারীবিদ্রোহের সুর লক্ষ করা যায়। তাঁর কাব্যের নায়িকাদের মধ্য দিয়ে যেন যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত, অবহেলিত, আত্ম সুখ-দুঃখ প্রকাশে অনভ্যস্ত ও ভীত ভারতীয় নারীরা হঠাৎ আত্মসচেতন হয়ে জেগে ওঠে। তারা পুরুষের নিকট নিজেদের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ এবং কামনা-বাসনা প্রকাশে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। তাঁর বীরাঙ্গনা (১৮৬২) পত্রকাব্যের নায়িকাদের দিকে তাকালে এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে। এখানে জনা, কৈকেয়ী, তারা প্রমুখ পৌরাণিক নারী তাদের স্বামী বা প্রেমিকদের নিকট নিজেদের কামনা-বাসনা ও চাওয়া-পাওয়ার কথা নির্ভীকচিত্তে প্রকাশ করে। নারীচরিত্রে এরূপ দৃঢ়তার প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের আগে আর কারও রচনায় প্রত্যক্ষ করা যায় না। মধুসূদনের এ সময়কার অপর দুটি রচনা হলো কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১) ও ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১)। প্রথমটি রাজপুত উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত একটি বিয়োগান্তক নাটক এবং দ্বিতীয়টি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য। এ পর্বে মধুসূদন দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং কিছুদিন হিন্দু প্যাট্রিয়ট (১৮৬২) পত্রিকা সম্পাদনা করেন ।

২৯শে জুন, ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটিয়ে অমৃত ধামে যাত্রা করেন। মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে । কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোডের গ্রেভ ইয়ার্ডে বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা, সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক , বাংলা মায়ের অন্যতম মেধাবী ও কৃতি সন্তান চির শান্তিতে শায়িত আছেন।।

 Soumya Ghosh

লিখেছেন —– অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
চুঁচুড়া। হুগলী। প: বঙ্গ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *