মাতৃঋণ – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

গল্পকার-সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

হাজারীবাগের এক বর্ধিষ্ণু বাঙালি পরিবারের মেয়ে নীলা। বাংলার বাইরে থাকলেও পরিবারটি আদ‍্যপান্ত বাঙালি। হরমোহনবাবু স্থানীয় কোর্টে উকিল, নিজের বিয়ের সূত্রেই এ শহরে তার আসা। তারপর এখানে ওকালতি ব‍্যবসা জমে যাওয়াতে আর ফেরা হয় নি।

মনে একটা শঙ্কা ছিল, দিনরাত হিন্দী বলয়ে থেকে ছেলেমেয়েরা না বিহারী বনে যায়। এই ভয়ে হরমোহন বাবু ছেলেকে কলকাতায় হস্টেলে রেখে পড়িয়েছেন। নীলাকে ওর মা কোনভাবেই কাছছাড়া করতে চায় নি, তাই স্থানীয় বটমবাজার প্রাইমারি স্কুল দিয়ে ওর পড়া শুরু হয়েছে। সংখ‍্যায় বেশী না হলেও আটের দশকে বেশ কয়েকটা বাংলা স্কুল ওখানে ছিল। নীলার আর একটা বড় ভরসা ওর পিসী শ্রীমানি।

পিসী বিয়ে থা করে নি, সরকারি স্কুল ইনস্পেকটার। বদলির চাকরি, আশেপাশে রাঁচি, জামতারা, ধানবাদ এসব জায়গায় বদলি হয়। তখন পিসীর বাড়ি নীলাদের বেড়ানোর জায়গা হয়। শ্রীমানি অবশ‍্য শনি রবিবার হলেই আসতে চেষ্টা করে কারণ নীলার ঠাকুর্দা গৌরমোহন এখনো বেঁচে। বাবা আর আদরের ভাইঝিকে না দেখে শ্রীমানিও থাকতে পারে না।

গৌরমোহন রামকৃষ্ণ আশ্রমের দীক্ষিত, তাই শ্রীমানি বাড়ি এলেই সেখানে পাঠচক্র বসে,- এই উপলক্ষ্যে আশেপাশের বাঙালি পরিবার এ বাড়িতে আসে, শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ হয়। ছোট্ট নীলা গান ধরে- “কে ঐ আসিল রে কামারপুকুরে, পুলকে নাচিয়া উঠে প্রাণ। দুখনিশা কাটিল, সুখরবি হাসিল, গগনে উঠিল নব গান।” উপস্থিত সকলের ” সাধু সাধু”তে বেশ ওস্তাদ ওস্তাদ মুখ করে ও তাকায়।

বাড়িতে লুচি,তরকারি, বোঁদের গন্ধ ম-ম করে। প্রতি মাসেই এটা হয়, যেহেতু গৌরমোহন বিশেষ বেরোতে পারেন না, তাই ওনার বাড়িতেই বেশী হয়। নীলার এই দিনগুলো ভালোই কাটে, সবাই আসে বলে পড়তে বসতেও হয় না, পিসী ঘরে থাকে, খাওয়াটাও ভালো হয়। এ হেন নীলারও ক্লাস সিক্স হয়ে গেল, পুরোনো স্কুল তো ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, আশেপাশে বাংলা হাই স্কুল নেই। একবার ঠিক হল ওকেও কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হোক, তাতে নীলার যা বুক ফাটা কান্না প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাওয়া গেল তাতে প্রস্তাবেই শেষ হল পরিকল্পনা। শেষে ঠিক হল নীলা রাঁচিতে পিসীর সঙ্গে থাকবে ওখানে কাছাকাছি ভাল বাংলা মাধ্যম স্কুল আছে।

এ প্রস্তাবে নীলা হাতে চাঁদ পেল, পিসীর সঙ্গে কাটাতে তো ও ভালোই বাসে, শুধু প্রাণপ্রিয় দাদুকে ছেড়ে যেতে হবে এই যা। গৌরমোহনের কিছু দরকার হলে-“ও গিন্নী শোন-”
বলে নীলার কাছেই যে চায় সবকিছু। নতুন শিক্ষা বর্ষে নীলা ওর রবীন্দ্ররচনাবলী, শরৎ সমগ্র আর সঞ্চিতার সঙ্গে অল্পকিছু জামাকাপড় নিয়ে চলল পিসীর সঙ্গে রাঁচী। রাঁচীর স্কুলটা বেশ বড়সড় নীলার খুবই পছন্দ হল, বেশীর ভাগ দিদিমণিই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন, এখানে হস্টেলে থাকেন।

নীলার হস্টেল ভীতি থাকলেও দিদিমণিদের সঙ্গে দেখা করতে হস্টেলে যায়। ওনারাও ওকে খুব স্নেহ করেন, গান গেয়ে এখানেও ও বাজিমাত করে। দেখতে দেখতে স্কুলের সীমা ছাড়িয়ে কলেজে যায়। ডাক্তারীতে ভর্তি হয়েছে, এবার তো ওকে পড়তে কলকাতা যেতেই হবে।ওর দাদাও তো ওখানেই আছে। পড়ার চাপে স্কুলের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ থাকে না, কিন্তু মাঝে মাঝে কথা হলে শোনে ওখানে আর বাংলা স্কুল থাকবে না।

দিদিমণিরা দুঃখ করেন, কিছু টাকা দিয়ে অবসর নিতে বাধ‍্য করাবে। ডাক্তারী পড়ার ব‍্যস্ততা থাকলেও ওকে তৈরী করেছে যে স্কুল তা উঠে যাবে ভেবে খারাপ লাগে। এরমধ্যে শ্রীমানি একটা কাজ করা শুরু করেছে, নীলার স্কুল যখন উঠে যাচ্ছে তখন বাকীগুলোরও একই অবস্থা হবে এই ভাবনায় স্কুল, অভিভাবক সবাইকে পিটিশন সই করাতে শুরু করেছে। কারণ শ্রীমানি জানে যে তার একার চেষ্টায় কিছু হবে না, বাঙালি অ‍্যাসোসিয়েসনকে পাশে চাই। পশ্চিমবঙ্গে যখন হিন্দী ভাষিরা তাদের মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে তখন এখানকার বাঙালিরা পাবে না কেন। মাতৃভাষা মাতৃ দুগ্ধ সমান,- তাহলে কি এটা কথার কথা।

একে রূপায়নের দায় কি কারুর নেই। কারুর যখন নেই তখন এই কাজটা সেই করবে, বৃহৎ যুদ্ধে সে না হয় বানর সেনাই হবে। শ্রীমানি নিজে সরকারি চাকরি করে,সরকারি নীতির বিরুদ্ধে এভাবে সরাসরি নামা যায় না তবুও সই সংগ্রহে সর্বতভাবে নামল। বিশেষ করে যারা শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে আছে তারা এইসময়ে কি করবে? যারা বোর্ড পরীক্ষার মুখে তারাই বা কি করবে, প্রথমে এই অংশের মানুষের কাছে যায় শ্রীমানি।

গিয়ে দেখে সবাই অবস্থার বাধ‍্যতায় আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের সমস‍্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। কেউ ভেবেছে মেয়েকে পশ্চিমবঙ্গে আত্মীয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে, কেউ বা কলকাতার কোনো স্কুলের হস্টেলে পাঠাবে, কেউ বা ক্লাস নামিয়ে হিন্দী মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করবে। শ্রীমানি ওদের বোঝায় এইভাবে ব‍্যক্তিগত স্তরে এ সমস‍্যার সমাধান হবে না, উল্টে সমস‍্যা ধামাচাপা পড়ে যাবে। ওরা শ্রীমানির কথা বুঝল, কিন্তু ভিন্ রাজ‍্যে বাস করে এসব বিবাদে জড়ানো ওদের জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করার মতো মনে হয়।

তবে শ্রীমানির অনুরোধে অনেকেই সইসাবুদ করল। শ্রীমানি স্থানীয় সরকারি কলেজের প্রফেসর হেমেন বোসকে এই আন্দোলনের সহযোগী হিসেবে পেল। আসতে আসতে শ্রীমানির শুরু করা আন্দোলন আরো অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। নীলা রাঁচিতে ঘটে যাওয়া এ সমস্ত ঘটনার খবর আর রাখতে পারে না, এফআরসিপি করতে লন্ডন চলে যায়। ও জানে ওর প্রিয় বাংলা মাধ‍্যম স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে ওটা হয়তো হিন্দি মাধ‍্যম স্কুলে রূপান্তরিত হয়েছে।

শ্রীমানির চেষ্টার্জিত ফসল সেই সইসাবুদ করা পিটিশন সরকারি দপ্তর ঘুরে বিধানসভার আলোচনার টেবিল অব্দি পৌঁছে গেছে। অনেক বাধার ঝড় পেরিয়ে আপাতত স্কুল তার স্বমহিমাতেই রইল। ছাত্রী ভর্তি অব‍্যহত থাকলে বাংলা মাধ‍্যমে পড়াশোনা চলবে। তিনবছর পর আজ নীলা ফিরছে, শ্রীমানি এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছে। আজ অবশ‍্য শুধু পিসী নয়, নীলার বাবা, মাও এসেছে নীলাকে নিতে। শ্রীমানি বলল-“নীলা আমরা প্রথমে রাঁচিতে তোর স্কুলে যাব,- তারপর বাড়ি।” নীলার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে হরমোহন বলে-“চল তো,- তোর পিসীই যা দেখাবার দেখাবে।” স্কুলে পৌঁছে নীলা দেখল তার স্কুল একই রকম আছে।

দিদিমণিদের কাছে সব শুনে পিসীকে জড়িয়ে ধরল-“আমার যে কি আনন্দ হচ্ছ’-কথাটা শেষ করতেই শ্রীমানি বলল-“মাতৃভাষা তো তোর মা, মায়ের ঋণ শোধ করবি না, চল।” স্কুলের নতুন পাঠাগারের সামনে এসে ওরা দাঁড়ানোর পর শ্রীমানি একটা কাঁচি নীলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল-“নে ফিতেটা তুই-ই কাট, তুই তোর স্কলারশীপের টাকা থেকে বাঁচিয়ে যে টাকা তোর বাবাকে পাঠাতিস তাই দিয়েই এটা তৈরী হয়েছে।”

খুশিতে নীলার চোখে জল এসে গেল,মুখে বলল-“না আমার শ্রদ্ধেয়া দিদিরা থাকতে আমি কেন?” শেষে সকলের অনুরোধে শ্রীমানি দ্বারোদ্ঘাটন করল পাঠাগারের। পাঠাগারের বইয়ের আলমারিতে থরে থরে সাজানো নতুন বাংলা গল্পের বই যেখানে বাংলা সাহিত‍্যের দিকপালেরা তাঁদের কীর্তির মধ্যে অমর হয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *