হ্যাপি চকলেট ডে – শম্পা সাহা

হ্যাপি_চকলেট_ডে

 

 

বাইকটা স্ট্যান্ড করাতে না করাতেই একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লো নেহা,
“অসভ্য, ছোট লোক, কখন থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি এই ভর দুপুর বেলা! আমি বাড়ি যাবো! “, রাগে নাকের পাটা ফুলতে থাকে নেহার। “

“স্যরি, স্যরি, এক্সট্রিমলি স্যরি বাবু। আমার দেরী হতো না, মাঝ রাস্তায় হঠাৎ বাইকটা ডিস্টার্ব করছিল। তাই একটু গ্যারেজ হয়ে এলাম। প্লিজ সোনা! “

” আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না, আমাকে আমার বাড়িতে ড্রপ করে দাও। “, মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে নেহা।

রেহান ভেবে পায় না কি করবে? এই ভিড় বাসস্ট্যান্ড, তার মধ্যে নেহার এই ছেলেমানুষি,ভীষণ এমব্যারাস্ড ফিল করে ও। কিন্তু ওই বা কি করবে? হঠাৎই বের হতে যাবে এমন সময় বাপিনের ফোন। ওর সঙ্গে একটু দেখা না করলেও চলতো না, ওর গার্লফ্রেন্ড আজ সকাল থেকে নাকি ফোন তুলছে না! এ সময় একটু না গেলে চলে? বাপিন পাগলের মত করছে, ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আসতে আসতে দেরি।

রেহান একেবারে সিনেমার স্টাইলে হাঁটু গেড়ে বসে চকলেটটা দিতে গেলে, নেহা রেহানের থেকে চকলেটটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেললো রাস্তায়। রেহানের মুখটা দপ করে নিভে গেল। ওর মলিন মুখটা দেখে নেহা বুঝলো, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তবু ডাট বজায় রেখে গম্ভীর মুখে উঠে বসলো বাইকের পিছনের সিটে। বাইক চললো ওদের প্রিয় পার্কের দিকে।

বেশ খানিকটা মান অভিমান, তারপর একটা বিরাট বড় ডেয়ারি মিল্ক স্ল্যাব সব সমস্যার সমাধান করলো। এরপর অন্য দিনের মতোই ওরা খুনসুটি তে ব্যস্ত। চারিপাশে ওদের মত রঙীন প্রজাপতি জোড়ায় জোড়ায় উড়ছে। এই তো ভালোবাসার দিন। “বসন্ত সমাগত প্রায়”, পার্কটার আনাচেকানাচে জোড়ায় জোড়ায় ভালোবাসার রঙীন ওড়াউড়ি।ভালোবাসার সপ্তাহে এই ইট কাঠের ভীষণ ব্যস্ত শহরটা, যেটা ছুটেই চলেছে যন্ত্র সভ্যতার সঙ্গে তাল দিতে, তাতে মানুষের এই সুকুমার প্রবৃত্তি যে এখনো মানুষ ভোলেনি, এখনো যে মানুষ ভালোবাসে এই যেন এক বিরাট স্বস্তি দেয়। হোক না আধুনিক, হয়তো আগামী বসন্তে এই প্রজাপতিরা জোড় বাঁধবে অন্য কারো সাথে কিন্তু আজকের এই মুহুর্তটাও তো মিথ্যে নয়।

আবোলতাবোল গল্পে প্রায় পাঁচটা বাজে। হুঁস করে কখন যে এতখানি সময় চলে গেল। পার্কের আলো গুলো জ্বলতে শুরু করেছে একে একে। নেহা খেয়াল করে একটি রোগা মত মেয়ে অনেকক্ষণ ধরে কোণের বেঞ্চে বসে। পাশে রাখা একটা ঢাউস ব্যাগ। পোশাক নেহাতই সস্তা চুড়িদার,মলিন মুখচোখ।বোঝাই যাচ্ছে বেশ অভাবী পরিবারের। হয়তো সেলস্গার্ল হবে।

অন্ধকার তখন প্রায় জমে উঠেছে, মেয়েটা বারবার হাতের কি প্যাড ফোনটা টিপে সময় দেখছে আর পার্কের গেটের দিকে তাকাচ্ছে, হয়তো কারো অপেক্ষায়। পার্কে বড় বড় ভেপার লাইটের আলোয় কোথায় এতটুকু অন্ধকার নেই। চারিদিকে যেন ভালোবাসার মেলা।

একটি ছেলে ঢুকলো, রোগা, কালো একটু বেশিই লম্বা চোয়াড়ে চেহারা, দেখেই বোঝা যাচ্ছে সারাদিন খাওয়া দাওয়া নেই। পরিশ্রমের ক্লান্তি মুখে চোখে স্পষ্ট, চোয়ালের উঁচু হয়ে থাকা হাড় সাক্ষী দিচ্ছে সারাদিনের পরিশ্রমের।

ছেলেটিকে আসতে দেখেই, মেয়েটি একটু নড়েচড়ে উঠল। এরপর ছেলেটি প্রায় ধপ করেই বসে পড়লো মেয়েটির পাশে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি তার কাপড়ের পুরোনো কাঁধব্যাগ থেকে বার করলো একটা টিফিন বাক্স। ওরা কি বলছে নেহা শুনতে পেলো না। শুধু দেখলো মেয়েটি বোতল থেকে জল ঢেলে হাত ধুয়ে পরম মমতায় ছেলেটিকে রুটি জাতীয় কিছু খাইয়ে দিচ্ছে, আর ছেলেটির ঠোঁট নড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে সে হয়তো সবথেকে প্রিয় মানুষটার কাছে ব্যাখ্যা করছে তার সারা দিনের সংগ্রামের, আর মেয়েটি খাইয়ে দিতে দিতে গভীর মনযোগ দিয়ে শুনছে ছেলেটির বলা প্রতিটা কথা। হয়ত ওদের একজনের টিফিন সারাদিন বাদে ওরা দুজন ভাগ করে খাচ্ছে।

নেহার হঠাৎই ভীষণ মন খারাপ করতে শুরু করলো, লজ্জা হতে লাগল নিজের ব্যবহারে। কোনো কারণে হয়তো রেহানের আস্তে দেরি হয়েছে, কিন্তু ও তো বাড়ি থেকেই আসলো, তাতেই ও কি না করলো আর ঐ মেয়েটি! সারাদিন পরিশ্রমের পরেও প্রায় ঘন্টা খানেক বা তারও বেশি অপেক্ষা করছে না খেয়ে প্রিয় মানুষটাকে খাওয়াবে বলে!

নেহার ঐ মুহুর্তে নিজেকে খুব স্বার্থপর, ছোট মনে হতে লাগল। ও রেহানের মত হাঁটু গেড়ে বসে নিজের কান ধরে বললো, “স্যরি, আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ! “, “হঠাৎ কি হলো?” রেহান নেহার এই মুড বদলের কারণ খুঁজে পেলো না। ” আমি খুব মিস বিহেভ করে ফেলেছি, তুমি রাগ করোনি তো? “, আরে দূর কান ছাড়ো, কি ছেলেমানুষি হচ্ছে? লোকে দেখছে তো! ” রেহান আর একবার অপ্রস্তুত।

নেহা এবার নিজের পার্স থেকে একটা চকলেট বের করে রেহানের দিকে এগিয়ে দেয়, “হ্যাপি চকলেট ডে”, রেহান নেহার ভঙ্গিতে হেসে ফেলে। দুজনেই এরপর ভাগাভাগি করে চকলেট ডের আনন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *