ধারাবাহিক প্রবন্ধ – কবিতা র রূপকল্প – ৯ – রবীন্দ্র সমসাময়িক কবি – সৌম্য ঘোষ

 

Soumya Ghosh

এই পর্বে আলোচনা করব সেই সব কবিদের কথা যারা পুরোপুরি রবীন্দ্র ছত্রছায়ায় আবির্ভূত হয়েছিলেন । ভাবে ,ভাষায় তাঁদের প্রধান ঋণ রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবীন্দ্র ধারার একটি বিশেষ পর্বের তাঁরা অনুবর্তন করে চলেছিলেন । খেয়াল করেননি যে , রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজেকে ভেঙে নতুন করে বারে বারে রচনা করেছেন নতুন আঙ্গিক ।

এই রবীন্দ্র অনুসারী কবিদের সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ‘চিত্রল পতঙ্গের’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন । এরা বুঝতে পারেননি যে, রবীন্দ্রনাথের মায়াবী আসঙ্গ নিরাপদ নয়। বাংলার কবিতার ইতিহাসে এই রবীন্দ্র অনুরাগীদের প্রধান সার্থকতা তাঁদের এই আত্মলোপী পরিণাম পরবর্তীদের সাবধান করে দিতে পেরেছিল । এই কবি গোষ্ঠীতে ছিলেন—– করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় ( ১৮৭৭-১৯৫৫), যতীন্দ্রমোহন বাগচী ( ১৮৭৮- ১৯৪৮), সতীশ চন্দ্র রায় (১৮৮২-১৯০৪), সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২), কুমুদ রঞ্জন মল্লিক (১৮৮৩-১৯৭০), কিরণ ধন চট্টোপাধ্যায় (১৮৮৭-১৯৩০), সাবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৬৫), এবং কালিদাস রায় (১৮৮৯-১৯৭৫) প্রভৃতি ।

করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন দাম্পত্য প্রেমের কবি । তিনি প্রকৃতিরও কবি । বহির্জগতের তরঙ্গ বিক্ষোভ এই কবির প্রসন্ন ধ্যানকে বিঘ্নিত করেনি । তাঁর সঙ্গীতময় কবিতার মধ্যে একটা আচ্ছন্ন তন্ময়তা আছে।
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবি মন, তাঁর কবিতা ভাবে ও ভাষায় বাস্তবিকই রবীন্দ্র পূজা । তাঁর স্বকীয়তা মেলে সমসাময়িক অনেক কবির মতো বাঙালির ঘরোয়া গার্হস্থ্য চিত্রণে । লৌকিক ছড়ার সৌরভে জড়ানো তাঁর কাজলা দিদি খুব জনপ্রিয় ছিল।
” মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই।”

যতীন্দ্রমোহনের “অন্ধবধূ ” কবিতাটিও চমৎকার।
তাঁর কিছু কিছু কবিতা পুরাণের নতুন ভাষ্য , যদিও এক্ষেত্রে তিনি রবীন্দ্রনাথের পথ অনুসরণ করেছিলেন।
সতীশ চন্দ্র রায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রভাবে শান্তিনিকেতনে কবির সান্নিধ্যে গড়ে উঠেছিল তাঁর কবিসত্তা । অকাল প্রয়াণে তাঁর কাব্য প্রদীপটি কে তিনি জ্বালিয়ে রাখতে পারলেন না । এই প্রকৃতিপ্রেমিক লিখেছেন :

” সোনার সন্ধ্যার পর এলো রাত্রি , বিকশিত তারা
দিগন্ত মিলায় বনে নভস্তল চন্দ্রকলাহারা।
কালো অন্ধকার যেন কালো এক ভ্রমর বিপুল
আবরিয়া বসিয়াছে ধরণীর মধুময় ফুল !”

তাঁর “চন্ডালী” একটি চমৎকার কবিতা ।

কবি কুমুদ রঞ্জন রায় ছিলেন গ্রামের কবি । শহরবাস তাঁর কাছে মনে হয়েছে বনবাস । অজয় নদী তীরবর্তী গ্রাম ও প্রকৃতির সঙ্গে ছিল তাঁর জন্ম জন্মান্তরের সৌহার্দ্য । তাঁর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য সারল্য ,আন্তরিকতা ও দরদ । পল্লী প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে তাঁর কবিতায় মেলে দেশ অনুরাগ , ঐতিহ্য অনুরাগ । এই খাঁটি বাঙালি কবির কবিতায় পাই অনাড়ম্বর শুচিতা ।

রবীন্দ্র ছত্রছায়ায় রবীন্দ্র অনুসারী কবি গোষ্ঠীদের নেতৃস্থানীয় ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত । তিনি ছিলেন ছন্দের জাদুকর । সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন এই সময়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় কবি । তাঁর কবিতায় আছে শব্দ মাধুর্য , ভাষার প্রসাধন, সর্বোপরি ছন্দ নির্মিতির কুশলতা । চিত্রময়তা , ছন্দ বিলাস আর লঘু কল্পনার চপলতায় তাঁর কবিতা সমকালের পাঠকের মনোরঞ্জন করেছিল । সত্যেন্দ্রনাথের কবিতায় প্রকৃতি প্রেম, মানবতাবাদ, ঐতিহ্যানুরাগী ও দেশ প্রীতির প্রমাণ প্রচুর । এই কবি তাঁর কবিতার উপকরণ আহরণ করেছেন প্রকৃতির চিত্রশালা এবং পন্ডিতের পুঁথিশালা থেকে।

রবীন্দ্রনানুরাগী কবিরা ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমিক ,ফলত: পল্লী প্রেমিক । কিন্তু কিরণধন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন নাগরিক কবি । দাম্পত্য প্রেম নিয়ে যে কবিতা লেখার ধারা চলে আসছিল বিহারীলাল চক্রবর্তী থেকে কিরণধন সেই ধারার কবি । আটপৌরে ভাষায় তিনি গার্হস্থ্য প্রেমের মধুর খুনসুটির ছবি এঁকেছেন:

” বেলফুল চাইনা , জুঁইফুল দাও!
ও গানটা গেয়ো না , এই গানটা গাও !”

সাবিত্রী প্রসন্নও ছিলেন পল্লী প্রেমিক কবি । কিন্তু তিনি রোমান্টিক দৃষ্টিতে বাংলার পল্লীকে দেখেননি । মোহমুক্ত দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন তার বাস্তব রূপ । তাঁর কিছু কবিতায় প্রেমমুগ্ধ হৃদয়ের প্রকাশ আছে । কিন্তু সাবিত্রীপ্রসন্ন প্রধানত দেশানুরাগের কবি ।
কালিদাস রায়ের কবিতাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ” বাংলাদেশের মাটির মতো স্নিগ্ধ ও শ্যামল” । তাঁর কাব্যগুলি পড়লে ” বাংলার ছায়াশীতল নিভৃত আঙিনার তুলসী মঞ্চ ও মাধবী কুঞ্জ মনে পড়ে ।” এই দিক থেকে কুমুদ রঞ্জন মল্লিক এর সঙ্গে কালিদাস রায়ের মিল আছে । তাঁর কবিতায় পাই :

” আমি বাঙালির কবি ; বাঙ্গালীর অন্তরের কথা,
বাঙালির আশাতৃষ্ণা , স্মৃতি -স্বপ্ন, চিরন্তন ব্যথা
ছন্দে গেয়ে যাই আমি ।”

প্রথম মহাযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ঘটেছিল । জমিদারি উপস্বত্ব ভোগী এবং চাকুরীজীবী বাঙালি মধ্যবিত্তের স্থিতিশীল জীবনে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল । কিন্তু এই রবীন্দ্র প্রতিধ্বনিতে বধির রবীন্দ্র ছত্রছায়ায় লালিত কবিরা সেই সময়ের পরিস্থিতিকে বিচার করতে পারেননি । সেই সময় বাংলার ছায়াশীতল আঙিনায় ভাঙ্গন ধরেছিল, গ্রাম পতনের বীজ প্রবেশ করেছিল । কিন্তু এইসব রবীন্দ্রমুগ্ধ কবিরা সময়ের বিচারে অসমর্থ ছিলেন ।
বহু প্রবন্ধে পড়েছি, কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৮৭-১৯৫৪), কবি মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২) এবং কাজী নজরুল ইসলাম কে (১৮৯৯-১৯৭৬) রবীন্দ্র অনুসারী সমাজের অন্তর্গত করা হয়েছে ।

ভাষার ভঙ্গিতে ছন্দে ছন্দে তাঁরা রবীন্দ্র বৃত্তের বাইরে সব সময় যেতে পারেননি ঠিকই । কিন্তু তাঁদের ভাব জগত স্বতন্ত্র । তাঁদের কবি কণ্ঠস্বর স্বকীয় । তাঁরা অনিশ্চিত প্রশ্নসংকুল জীবনকে নিয়ে নতুন কাব্যধারার আবির্ভাব আসন্ন করেছিলেন, পূর্ব আভাস দিয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথের মাছিমারা অনুকরণ এর অর্থ হবে নিজেই মরা , একথা বুঝতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ সমসাময়িক যতীন্দ্রনাথ , মোহিতলাল এবং কাজী নজরুল ইসলাম । এই তিন কবি বাংলা কবিতার ইতিহাসের রবীন্দ্র পর্বের সঙ্গে আধুনিক পর্বের যথার্থ সেতু রচনা করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর আগে থেকেই তাঁরা শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রোত্তর পর্বের বাংলা কবিতার নান্দীপাঠ ।।

লিখেছেন :- অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ ।
চুঁচুড়া হুগলী।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *