উপন্যাস – জীবনহাটের কড়চা – সুদীপ ঘোষাল

জীবনহাটের কড়চা সুদীপ ঘোষাল

সুনীল বড় হয়েছে বন জঙ্গলের আদর পেয়ে । সুনীল জানে, মা মাঠের বাড়ির ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতেন অবসর সময়ে। মায়ের সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। মায়ের বাবার অফিসের মত ছুটি নেই। বিশ্রাম নেই। বৈকালিক ভ্রমণ নেই। বাবা অফিস থেকে এসেই জলখাবার খান। মা রান্নাঘরে। তারপর রাতের রান্নার ফাঁকে আমাকে পড়ানো।

সুনীল দেখে আর ভাবে, মায়ের কেন ছুটি নেই। মুখে হাসি নেই। বাবা পান থেকে চূণ খসলেই ধমকের সুরে মাকে বকেন। মাঝে মাঝে গায়ে হাত তোলেন। বাবা বলেন, আমার পিঠে দুটো নয় তিনটে তেচোখা মাছের মত চোখ আছে। তুমি পাশের বাড়ি ভূতটার সঙ্গে প্রেম করো। আমি সব দেখতে পাই। সুনীল বাবার পিঠে চোখ দেখতে পায় না। মা ছাদে উঠলে ঘন একরাশ আলো মায়ের চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ছাদ থেকে প্রতিবেশির সঙ্গে কথা বলে।

আজকে সুনীলের বাবা একটা চিঠি এনেছে। বিয়ের চিঠি। কলকাতার কাকুর মেয়ের বিয়ে। ঠিক হলো সুনীল আর বাবা যাবে। মা যাবে না। কারণ বাড়ি ফাঁকা থাকলে চোর আসে। সব কিছু চুরি করে।

সুনীল ভাবে, চোর মাকে চুরি করে নিয়ে যাবে না তো? আবার ভাবে বাবার সঙ্গে গেলে কলকাতা ঘোরা হবে। পড়া ফাঁকি দিয়ে মোবাইল ঘাঁটা হবে। তবু তার মায়ের জন্য মনখারাপ করে। কিন্তু একথা বলা যাবে না কাউকে।

তারপর আবোলতাবোল ছাইখেলার ছন্দে চলে এলো বিয়ের দিন। নকল পরিবেশে তিন চোখের রহস্যে সুনীলের মন একটু বিভ্রান্ত। বিয়েতে একটু আনন্দ হবে। পাঁচজনের মুখ দেখতে পাবে। এই মনে করে সে বাবার সঙ্গে চলে এলো কাকার মেয়ের বিয়েতে।

বিরাট অনুষ্ঠান। বড়লোক কাকার একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। শহরে এসে সুনীল বেশ খুশি। একদিন কলকাতা চিড়িয়াখানা দেখতে এলো বাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গে। বাবাও আছে। সুনীল শহরে ঘুরে কত জন্তু জানোয়ার দেখলো। তারা কত কষ্টের মধ্যে আছে। বাঘগুলো খাঁচার কাছে এসে থমকে যাচ্ছে। পাখিগুলো বোধহয় ওড়া ভুলে গেছে। সব জন্তুগুলোর মুখ কেমন গম্ভীর। সুনীলকে তোতা পাখিটা বোধহয় একবার বলে উঠলো, ছেড়ে দে আমাদের।ফিরিয়ে দে আমাদের আকাশ। কিন্ত সুনীলের তো অত ক্ষমতা নেই। মানুষকে খুশি করতে গিয়ে ওরা আকাশ, অরণ্যকে বন্দি বানায়। এমন আহাম্মকি বুদ্ধি মানুষ ছাড়া আর কারও নেই। সুনীল নিজের মনে বিড়বিড় করে। ছোটো থেকে বাবা মায়ের ঝগড়া দেখে বড় হওয়া ছেলেটা এতবড় মন কোথা থেকে পেলো। সুনীল ভাবে, সে কি পাগল। কই চিড়িয়াখানায় কারও তিনটে চোখ তো দেখা গেলো না। তাহলে বাবা কেন প্রায়ই এই কথা বলে।

তারপর সন্ধ্যা হলে সকলে বিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো সবাই। সুনীল ঘুরে বেড়ায় বাড়িময় । মায়ের মত মুখ খোঁজে।কাকিমার মেয়ে এসে বলে,এই সুনীল,এদিকে আয়।আমার কাছে বোস। কালকে আমার বিয়ে হয়ে যাবে। একটু কথা বলি তোর সঙ্গে। তোর কোন ক্লাস হোলো রে? আমি ভুলে গেছি।
সুনীল বলে, এবার ক্লাস এইট হবে।

তাহলে তুই এত বোকা হাবার মত চুপ করে থাকিস কেন?

আচ্ছা বলো তো দিদি, মানুষের তিন চোখ পিছনে হয়।

দিদি হেসে ওঠে। বলে,তুই এত বোকা কেন? এইটে পড়িস অথচ কি বোকা তুই। পিঠে কারও তিনচোখ হয় না। আর কাউকে জিজ্ঞেসও করবি না।
সুনীল কি করে বোঝায়,বাবার মুখ থেকে শোনা কথা কি করে মিথ্যা হয়। সে কিছু না বলে চুপ করে থাকে।

দিদি বলে, তুই আর ভাই মিলেমিশে থাকবি। তোরা দুইভাই আমার শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যাবি।
সুনীল বলে, যাবো।
সুনীল দেখে দিদির চোখে জল। দিদিকে ঠিক এখন মায়ের মত লাগছে। মায়ের চোখের জলও ঠিক এইরকম। সব মায়ের চোখের জল কি এইরকম হয়। হতেও পারে। মায়ের জাত তো।

একবার সুনীল গ্রামে বন্ধুর বাড়ি গেছিলো। সেখানেও সে তার মায়ের চোখে এইরকম জল টলটল করতে দেখেছিলো। চোখের জলের তো রঙ হয় না। তবু সুনীল একটা মিল খুঁজে পায়। আর কেউ পায় কি? সুনীল জানে না।

আজ বিয়ে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। কে কোথায় শোবে সব ব্যবস্থা হচ্ছে। পাড়ার প্রতিবেশীদের ঘর নেওয়া হয়েছে। কাছাকাছি সব বাড়ি। বেশ ভালো লাগছে সুনীলের। বাবাকে বেশি দেখতে পাচ্ছে না সে। হয়ত কাজে ব্যস্ত আছে।
সুনীলও মোবাইল নিয়ে গেম খেলে মাঝে মাঝে। চিড়িয়াখানার ছবিগুলো দেখে। কাকার ছেলে সন্তুকে দেখায়। সন্তুর আবার অনেক বন্ধু। মেগাসিটির ছেলে। বেশিক্ষণ এক জায়গার থাকে না। সে স্মার্ট। কথাবার্তা সুন্দর। অনেক বন্ধু। ছেলে মেয়েরা তাকে ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু সুনীল একা একা থাকতেই ভালোবাসে।
বেশি মাথা তার পছন্দ নয়। ভিড় এড়িয়ে চলাই তার মজ্জাগত অভ্যাস। একজন বললো,কি রে হাবাগোবার মত বসে আছিস কেন? যা খেলা কর। আনন্দ কর। কিন্তু সুনীলের খেলতে এখন ভালো লাগছে না। খেতেও ভালো লাগছে না। মা হয়ত খেতেও পাচ্ছে না আমার কথা মনে করে। মায়ের তো আর কেউ নেই, আমি ছাড়া। আমি মায়ের কাছে যাবো। সুনীল চঞ্চল হয়ে উঠলো।

রাত হয়ে গেলো। বর যাত্রীর বাস চলে গেলো। তবু প্যান্ডেল ভরতি লোকজন। কিন্তু সুনিল বাবাকে দেখতে পায় না। বাবা কোথায় গেলো। এবার তো শুয়ে ঘুমোতে হবে। সকালে উঠেই বাড়ি যেতে হবে। আর ভালো লাগছে না মাকে ছেড়ে। মাকে ছেড়ে সুনীলের এই প্রথম থাকা। গুটি গুটি পায়ে সুনীল বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে গেলো রায়বাড়ি। এই বাড়িতে তাদের শোয়া খাওয়ার ব্যবস্থা। ঘর খোলা।অন্ধকার ঘর। তবু পাশের বাড়ির জানালা গলে এক চিলতে আলো পড়েছে ঘরের মেঝেতে। একটা আলোছায়ার মত ঘরের মায়াময় অবস্থা। সুনীল দেখলো দুটো মানুষ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠগুলো আড়াআড়ি ভাবে আছে। ঠোঁটে ঠোঁট একবার লাগছে আবার খুলে যাচ্ছে। বাবাকে চিনতে পারা যাচ্ছে। আর ওটা কে? মাছ খাচ্ছে মনে হচ্ছে। এ নিশ্চয়ই মেছো পেত্নি। দুজনের কাপড় চোপড় এলোমেলো। বাবাকে ধরেছে, যাদু করেছে পেত্নীটা।পেত্নীটার বড় বড় মাথার চুল।দুধগুলো দুলছে বাতাবি লেবুর মত। সুনীল বাতাবি লেবু দেখেছে বাবুদের গোয়াল বাড়িতে।

দুজনের ঠোঁটে একটা করে, মোট দুটো তেচোখা মাছ। লালায় সাঁতার কাটছে। একবার এদিকে যাচ্ছে আর একবার ওদিকে। চুমু খাওয়ার সময় চোখ বন্ধ হয় কেন? সুনীল জানে না। ওদের দুজনের পিঠ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে দেখা যেতো দুজনেরই কি পিঠে তিনটে চোখ?

সুনীল দেখছে মেছো পেত্নীর গালের কষ বেয়ে বাবার দাবনার কাছে তিনচোখের মাঝখানে রক্ত পড়ছে টপ টপ করে। মোবাইল তার হাতে আছে। কিন্তু ছবি তুললেই ফ্ল্যাশ হবে। জেগে যাবে তিনচোখ। আর ভস্ম হয়ে যেতে পারে তার চোখ মুখ মন। তার থেকে এই মেছোপেত্নী তাড়াবার মন্ত্রটা বলি মনে মনে। মায়ের কাছে শোনা মন্ত্র।
‘খটাং খটাং খটাং, সাত ভুবনের জাহাজ খটাং। আসতে কাটে, যেতে কাটে, ছেদ কাটে, ভেদ কাটে। আমার বাবাকে যে করে হান , তার বুকে মারি শ্রীরামচন্দ্রের জলপড়া বাণ।’

সুনীল ভাবে, মাকে বাড়ি গিয়ে এই মেছো পেত্নী আর তিনচোখের কথা বলতেই হবে….

মাধব সকালে উঠেই পুরােনাে দিনের কথা ভাবতে ভাবতে দোকানের পাশের ছেলেটাকে বলছে, পোষোলা করতাম পৌষ মাসে। অজয় নদী যেখানে ‘এস’ এর বাঁক নিয়েছে ইংরেজি অক্ষরের মতো। সেখানে বন্ধু, বান্ধবী একসাথে পােষল্যা করতে যেতাম শীতকালে পৌষ মাসে। নদীতে চান করতাম। বাড়িতে নিষেধের বেড়া। বাঁধা গরু ছাড়া পেলে যখন পাগলের মতাে ছুটে ছুটে বেড়ায় স্বাধীনতার আনন্দে, ঠিক তেমনই আমরাও কী করবাে ভেবে পেতাম না। শুধু খেলা, ছােটা আর উল্টোপাল্টা চিৎকার চেঁচামেচিতে নদী উচ্ছল হতাে। প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে বারে বারে। এত খােলা জায়গা, এত আকাশ, নদী, জল আমরা সহজে তাে পাই না। তাই মুহর্তের আনন্দ আজও হৃদয়ে রং ধরায়, চোখ ভেজায় নব আনন্দে। স্মৃতি রােমন্থনেও অনেক সুখ। ছেলেটি বলল, ঠিক বলেছাে মাধবদা। বলেই পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মাধব দেখে দোকানের সামনে একগাদা ও। গতকাল চায়ের দোকান বন্ধ করে রাতে বাড়ি ফেরার সময় বুড়িদির পাঁদাড়ে একটা ছেলেকে মলত্যাগ করতে দেখে মাধব প্রতিবাদ করেছিল। হয়ত তারই কাজ এটা। না হতেও পারে। সে ভাবে। নির্মল ভারত অভিযানের একটা মিছিল আসছিলাে। সমবেত স্বরে সবাই বলছে, “মাঠে ঘাটে পায়খানা, মৃত্যুর পরােয়ানা”। কে শােনে এসব কথা। কিছু ছাই এনে গু ঢাকা দিয়ে সে কোদালের সাহায্যে দোকানের সামনেটা পরিষ্কার করল। তারপর ঝাপ খুলে জল এনে আঁচ ধরিয়ে দিল। মিছিলটা চলে গেল। উনুনে তেল ফুটছে। এবার তৈরি গােলা বেসনে মাখিয়ে ছাড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোকানে ভিড় হয়ে গেল। মাধবের চপ একবার যে খাবে তাকে আবার আসতে হবে। তারপর দোকানে পেয়ে যায় জনপ্রিয় পত্রিকা। তাছাড়া বিভিন্ন লেখকের লেখা নতুন নতুন বই রেখে দেয় চায়ের দোকানে। লােকে চা খায় আর তারিয়ে তারিয়ে উপভােগ করে সুকুমারবাবুর গল্প। দোয়েলের শিস, উত্তরকথা এই সব বই মাধব দোকানে রাখে সবার পড়ার জন্য। আশা তার লেখা কাব্যগ্রন্থ, ছাই হতে চাই, মাধব বার বার পড়ে। অন্য লােকেও পড়ে। এই ব্যবসার কায়দা। খদ্দের টানার ট্যাকটিক্স। আর তার ব্যবহার মানুষের একঞ্জা প দেখলাে গতকাল যে ছেলেটার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে সেও এসেছে। বসে কাম পড়ছে। গল্পের বইটার দিকে লােভী চোখে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি বলল, একটা কথা বলব। বল বল, তাড়াতাড়ি বল। দেখাে আমাদের তাে বাড়িতে পায়খানা নাই, তাই কাল… সকলে চলে যাওয়ার পর আমি বুড়িদির পাঁদারে মলত্যাগ করেছি বাধ্য হয়ে।
– আমার দোকানের সামনে অপকর্ম কে করল বল তাে?

-বলতে পারব না। আমি নই। তুমি কত ভালাে লোক। তােমাকে আমার খুব ভালাে লাগে।

-বেশ, পুরবােধিবাবুর সংগঠন সকলের উপকার করে থাকেন। তােরাও আবেদন কর। সমাজসেবি , পুরােবােধি বাবু, অসীম ডাক্তার, অজয় আচার্য আছেন। ঠিক পেয়ে যাবি। কােন অসুবিধার কথা অনিলদা, , অশােকাকে বলবি। ওরা সকলের উপকার করেন।
সমাজসেবী মানুষকে জানাতে পারেন। তাদের মিলিত সংগঠন সমাজে অনেক ভালো। কাজ করে থাকেন।

ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে চলে যাবার আগে বলল, একবার বইটা পড়ব। মাধব বলল, সে পড়তে হবে কিন্তু। জানিস তো ভাই, বউ আর বই বাইরে গেলে আর ফেরে এখানে বসে পড়তে হবে কিনা। ন। আমার দাদু বলতেন পুরােনাে প্রবাদ আর কি।। ঠিক আছে, আমি বসেই পড়ব। নিয়ে যাবাে না। ছেলেটি বসে বই পড়তে শুরু করল। একজন বলল, বই পড়াে ভালাে ভালাে। আর এখানে, সেখানে মলত্যাগ করাে কেন। ছেলেটি চুপ করে থাকলাে।। মাধব বলল, শুধু একা ওর দোষ নয়। একা কেউ সমস্যার সমাধান করতে পারে না। শুধ ও নয় সমস্ত জনগণকে সচেতন হতে হবে। সামান্য চপের দোকানের মালিক হয়ে সে স্বপ্ন দেখে, ছেলেদের জন্য সে স্কুল করেছে। কত ছেলে মেয়ে লেখাপড়া শিখছে। আর তার চোখের সামনে ভারতের সমস্ত ছেলেমেয়ে স্কুলের পথে পা বাড়িয়েছে। আর্থিক সঙ্কট চলছে। ঠিক একদিন আলাের পরশ পাবােই। এইসব ভাবতে ভাবতে মাধব ভাবুক হয়ে

ও মাধবদা তােমার চপ ছাড়াে। পােড়া গন্ধে আর ছেলেটার চিৎকারে গােবিন্দ সম্বিত

ফিরে পেল। দেখেছিস একটু অন্যমনস্ক হয়েছি আর ..
-দাও আমাদের চপ, মুড়ি দাও। আচ্ছা দাদা, তুমি কী এত চিন্তা করাে। মাঝে মাঝেই

-তুমি কেমন যেন হয়ে যাও। জানি না রে। কেন যে মনটা উড়ু উড়ু করে। কে জানে না ও কেন ওইরকম হয়ে যায়। সে বলে, কত অভুক্তজন একমুঠো ভাতের জন্য কাদে। তাদের কান্না আমার অন্তরে দুঃখের ঝড় তােলে।সে কেঁদে ফেলে। মাধবদা, তােমার চোখে জল কেন?
ও কিছু না, এই উনুনের ধোঁয়ায় এই রকম হয়েছে। খরিদ্দার সবাই চলে গেলে, ঠিক দুপুর একটার সময় চারজন ভিক্ষুক আসে। তাদের খাবারের জন্য টাকা পয়সা দিয়ে সে গান করতে করতে নিজের বাড়ি যায়। অনেকে তার নয়ায় খেয়ে, পরে বেঁচে আছে। কিন্ত মাধব খুশি নয়। আরও অনেক মানুষের সেবা করতে চায় সে।
তারপর বাড়ি গিয়ে দুপুরে স্নান, খাওয়া সারা হলে বিশ্রাম নিয়ে বিকেল চারটের সময়। আবার দোকান খােলে। এইভাবে বেশ চলে যায় দিনগুলাে। মাধবের বয়স বেড়ে যাটের দরজায় কড়া নাড়ে।মাধব গান জানে। তাই মন খারাপ হলেই সে গান করে। খরিদ্দারও আনন্দ পায়। সকলেই তাকে ভালােবাসে।
পানুহাটের আর দাঁইহাটের অনেক গরীব মানুষ দুপুরে খেতে যায়। কোনো পয়সা লাগে না। ওখানে বাবু, ভবরঞ্জন মাস্টারমশাই, আদিত্য কবিয়াল, সহ বিবেকানন্দ ডাক্তারবাবু, তাপসদা, জয়দেবদা, ভবদা, বিকাশদা, পল্লবদা, অনিলদা, প্রবীন আলােকদা, প্রলয়, দিলীপ দা ও আরও অনেকে ভবা পাগলার ভক্তরা ভবা পাগলা সেবা দেখাশােনা করেন। প্রত্যেক দিন প্রায় পাঁচশাে অভুক্ত লােক ওখানে খাওয়া দাওয়া করেন। সবাই খায় কিন্তু কার টাকায় এই ব্যবস্থা কেউ জানে না। জানে শুধুমাত্র কমিটির লােকজন। আজ রিপাের্টার এসেছেন। কমিটির লােকের কাছে জানতে চাইছেন, কার টাকায় এই সেবাশ্রম চলে বলুন তাে?সেক্রেটারি প্রবীরদা বললেন, মাধবদার টাকায় এই সেবাশ্রম চলে। তিনি চপ ও মুড়ি বিক্রি করেন। | রিপাের্টার যখন মাধবের চপের দোকানে গেলেন সে তখন চা দিতে দিতে গান ধরেছে, ও মন সওদাগর বিদেশে বাণিজ্যে এসে কেন বাধিস বসতঘর, দেশের মানুষ দেশে ফিরে চল | রিপাের্টার প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলেন, কবি অসীম সরকারের গান। খুব ভালাে করেন তাে আপনি। আপনি এতবড় সমাজ সেবক। সামান্য চপের দোকান থেকে আয় করে আপনি এই অসম্ভব কাজ কী করে করলেন। মাধব বলল, কোনাে কাজই, ইচ্ছা থাকলে, অসম্ভব নয়। শুধু প্রয়ােজন অদম্য ইচ্ছা শক্তি। আমি তিল তিল সঞ্চয়ে তাল করেছি। নিজের খরচ কম করে অর্থ বাঁচিয়েছি তিরিশ বছর। আমি যা সঞ্চয় করেছি আর লােকের কাছে পাওয়া অর্থ একত্র করে, আমি এই আশ্রম গড়ে তুলেছি। আমার জীবনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। আমি আজ খুব খুশি। কত মানুষ আমাকে এই কাজে সাহায্য করেন তার ইয়ত্তা নেই। রােজ আমার কাছে অনেক অনেক টাকা আসে সাহায্যবাবদ। সব টাকা ওই আশ্রমের নামেই সঞ্চিত হয়। আমার কিছুই নয়। সব মানুষের। ভববাবু, সুকুমারবাবুর মতাে কত লােক যে টাকা পয়সা দান করেন তার ইয়ত্তা নেই।এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলতে তার চোখে অশ্রুধারা। আনন্দের অশ্রু। জীবনের সবকিছু সকলের জন্য উজাড় করে নিঃস্ব হওয়ার আনন্দ একমাত্র দাতারাহ অন্তরে অনুভব করেন, সাংবাদিক গম্ভীর হয়ে বললেন। এতকিছু করেও মাধব কিন্তু নির্বিকার। এই সেবাশ্রমের কাজ সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ুক। আর স্বপ্ন দেখে ভারতমাতার সমস্ত সম্তান গরম ভাত খাচ্ছে পেট ভরে। শত শত সমাজ কর্মী এগিয়ে।সবুুজ ধানক্ষেতের ঢেউয়ে ফুটে উঠেছে ভারতের মানচিত্র। মাধব লাবাসে। সে দেখতে পায়, তরুণদের হাতে লাঙলের বোঁটা। তারা চাষ
আসছে দৃপ্ত পদক্ষেপে। সব স্বপ্ন দেখতে ভালােবাসে। সে একদিন এসে বলল, মাধবদা তােমাকে নিউ আপনজন ক্লাব’ পুরস্কৃত করবে। রঞ্জন একদিন এসে বল সয়ে বলল, কেন রে, কী করেছি আমি। আমি এখনও কিছু করিনি। তবে, সে গম্ভীর হয়ে বলল, কেন কিসের জন্য?

সে বলে, এ কথার কোনাে উত্তর হয় না, দাদা। কারণ সবাই জানে তুমি কী করেছে। ক্লাবের ছেলেরা এলে মাধব তাদের বলল, তােরা আমার সঙ্গে থাকিস তা হলেই হবে। মানুষের ভালাে করাই হােক আমাদের জীবনের ব্রত। সকলকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের সাহায্য নিয়ে গােবিন্দ পাশের গ্রামে গড়ে তুলল আর একটি সেবাশ্রম। তার নামও দিল ভবা পাগলা সেবাশ্রম। এমনি করে সদিচ্ছার জোরে দশটি আশ্রম আজ চলছে মাধবের দয়ায়। মানুষ আজ জাতিবিদ্বেষ ভুলে গিয়ে মানুষের সেবায় নিয়ােজিত। পরশ পাথরের পরশে আজ অনেক তরুণ দীক্ষা নিয়েছে মানব সেবার ব্রতে।। বাংলার সরকার সেবা মনােভাবের স্বীকৃতি স্বরূপ মাধবকে সম্মানিত করতে চায়। আনন্দ সংবাদটা সবাই মাধবকে জানাতে গিয়ে জানতে পারল, সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে রাস্তায়। অসংখ্য, আরও অনেক অভাবী মানুষের পাশে তার হৃদয় কুসুম ফোটানাের আশায়।.

এদিকে অজয় তীরে নেমে এলো সন্ধ্যা চারিদিকে সন্ধ্যার অন্ধকারে প্রকৃতি ছিল ঢাকা। কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখা যায় আকাশের তারা, অগুন্তি তারা। তবু তার মধ্যেই চলে সময় প্রবাহ। আবার সকাল হয়। কলরবে মেতে যায়,গ্রাম। আর পাশের এলাকার গুমটিতে পুরুলিয়া মুসলমানের বসতি কম। তবু কেতুগ্রাম রাউন্দী এলাকায় মুসলমান বসতি আছে। বিভিন্ন গ্রামের মুসলমান পাইকার আসে। তারা ভুলকুড়ি, দক্ষিণ দিকে কোপা, কোমডাঙ্গা গ্রাম থেকে গরু ছাগল নিয়ে কেনাবেচা করে। এদিকে প্রবাহিত হয় অজয় নদ সময়ের তালে তালে।

ফলে হিন্দু মুসলমান আত্মীয়-স্বজন এখানে। মুসলিম পাড়ার নদের জল মিলিত হয় হিন্দু পাড়ার নদের জলে। তারা একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার সম্পর্কে।

খুব সুন্দর পরিবেশে বড় হয়েছে নুর আলি । আর স্বপনও নুর আলির বন্ধু।

বাবার সঙ্গে ছোট থেকেই নুর আর স্বপন নিজেদের চাষের জমিতে যেত এবং চাষবাস দেখাশোনা করত। মধ্যবিত্ত পরিবার। অভাব থাকলেও সংসার চলে যায় কোন রকমে তাদের।

সকালে মাঠে যাওয়ার পথে পা দিতেই স্বপনে ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে গিয়ে চনমনে লাগে ঘড়িতে তখন বিকেল চারটে সমস্ত গ্রামটা যেন নিষ্পাপ শিশুর মত লাগে।

স্বপন হালদার বয়স 25। গ্রাজুয়েট হয়েছে হাওড়া নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে। টিউশানি করে চুটিয়ে।

গ্রামে থেকে চাষবাস দেখাশোনা করা, টিউশনি করা তার পেশা। বাবা মারা গেছেন দু বছর আগে বাড়িতে মার ছোট ভাই আছে।

স্বপনের অনেক বন্ধুর মধ্যে কেতুগ্রামের নুর আলি অন্যতম প্রধান বন্ধু। বাড়ি আসে আবার সময় পেলে ওদের বাড়ি যায় স্বপন। আসলে নুর আলির বাবার বন্ধু ছিলেন স্বপনের বাবা। এইভাবে হিন্দু-মুসলমানের পরিবার বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।

কবি নজরুল লিখেছিলেন, “আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান।”

স্বপন আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে মাঠে গিয়েছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি গান গাইতে গাইতে। ” যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু এ জীবনে” গাইতে গাইতে যাচ্ছিল!

হঠাৎ মর্নিং ওয়াক করতে যাওয়া যদু মাস্টারের 19 বছরের মেয়ে তনুর সঙ্গে দেখা।
সে বলল স্বপনদা মাঠে যাচ্ছ আজ একবার আমাদের বাড়িতে যেও ইংরেজিটা দেখিয়ে দেবে। বাড়িতে বাবা আছেন।

বেগুনি আর মুড়ি খেতে খেতে স্বপন আর তনু কথা বলছিল। পাশের ঘরে তনুর বাবা-মা জানে ওদের প্রেমের কথা।

ওদের দুই পরিবারের মধ্যে মিলনে কোন বাধা নেই। সকালে মুড়ি খাওয়ার পর হাত ধুয়ে তনু সামনে বসল বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে পনেরোই কার্তিক মাস। নদীর জলে ভরা ঢেউ লাগলো, কেঁপে উঠলো শরীর বাঁশি।

দুজনেই বিয়ের আগেই মিলনের অপূর্ব স্বাদ মিটিয়ে নিল।
বিধাতার খেলা। কখন যে কার কি হয় কেউ বলতে পারে না।

সেদিনের সেই ঘটনার পরে স্বপন চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা সেরে ফেলতে। কারণ সাবধানতা অবলম্বন না করায় মা হওয়ার লক্ষন প্রকাশ পেল তনুর দেহে।

বিয়ে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তনুর দাদু মরে যাওয়ায় বিয়ের দিন ঠিক হল এক বছর পরে।

এদিকে তো চিন্তায় পরলো স্বপন আর তনু।

স্বপন খুব ভোরে মাঠে গিয়েছে।
নিজে গিয়ে জমিতে আল বেধেছে। অভ্যাস নেই।
তবুও চেষ্টা করছে ।

ঠিকই কিন্তু মুনিষ দিয়ে বেশিরভাগই কাজ করায়।

কিন্তু ওর ইচ্ছে সব কিছু নিজে চাষ করে ফসল ফলানো।
তার মজাই আলাদা।

একমাত্র কৃষক ছাড়া কেউ তা অনুভব করতে পারে না।

কৃষকের জয় হোক।

ছাত্রদের এই বাণী স্বপন শেখায়।

আল বেঁধে দেওয়ার সময় হঠাৎ কি করে কি যেন একটা কামড়ে দিলো স্বপনের আঙুলে। খুব জ্বালা করছে রক্ত পড়ছে। শব্দ না করে কেতুগ্রাম হাসপাতালে গেল স্বপন সাইকেলে চেপে। সাইকেল চালাল নুর। সে পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল।

কিন্তু কেতুগ্রামে সাপে কাটা রোগীর কোন চিকিৎসা হয় না। সেখানে সাপে কামড়ানোর ওষুধ নেই যদি পাওয়া যেত ভালো হতো। তা শোনা মাত্রই তাকে ভ্যানে করে কাটোয়া হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই সে পথে মরে গেল বোধহয়, নুর আপনমনে বলল। সিওর হল হাসপাতালে গিয়ে।

ডাক্তারবাবু তাকে দেখে মৃত ঘোষণা করল।

মানুষ ভাবে এক আর হয় অন্যরকম তনু এই খবরে খুব ভেঙে পড়ল গর্ভে সন্তান আর বিয়ের আগেই স্বপন তাদের ছেড়ে চলে গেল।

খুব রাগ আর অভিমান হল স্বপনের উপর একটা আম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে লাগল ঘন্টার পর ঘন্টা বাড়ি আর ফিরে যাবে না সে আত্মহত্যা করায় ঠিক করলো সে।

কুমারী গর্ভবতী। যদিও সে জানে কুমারী গর্ভবতী সুপ্রিমকোর্টের এক রায়ে, সন্তানের একমাত্র অভিভাবিকা হতে পারে। তবু মন এখনো পুরোপুরি সংস্কারমুক্ত নয় মানুষের।
তাই সে শিবলুনে ট্রেন ধরল। কাটোয়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে কাটোয়া গঙ্গার ধারে এল।

কিন্তু গঙ্গার ঘাটে দিনের আলোয় অনেক মানুষের আনাগোনা।

তাই সে অন্ধকার হওয়ার জন্য বসে প্রতীক্ষা করতে লাগল। আর চিন্তা করতে লাগল, স্বপ্নে ভালোবাসার কথা, কত ভালোবাসতো তাকে।

সে আদরে সোহাগে ভরে তুলেছিল অন্ততর। অল্প সময়ে চলে যাবে বলে হয়তো এত তাড়া ছিল। ভাল লোকের স্বর্গীেও প্রয়োজন হয়।

তাই ঈশ্বর বোধহয় ভালো লোককে বেশিদিন পৃথিবীতে রাখতে চান না কিন্তু কি দায়িত্বজ্ঞানহীন এর মত চলে গেল সে, তনু বিড়বিড় করে পাগলের মত।

এসব চিন্তা করতে করতে তনু ঘুমিয়ে পড়েছিল ক্ষুধায় ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে।

হঠাৎ যখন ঘুম ভাঙলো দেখল নুরআলি সামনে দাঁড়িয়ে। চোখে অশ্রু এসেছিল।
নুর বাজার করতে এসে দেখে তনুকে।

আর গঙ্গার ধারে ওর এক আত্মীয় বাড়িতে দেখা করে করে একটু বেড়াতে এসছিল এদিকে। তাই দেখা হল,
এই মুহূর্তে।।

বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করতে লাগল নুর কিন্তু কিছুতেই রাজি নয় তনু। সে লাফ দিতে চেষ্টা করছে গঙ্গায়। অবশেষে বাধ্য হয়ে থাপ্পড় দিল তনুর গালে, নুর।

তনু নিজে মা হতে চলেছে,এই খবর নুরকে জানাল।

নুর বলল তুমি যদি রাজি থাকো তাহলে আমি তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

তবু বলল আমি যে মা হতে চলেছি।

তখনই আমার এক বন্ধু রাজি হবে আশা করি।
সমস্ত সংবাদ জানিয়ে তনুর বাবাকে একটা ফোন করল।
তনু বলল, আমি কাউকে ঠকাতে পারব না।
নুর বলল,তাহলে আমি স্বইচ্ছায় ঠকতে রাজী।
চল আজ আমরা বহরমপুরে যাব। ঘরভাড়া নেব। সংসার করব চুটিয়ে।
আজ থেকে তুমি আমার স্ত্রী হলে। তনু বলল, এটা কি করে সম্ভব। তুমি ভাল ছেলে। আমার কলঙ্ক তুমি বইবে কেন?
নুর বলল, এ কলঙ্ক কালো নয়। আমি তোমার মধ্যে আলোর বিজুলি দেখেছি। তুমি মা হও স্বপনের স্বপ্ন পূরণ কর।
তনু ভাব আকাশে দেখল, নুর আলি আর বংশীধারি একসাথে পাশাপাশি তার সাথে ছাতা ধরে চলেছে কঠিন জীবনের চড়াই উৎরাই পথে…

আমাদের বিয়ের পরে তারাপীঠে প্রণাম করে এলাম দুজনে। আমার স্ত্রী আমাকে বললেন, মায়ের কাছে ঘোরা তো বারোমাসের ব্যাপার। চল, এবার দূরে কোথাও হনিমুনে যাই।
আমি বললাম, ঠিক আছে সামনের মাসে পূর্ণিমাতে হনিমুন হবে আমাদের। স্ত্রী খুব খুশি। নতুন বৌয়ের আদর সেই সুবাদে পেলাম খুব। আমি খুঁজে খুঁজে সবকিছু ঠিক করে রেখেছি। প্রেজেন্টেশন কি ভাবে করব তার প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছি। আদরে সমাদরে চলে এল বহু প্রতিক্ষিত পূর্ণিমারাত।
রাতে বৌ বলল,তুমি যে বললে পূর্ণিমাতে আমাকে হনিমুনে নিয়ে যাবে। সারাদিন চলে গেল কই এখনও তার প্রস্তুতি দেখছি না।

আমি বললাম, রাত তো বাকি। তুমি সেজে নাও। বৌ খুশি হয়ে সেজে নিল। তারপর আমি ব্যাগ নিয়ে ওর হাত ধরে বললাম, চল তো একবার ছাদ থেকে ঘুরে আসি।
– কেন গো, ছাদে কি হবে?
– চলোই না, গিয়ে দেখবে।
আমার জেতার জেদে বৌকে নিয়ে ছাদে উঠলাম। বৌ বলল, বলো কি বলবে।
আমি ভাল করে শয্যা পাতলাম। তারপর দুজনে বসলাম তার উপর। বৌ বলল,বল তাড়াতাড়ি বল। কি যে কর, দেরী হয়ে যাবে তো।
আমি বললাম, দেখ চাঁদের আলোর বন্যায় কেমন জগত মায়াবী হয়ে উঠেছে। তোমাকেও চাঁদের মত লাগছে। তুমিও আমার চাঁদ।
তারপর ব্যাগ থেকে ডাবরের একটা মধু মানে হানির শিশি বের করে বৌয়ের ঠোঁটে দিলাম। বললাম, এই হল হানি আর অই আকাশের মুন। তাহলে হানিমুন হল তো?
বৌ ও কম যায় না। বলল,আমি জানতাম তুমি যাবে না কোথাও। কেবল দৌড়টা দেখলাম। আমি বললাম, বাড়ির কাছে শিশিরবিন্দু আমরা ঠিকমত দেখি না। একটু তাকিয়ে দেখ বাইরের জগতের থেকে আপন জগতের সৌন্দর্য বেশি।
বৌ হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ল আমাকে জড়িয়ে।
আমাদের জ্যোৎস্না রাতের ঘরে রোজ দুজনে দুজনের দেহে আলো মাখাই হানিমুনের। মন জুড়ে ক্যাপসিক্যামের আদর।আলুপোস্ত আর মুগের ডালে রসনা তৃপ্ত।ঝাল লাগলে জলের স্নেহ মাখি…
ওপাড়ে যে কুটীর দেখা যায় গোলাপ ঘেরা।তার পাশ দিয়ে বয়ে চলে ছোট নদী।শ্রমিকের ঘাম ধুয়ে দেয় উদার কুলুকুলু স্রোত। ওটাই আমাদের শীতল আশ্রয়ের আদর
সবুজ মনে মাঠে কাজ শেষে ফেরে যখন,ঈশানীর হাওয়ায় দোলে প্রতিক্ষারত চাঁদমুখ, খুশির হাওয়ায় জেগে ওঠে রাঙা সূর্যের রোদ…চন্দ্রাবলীর পরিশ্রমের ঘাম চেটেপুটে খায়
খিদের পাতে। একেবারে হানিমুন হয় নি তাও না।

পরের দিন রোদের ভালবাসার আদর গায়ে মেখে সস্ত্রিক উইকেন্ডসে আমরা এসেছি এখানে ভালোবাসার টানে। বহুবছরের ঋণ মনে হয় জমা হয়ে আছে এই খোলা মাঠের মায়ায়।স্ত্রী বলল, তুমি হানিমুনে এসে কবি হয়ে গেলে। স্ত্রীর নাম সোমা, সে বলল,এটা আমার দূরে যাওয়া না হলেও আফটার অল হানিমুনে আসতে পেরে ভালো লাগছে খুব।
সোমা আমাকে বলল,সিঙ্গি হল বাংলার প্রাচীন গ্রাম। এই গ্রামেরই নদী পুকুর খাল বিল জলাশয় সব আছে। ফসল বিলাসী হওয়ার গন্ধ আছে সিঙ্গীর মাটির উর্বরতায় ফুলে ফলে ফসলের সুন্দর গ্রাম।
বাংলার সব পাখিরা কমবেশি সিঙ্গীর আকাশে বাতাসে ঘুরপাক খায়। তিনি বিখ্যাত করেছেন ইতিহাসে স্থান করে দিয়েছেন।কবি কাশীরাম দাস সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন মহাভারতের কাহিনী। এই মহাপুরুষের জন্মভিটার সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা দিনে তাঁর ভিটাতে দাঁড়িয়ে তাঁকে শ্রদ্ধাসংগীত শোনাতে পারি। তারপর অনেকটা হেঁটে গিয়ে দাসপাড়া পেরিয়ে গিয়ে বটবৃক্ষের তলায় দাঁড়ালাম উদাস হয়ে। এই স্থানের মাটি কপালে বুলিয়ে নিলাম একবার। সবাইকে ক্ষেত্রপালের মন্দির নিয়ে গেল। ক্ষেত্রপাল বটবৃক্ষের নিচে অবস্থিত। তারপরে রাস্তা দিয়ে গিয়ে সোজা শিব মন্দির।
এখন পাকা রাস্তা হয়ে গেছে বুড়ো শিবের মন্দির যেতে। আমি বললাম, ছোটবেলায় আমাদের কোপা গ্রামে মাটির রাস্তা ধরে ধুলোমেখে ঘরে ঢুকতাম। বর্ষাকালে এক হাঁটু কাদা হয়ে যেত। গোরুর গাড়ি ছাড়া কিছুই যান ছিল না। আর ছিল পাল্কি। গ্রামের ছেলেমেয়ের বিয়ে হলেই শুনতাম পাল্কির গান।

রাতে খেয়েদেয়ে সোমা ও আমি আবার চাঁদের আকাশে।
তার পরের গল্প ডুব দিয়েছে জ্যোৎস্না সাগরে…

.

কমলের স্ত্রী সকলের সঙ্গে কথা বলতে ভালবাসে। তার মধ্যে সরলতা আছে। কমল বার বার তাকে সাবধান করে। বলে সংসার কিন্তু তোমার মত সরল নয়। সকলকে বিশ্বাস করবে না।কমলের স্ত্রী আদৃজা বলে, ওইরকম মন নিয়ে সমাজে চলা যায় না। ছেলেদের সঙ্গে কথা বললেই তোমার রাগ হয়। এটা কিন্তু তোমার চরিত্রগত একটা দোষ।
কমল আর কথা বাড়ায় না। দিন চলে জলের স্রোতের মত। কমল ভালোবেসে ফেলে এক বিধবা রমণী রমাকে। রমা কমলের অফিসের ক্যাশিয়ার। অনেকদিনের পরিচয়। রমা বেশ সুন্দরী। নিজে চারচাকা গাড়ি নিয়ে ড্রাইভ করে অফিসে আসে। চোখে সানগ্লাস। এই চল্লিশের কোঠায় তার দেহ টানটান। যেকোন ছেলে তার প্রেমে পড়তে বাধ্য। কিন্তু প্রেম তো বলেকয়ে আসে না। হঠাৎ আসে হুড়মুড়িয়ে। তখন কিছুই করার থাকে না। কমলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। রমার হৃদয়ে বাঁধা পড়লো তার মন। রমা তার গাড়িতে কমলকে নিয়ে অফিসফেরতা প্রথমে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। গল্পগুজব করে। খাওয়া দাওয়া করে। তারপর কমল নিজের বাড়ি যায়।
কমলের স্ত্রী বলে, কয়েকমাস ধরে তোমার অফিস থেকে আসতে দেখছি দেরি হচ্ছে।
কমল বলে, হ্যাঁ একটা বন্ধুর বাড়ি যাই। তারপর খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি আসি।
– তাহলে সন্ধ্যার খাবার বাড়িতে খাবে না তো কোনদিন।
– না সন্ধ্যার খাবারটা খেয়েই আসি। আর তাছাড়া অফিসের কাজে অনেক রাত অবধি মাঝে মাঝে কাজ পরে যায়। দু এক রাত বাড়ি না আসতেও পারি। মোবাইলে ফোন করে জানিয়ে দেব। তুমি চিন্তা কোরো না।
আদৃজা কেমন যেন হয়ে গেল এই কয়েকমাসে। আর আগের মত বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলে না। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সে।একদিন
আদৃজা বলে, তুমি সত্যি করে বলো। কাল রাতে কোথায় ছিলে?
– আমি রমার কাছে ছিলাম
– সে আবার কে?
– আমাদের অফিসের ক্যাশিয়ার
– তাহলেও ও তো মেয়ে। রাতে থাকলে কেন?
– আমি ওকে ভালবাসি।
আদৃজার মাথার ওপর আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বিষ খেলো। তার ছেলেরা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে কোনওরকমে তাকে বাঁচিয়ে আনলো। কমল বললো, আমার অনেক টাকা খরচ হয়ে গেলো। তুমি বিষ খেতে গেলে কেন। আমি রমাকে ছাড়তে পারব না। ও আমাকে আরও উন্নত পথে নিয়ে যাবে। ও খারাপ মেয়ে নয়।
আদৃজা বুঝতে পারলো আর স্বামীকে ফেরানো যাবে না রমার খপ্পর থেকে। আদৃজা কমলকে বললো, তোমার মনে এই ছিলো। কেন আমার মধ্যে কি নেই যা রমার মধ্যে পাও।
কমল বললো, মন আর চিন্তার পার্থক্য।রমা আমাকে স্মার্ট করে তুলেছে। আমি এখন গাড়ি চালাতে পারি, কবিতা লিখতে পারি। কিন্তু তোমার সঙ্গে থাকলে কোনওদিন আমার প্রতিভার স্ফুরণ হত না। আমি রমাকে ভালোবাসি।
এইভাবেই সময় কাটে। শেষে কমলের বয়স বাড়ে আর বাড়ে তার শরীরের রোগ। সে আর আগের মত সবল নয়। বিছানায় সময় কাটে বেশি। অসুস্থ হয়ে পড়ে প্রচন্ড। এদিকে রমা মোবাইলে খবর নেয় কিন্তু অফিসের কাজের চাপে সে ব্যস্ত থাকে। আর সময় থাকলেও কমলের বাড়ি সে আসতে পারে না লজ্জায়। কমল এখন তার স্ত্রী আদৃজার ওপর নির্ভরশীল। আদৃজা স্বামীর সেবা করে দিনরাত। তারপর কমল একদিন সুস্থ হয় স্ত্রীর যত্নে।
কমল বলে, প্রকৃত প্রেম কি তা বুঝতে আমার অনেক সময় পেরিয়ে গেলো গো…

রমা কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। এতদিন কমল কোমল কমল চিবিয়ে ছিবড়ে করে স্ত্রী দরদি হয়ে উঠবে একথা রমা মানতেই পারে নি। কমলকে ফোন করে, তোমার শরীর তো একটু সুস্থ হয়েছে, আমার সঙ্গে রাতে দেখা কোরো।
কমল ভিডিও কলটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করলো। এখনি আদৃজা চলে আসতে পারে। শুনতে পেলে আবার অশান্তি হবে। কিন্তু না। আদৃজা আর কলহ করে না। সবটাই ছেড়ে দিয়েছে সে সময়ের হাতে। আদৃজার মনের জোর আগের থেকে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। একটা ভীষণ ভারি বোঝা তার মাথা থেকে নেমে গেছে চিরদিনের মত। সে স্বামীকে বলে, চলো তোমার রমার সঙ্গে একদিন দেখা করি দুজনে।
– তাহলে একদিন রবিবার দেখে তিনজনে বেড়াতে যাবো মুকুটমণিপুরে। সেখানে তোমার সঙ্গে পরিচয়ও হবে আবার ঘোরাও হবে।
কমল চাইছিলো এই সুযোগে দুজনের ভিতর একটা সেতু তৈরি করতে। এই সেতু দুজনের মনের দূরত্ব কমিয়ে আনবে। মিলিয়ে দেবে মিলনসেতুর আকারে। কিন্তু একজন নারী কি কখনও ভুলেও তার স্বামীকে অপরের হাতে চিরকালের মত ছেড়ে দিতে চায়। কমল জানে না। তবু একবার ট্রাই করতে চায় তার মন।
মুকুটমণিপুরে গিয়ে স্মার্ট রমা কমলের বউকে আপন করে নেয়। আদৃজারও ভালো লেগে যায় রমাকে। সে ভাবে সত্যি রমা তো খুব ভালো মেয়ে। হয়ত বিধবা হওয়ার জন্য পরকীয়ায় বাঁধা পড়েছে। দেহেরও তো একটা দাবি আছে। আদৃজা কেমন যেন মায়ায় আচ্ছাদিত হয়ে যায় রমার আদরে আর ভালোবাসায়। তাহলে পুরুষতো বশ হবেই রমার প্রেমে। রমার প্রেম আর পারিজাত ফুলের পরশ কি একইরকম। আদৃজার নারীত্ব ফুটে ওঠে পদ্মফুলের মত।

আদৃজা ভাবে, এখন সে কি করবে। দুই সতীনের ঘর করবে, নাকি রমাকে সটান একচড় কশাবে।কিন্তু চড় মারার তো কারণ চাই। রমা তো একটাও কটু কথা বলে নি। শুধু একটা হাহাকার তার অন্তরজুড়ে, এটা আদৃজা লক্ষ্য করেছে বারবার। কমল ভাবে, নারীদের তৃতীয় নয়ন আছে। ওরা সবকিছু বুঝতে পারে তান্ত্রিক সাধকের মত।

আদৃজা খেই হারিয়ে ফেলে। মনে হয় মুকুটমণিপুরের পাহাড়ের একটা বড় পাথর ভারি হয়ে নেমে আসে তার বুকে। একটা চাপা অনুভূতি। রমা এসে সে পাথর সরিয়ে দেয়। রমা বলে, স্বামীকে চোখে চোখে আগলিয়ে রেখো। তোমাকে আমি স্মার্ট করে গড়ে তুলব। তুমি আসবে তো আমার বাড়ি।তুমি তো এমনিতেই সুন্দরী। শুধু প্রয়োজন একটু বাগানের মালির মত আদরে ক্যাকটাসের যত্ন নেওয়া।
তারপর আদৃজা এক অমোঘ আকর্ষণে রমার বাড়ি যায়। আসা যাওয়া সহজ হয়ে যায় মানুষের বিচিত্র মনের মত গতিময় আবেশে।
এখন আদৃজা স্কুটি চালায়। ডায়েট মেইনটেন করে। আদৃজার কোমর দেখে কমলের মনে হয় একটা হিলহিলে সাপ কেমন জড়িয়ে রয়েছে তার শরীরজুড়ে। কমলের ছোবল দিতে ইচ্ছে হয় আদৃজার ঠোঁট বরাবর মাঝখান দিয়ে নেমে একেবারে মাঝ নদীর গভীরতায়। রমার যত্নে সে স্বামীর চোখের মণি হয়ে উঠছে দিন দিন। আদৃজা বলে, এ তে তোমার স্বার্থ কি।আমি সুন্দরী,স্মার্ট হলে কমল তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে তো। প্রেম বিফলে যাবে।
রমা বলে, সবকিছুতে এখন স্বার্থ দেখলে হবে।সব প্রেম শরীর চায় না। মনের পরশেও ফুটে ওঠে আত্মার শক্তি। সে প্রেম তো আর ছেলেখেলা নয় যে ঠুনকো আঘাতে ঝরে পড়বে বাইরে।আর তাছাড়া নিজের হাতে গড়ে, দুনিয়া পাল্টে ফেলার তো একটা আলাদা আনন্দ আছে গো সুন্দরী…

অনিল আর বিমল একই স্কুলের শিক্ষক। একই স্কুলে চাকরি করার দরুণ তারা দুজনে একসঙ্গে স্কুলে যায় মোটর সাইকেলে। একটা মোটর সাইকেলে চেপে যায়। বিমল চালায় আর অনিল পিছনে বসে থাকে। বিমল গাড়ি চালানোর সময় মাঝে মাঝে ঢুলতে থাকে। গাড়ির গতি কমে যায়। অনিল মিটার রিডিং এ দেখে কাঁটা কুড়ির ঘরে নেমে গেছে। অনিল বিমলের পিঠে হাত বুলোয় তাকে জাগানোর জন্য। অনিল জানে, কলিগরা কখনও বন্ধু হয় না। হলেও কোটিতে গুটি। বিমল পিঠে হাত দিলে অসন্তুষ্ট হয়। বিমল একবার অনিলকে বলেছিলো, কেউ আমার গায়ে হাত দিলে খুব খারাপ লাগে। এখন বিমল মোটর সাইকেল চালানোর সময় ঘুমিয়ে গেলেও গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে সাহস করে না। মনে পড়ে যায় বিমলের কথা। গায়ে হাত দিলে তার ভালো লাগে না। একদিন মোটর সাইকেল একটা উঁচু মাটির ঢিপির ওপর উঠে গিয়ে থমকে গেল। বিমল কিছুক্ষণ দুদিকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে নিল। তারপর পিছনে গাড়িটা সরিয়ে এনে আবার রাস্তায় নেমে এল। অনিল জানে এ এক ভীষণ বাজে রোগ। বিমলের রোগের স্বীকার। অনিলের ডাক্তার বন্ধু সব শুনে বললেন, স্লিপ অ্যাপনিয়া হলে ঠিকঠাক ঘুমের পরও ক্লান্তিভাব আসে। এই অসুখে প্রবল নাক ডাকার সঙ্গে শ্বাস বন্ধ হয়ে মাঝেমধ্যে ঘুম নষ্ট হয়। ভাঙা ভাঙা ঘুম। ফলে কম ঘুম গোটা দিনের জন্য ক্লান্তিতে ভরিয়ে তোলে। তোর কলিগেরও এই অবস্থা হয়েছে। হয়ত অনেক রাত অবধি পড়ে। হয়ত কোনো ডিপ্রেশন কমানোর ওষুধ খায়। তাহলে সারাদিন ঢুলুনি ভাব থাকবে। খুব সাবধান কিন্তু। অনিল বলে, আমি সাবধান হয়ে কি করব। গাড়ির চালককে বুঝতে হবে কারণ তার উপরেই নির্ভর করছে দুটি প্রাণ। অনিলের ডাক্তার বন্ধু আর কিছু না বলে চিন্তিত হয়ে হাঁটতে শুরু করলেন হাসপাতালের দিকে। অনিল বাড়ি এল। তার স্ত্রীকেও এই কথাটা বলল। স্ত্রী বললেন, রোগ হলে তো কিছু করার নেই। আমার মামার এই রোগ আছে। একবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছিলো মামার, এই ঢুলুনি রোগের জন্য। তোমার ভয় লাগলে ওর সঙ্গ ছেড়ে দাও। অনিল বললো, না গো লোকটা খুব ভালো। আমার কাছে কোনো টাকা পয়সাও নেয় না তেল খরচের। আমি চাইছি দুজনে একসঙ্গে ট্রেনে যাওয়া আসা করলে বেশ হয়। কিন্তু বিমল বলে, ট্রেনে গেলে স্কুল পৌঁছতে দেরি হবে। বদনাম হবে লেট হলে রোজ।
অগত্যা অনিল প্রাণ হাতে করে বিমলের সঙ্গেই যায়। কিছুতেই ওর সঙ্গ ছাড়তে মন চায় না। বিমল ফোন করে ডেকে নেয় রোজ। কেমন একটা আকর্ষণে জড়িয়ে গেছে অনিল। হয়ত এটাই বন্ধুত্ব। অনিল ভাবে, ভালো সঙ্গ পাওয়া দুস্কর। তাই তার সঙ্গ সে ছাড়তে চায় না।
অনিল আর বিমল আজ স্কুলে যাচ্ছে। বিমলে সেই একইভাবে ঢুলতে শুরু করলো। অনিল বললো, এত বুদ্ধিমান লোক হয়ে আপনি গাড়ি চালানোর সময় ঘুমুচ্ছেন। বিমল বলে, না না। কত কাজ জানেন সারাদিন। মা বাবা দুজনে বয়স্ক লোক। তাদের দেখাশুনা করি। মেয়ে ও মেয়ের মা স্কুলে চলে যায়। তারপরে আমি বের হই। অনিল বলে, মেয়ের মা স্কুলে যায় কেন? বিমল বলেন, ও একটা স্কুলের টীচার। সারাদিন বাবা, মা একা। রাত হয়ে যায় শুতে। কি বলব আপনাকে অনিলদা। কিছু বলার নেই।
অনিল আর কিছু বলতে পারে না। সবটাই ছেড়ে দেয় ঈশ্বরের হাতে। যা হয় হবে। আর কি করব। এই ভেবে সেও চোখ বন্ধ করে থাকে।
এখন বিমল স্পিডে গাড়ি চালায় আর তারই ফাঁকে ঘুমিয়ে নেয়। মাঝে মাঝে হ্যান্ডেল কাঁপে। অনিল ভাবে এ তো বেশ চালাকি শুরু করেছে। ও মনে করছে জোরে গাড়ি চালালে হয়ত বুঝতে পারবে না অনিল। অনিল একদিন বলেই ফেললো বিমলকে, আপনি এইভাবে গাড়ি চালান। পুলিশ দেখলে কিন্তু পেটাবে। আর তাছাড়া আমরা দুজনেই তো সোজা নিমতলার শ্মশানে চলে যাবো।বিমল বললো, না না। কিছু হবে না। তবে আমি একবার প্যারাডাইস লজের কাছে পরে গেছিলাম গাড়ি নিয়ে। হাত, পা ছিঁড়ে গেছিলো। বাড়িতে বলি নি। বললে আর গাড়ি চালাতে দেবে না। অনিল বললো, বিমলবাবু আপনি এভাবে গাড়ি চালাবেন না প্লিজ। তারপর দুদিন খুব ভালোভাবে তারা স্কুলে গেলো। কিন্তু তারপর থেকে সেই একই অবস্থা। আবার ঢুলুনি। গাড়ি চলছে কম গতিতে।এক একবার গাড়ি রাস্তার পাশে খালে পড়ছে তো আবার উঠছে উঁচু স্থানে। অনিল ভাবে, ভারি মুস্কিল তো। মানুষের কোনো হাত থাকে না কিছু কিছু জায়গায়। সেখানে অজানা অদৃশ্য এক চালক ঠিক করে মানুষের আগামী জীবনের গন্তব্য ।

একবার আমরা সপরিবারে পুত্র কন্যাসহ দার্জিলিং এর তিনচুলে(৫০০০ফুট) গিয়েছিলাম।প্রচন্ড ঠান্ডা।
আমরা একটা কমদামি লজে আশ্রয় নিলাম।তিনচুলে ও ছোটোমাঙ্গোয়ার মধ্যবর্তি পথ বেশ বিপজ্জনক।ছোটা মাঙ্গোয়ারা দৃশ্য মোহিত করে দেয় মন।একদিকে দার্জিলিং, কালিম্পং অন্যদিকে সিকিম।শালিক পাখি আর কমলালেবুর বাগান চোখে পড়ার মত। সকালবেলার কুয়াশা কাটতেই বেলা বারোটা বেজে যায়।

আমি কোনোদিন ভগবানের অস্ত্বিত্বে বিশ্বাস করতাম না। সবাই আমাকে নাস্তিক বলেই জানতো। কিন্তু ভগবান না থাকলে তো, ভূতেরও অস্তিত্ব নেই। এই তিনচুলে এসে সে বিশ্বাস আমার ভঙ্গ হয়েছিলো।বলছি সে ঘটনা। বিশ্বাস নাও করতে পারেন।

আমি আর আমার এক বন্ধুর পরিবার এখানে লজে আছি। পোশাক আরও প্রয়োজন ছিলো। ঠান্ডা যে এত বেড়ে যাবে এই ধারণাটা ছিলো না। একদিন আমি আর আমার বন্ধুটি রাতে ঘুরতে বেড়িয়ে দেখি এক স্কন্ধকাটা লোক আমাদের আগে আগে চলেছে। বন্ধুটি ভয়ে বু বু করছে। আমি বললাম, চুপ। ভয় পাস না। কেউ হয়তো আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। আমি কথাটা বলামাত্র পুরো শরীরটা লোকটা পাহাড়ের উপর থেকে নিচে ভাসিয়ে দিলো। লোকটা নিচে পড়ছে। প্রায় কয়েক হাজার ফুট নিচে। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম লোকটা লাফিয়ে পড়লো নির্দ্বিধায়। দেখে আমাদের পিলে চমকে উঠলো। বন্ধুটি বললো, চল লজে ফিরে যাই। আমিও বললাম,সেই ভালো। আর ঘোরার শখ নেই।
তারপর লজের দিকে পা বাড়ালাম। ও মা, হঠাৎ ধূমকেতুর মত স্কন্ধকাটা আবার আগে আগে চলতে লাগলো।বন্ধু বললো,এখনি তো লাফিয়ে নিচে পড়লো। আবার কি করে উপরে এলো। আমি বললাম,ওরা সব পারে। উড়তেও পারে। বন্ধুটি বললো,ওরা মানে , ওরা কে? আমি বললাম, বোঝো না কেন? ওরা হলো অশরীরী। আমরা যাকে ভূত বলি। ভীত বন্ধুটি অজ্ঞান হয়ে গেলো। আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে লোক জড়ো হলো। আমাদের গাইড বললো আপনি রাতে বেড়িয়েছেন? ভালো। রাত এগারোটার পর আপনাদের বেরোতে বারণ করেছিলাম। আমার কথা শুনলেন না। এখন চলুন লজে যাই।

মাথায় জল দিলে বন্ধুটি জ্ঞান ফিরে পেলো। আমরা সানাই লজে, সবাই এক ঘরে বসলাম। সকলে আমাদের ঘটনা শুনে ভয় পেলো। গাইড বললো,ভয় পাবেন না। আজ পর্যন্ত কোনো লোকের ক্ষতি হয় নি। শুনুন এই ভূতের একটি মর্মান্তিক ঘটনা আছে।

একবার নব দম্পতি বেড়াতে এসেছিলো। মধুচন্দ্রিমা, বিয়ের পরে আনন্দ ভ্রমণ। আর তাদের সঙ্গে এসেছিলো ছেলেটার বন্ধু। বেশ চলছিলো আনন্দের ফোয়ারা। কিন্তু বাদ সাধলো এক বিকেলের ঘটনা।
বর ছেলেটি, চা আনতে গেছে সামনের দোকানে। একটু দেরী হয়েছে। চল্লিশ মিনিটের মত। তারপর ফিরে এসে দেখে, তার বৌ, বন্ধুর সঙ্গে বিছানায় মধুচন্দ্রিমায় রত। আর বন্ধুট বলে চলেছে বিয়ের আগের সম্পর্কের কথা। বর ছুটে গিয়ে নিজের বৌকে ধরে মারতে মারতে দরজার বাইরে বের করে দেয়। তারপর নিজে দরজা বন্ধ করে বন্ধুর সঙ্গে অনেকক্ষণ বাগ বিতন্ডা করে। মারামারও চলে।

তারপর সেইদিন রাতে প্রেমিক বন্ধুটি তার প্রতিদ্বন্ধি বন্ধুটিকে চিরতরে সরিয়ে দিলো।
আমি বললাম,কি ভাবে?
গাইড বললো,মাথা কেটে দিয়েছিলো , তারপর বডিটা পাহাড় থেকে ছুড়ে ফেলে পালিয়ে গেছিলো দুজনেই। আজ পর্যন্ত পুলিশ তাদের খোঁজ পায় নি।
তারপর থেকে প্রতি রাতে এই লজে কেউ এলেই গলাকাটা অই ভূতটি দেখে নেয় কে এসেছে তার লজে। একবার এক নব দম্পতীর সঙ্গে এক বন্ধু এসেছিলো। বন্ধুটির দেহ পরের দিন পাওয়া গেলো পাহাড়ের নিচে মৃত অবস্থায়।

তারপর থেকে লজের মালিক, পরিবার ও তার সন্তান থাকলে তবেই ভাড়া দেয়। আপনার বন্ধুটিকে দেখে হয়তো মারার পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্তু আপনার বন্ধুর স্ত্রীও কন্যা থাকায় রক্ষা পেলেন । পরিবার সঙ্গে থাকলে কোনো ক্ষতি হয় না।হয় নি আজ পর্যন্ত।

এই গল্প শুনে আমরা আর ওখানে থাকার সাহস করলাম না। পালিয়ে এলাম প্রাণ নিয়ে…

লতিকা স্বামীকে ডেকে বললো, শোনো আমি বাজারে যাচ্ছি। তারপর ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে যাবো। আমার দেরি হবে আসতে।
স্বামী জয় বলে, ঠিক আছে। যাও।

জয় চাকরী করে একটা বেসরকারি কারখানায়। লোহার রড তৈরি হয়। ছুটি বুধবার। আর এই একটা ছুটির দিনে জয় আর বাইরে বেরোতে চায় না। নিজের পছন্দ গাছ লাগানো। তাছাড়া বাড়ির উঠোনে ঘাস, জঙ্গল পরিষ্কার করতেই তার দিন কেটে যায়। আর লতিকা এই সুযোগে বাজার করা, বিল দেওয়া সব বাইরের কাজ সেরে নেয়।

যখন জয় চাকরী পায় নি, তখন ছাত্র পড়িয়ে তার রোজগার হতো মোটা টাকা। সবটা খরচ না করে সে জমিয়ে রাখতো নিজের অ্যাকাউন্টে। বরাবর স্বাধীনচেতা ছেলে। কাউকে নিষেধের বেড়ায় রাখতে তার মন সায় দিতো না। গ্র্যাজুয়েট হবার আগে অবধি মেয়েদের সাথে কথা বলতে তার শরীর ভয়ে কাঁপতো। তার কারণ আছে।

তখন কলেজর পড়ে। হিরু বলেএকট ছেলে ভালোবাসতো অনিতাকে। অনিতা আল্ট্রামডার্ণ মেয়ে। স্কুটি চালিয়ে কলেজে আসতো। আর পোশাকে ছিলো খোলামেলা মেজাজের পরিচয়। হিরু কালো সাদাসিধা একজন শহরের ছেলে। আমাদের বন্ধু বান্ধব অনেকে আড়াল থেকে অনিতাকে দেখতো কিন্তু সামনে গিয়ে কথা বলতে পারতো না। কিন্তু হিরু পারতো। ওদের দুজনের কলেজে নাম হয়েছিলো, ওথেলো, দেসদিমোনা।জয়ের মনে পরছে, কলেজে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে

একদিন হিরু বললো, অনিতা, চলো সিনেমা দেখতে যাই। অনিতা রাজি হলো। হিরু আমাদের সকলকে যেতে বললো। আমরা সবাই অবাক। মলয় বলছে, কার মুখ দেখে উঠেছিলা। অসীম বললো, অনিতার সাথে সিনেমা। এই সুযোগ মিস করা যাবে না। ওদের পাল্লায় পড়ে জয় গিয়েছিলাো। হাওড়ার পুস্পশ্রী হলে। ভিতরে অন্ধকার, হিরু আর অনিতা সামনে এগিয়ে বসলো। জয়রা পিছনে।ওরা দেখলো ওরা সিনেমা দেখা বাদ দিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে বসে। আলো আঁধারিতে এর বেশি কিছু দেখতে পাইনি জয়।

তারপর একমাস হিরু ও অনিতাকে দেখতে পাই নি জয়।

লতিকা বাজারে গেছে। জয় বাড়িতে একা। মেয়ে স্কুলে গেছে। জয় বিছানায় গা এলিয়ে কলেজ জীবনের কথা ভাবছে। ঘন্টা খানেক হয়ে গেলো। লতিকা বাজারে গেছে।
জয় ভাবছে,আমার
নিজের মনের আয়নায় হিরুর ছবি।
অসীম একদিন আমাকে নিয়ে সুরে্ন্দ্রনাথ কলেজে গেছে। হিরুর সঙ্গে দেখা। অসীম বললো, কি ব্যাপার হিরু তোরা আর কলেজে যাস না। কেমন আছিস। এখানেই বা কি করছিস। হিরু নোংরা জামা প্যান্ট পরে কলেজের সামনে ফুটপাতে বসে আছে। আমরা তো নরসিংহ কলেজে পড়ি। আজকে কাজ আছে বলে এই কলেজে আসা।

আমি হিরুকে জিজ্ঞাসা করলাম, বল কিছু বল।
হিরু অন্ধকার মুখ তুলে বললো, জীবন শেষ। অনিতা বিয়ে করে আমেরিকা চলে গেছে।

হাতে হিরুর সাদা কাগজে মশলা পুড়ছে। ধোঁয়াটা নাক দিয়ে টেনে নিচ্ছে।

তুই হেরোইনের নেশায় জীবন শেষ করিস না হিরু। বললো, অসীম। আমি বললাম কি করে জানলি তুই,যে ওটা নেশার জিনিস।
—- আমি আমাদের পাড়ায়একজনকে ওই নেশায় মরতে দেখেছি। তখন সকলের আলোচনায় বুঝেছি নেশার মারাত্মক প্রভাব
হিরুকে নিষেধ করতে হবে।

মুখ ঘুরিয়ে দেখা গেলো হিরু পাগলের মতো ছুটছে। একটা দোতলা বাসে চেপে পড়লো হিরু। তারপর ওর দেখা আর কোনোদিন পাইনি। নাটক শুরুতেই শেষের বাজনা বাজিয়ে অনিতা মহাসুখে ঘর করছে বিদেশে।
জয় ভাবছে, আর নিজের মনের সঙ্গে কথা বলে চলেছে।
পরে শুনেছিলো জয় চিরকালের মতো হিরু তাদের ছেড়ে চলে গেছে অচিন দেশে।সেই থেকে জয় মেয়েদের একটু এড়িয়ে চলতো ভয়ে। ভালোবাসার ভয়ে…।

আবার জয়, যার পাল্লায় পরেছে তার কবে যে পরিবর্তন হবে কে জানে। মনে মনে ভাবে অসীমের কথা, জানিস শতকরা আশি ভাগ মানুষ ভালো। তা না হলে পৃথিবী অচল হয়ে পরবে। সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে। আশি শতাংশ মানুষ সৎ মানুষ।

লতিকা বাজারে গেছে দুঘন্টা হয়ে গেছে। এর মধ্যে মেয়ে রুমা চলে এসেছে। মেয়ে বলছে, বাবা, আমি আজ স্কুলে যাবো না।
— ঠিক আছে, তোর মা আসুক বলবি।
—- তুমি একটু বলে দিও
—-বেশ বলে দেবো।

সংসারে কে যে কখন কোন রোলে অভিনয় শুরু করে দেয় বোঝা মুস্কিল। লতিকা সব ব্যাপারে স্বাধীন। তবু সবাইকে বলে বেড়ায়, জয় স্বামী হয়েও তাকে সন্দেহ করে।

জয় সব জানে, শোনে। কিন্তু ঝগড়া এড়িয়ে যায়। সংসারে যার সাথে সব সময় থাকতে হবে তার সাথে ঝগড়া করতে ভালো লাগতো না। তারপর মেয়ে বড়ো হয়েছে।

জয়ের মনে পরছে,তখন বিয়ে হয়েছে এক বছরও হয়নি। লতিকা বাপের বাড়িতে গেছে।
জয় দেখা করতে গিয়ে দেখে, লতিকা ঘরে কার সঙ্গে কথা বলছে। অন্ধকার ঘর। শ্বশুর, শ্বাশুড়ি অন্য ঘরে। জয় আর শ্বশুর বাড়িতে ঢোকে নি। লোকজন ডেকে এনে দেখে, দুজনে বিছানায় শুয়ে গল্প করছে। তারপর অনেক জল গড়িয়ে গেছে কিন্তু লতিকার স্বভাবের পরিবর্তন হয় নি। পরপুরুষের সঙ্গে বিছানায় গল্প করার অনুমোদন সেদিন গ্রামের লোকে দেয়নি। তার বেশি অসভ্য কথা ভাবতে জয়ের রুচিতে বাধে।

লতিকা এখনও মেয়েকে বাড়িতে রেখে প্রতিবেশিদের বাড়িতে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে। পুরুষ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে তার বেশি ভালোলাগে। জয় বাধা দিয়েছে অনেকবার। কিন্তু ও কাজে ব্যস্ত থাকে। বেশি কিছু বলতে পারে না।

মেয়ে বড়ো হয়েছে। এবার তারও শখ আছে, আহ্লাদ আছে। মেয়ে বলে, বাবা আমি কার্তিক লড়াই দেখতে কাটোয়া যাবো। জয় বলেছিলো, নিশ্চয় যাবে।কার্তিক লড়াই দেখতে মেয়েটা কাটোয়া মামার বাড়ি চলে গেলো।

জয় বলছে, মেয়েটা নেই বাড়িটা ফাঁকা লাগছে। লতিকা বলে, বড়ো হয়েছে। পঁচিশ বছরের হলো। এবার বিয়ে দিয়ে দাও।
জয় বললো, তোমার তো অনেক জানা শোনা। সবাইকে বলে দেখতে পারো।

জয়ের মেয়ে রুমা বাবার মতো হয়েছে। সে সাদা সিধা। কোনোরকম চালাকি তার মধ্যে নেই। কার্তিক লড়াই দেখতে গিয়ে অনি র সঙ্গে তার প্রেম হয়েছে।অনিকে তার খুব ভালো লেগেছে। সে তাকে বিয়ে করতে চায়।রুমা বাড়ি এসেই বাবাকে বলছে,বাবা কাটোয়ার অনি বলে একটি ছেলেকে আমার ভালো লেগেছে।আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।
—- ঠিক আছে তোর মাকে বলবো।

জয় রাজি। ছেলে স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু লতিকা বলছে, আমি যেখানে ছেলে দেখেছি তাদের বড়ো ব্যাবসা। অল্টো গাড়ি আছে। ওখানেই বিয়ে হবে।কিন্তু মেয়ে বেঁকে বসেছে।

বেশ কয়েকদিন ধরে মেয়ের বিয়ে নিয়ে অশান্তি হচ্ছে জয়ের বাড়িতে।

জয় বললো, খুব স্পর্শকাতর ব্যাপার, একটু সাবধানে ম্যানেজ করবে,যদি কিছু করে বসে।
লতিকা বললো, যা করে করবে। আমি ওই ছেলের সাথেই বিয়ের ব্যবস্থা করবো।

যে ছেলেটিকে রুমা ভালোবাসে সে একটা বেসরকারি ফার্মের মালিক । তার নাম হারু। অপরের বিপদে আপদে এক ডাকে সকলে হারুর হেল্প পেয়ে থাকে। বন্ধুরা সকলেই হারুর বিয়ের ব্যবস্থা শুরু করে দিয়েছে। হারুর বন্ধুর লিষ্টে পুলিশ অফিসার থেকে আরম্ভ করে অল্টো গাড়ির মালিক লিপিকার পছন্দ করা জামাই অবধি আছে। হারু এখনও রুমার মায়ের অপছন্দের কথা জানে না। সমাজসেবার জন্য অনেক বড়ো বড়ো পুরস্কার হারু পেয়েছে। পুরস্কারের টাকাও সমাজসেবার কাজে লাগায়। কত বেকার ছেলে তার দয়ায় কাজ করে খায় তার হিসাব রাখে না হারু। মায়ের হারাধন ওরফে হারু রত্নধন হয়ে সমাজের ভালো কাজ করে।

রুমার মন খুব খারাপ। সাত আটদিন হারুর সাথে দেখা হয় নি। কিছুতেই মা রাজী হচ্ছে না। সে ভাবছে, বেঁচে থেকে লাভ নেই। কিন্তু বাবা আছে। তাকে কেন দুঃখ দেবো, এই কথা ভেবে সবকিছু ঈশ্বরের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিলো নিজের ভবিষ্যৎ ।

এদিকে হারু ভাবছে, রুমা কেন দেখা করছে না। মোবাইলে অন্য কথা বলে এড়িয়ে যাচ্ছে।
হয়তো লজ্জা পাচ্ছে। বিয়ের দিন ঠিক হবে তাই।লাজুক হয় ভদ্র স্বভাবের মেয়েরা।

বন্ধুরা বলছে, হয়, হয় এরকম হয়। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। হঠাৎ ওরা খবর পেলো অল্টো গাড়ির মালিকটি রোড অ্যাক্সিডেন্ট করে রাস্তায় পরে আছে। সঙ্গে সঙ্গে হারু বন্ধু বান্ধব ডেকে চলে গেলো স্পটে। এখন রাত সাতটা বাজে। মহুকুমা হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হলো। সে যাত্রা বেঁচে গেলো সে।

রুমার মা লতিকা এসেছে রুমাকে সঙ্গে করে,আহতকে দেখতে। তারা ফলমূল নিয়ে এসেছে। মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখে,হারু তার বন্ধুদের নিয়ে বসে আছে। পুলিশএসেছে। লিপিকা শুনছে, পুলিশ জিজ্ঞাসা করছে, গাড়ির মালিক কে? শুয়ে শুয়ে আহত ছেলেটি বলছে,হারু সরকার। পুলিশ বলছে, তিনি কোথায়?

হারু হাত তুলে বললো,এই যে স্যার আমি।
পুলিশটি বললেন, ও আপনি। সমাজসেবক নামেই আপনাকে চিনি। নমস্কার নেবেন।আজকে আপনার নাম জেনে খুশি হলাম। নো প্রবলেম।
—-কি যে বলেন। মানুষ হয়ে মানুষেরএকটু সেবা করার চেষ্টা করি বন্ধুদের নিয়ে। এরাই আমার সব।
পুলিশ তাদের কাজ করে চলে গেলো।

লতিকা সব শুনেছে। হারুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, তোমার মা রত্নগর্ভা। তোমার জন্যই অনেকে প্রাণ ফিরে পায়। রুমা দেখলো ওর মায়ের চোখটা জলে চিক চিক করছে। তারপর লিপিকা ফলমূল হারুর হাতে দিয়ে বললো,বাবা তোমার মা বাবাকে ব’লো আমরা দেখা করবো। হারু ঘাড় নেড়ে সায় দিলো।রুমার হাল্কা হাসিতে হারু নিশ্চিন্ত হলো।

সারা রাস্তা লতিকা মেয়ের সাথে কথা বলতে পারেনি লজ্জায়। বাড়িতে আসার পথে পরশমণির স্পর্শে রঙ পালটানোর খেলা দেখছিলো শরতের আকাশে, লিপিকা। আলোর লিপি আজ থেকে তার আকাশে রঙের আলপনা, সত্য, সুন্দরের ছবি এঁকে দিলো।

ঘরে ঢুকেই লতিকাকা এই প্রথম স্বামীকে একটা প্রণাম করে ফেললো প্রসন্নমনে

লিলুয়ার পটুয়াপাড়ায় আমরা ঘরভাড়া নিয়ে থাকতাম বাবার চাকরিসূত্রে।ভাড়া বাড়ির সামনে একটা কুলগাছ ছিল। টালির চাল। তখন চোর ডাকাতের উপদ্রব ছিল খুব। আমার বাবা সন্ধে হলেই দরজা জানলা বন্ধ করে দিতেন। আমরা চার ভাই। কিন্তু বড়দা গ্রামের বাড়িতে কাকাবাবুর কাছে থাকতেন। বাবার কাছে থাকতাম আমরা তিনভাই। বিশ্বকর্মা পুজোতে ঘুড়ি ওড়াতাম। দোলে রঙ মাখতাম উল্লাসে। তখন আকাশ এত খোলা ছিল, পুকুর ছিল। শীতকালে পুকুরের জল শুকিয়ে গেলে আমরা মাঠ তৈরি করে খেলতাম। ঝুড়ি, কোদাল নিয়ে পুকুরের তলা সমান করে ক্রিকেট খেলার পিচ বানাতাম। কবাডির কোর্ট বানাতাম দাগ দিয়ে। সকালে ছুটির দিনে কবাডি খেলতাম ছেলেমেয়ে একসাথে। একটা মেয়ের তনু নাম ছিল।তার সঙ্গে আমি কবাডি খেলতে পারতাম না। কত বন্ধু। তাদের সঙ্গে পড়াশুনোয় চলত কম্পিটিশন। কিন্তু বাইরে বন্ধু। বিকেলে ক্রিকেট খেলতাম। শটিবনের জঙ্গল ছিল পুকুরের পাড়জুড়ে। সেখানে লুকোচুরি খেলতাম।
সৈকত তার স্কুলবেলায় বিজ্ঞানের স্যারকে খুব ভালবাসত। সৈকতের অন্য বন্ধুরা বলত পাগলা স্যার। সৈকতের খুব রাগ হত। সে বলত, এইরকম পাগল হাজার হাজার প্রয়োজন আমাদের শিক্ষার জন্য।বিজ্ঞান স্যারের নাম ছিল পাই স্যার। মার্চ মাসে বিজ্ঞানী আইন স্টাইনের জন্ম। এই বিজ্ঞানীর জন্মদিনে খুব মজা করে বিজ্ঞান বোঝাতেন স্যার। তিনি একবার বলেছিলেন, ছোটবেলায় আমরা সৌরজগতের গ্রহগুলো কে সূর্যের থেকে কত দূরে শিখেছিলাম। পৃথিবীর থেকে সূর্য পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে। কিন্তু মুশকিল হল এই‘পনেরো কোটি কিলোমিটার’–টা কতদূর তার ধারণা আছে নাকি আমাদের? তোমার স্কুল আর মামার বাড়ির দূরত্ব কত, বলতো সৈকত।
সৈকত বলল, স্যার তিন’কিলোমিটার হেঁটে স্কুল যেতে মিনিট কুড়ি লাগে। একশো কিলোমিটার দূরে মামার বাড়ি যেতে বাসে ঘন্টাখানেক লেগে যায়। অমর বলল, আমার মামা দিল্লিতে থাকেন। কলকাতা থেকে দিল্লীর দূরত্ব দেড় হাজার কিলোমিটার – প্লেনে যেতে লাগে ঘন্টা দেড়েক কি দুয়েক। স্যার বললেন,তাহলে দেখ, এই একশোকিলোমিটার বা দেড় হাজার কিলোমিটার দূরত্বের সাথে আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে একটা সম্পর্ক তৈরি হল। কিন্তু পনের কোটি?সেটা কত বড় সংখ্যা তা বুঝি নাকি? সুতরাং, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব আমাদের কাছে একটা মুখস্থ করার সংখ্যা হিসেবেই রয়েগেল, অনুভূতি বা‘ইনটুইশন’–এ সাথে যুক্ত হল না। আবার এই দূরত্বের সাপেক্ষে পৃথিবী কত বড়, সূর্যই বা কত বড়, তাও মনের মধ্যে ছবি হয়ে রইল না!এই ধরণের নতুন তথ্যকে আমাদের অনুভূতির সাথে যুক্ত করা যায় অনেকভাবে। যেমন, একটা উড়োজাহাজ যার কলকাতা থেকে দিল্লী যেতে এক-দেড় ঘন্টা লাগে, তার কতক্ষণ লাগবে একই বেগে পৃথিবী থেকে সূর্য যেতে? উত্তরটা সহজেই দূরত্বকে গতিবেগ দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যাবে – প্রায় সতের বছর! আবার ব্যাপারটাকে অন্যভাবেও ভাবা যায়। ধরা যাক, পৃথিবীর সাইজ একখানা পাঁচ সেন্টিমিটার ব্যাসের রাজভোগ কি রসগোল্লার মত। তাহলে এই স্কেলে সূর্য কত বড় আর কত দূরে হবে? অমর বলল,অঙ্কটা চট করে কষতে পারব ঐকিক নিয়ম লাগিয়ে।স্যার বললেন, হ্যাঁ পৃথিবীর ব্যাস মোটামুটি ১২,৮০০ কিলোমিটার,সেটাকে ছোট করে ৫ সেন্টিমিটার করে নাও। তাহলে পনেরো কোটি কিলোমিটার হবে ‘৫ সেন্টিমিটার X ১৫ কোটি / ১২,৮০০’ সমান প্রায় ৬০০ মিটার। এবার কিন্তু সৌরজগত সম্বন্ধে আমাদের একটা ধারণা তৈরি হল। মনে মনে একটা ছবি বানিয়ে নিলাম যে আমার টেবিলের উপরের রসগোল্লাটা পৃথিবী, আর মিনিট পাঁচ–ছয় হেঁটে গেলে সূর্যকে পাব। কিন্তু সূর্য তো বিন্দু নয়! তার ব্যাস প্রায় চোদ্দ লাখ কিলোমিটার। তাহলে আবার ঐকিক নিয়মে দেখে নেব যে আমাদের উদাহরণে সূর্য হবে প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটার মানে মোটামুটি একখানা বড়সড় ঘরের মত। ঘরের মত চৌকো নয় অবশ্য, মোটামুটি গোলাকার।এইভাবে তিনি বিজ্ঞান বোঝাতেন সহজ করে। তারপর যখন বারো ক্লাসে পড়ি তখন স্যার একবার স্কুল ল্যাবরেটরিতে ক্লাস নিলেন। স্যার সিরিয়াস হয়ে পড়াচ্ছেন। প্রায় কুড়ি মিনিট পরে ক্লাসে সকলেই হাসতে শুরু করেছে। সৈকত ও তার বন্ধুরা তো হাসছেই। তার সঙ্গে হাসছেন, পাই স্যার।আমরা অবাক হয়ে হাসছি।হাসির কলরবের শব্দ পৌঁছে গেল হেড মাষ্টারমশাইয়ের ঘরে। তিনি একটি শক্ত লাঠি নিয়ে এলেন মারার জন্য।তিনি চিৎকার করছেন আর বলছেন, বাঁদরামি হচ্ছে। এটা স্কুল। স্কুলে হাসি। ঘরে ঢুকে পড়ে হেড মাষ্টার মশাই ও হাসতে লাগলেন। সৈকতরা অবাক। কি ব্যাপার হলো।এদিকে পাই স্যার হাসতে হাসতে এগিয়ে চলেছেন একটা মোটা কাঁচের বোতলের দিকে। তিনি দেখলেন বোতলের মুখ খোলা। লেখা আছে বোতলের গায়ে নাইট্রাস অক্সাইড। স্যার বন্ধ করলেন ঢাকনা।তারপর দশমিনিট পরে হেডস্যারকে বললেন, স্যার লাফিং গ্যাসের বোতল খুলে ফেলেছে কেউ। তার ফলে এই হাসি।অমর বললো,স্যার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে।কে যে বোতলটা খুলেছিলেন তা আজ পর্যন্ত জানা যায় নি…

পাই স্যারের বাড়ি গেলেই তিনি পরাণের পান্তুয়া খাওয়াতেন। তিনি আমাদের বাড়িতেও পড়াতেন। তিনি আমাকে বলতেন, তোর কি পাখির পেট নাকি। খা পরাণের পান্তুয়া। আরও দুটো নে। আমি বলতাম, না না আর নেব না। প্রত্যেকদিন তিনি আমাদের পান্তুয়া খাওয়াতেন। মনে পড়ে আজও লিলুয়ার কথা। এটা শহর নয়। গ্রামের মতই।জায়গাটার নাম পটুয়াপাড়া।এই পাড়ায় মাটির পুতুল বিখ্যাত ছিল। দুটো পুতুল কিনলেই মাসি বলতেন, নে নে আরবএকটা নে। এটার দাম লাগবে না। মাটির পুতুল নিয়ে আনন্দে ঝুলন সাজাতাম। পুজো দিতাম। পরাণদার পান্তুয়া ছিল প্রসাদ। তার লোভেই আমরা ঝুলন সাজাতাম প্রতিবার।আমরা ছোটোবেলায় মোবাইল পাই নি। কিন্তু আমরা যেসব আনন্দের অংশিদার ছিলাম সেসব আনন্দ এখনকার ছেলেরা আর পায় বলে মনে হয় না । ইতিহাসের বাইরে চলে গেছে ভুলোলাগা বামুন। তিনি ঝোলা হাতে মাথায় গামছা জড়িয়ে আসতেন শিল্পকর্ম দেখিয়ে রোজগার করতে। তিনি আমাদের বাড়িতে এসে শুরু করতেন নিজের কথা বা শিল্পকর্ম। নাটকের অভিনয়ের ভঙ্গিমায় বলতেন, আর বলো না বাবা। তোমাদের গ্রামে আসতে গিয়ে চলে গেলাম ভুলকুড়ি ভুল করে। তারপর মেলে, কোপা, বিল্বেশ্বর, চুরপুনি, সুড্ডো ঘুরে কোমডাঙ্গা। তারপর কেতুগ্রাম, কেউগুঁড়ি হয়ে গুড়ি গুড়ি পায়ে হেঁটে পোশলা, নঁগা, খাটুন্দি, পাঁচুন্দি হয়ে তৈপুর, পাড়গাঁ, বাকলসা, পাঁচুন্দি, মুরুন্দি, সেরান্দি,খাটুন্দি পার করে কাঁদরের গাবায় গাবায় হেঁটে এই তোমাদের গ্রামে। আমরা জিজ্ঞেস করতাম, এতটা পথ হাঁটলে কি করে দাদু। তিনি বলতেন, সব ভূতের কারসাজি। তেনারা ভুলো লাগিয়ে দেন। ভর করে দেহে। তাই এতটা পথ হাঁটতে পারি। তারপর চালটা, কলাটা, মুলোটা দিতেন তার ঝোলায় আমার মা বা পিসি। ভুলোলাগা বামুন এলেই সেই দিনটা আমাদের খুব ভালো লাগতো। তার পিছু পিছু মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘুরে বেড়াতাম ভুলো লাগা বালক হয়ে। বৃষ্টির পরেই রাম ধনু দেখা যায় । দুঃখ শেষে আনন্দ । আমার পাগলামি যে ভালোবাসে সেই শোভন ।দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে মানুষকে ভালোবাসা র নামই জীবন । নর জীবনে নারী ছাড়া জীবন অচল । তবু কেন এত অন্যায় অত্যাচার নারীর উপর । সাধুবেশে নারীদের বিশ্বাস অর্জন করে ন্যায় অন্যায় জলাঞ্জলি দিয়ে কেন তাদের বিশ্বাস হত্যা করা হয় । তারা যে মায়ের ,মাসির আদরের আঁচল । তাদের রক্ষা করার জন্য তৈরি হোক সমস্ত মানবহৃদয় ।তারপর যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন কাকাবাবু মরে গেলেন অকালে। বাবা হতাশ হয়ে পড়লেন। ভাই অন্ত প্রাণ। বাবা বললেন, আর লিলুয়ায় থাকব না। গ্রামে গিয়ে জমিজমা দেখভাল করব। চাষ করব। বাবারা দুই ভাই দুই বোন। পিসিদের বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন। তারপর চলে এলাম গ্রামে। গ্রামে এসে নতুন পরিবেশে মিশতে সময় লাগল। কিন্তু টাইম ইস দ্য বেষ্ট হিলার। সময়ের প্রলেপে খাপ খাইয়ে নিলাম নিজেকে। তারপর অজয়ের বন্যায় মাটির বাড়ি ভেঙ্গে গেল। ভেসে যাচ্ছিলাম বন্যার জলে। চিৎকার করলাম, আমাকে বাঁচাও… যতবার আমি বিপদে পড়েছি রক্ষা পেয়েছি নারী হৃদয়ের কমনীয়তার গুণে ।ভীষণ বন্যায় ভেসে চলেছিলাম স্রোতের তোড়ে । রক্ষা পেয়েছি সর্দার দিদির বলিষ্ঠ হাতের আশ্রয়ে । জীবনে জ্বর হয় বারে বারে । সেবা পেয়েছি স্বপ্না বোনের শাসনে । বারে বারে জীবনযুদ্ধে যখন হেরে যাই ভালোবাসা র আড়ালে মায়াচাদর জড়িয়ে রাখেন আমার বড় সাধের সহধর্মিণী ।আর আমার মা সুখে দুখে শোকের নিত্যদিনের সঙ্গী । পুরো জীবনটাই ঘিরে থাকে নারীরূপী দেবির রক্ষাকবচ । সমগ্র পুরুষ সমাজ আমার মতোই নারীর কাছে ঋণী । তবে কোন লজ্জায় পুরুষ কেড়ে নেয় নারীর লজ্জাভূষণ । পুরুষদের মধ্যেই অনেকে আছেন তাদের শ্রদ্ধা করেন । তাদের রক্ষায় জীবন দান করেন । তারা অবশ্যই প্রণম্য । তাদের জীবন সার্থক ।এই পৃথিবী সকলের স্বাধীন ভাবে বিচরণের স্থান হোক । হিংসা ভুলে পৃথিবীর বাতাস ভালোবাসা ভরুক দুর্বল মানসিকতায়।

বিল্বেশ্বর স্কুলের হেড টিচার অম্বুজাক্ষবাবু বলতেন, যোগ,বিয়োগ,গুণ,ভাগ জীবনের ক্ষেত্রেও মেনে চলবি। যত দুঃখ,ব্যথা বিয়োগ করবি। আনন্দ যোগ করে খুশি গুণ করবি। আর খাবার ভাগ করে খাবি। একা খেলে,বেশি খেলে রোগ বেড়ে যাবে। মজার মধ্যেও কতবড় শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়েছিলেন আজ বুঝতে পারি। আদর্শ শিক্ষক বোধহয় এই রকম হন। ফোচন বললো।ফোচনের বোন ফোড়োনকে মাস্টারমশাই মশলা বলে ডাকতেন। ফোড়োন খুব রেগে যেতো। কারণ বন্ধুরাও তাকে মশলা বলেই ডাকতো। একদিন স্যারের কাছে ফোড়ন বললো,আপনি মশলা নামে ডাকেন বলে সবাই ডাকে। মাস্টারমশাই বলেছিলেন,আদর করে দেওয়া নাম কোনোদিন ফেলবি না। রাগ করবি না। দেখবি একদিন যখন তোর বন্ধু, বান্ধবীরা দূরে চলে যাবে তখন এই নাম তোর মুখে হাসি ফোটাবে। সংসারের সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেবে আদরের পরশে। ফোড়োনের জীবনে সত্য হয়েছিলো এই কথা। একদিন বিয়ের পরে রমেশের সঙ্গে দেখা হলো তার। রমেশ বললো,কেমন আছিস ফোড়োন। ফোড়োন বললো,একবার মশলা বলে ডাক। তা না হলে আমি তোর প্রশ্নের উত্তর দেবো না। রমেশ তারপর ওকে মশলা বলে ডেকেছিলো। মশলা সেবার খুশি হয়ে রমেশকে ফুচকা খাইয়েছিলো। তারপর বিয়ে হল বন্ধু রমেশের। প্রায় কুড়িবছর পরে ২০২০ সালে করোনা রোগ এল বিশ্বজুড়ে।রমেশের ছেলের জ্বর হল। কোনমতেই ছাড়ে না। ছেলে চোদ্দদিন পরে বলে, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চল বাবা। টোল ফ্রি নাম্বারে ফোন কর। তোমাকে যেতে হবে না। রমেশ বলল, তুই আমার একমাত্র ছেলে। তোকে যদি করোনা ভাইরাস আ্যাটাক করে আমি হাসপাতালে পাঠাব না। আইসোলেশনে রাখার পরে তুই যদি আর ঘরে না ফিরিস।

-তাহলে কি হবে। আমি একা মরে যাব। আর হাসপাতালে না পাঠালে তুমি আর মাও মরে যাবে। আমার শরীরে অসুবিধা হচ্ছে। তুমি আমাকে হাসপাতালে পাঠাও।

– তা হোক শরীর খারাপ হলে কাউকে বলার দরকার নেই। ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যাবি।
– না বাবা। তা হয় না। আমি যদি পজিটিভ হই আমাকে হাসপাতালে দেওয়াই ভাল।

বাবা ভাবেন ছেলেটা সমাজের মুখ তাকিয়ে ঠিক বলছে। সমাজে এ রোগ ছড়িয়ে গেলে আরও অনেক লোক মরে যাবে। কিন্তু ছেলেটাতো বাবা হয় নি। ও কি করে জানবে বাবার দৃষ্টিকোণ। আমি কি ওর মায়ের অন্তর দেখতে পাচ্ছি। মেয়েদের বুক ফাটে মুখ ফোটে না। ছেলে হারাবার ভয়ে বা স্বামীকে হারাবার ভয়ে সে করোনা রোগের নাম করে না।
ওর মা বলে, বড্ড অপয়া রোগ। একজনকে গ্রাস করলে সারা বলয় গিলতে চায়।
বাবা ভাবেন, এখনও এই উন্নত যুগে মানুষ কত অসহায়। মিথ্যে ক্ষমতা আর টাকার বড়াই। কোনো কিছুই মৃত্যুকে আটকাতে পারে না।

ছেলে আইসোলেশন ক্যাম্পে চলে গেলো। করোনা পজিটিভ। চিকিৎসায় কোন ফল হলো না।

ছেলেটা চলে গেল…রমেশ আর তার বউ কেমন যেন হয়ে গেল। কারও সাথে আর কথা বলে না। তারপর পৃথিবীর সব রোগ সেরে গেল দুমাস পরে।সংসার সহজভাবে চলতে থাকল। সে ত থামতে জানে না।
আমি সুরেন্দ্রনাথ কলেজে আইন পড়তে ভরতি হলাম। বড়দা বাবার মত ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন চাকরিসূত্রেই।লিলুয়ায় বড়দার বাসায় থাকতাম। ফিরে ফিরে দেখতাম ছোটবেলার পুকুরটাকে। বন্ধুরা সব বড় হয়ে গেছে। কেউ আর পাত্তা দেয় না। সেই পাই স্যার,সৈকত,বিশ্বকর্মা পুজো আমার মনে বিষাদের বাজনা বাজায়। পরাণদার বাড়ির সামনে মিষ্টির দোকানে গেলাম। সেখানে পান্তুয়ার দোকানের বদলে মোমোর দোকান দিয়েছে পরাণদার ছেলে। পরাণদা বুড়ো হয়েছেন এখন। আমাকে দেখে বললেন, কে তুমি চিনতে পারলাম না তো। আমি পরিচয় দিলে তিনি আমাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন আমাকে, পাই স্যার নেই তো কি হয়েছে, আমি তোমাকে পান্তুয়া খাওয়াব। আমি বললাম, না তুমি এখন বুড়ো হয়েছ। আর তোমাকে কাজ করতে হবে না। পরাণদাকে প্রাণভরা ভালবাসা জানিয়ে চোখে জল নিয়ে বাইরে এলাম। এখনকার ছেলেরা কেউ আমাকে চেনে না। পরের দিন বিকেলবেলা পরাণদা তার বাড়িতে আমাকে ডাকলেন। থালায় চারটে পান্তুয়া। খেলাাম তৃপ্তি করে। শেষে তিনি কাগজের ঠোঙায় অনেকগুলো পান্তুয়া হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা তুমি বাসায় গিয়ে খেও। আমার আনন্দ হবে। ইতস্তত হয়ে আমি ঠোঙা হাতে ধরে একশ টাকার নোট বের করলাম। পরাণদা বললেন, ভালবাসায় টাকাপয়সার স্থান নেই। আমার এখন টাকার অভাব নেই। তোমাকে পান্তুয়া খাইয়ে আমি যে কতটা আনন্দ পেলাম তা আমি ছাড়া কেউ বুঝবে না। পরাণদার এই কথা শুনে আমি আর কথা বলতে পারলাম না। গলা ধরা গলায় বললাম, আসছি। এখনও পটুয়াপাড়ায় আমি সময় পেলেই চলে যাই পুকুরের পাড়ে। বসে থাকি শটিবনের ধারে। জঙ্গলের এক বুনো গন্ধে পরাণদার কথা মনে পড়ে।এই পুকুরে খেলার সঙ্গিদের মনে পড়ে। বুকটা চিন চিন করে ওঠে। মন উদাস হয়। অতিতের এই পুকুর পাড়ে আমার বয়স, আমার স্মৃতি থমকে রয়েছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চিরন্তন খেলায়। আমি পুকুড়ের পাড়ে বসে আমার ছোটবেলার খেলা খেলি আপনমনে।
ছেলের জন্য মায়ের অপেক্ষা চিরকালের প্রথা হয়ে গেছে। রাত্রিবেলা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমার তারা গুনতে ইচ্ছা হয়। যারা চার দেওয়ালে শ্বেত পাথরের আড়ালে বড় হয় তারা কি এই খোলা আকাশ আর আপন-মনে বেড়ে ওঠা প্রকৃতি বাগান দেখতে পায়। এইসব চিন্তা করতে করতে হাঁটার সময় গতি শ্লথ হয়ে যায়। আর মায়ের চিন্তা বাড়ে।
আমি জানি যত রাতই হোক মা ঠিক অপত্য স্নেহ নিয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে।

আমরা চার ভাই দুই বোন। চারা গাছের মত বেড়া দিয়ে যত্ন করে মা আমাদের মানুষ করেছেন।
কোনদিন কোন অভাব তিনি বুঝতে দেননি।
বাবা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।
সকালবেলা ব্রেকফাস্ট করে তিনি বেরিয়ে পড়তেন সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে।
আবার দুপুর সাড়ে বারোটায় খেতে আসেন।
তারপর দুপুর দুটোর সময় অফিস গিয়ে রাত্রি আটটার সময় বাড়ি ফিরতেন।
ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি প্রাণ মন সমর্পণ করে কাজ করতেন। নিজের কাজে বাবা খুব একটিভ ছিলেন।

সকালবেলা চোখ মেলেই দেখি মায়ের সুন্দর দেবী প্রতিমার মত মুখ। হাতে চা মুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি মাঝে মাঝে মাঝে মাকে একটা প্রণাম করে নিতাম। জানি সকালবেলা মায়ের মুখ দেখলে সারা দিনটা ভালো যাবে। রক্ত দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করা মা আমাদের জ্যান্ত দেবী।

এখন ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। যে যার নিজের মতো সংসার নিয়ে ব্যস্ত।
মা বৃদ্ধা হয়েছেন।
এবার মাকে তো যত্ন করে দেখাশোনা করা চিকিৎসা করানো তার খাওয়া-পরার সমস্ত ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন।

আমি আমার মায়ের নাম করে পৃথিবীর সব মায়ের 70% মা কিভাবে থাকেন তার কথা বলছি।

আর শতকরা তিরিশ ভাগ মা যেসব আছেন তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন।
তারা ভালই থাকেন আশা করি।
আমি কোনো বিতর্কে যেতে চাইছি না আমার দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটা ঘটনা বলছি।
তারা সবাইকে নিয়ে সুখে থাকে। কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে তাদের মাকে নিয়ে। ওদের আলাদা সংসারে একটি দুটি করে বাচ্চা স্বামী অফিস চলে গেলে স্ত্রীর আর কোন কাজের চাপ থাকে না। কারণ ছেলেও স্কুল চলে গেছে। নিজে বেশ পেট ভরে ভালোমন্দ খেয়ে ফাঁটিয়ে টিভির সামনে বসে অখন্ড অবকাশ কাটাচ্ছেন।

হয়তো মা বললেন, বৌমা এবার আমাকে খেতে দাও বেলা দুটো হলো, যাহোক একটু খাই।
বৌমা বললেন, যান রান্না ঘরে ঢুকে নিজে খেয়ে নিন।

ছোট ছেলের কাছে ছয় মাস। বড় ছেলের কাছে ছয়মাস মা থাকেন।
বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। এখন বিধবা মা। তিনি একাদশী করেন। তাহলে মায়ের খাবার কথা চিন্তা করা কি উচিত নয়?

কিন্তু ছেলেরা বলছে বাজে খরচ করার পয়সা নেই।

একাদশী বা উপবাসের দিন কষ্ট হয় বেশি মায়ের। ছেলেরা ওসব পাত্তা দেয় না। মেয়েরা তবু শ্বশুরবাড়ি সামলে মাকে দেখেন যতটা পারেন।

মা বিছানায় শয্যাশায়ী। পায়খানা, পেচ্ছাপ সবকিছু এখন বিছানায়। ছেলেরা যুক্তি করে মাকে হাসপাতালে ভরতি করে দিল। হাসপাতালে নাতি যায় দেখতে মাঝেমাঝে ঠাকুমাকে। নাতির অন্তর কেঁদে ওঠে। কিন্তু তার হাতে তো পয়সা নেই। ঠাকুমা হাতের সোনার বালা আর গলার চেনটা খুলে নাতির হাতে দিলেন উপহারস্বরূপ। নাতি কলেজে পড়ে। যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। সে সোনার গহনাগুলো বিক্রি করে ঠাকুমাকে দেখাশোনার জন্য আয়া রাখল। ফলমূল এনে ঠাকুমাকে
খাওয়াত। ঠাকুমা প্রাণভরে আশীর্বাদ করতেন নাতিকে। এসব কিন্তু বাড়ির লোকজন জানত না। তারা অপেক্ষায় থাকত কখন বুড়ি মরবে।

মরবে বললেই তো মরা হয় না। সময় তার বিচারক।নাতি বলল,ঠাকুমা এবার আমি তোমাকে ঘরভাড়া করে আলাদা জায়গায় রাখব। তোমার যত্ন করব। সেই রাতেই ঠাকুমা নাতিকে ছেড়ে চলে গেলেন।

ছেলেমেয়েরা এল। দাহকাজ সমাপ্ত হল। নাতি বলে উঠল আবেগ ভরা কন্ঠে, মা এবার তো ঠাকুমা নেই।এবার তোমার পালা শুরু হল। কি হবে গো, ঠাকুমার চোখের জলের অভিশাপ তোমাদের দগ্ধ করবে না তো…
নয় ছেলে আর পাঁচ মেয়েকে নিয়ে মিতা ও তার বর পাঁচবিঘে জমির আমবাগানে বেশ সুখেই ছিল। মিতার বর মিলিটারি বিভাগে কাজ করার সময় এক অত্যাচারী লম্পটকে মেরে জঙ্গলে পুঁতে ফেলেছিল। কেউ জানতে পারে নি। তারপর কয়েক বছর পরে চাকরি ছেড়ে তার শখের আমবাগানে চলে এল। একরাশ বৃষ্টিফোঁটার ঝাপটা লাগা সুখে সে মিতার সংসারে মেতে গেল। ছেলেরা ধীরে ধীরে বড় হল। একে একে তাদের বিয়ে হল। চাকরির সন্ধানে তারা চলে গেল বাড়ি ছেড়ে। মিতার বয়স হল। তার বর চলে গেল পরপারের ডাকে।

আমবাগানে মেজ ছেলে, ছোট ছেলে কে নিয়ে মিতা শেষ বয়সে আনন্দে ছিল। বয়স পঁচাশির কোঠায় হল মিতার। তবু সে মুড়ি ভাজে, বাগান পরিষ্কার রাখে।

মিতা বেশ কিছুদিন ধরে তার এক টি ছেলে সনৎকে দেখতে পায় না। সব ছেলে মেয়েরা মায়ের সঙ্গে দেখা করে কিন্তু সনৎ কেন দেখা করে না। প্রশ্ন করে মিতা সব ছেলে মেয়েদের। কেউ বলে, মা আমি কি করে বলব তার কথা। আবার কেউ বলে, ওর ব্যাপার অই জানে, আমরা জানি না মা।

মিতার কেমন যেন সন্দেহ হয়। সে ভাবে, ছেলেটি কি মরে গেল? আর দেখা করে না কেন। আবার ভাবে, হয়ত রাগ হয়েছে বলে আসে না। মিতার মনে প্রশ্নগুলো ভিড় করে আসে।

ময়ুরাক্ষীর ধারে বাড়ি মিতার। ছোট থেকেই এই নদীর বুকেই তার যত অভাব অভিযোগ ছুঁড়ে দেয়। ফাঁকা নদীর ধারে চেঁচিয়ে সে মন হাল্কা করত। আজ মিতার নদীর ধারে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই বাড়িতে বসেই কাঁদে আর নদীকে গোপন কথা বলে।

ছোট ছেলে ছিদাম মদ খাওয়া ধরেছে দাদা মরার পর থেকে। সংসার আর তার ভাল লাগে না। মায়ের কাছে বসে। মা তার হাতে পরা আংটি দুটি হাত দিয়ে ধরে দেখে। ছিদাম কথা বলে না। শুধু মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। মা, তার না বলা কথা কেমন করে বুঝে যায়। মা বলেন, ভাল করে সংসার কর। শরীরের যত্ন নিও। আর তারপরেই বলেন, হারে ছিদাম তোর দাদা সনৎ আর দেখা করে না কেন?
ছিদাম কি করে বলবে,জানি না মা।
সে কি করে মাকে বলবে, দাদা মারা গেছে ক্যানসারে। আর এক দাদা ভুগছে রোগে। কখন কি হয়, কেউ জানে না। আর মায়ের বয়স পঁচাশি হল কিন্তু মরার কোন লক্ষণ নেই। ছিদাম ভাবে, কেউ চায় না মা মরুক। কিন্তু দাদারা মরার লাইনে নাম লিখিয়েছেন। ছিদামের শরীরও ভাল নেই। মা পুত্রশোক পেলে বাঁচবেন না। আর বিছানা থেকে উঠতে পারে না মিতা। তবু কোনও ছেলে বলে না। ছিদাম ঠিক করে নিল, আজ সে বলবে মাকে সমস্ত ঘটনা। মা মরে যায় যাবে? মরবে না বেঁচে যাবে। সে ভাবে, রাতে হেগে মুতে বিছানায় মাখামাখি। মদ খাই বলে পরিষ্কার করতে পারি। আর কেউ মায়ের ঘরের দিকে আসে না। বৌ, ভাইঝি,ভাইপোরা কাজ নিয়ে থাকে। আবার রাধামাধবের মন্দির আছে। ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার আছে। এমতাবস্থায় কাউকে দোষারোপ করা যায় না।

ছিদাম ভাবে আজ বলবেই মাকে আসল ঘটনা। বাইরে একবার বেরিয়ে এল। কোঁচর থেকে প্লাষ্টিকের বোতল বের করে তরল পদার্থের সবটুকু গলায় ঢেলে দিল। তারপর আয়েশ করে একটা বিড়ি ধরাল।

ঘরে ঢুকতেই মা বলল,আয় ছিদাম এখানে বোস। এঘরে ছিদামই বেশি আসে। আর ছিদামের গায়ের গন্ধ মায়ের চেনা হয়ে গেছে। ছিদাম জানে, মা এবার প্রশ্ন করবে। ঠিক তাই। মা বললেন , বাবা ছিদাম, তুই বল সনৎ কোথায়। সে আসে না কেন? আর কদিন ধরে ভোলাকে দেখছি না। কি হল তাদের।

ছিদামের নেশা ধরেছে।নেশার ঝোঁকে সে বলল,আরে মা শোন আসল কথা। সনৎদা দুবছর আগে মরে গেছে। আর ভোলাদা আজকালের মধ্যেই সেঁটে যাবে বোধহয়। তুমি বুড়ি হয়েছ বলে কেউ বলে না। আমি বলে ফেললাম। ক্ষমা করে দিও। তবে মা, এবার তোমার মরাই ভাল। আর বেঁচে থাকলে কষ্ট পাবে গো, বলেই ছিদাম বাইরে তালা লাগিয়ে চলে গেল।

সকাল সকাল উঠে ছিদাম মন্দিরে একটা প্রণাম করে মায়ের ঘরে তালা খুলল।গু,মুত পরিষ্কার করবে বলে তৈরি হল।
তার আগে ছিদাম মায়ের গায়ে হাত দিল।অনুভুব করল, মায়ের দেহ ঠান্ডা হয়ে গেছে।

সকলকে ডেকে আনল ছিদাম। মেজদা বললেন, ভাল হল বুঝলি ছিদাম। ছেলে মরার দুঃখটাতো পেল না। নাকি বল বৌমা।

নাতি নাতনিরা ঠাকুমাকে ভালবাসত। তার ফুলের মালা দিয়ে সাজাল মিতার শেষশয্যা।
ছিদাম একবার দেখল মায়ের মুখের দিক তার মনে হল, মা তাকে যেন হেসে বলছেন, তুই আমাকে মুক্ত করলি ছিদাম..।বাসে উঠেই একটা লোক এক সুন্দরী মহিলার পিছনে দাঁড়ালো।বাসে বেশ ভিড়। এই লোকাল বাসগুলো একদম, যাকে বলে নড়বড়ে। খাটালা বাস দুলতে দুলতে চলেছে। লোকটি আরামসে পিছনে দাঁড়িয়ে । কোনরকমে ব্যালেন্স রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।
বাসের কুড়ি জোড়া চোখ কমপক্ষে নজর রাখছে।

মহিলাটি গর্জে উঠলেন,সকালে উঠেই গাঁজা সেবন করেছেন মনে হয়। একটু সরে দাঁড়ান। নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুন। লোকটি সরে দাঁড়াল। কিন্তু ব্যালেন্স রাখতে পারছেন না ভিড়ে।
আমি দূরে ছিলাম। বুঝলাম,লোকটার কপালে কষ্ট আছে।

একটা বছর চল্লিশের যাত্রী লোকটাকে বললো, দু কান কাটা আপনার। সরে দাঁড়ান। তা না হলে এক ঘা নিচে পড়বে না। সাবধান। এইসব যাত্রীরা সিন ক্রিয়েট জন্য ছুটে যায় ।কিন্তু প্রয়োজনে হাওয়ার মত মিলিয়ে যায়।

হঠাৎ মহিলাটি ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটার গালে সপাটে এক চড় মারলেন। লোকটি চড় খেয়ে গালে হাত রেখে বসে পড়লেন।
মহিলাটি একটু অবাক হলেন। মহিলাটি দেখলেন লোকটি দুহাতে সব্জী ভরতি একটা ব্যাগ ধরে আছেন।

লোকটি কোনো প্রতিবাদ করলেন না কেন
আমি ভাবলাম, কি হলো উনি বসে পড়লেন কেন?

বছর পঁচিশের একটি ছেলে এগিয়ে গিয়ে বললো,বসে কেন? উঠে বসুন। যান নেমে যান। না হলে দেবো আর এক চড়। বদমাশ কোথাকার। আরও পাঁচজন কন্ডাকটরকে ডাকলেন।অভিযোগ করলেন বসে থাকা লোকটার বিরুদ্ধে।

কনডাক্টর ভাড়া নিতে এলেন। সবাই ভাড়া দিলেন। কিন্তু লোকটি বসে আছে। কন্ডাকটর ভাড়া নিলেন না তার কাছে। একটা সিট খালি হলে বসিয়ে দিলেন আদরে।

মহিলা জিজ্ঞেস করলেন,ভাই ওনার ভাড়া নিলেন না কেন?
কন্ডাকটর বললেন, আপনি চড় মারলেন দেখলাম। কিন্তু যাকে মারলেন সে দেখতে পায় না, আপনার আমার মত। কথাও বলতে পারেন না। তবু উনি ভিক্ষা করে টাকা জোগাড় করে একটা অনাথ সেবাশ্রম চালান। মিথ্যে কথা মনে হচ্ছে নয়? সাজানো গল্পের মত মনে হচ্ছে, তাই না?
এক ভদ্রলোক বললেন, না না। সত্যিকথা আমিও জানি। আমি দেখলে ওনাকে বাধা দিতাম চড় মারার সময়।

মহিলাটি হঠাৎ করে কেঁদে ফেললেন। বাসের মধ্যে একটা থমথমে পরিবেশ। অন্ধ সমাজসেবী চুপচাপ নেমে গেলেন বাস থেকে। তার,যে অনেক কাজ। তারপর দুটো স্টপেজের পরে আমিও নিচে নেমে ভাবলাম, নিঃশব্দে বিবেকের চড়টা, মহিলার গালে বেশ জোরেই লেগেছে। তা না হলে উনি কাঁদবেন কেন?অন্ধলোকটি সত্যিকারের মানব প্রেমিক।

বেশ ভাল লাগল ভেবে যে, সব পুরুষ ভন্ড,অসভ্য হয় না। কেউ কেউ প্রেমিকও হন…

 

সুদীপ ঘোষাল নন্দন পাড়া খাজুরডিহি পূর্ব বর্ধমান ৭১৩১৫০

সুদীপ ঘোষাল নন্দন পাড়া খাজুরডিহি পূর্ব বর্ধমান ৭১৩১৫০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *