Month: April 2021

পাতাঝরার কাব্য ও ভালোবাসা

পাতাঝরার কাব্য ও ভালোবাসা অসীম পাল ১৯/০৪/২০২১ ইং পাতাঝরা নিঃশব্দ বিকেলের মর্মর দুঃসহ মর্মবেদনা, অামাকে …

পাতাঝরার কাব্য ও ভালোবাসা Read More »

লেখক

Tasnim Fahatema : বুক রিভিউঃ অণুগল্পের একশো এক শয্যালেখকঃআনোয়ার রশীদ সাগরপ্রকাশকঃএবং মানুষ প্রকাশনীপ্রচ্ছদঃকাব্য করিমধরণঃঅণুগল্পের সংকলনপ্রকাশকালঃঅমর …

লেখক Read More »

স্মৃতিটুকু থাক

স্মৃতিটুকু থাক শ্রী রাজীব দত্ত জ্বলন্ত সিগারেটের এক একটা টানে নির্গত ধোঁয়া যখন ফুসফুসে আঘাত …

স্মৃতিটুকু থাক Read More »

গুপ্তজীবন – ২ – সুদীপ ঘোষাল

কামলীলায় পুরুষদের প্রাধান্য আর বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। নারী তলে আর পুরুষ উপরে এই প্রথার অবসান হতে চলেছে। অবশ্য অনেক পুরুষ নারীকে উপরে স্থান দিয়ে বেশি তৃপ্ত হয়।যাক এবার আলোচনা করব পুরোনো প্রথা নিয়ে। কাম পরিপূর্ণ হয় ভালোবাসা থাকলে। তা না হলে যান্ত্রিক নিয়মে পরিণত হয়।

বিদ্যাপতির মাথুরের একটি বহু পরিচিত পদ, এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।  পরপুরুষের প্রতি বিরহের বোধ আসলে সুখের। সুখ এবং দুঃখ দুই ই। অর্থাৎ প্রেমের তীব্র না পাওয়াও একরকম পরকীয়ার সন্ধান দেয়, এক গভীর আত্মকেন্দ্রিকতা মুক্তি পায়, আহ্লাদ হয় নতুন কামলীলায়, অনুভবনের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কারের।

পূর্বের মিলনস্মৃতি হেরে যায় নবকামরূপ নদীর কাছে।পুরুষর ও নারি নিজেদের শারীরবৃত্তীয়  হরমোনের কারণে, সুখ বা দুঃখে উপনীত হয় । কামলীলা শুধু সুখ নয়, প্রচন্ড দুঃখেরও মূল কারণ।  উৎস হল এই বিরহের পদটি।রাধা বললেন, “ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্তত, ভুবন বরিখন্তিয়া, কান্ত পাহুন কাম দারুণ, সঘন খরশর হন্তিয়া।”

প্রকৃতি রাজ্যে এই মিলনের উৎসব, অথচ আমার গৃহ শূন্য। রাধা তখন নিজের জন্য এক নতুন স্বপ্নলোক বুনলেন। মনে পড়বে আলব্যর কামু র সেই বিবাহিত মহিলার নিশাচরবৃত্তি। এ হেন অ্যাডাল্টেরি ১৫,১৬ শতকের মহিলাকে সাজে কিনা তা ভাবার অতীত। কিন্তু বিদ্যাপতি রাধাকে বিন্দাস একক আত্মরতিতে মগ্ন করে সুখানুভবে ব্রতী দেখালেন।

হয়ত কবির অন্তরে কবির সচেতন দৃষ্টি তখনো সক্রিয়তা শেখেনি। এ হল সেই অর্ধমাগধী, যা তোমার আছে আর যা নেই দুইই। ভাষার বা শব্দের সিগনিফায়ার ও সিগনিফায়েড দুইই কবির অপুষ্ট অবচেতনের সংকেতজনিত। এ ভাষা তাই আজও পারিনি আমরা ডিকোড করতে। ফ্রয়েডের পিতৃতান্ত্রিক ভুল দিয়ে একে পড়া সমীচীন নয়।

কারণ, যিনি কলম ধরেন, তিনি এখানে একমাত্র ভাবয়িতা নন। মনের অনেক আয়না। সর্বোপরি, প্রেয়সীর অসহায় অস্বীকার, সামাজিক নিষেধ, নিজেকে নিষেধ, এ সবই এখানে বহুস্তরীয় মননশীলতার গতিস্পন্দ তৈরি করেছে। তাই যাকে রাধা বলে ডাকা হল, সে আসলে এ সবের মিলিত একটি বাসনাপূরণের ডিল্ডো। সেক্স টয়।

সেমিওটিক বিশ্বে হয়ত এই আমাদের প্রাচীনতম সাংকেতিক পুনর্বাসন। পৃথিবীর সেরা নিষিদ্ধ বস্তু বা ট্যাবু। তাই পলিঅ্যান্ড্রিকে ১৭ ও ১৮ শতকে গৌড়ীয় দর্শনের সাহায্য নিয়ে আমরা বৈধ করে নিলাম।

আর নষ্ট করলাম আমাদের ইমপারফেক্ট্ যৌনতার প্রকৃত প্রমাণ। দস্তখত মিটিয়ে দিলাম চৈতন্যচরিতামৃত দিয়ে। চতুর্থ পরিচ্ছেদ আদিলীলা ও ৮ম মধ্যলীলায় বারংবার বলতে হল, আসলে রাধা হলেন কৃষ্ণের একটি শক্তি। হ্লাদিনীশক্তি, যা ত্রি শক্তির মূল নিয়ন্ত্রী। তিনি পরা শক্তির অন্যতমা, স্বকীয়া। পরকীয়া নন।

ইন্দ্রের সঙ্গে সরস্বতীর সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ তেমনি ঘনিষ্ঠ মরুৎ ও অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গে। সরস্বতী কখনো ইন্দ্রের পত্নী আবার কখনো শত্রু, কখনোবা ইন্দ্রের চিকিৎসক। ঋগ্বেদেই আবার যে বাক-দেবীর সাথে ব্রহ্মার যৌনসংসর্গ দেখানো হয়েছে, সে বাক-দেবী সরস্বতী ভিন্ন আর কেউ নন।ইন্দ্র তার গুরুপত্নীকে গুরুর রূপ ধরে ধর্ষণ করায় তার দেহে সহস্র যোনীর চিহ্ন প্রকট হয়ে ফুটে ওঠে ঋষির অভিশাপে।

পক্ষান্তরে, কোন কোন পুরাণকারের মতে ব্রহ্মা স্বীয় কন্যা সরস্বতীর সাথে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন। কলকাতার জাদুঘরে রক্ষিত এক সুপ্রাচীন মূর্তিতে এর পক্ষে প্রমাণ মিলে, যেখানে দেখা যায় ব্রহ্মার বামজানুর উপর সরস্বতী বসে আছেন এবং তাঁর এক হাত ব্রহ্মার কাঁধে জড়িয়ে বেশ ঘনিষ্ঠ।

নেপালে চতুর্দশ শতকের পাওয়া এক শিলালিপিতে আছে দেবী বন্দনা – “সারদা তুমি মাতৃরূপী, তুমি কামমূর্তি”! সারদা সরস্বতীরই নাম। এতো দেবতার সান্নিধ্য পেয়েছেন বলেই হয়তো মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা সরস্বতীর গায়ে কোন আব্রু নেই। অজস্র যৌনতা বা কামজ কাহিনি ছড়িয়ে আছে ভারতীয় পুরাণের পরতে পরতে। যার কারণে মেঘদূত, গীতগোবিন্দ সহ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কাব্যেও দেহজ রূপ বর্ণনার ছড়াছড়ি। চোখ-নাক-ঠোঁট-মুখ ইত্যাদি কম ধর্তব্য ছিল বিধায় পটল-বাঁশি-কমলার কোয়া-পানপাতা ইত্যাদি রূপকের তেমন পাত্তা দেখা যায় না।

বরং পীনোন্নতবক্ষ-স্বর্ণাভ স্তনাগ্র-কদলীসদৃশউরু-বর্তুলাকার নিতম্ব ইত্যাদি রূপকের সেখানে জয়জয়কার। আর তাতেই যেন রূপের প্রকাশ আরো খোলতাই হয়েছে। আবার একইসাথে কুচ-জঘন-উরু এসব রীতিমত ভক্তিস্নাত হয়ে গেছে।তবে একথাও সত্য যে, প্রাচীন অনেক শব্দের ব্যবহার আজকাল সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ হয় বিধায় প্রাচীন শাস্ত্রপাঠে কোন কোন শব্দ পাঠকের মনে দ্বিধার জন্ম দিতে পারে। যেমন, প্রাচীন তন্ত্রমতে শিব দুর্গাকে বলছেন, “কুলবেশ্যা, মহাবেশ্যা, ব্রহ্মবেশ্যা প্রভৃতির মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ বেশ্যা। যোনিপীঠ সাধনায় তুমি প্রসন্না ও তুষ্টা হয়ে সাধকের সকল কামনা, বাসনা, অভীষ্ট সিদ্ধ করে থাকে।

 আদি নাম ছিল দেবর্ষি উশনা। গোড়ায় তিনি দেবদ্বেষী ছিলেন না। একবার দেবগণের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য অসুররা দেবর্ষি উশনার মা ভূগুপত্নীর আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিল। দেবতারা সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি। বিষ্ণু তখন তার চক্র দিয়ে ভৃগুপত্নীর শিরচ্ছেদন করেন। এই ঘটনার পর দেবর্ষি উশনা দেবদ্বেষী হন। একদিন তিনি যোগবলে কুবেরকে বদ্ধ করে তার সমস্ত ধন অপহরণ করেন। কুবের মহাদেবের কাছে অভিযোগ করে। মহাদেব কুবেরের অভিযোগ শুনে শূল হস্তে উশনাকে মারতে আসেন।

উশনা মহাদেবের শূলের ডগায় আশ্রয় নেন। মহাদেব উশনাকে ধরে মুখে পুরে গ্রাস করে ফেলেন। তার ফলে উশনা মহাদেবের পেটের ভিতর থেকে যায়। মহাদেব মহাহদের জলের মধ্যে দশ কোটি বৎসর তপস্যা করেন। পেটের ভিতর থাকার দরুন, এই তপস্যার ফল উশনাতেও অর্শায়। মহাদেব জল থেকে উঠলে, উশনা মহাদেবের পেট থেকে বেরিয়ে আসার জন্ত বারম্বার প্রার্থনা করে।

মহাদেব বলে তুমি আমার শিশ্নমূখ দিয়ে নির্গত হও। মহাদেবের শিশ্নমুখ দিয়ে নির্গত হওয়ার দরুণ, তার নাম হয় শুক্র। মহাদেব শুক্রকে দেখে আবার শূল দিয়ে তাকে মারতে যান। এমন সময় ভগবতী বলেন শুক্র আমার পুত্র। তোমার পেট থেকে যে নির্গত হয়েছে, তাকে তুমি মারতে পার না।

কিন্তু কাহিনীটার শেষ এখানে নয়। হরিবংশ অনুযায়ী বিষ্ণু শুক্রের মার শিরচ্ছেদ করেছিলেন বলে শুক্রের পিতা মহর্ষি ভৃগু ক্রুদ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে অভিশাপ দেন যে স্ত্রীবধ-হেতু পাপের জন্য বিষ্ণুকে সাতবার মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করতে হবে। তারপর তিনি মন্ত্রবলে শুক্রজননীকে আবার জীবিত করে তোলেন। এই ঘটনার পর দেবতারা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। সবচেয়ে বেশী ভয় পান ইন্দ্র।

কেননা মহাদেবের আদেশে শুক্র ব্রহ্মচারী হয়ে তপস্যা করেছিলেন এক প্রার্থিত বর পাবার জন্ত ! ইন্দ্র শুক্রের এই তপস্যা ভঙ্গ করবার জন্য নিজ কন্যা জয়ন্তীকে শুক্রের কাছে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘকাল তপস্যার পর শুক্র তার ইন্সিত বর পান। এদিকে জয়ন্তীর ইচ্ছানুসেের শুক্র অদৃশ্য হয়ে থেকে জয়ন্তীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন। সেই সুযোগে বৃহস্পতি শুক্রের রূপ ধরে অসুরদের মধ্যে আসেন ও অসুররা তাকে প্রকৃত শুক্র ভেবে গুরু হিসাবে সংবৰ্দ্ধনা করেন। অদৃশ্য অবস্থায় থাকাকালীন শুক্রের ঔরসে ও জয়ন্তীর গর্ভে দেবযানী নামে এক কন্যা হয়।

শুক্র যখন ফিরে এল, অসুররা তখন তাকে চিনতে না পেরে তাড়িয়ে দেয়। তারপর যখন তারা বৃহস্পতির ছলনা বুঝতে পারল, তখন তারা শুক্রকে গ্রহণ করে তার কোপ নিবৃত্ত করল।দেবতাদের কামচরিত্র খুব দূর্বল ও ছলনাময়ী ছিল। অসুর বা মানুষ কুমুক হবে এটা স্বভাবিক কিন্তু দেবতাদের লুকিয়ে চুরিয়ে পরস্ত্রী বা কন্যার সঙ্গে যৌনমিলনকে আপনি কোন চোখে দেখবেন। তাহলে মানুষ লুকিয়ে চুরিয়ে মিলন করার শিক্ষা কার কাছে পেল। বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায় ভক্তির মাঝে।

এইসব তথ্য পড়ে মনে হয় এখনকার নীলছবি নেহাতই ধার করা প্রতিচ্ছবি। আসলে বহুকাল আগে থেকেই যৌনশাস্ত্র পরিপুষ্ট। এখনকার ছেলেমেয়েরা ব্লুফিল্ম মোবাইলে বা কম্পিউটারে সার্চ করে দেখে নিজেদের আধুনিক প্রমাণ করতে চাইলেও আসলে এগুলি পৌরাণিক গল্প থেকে ধার করা বিদ্যা। যৌনাঙ্গ চোষণ,মর্দন,লেহন সবই সেকেলে বিদ্যা। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে গেলে শুধু কামুক হলে হবে না, যথেষ্ট মগজেরও প্রয়োজন। আগামী কামলীলার আধুনিকিকরণ তাদের উপরই ন্যস্ত থাকুক।

কবিতা সমগ্র

শপথের পথেই আমার ঘর
রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

এ যাবৎ যতবার হেঁটেছি শপথের পথ
ততবারই একদিনে তেইশ ঘণ্টা রাত্রি ঘেঁটেছি
অবশিষ্ট এক ঘণ্টার সূর্যে
শুকিয়ে নিয়েছি তেইশ ঘণ্টার ঘাম…..

আম্রপালী বা আপেলের দিকে নজর নেই
চব্বিশ ঘণ্টায় একশো আটবার দণ্ডবৎ করে
বরং নু’য়ে আছি উপরোক্ত চার বাক্যের অঙ্কে
আজও শপথের পথেই আমার ঘর….

আমি আলোর উপাসক হলেও
গন্তব্যের নাম অন্ধকার
অন্ধকারেই চেনা যায় নক্ষত্ররাজি
অন্ধকারেই ফুটে ওঠে আলোর শ্রেষ্ঠত্ব…..

আর শপথ অর্থে আমার অভিধান বলে:
অমাবস্যায় চড়ে সূর্যের দেশে যাবো….।

 

ব্যর্থ নারী দিবস
কলমে  সবিতা কুইরী

আমি ধর্ষিত এক নারী
হ্যাঁ  ধর্ষিত হয়েছি আমি।
দিনটা ছিল দু হাজার এগারো আট ই মার্চ।
বর্ষণ মুখর এক দুর্যোগের দিনে ।
দিনের বেলায় অন্ধকার নেমে এসেছিল সেদিন।
টিউশন থেকে বাড়ি ফিরছিলাম।
পথে দাড়িয়ে থাকা কয়েকটি নেড়ি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এসেছিল কিন্তু তারাও ঘ্রাণ নিয়ে
মুখ ফিরিয়ে আমাকে নিরপরাধ
প্রমান করল।
বিজ্ঞান বই এ পড়া কুকুরের ঘ্রাণশক্তির প্রমান যেন সেদিন
আরো একবার উপলব্ধি করলাম।
আজকেই ইতিহাস বই এ পড়ে ফিরছি
সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী
মানুষের কীর্তি কাহিনি।
গর্ব বোধ করছিলাম ।
আর বেশি পথ নেই
ভাবতে ভাবতেই বাড়ির আগে গাছগাছালিতে ঘেরা পোড়োবাড়িটা এসে গেল
ভীষণ দুর্যোগ ।
বিদ্যুতের ঝলকানি আর বজ্রপাত সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি।
সেখান থেকে ভেসে আসা মানুষের গলার আওয়াজ এ
আশ্বস্ত  হলাম ক্ষণিকের জন্য
যাক আর কুকুর গুলো জ্বালাতে পারবে না।
কিন্তু সেখানে
কয়েকটি নররাক্ষসদের দৃষ্টি
দেখে হাড় হিম হয়ে গেল
কিছু বুঝে ওঠার আগেই
অবর্ণনীয় অত্যাচারে জ্ঞানশূন্য হলাম।
কয়েক ঘন্টা পর পর চেতনা ফিরে বুঝলাম বেঁচে আছি।

আগে খবরের কাগজ টিভি
রেডিও তে এসব খবর পড়েছি।
মুখে মুখে মানুষের মহানুভবতার কথা শুনেছি।
তাই স্থির করলাম মরব কেন?
সব মানুষ তো পাশে আছে।
বাড়ি ফিরলাম।
ঘটনা আমার বলার  আগেই পাড়াপড়শিরা জেনে গেল
একেই বলে দেওয়ালেও কান আছে।
বাড়ির উঠোনে থিকথিক করছে
লোকজন।
দুর্যোগ কমেছে কিন্তু  একেবারেই নেমেছে বলা ভুল।
মাঝে মাঝে বিদ্যুত তখনও উঁকি ঝুঁকি বর্জ্রের গর্জন আর বৃষ্টি
কিন্তু উৎসুক মানুষ জনের ভুক্ষেপ নেই তাতে।
সবাই অ্যাকসিডেন্ট এ উদ্ধারের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
হসপিটাল যেতে লোকজনের অভাব নেই
মিডিয়ার ফোন নং জোগাড় করতে হল না
পুলিশ কে ডাকতে কোন হ্যাপা নেই।
আমি পাড়াপড়শি র গল্পের খোরাক
খবরের কাগজের হেড লাইনে
টিভি চ্যানেল গুলো আমার বাড়িতে লাইন দিয়ে বসে থাকে।
কবি  সাহিত্যিকদের  কলমের
ডগায় আমার স্থান।
এক ঝটকায় পাল্টে আমি হলাম নতুন আমি।
মানুষজন কাছে এসে তাদের নরপশু
বলে।নর রাক্ষুস বা এর থেকেও
নিম্ন মানের শব্দে আখ্যায়িত করে
মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এখন।
কিন্তু দুরে গেলেই অন্য কথা
কেউ বলে মেয়ে মানুষ একা একা গেল কেন
কেউ বলে নিশ্চয় পোশাক ঠিক ছিল না
কেউ বা বলে নিশ্চয় কিছু ছিল
আমাদের কই হচ্ছে?
এভাবেই গেল কিছুদিন
আস্তে আস্তে আমার নামের খবরের কাগজ গুলো ঠোঙা
হয়ে বাজারে হাতবদল হল।
কেস এখন আদালতে ঝুলছে
মাঝে মাঝেই হাজির
বিরোধী পক্ষের বাকপটু উকিলবাবুর রকমারি প্রশ্ন
তির্যক মন্তব্যে মাঝে মাঝে
মনে হয় সেদিনের বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত মস্ত বড় ভুল ছিল।
খুড়তুতো বোন কে তার নিজের পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে
তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিলেন কাকু।
আর ভাল পাত্র তো এ বাড়িতে
আসবে না।
আমার পর দুটো বোনের ভাগ্য
থেকে আইবুড়ি নাম কি উঠবে?
এ চিন্তায়  পাড়াপড়শি র ঘুম খিদে যেন উঠে গেছে ।
আমি বোনেদের মধ্যে বড়
আমি তো কলঙ্কিত
না আইবুড়ি না বিবাহিত।
বাবা মাকে দেখি অসহায় দৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছেন।
কি করি বলুন তো?
উপদেশ দিতে আপনারা ভালোই পারেন।
জানি বলবেন
শক্ত হও
পড়াশুনা শুরু কর
নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলবেন।
কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার মাথা
কাজ করে না।
উৎসুক সমাজের নজর এড়িয়ে
কিছু করতে পারার ক্ষমতা নেই।
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস
যা আমার কাছে অর্থ হীন।
আমার জীবনটাই তো অর্থহীন ।
আমি একটা সমস্যা ছাড়া তো আর কিছুই নয় এখন।
ভেবে পায়  না কাকে দোষারোপ করব?
ঐ নর রাক্ষুস গুলো কে? নাকি
সমাজ কে?
সমাধানের পথ কি আপনারাই বলুন।
এখন আমি কলঙ্কিত নারী।
বাবা মায়ের বোঝা
পাড়াপড়শি র বোঝা।আমার মুখ দেখলে নাকি অশুভ হয়।
আমার বোনেরা সংসারী হতে পারছে না।

আমি কি বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত
ভুল নিয়েছিলাম??

 

নারী
শ্রী রাজীব দত্ত 

আসলে কি  নাড়ীর টান ভাই
কখনো কি ভেবে দেখেছো তাই?
রক্তে-মাংসে গড়া স্নেহময়ী শরীরের কথা
সে যে স্নেহময়ী মা।
নারী দিবস উৎসবের আয়োজন
নাকি নারী সুরক্ষার প্রয়োজন।
অত্যাচার, ধর্ষণ চলেছে প্রতিনিয়ত
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারী পুরুষ গর্জে ওঠো।
সেদিন হয়তো ঘরের মেয়ে
নতুন আশা দেখবে
সমগ্র জাতি নতুন কিছু শিখবে।
হাত ধরো একে অপরের শক্ত করে
নারী জাতির উদ্দেশ্যে
সৃষ্টি যারা অঙ্গীকার
সেই নারী পূর্ণতা পাক এই সমাজের সাহায্যে।
যে  মা বোন বা প্রেমিকা তোমার প্রিয়
তারাও নারী
তাই সমগ্র নারী জাতিকে  সম্মানটুকু দিও।
আজ এই মহান দিনে এটাই হোক অঙ্গীকার

নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান অটুট থাক তোমার আমার।

 

নারী ও পুরুষের গল্প
মহীতোষ গায়েন

নারী দিবসে কবিতা লিখবো বলে
স্থির করেছি,নারী ও কলম হারিয়ে
গেল,যেমন হারিয়ে যায় ভালোলাগা
ভালোবাসার বাগানে শুরু আর্তনাদ।

নারীকে নিয়ে কবিতা লিখলে সবাই
রে রে করে তেড়ে আসছে,পুরুষকে
নিয়ে কবিতা লিখলে পুরুষ বলছে
আমি আবার কি দোষ করলাম কবি?

নারী ও পুরুষকে নিয়ে কবিতা লিখলাম
নারী বললো আমিইতো পুরুষের শক্তি,
পুরুষ বললো আমি নারীর পথ প্রদর্শক
সারা পৃথিবীতে চলছে এই দড়ি টানাটানি।

কৃষ্ণ ও রাধাকে নিয়ে কবিতা শুরু করবো
বলে ভাবছি,এমন সময় বাঁশি বেজে উঠলো,
দলে দলে রাধারা আসছে,দলে দলে কৃষ্ণরা

বাঁশি বাজাচ্ছে,ফুটছে শক্তি ও মৈত্রীর ফুল।

 

একটি বসন্তকালীন অভিযোগ
       শিবপ্রসাদ গরাই

আগুনরঙা পলাশের সঙ্গে আমার তীব্র বিরোধিতা
পলাশ ফুল দেখলেই মনে হয় তাতে লেগে আছে রক্তের রং
পলাশের লকলকে পাপড়িগুলি যেন আমার হৃদয়ের বেদনা
একটা সোজা রাস্তা ধরে যখন হেঁটে গেছি তোমার পাশেপাশে
তখনও রাস্তার পাশে পাশে ছড়ানো ছিল অসংখ্য পলাশের গাছ
বসন্ত এলে তার ডালে কালো ঘন কুড়ি সমস্ত পাতা ঝরিয়ে জেগে উঠতো
আর তখন থেকেই প্রতিদিন রাত্রে তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে পড়ত আমার হৃদয়
বুঝতে পারতাম রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে
এর কোনো শেষ নেই
পলাশের ফুলগুলিও ফুটে ফুটে মাটিতে ঝরে পড়ে যাবে একদিন
সেদিনও এই যন্ত্রণার সমাপ্তি ঘটবে না ।

তুমি জানতে একথা
আমিও জানতাম
রক্তের সঙ্গে আমার আজীবন রক্তের সম্পর্ক
কিন্তু তাও প্রায় প্রত্যেক দিন আমরা পাশাপাশি হেঁটে যেতাম
আমার রক্তক্ষরণের দিনগুলোর যন্ত্রণার  উপশম হতে পারতে তুমি
কিছু কিছু দিন হয়েছও
কিন্তু পেনকিলার  খেলে যেমন তৎক্ষণাৎ যন্ত্রণার উপশম হয় যন্ত্রণার গভীরে যাওয়া যায় না
ঠিক তেমনই তোমার হাত আমাকে  যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলেও
চিরকালীন কোন উপশম  দিতে পারেনি
কিন্তু কিছুই করার ছিলনা ।

আজও একই রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে
পলাশ ফুল আগুন হয়ে আমায় খেতে আসে।

 

উর্বশী নদী ও রিক্ত পুরুষের গল্প
মহীতোষ গায়েন

কখনও  প্লাবন কখনও শান্ত
পূর্ণিমার চাঁদে মোহনিয়া নদী,
কখনও জোয়ার কখনও ভাঁটা
গোধূলির রঙে রিক্ত সে পুরুষ।

বেগবতী যৌবনা উর্বশী নদী,চলমান
জীবনের কথা এঁকেছে আহত পুরুষ,
সে এক ঘরছাড়া বাউল,বাসরের বাসি
ফুল সঁপে দেয় উত্তাল স্রোতের বুকে।

নিরিবিলি রাতভর স্রোতের শীৎকার
শুনে ক্লান্ত ঘুমায় সে পরকীয়ায় মজে,
কখনো ভাসায় তাকে,কখনো ডোবায়
নব-প্রেম খেলা করে ভাটিগাঙ বুকে।

সুরে সুরে বাঁধা পড়ে নদী,কামনার ফুলে
আবার সেজে ওঠে তাদের জীবন-বাসর,
সুখের গোলাপ বনে ঝড় ওঠে,সুরভিত
বাহারি বসন্ত-মৈথুনে তৃপ্ত নদী ও পুরুষ।

কাল থেকে কাল,ছয় ঋতু বারোমাস…
এভাবেই হিরণ্ময় প্রেম নদী ও পুরুষে
দীপ্ত হয়,কালের রাখাল সে পুরুষের

অতৃপ্ত প্রেম ভাসে উর্বশী নদীর বুকে।

 

ফসল বোনার ইতিকথা
মহীতোষ গায়েন

বহু বছর কেটে গেল! নিজেকে নিজের মত
দেখে নেওয়ার সময় এবার করে নিতে হবে,
আকাশ মেঘে ভরে যাবে,বৃষ্টিও হবে,উঠবে
ঝড়,দুর্যোগ কেটে গিয়ে সূর্য উঠবে আবার।

অসময়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করাটা খুব
জরুরি,লড়াইয়ের ময়দান সবার জন‍্য খোলা,
লড়াই থেকে নিজেকে সরালে অস্তিত্ব বিলোপ
হবে,তুমি ঘুরে দাঁড়াও,আগুনে আর কেন ভয়?

বহু বছর হয়ে গেল,নিজেকে নিজের মত করে
চেনার সময় এসে গেছে,চিনে নাও মানুষ,চিনে
নাও সময়,চিনে নাও জল বাতাস,চিনে নাও সব,
জেনে নাও হাওয়া মোরগের গতি,বিকশিত হও।

তুমি যদি আগুন নেভাতে না পারো আগুন তো
তোমাকে পোড়াবে,তুমি যদি আগুন জ্বালাতে
জান অন্ধকারে নিজের মুখও হারিয়ে যাবে,তুমি
যদি বৃষ্টি আনতে না পারো ফসল কিভাবে বুনবে?

 

কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৬ – সৌম্য ঘোষ

ধারাবাহিক প্রবন্ধ :
কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৬
 বিশুদ্ধ কবিতার আত্মমগ্ন ধারা       
            
  
                    প্রগতি আন্দোলন দ্বারা প্রাণিত সমাজসচেতন কবিতার ধারার পাশাপাশি প্রভাবিত হয়েছিল ” বিশুদ্ধ কবিতার আত্মমগ্ন ধারা” ।  এই ধারার কবিরা বুদ্ধদেব বসুর কলাকৈবল্যবাদকে গ্রহণ করেছিলেন । তাঁরা বুদ্ধদেব বসুকে তাঁদের ‘নেতা’ মেনে নিয়েছিলেন।  এঁদের মধ্যে আছেন —- সুনীল চন্দ্র সরকার , অশোক বিজয় রাহা , কামাক্ষী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ কুমার সরকার, নরেশ গুহ, রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরী, জগন্নাথ চক্রবর্তী, অরুণ ভট্টাচার্য, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আলোক সরকার প্রভৃতি।
                   কবি সুনীল চন্দ্র সরকার (১৯০৭-১৯৬১) মগ্ন মুগ্ধ কবি । তিনি আহ্বান করেন,
“আয় চলে এই জামতলায়
 দূর থেকে দ্যাখ বাড়িটা তোর ।”
দেশ ভাগ এবং তর্জনীর উদ্বাস্তু বন্যার কথা তিনি ভুলতে পারেন না ।
“ছেড়ে গ্রাম জমি জোত
 আজ এই শ্রেণী স্রোত
 হয় পৃথিবীর ।”
                 কবি অশোক বিজয় রাহা (১৯১০–৯০)
ছিলেন ‘রূপদক্ষ কবি’ । তাঁর কবিতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য সৌন্দর্য চমৎকারভাবে রূপায়িত হয়েছে । এই দেশ যেন রূপকথার দেশ, সেখানে নিসর্গ আর প্রেমের অনুভূতি মিশিয়ে তাঁর কবিতার বই “উড়োচিঠি ঝাঁক”।
             কবি কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯১৭–৭৬) এই সময়ের একজন সুপরিচিত কবি ছিলেন ।
“মৈনাক, সৈনিক হক
 ওঠো কথা কও।
 দূর করো মন্থর মন্থরা
  মেদময় স্ফীত বৃদ্ধ জরা ।”
            কবি বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১৬–) আজ প্রায় বিস্মৃত । তাঁর কাব্যগ্রন্থ “আকাশিনী ও  মৃন্ময়ী” ।
           বিশুদ্ধ কবিতার ধারা র তিনজন খুব উল্লেখযোগ্য কবি হলেন , কবি অরুণ কুমার সরকার (১৯২২–৮০) , কবি নরেশ গুহ (১৯২৪–২০০৯),কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী ( ১৯২২–২০০৯ ) । অরুণ কুমার সরকার মনোজ্ঞ কবিতা লিখতেন । তাঁর কবিতায় আছে জাত শিল্পীর প্রমাণ ।
        “স্মৃতি থেকে তাই এনেছি দু’মুঠো
          গন্ধ মদির আমনধান্য ‌।
          ওদুটি চোখের তাৎক্ষণিকের
         পাব কি পরশ যৎসামান্য ?”
আনন্দ চিত্তে বুদ্ধদেব বসুর কাব্যের রাজ্যে ভ্রমণ করেন তিনি এবং প্রার্থনা করেন, “যদি মরে যাই/ ফুল হয়ে যেন ঝরে যাই ।”
আদ্যন্ত প্রেমের কবি অরুণ কুমার লিখলেন,
      “বইতে পারিনা আমি এই গুরুভার
       এত প্রেম কেন দিলে এতটুকু প্রাণে।
       প্রেম জাগে দু নয়নে, প্রেম জাগে ঘ্রাণে
        প্রেম জাগে তৃষাতুর হৃদয় আমার ।”
                       কবি নরেশ গুহ বুদ্ধদেব বসুর ভাব শিষ্য। তাঁর প্রথম বই “দুরন্ত দুপুর” । এই কবি শৈলী দক্ষ ।
“আমাকে ডুবাও জলে, হাওয়ায় শুকাও,
 তবু গান দাও।”
প্রেমের কবি লিখলেন,
      “মাঘ শেষ হয়ে আসে
      ভোর হলো হীমে নীল রাত ।
       আলোর আকাশগঙ্গা ঢালে কত উল্কাপ্রপাত।
       আনত ওষ্ঠের তাপ বসন্তের প্রথম হাওয়ায় ।”
কবির  সংকল্প :
        “মৃত্যুকে দিয়ে মৃত্যুকে হবো পার,
         কবিতা আমার, কবিতা আমার ।”
আবার কখনো লেখেন :
         “এক বর্ষার বৃষ্টিতে যদি মুছে যায় নাম
      এত পথ হেঁটে এত জল ঘেঁটে কী তবে হলাম ?”
                  কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী এই সময়ের এক বড় মাপের কবি । তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ  একত্রে সংকলিত হয়ে ” ব্রহ্ম ও পুঁতির
মউরি ” । তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই “আরশিনগর”।
               এই ধারার দুই সফল কবি  জগন্নাথ চক্রবর্তী (১৯২৪– ৯২), অরুণ ভট্টাচার্য (১৯২৫–৮৫) ।
                 নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
               —————————–
  তাঁর কবিতার প্রেরণা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, আবার তিনিই বিশুদ্ধ কলাকৈবল্যবাদী কবিও নন।
তাঁর অবস্থা যেন মধ্যবর্তী । তিনি এই রোগ নয় সমাজের ব্যাখ্যাতা এবং দুঃস্থ  দিবসের ভাষ্যকার ।
তিনি     নীরেন্দ্রনাথ     চক্রবর্তী   ( ১৯২৪—২০১৮)
তিনি সময় কে তাঁর কবিতার দর্পণে নিজের মতন করে ধরতে সবসময় উদ্যোগী থেকেছেন। তাঁর বামপন্থী কবিতা “এশিয়া” । পরে তিনি রাজনৈতিক সংস্রব থেকে সরে যান । “আমার ভিতরে / দলবদ্ধ হবার আকাঙ্খা নেই ।/ দলভুক্ত কবি, তুমি গজভুক্ত কপিত্থ প্রায় । “
 ‘উলঙ্গ রাজা’ তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থ লেখার জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
দীর্ঘ সময় তিনি ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। নীরেন্দ্রনাথের প্রথম কবিতার বই ‘নীল নির্জন’, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এরপর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা ‘অন্ধকার বারান্দা’, ‘নীরক্ত করবী’, ‘নক্ষত্র জয়ের জন্য’, ‘আজ সকালে’ সহ অসংখ্য কবিতার বই।
তাঁর কবিতা :
 ” অন্ধকার বারান্দা “
——————————
 “না, আমাকে তুমি শুধু আনন্দ দিয়ো না,
বরং দুঃখ দাও।
না, আমাকে সুখশয্যায় টেনে নিয়ো না,
পথের রুক্ষতাও
সইতে পারব, যদি আশা দাও দু-হাতে।
ভেবেছিল, এই দুঃখ আমার ভোলাবে
আনন্দ দিয়ে; হায়,
প্রেম শত জ্বালা, সহস্র কাঁটা গোলাপে,
কে তাতে দুঃখ পায়, ………..”
কিম্বা ,
|| অমলকান্তি ||
 “…………      ……..   …………
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। “
অথবা তাঁর  বিখ্যাত জনপ্রিয় কবিতা :
   ” উলঙ্গ রাজা “
—————————
“………       ……..      ………
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক:
রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”
__________________________________________
লিখেছেন :—-   সৌম্য ঘোষ । চুঁচুড়া । হুগলী ।

আসুন বদলাই – শম্পা সাহা

নারীকে অধিকার দিতে হবে না, সমানাধিকার ও নয়। এ আপনাদের পকেটে রাখা মানিব্যাগ নয়, যে পকেট থেকে বার করে তার থেকে দয়া করে দুএকটা খুচরো দেবেন। আমাদের অধিকার আমরা বুঝে নিতে পারবো। শুধু অকারণে ভয় পেয়ে আমাদের রাস্তায় পাথর, কাঁচ ছড়াবেন  না।
কি? ভয় পাচ্ছেন না! তাহলে এতো প্রতিবাদ কেন? কেন এতো নাকি কান্না, যে পুরুষ রা অত্যাচারিত অথচ তাদের জন্য কোনো আইন নেই! কি মনে হয়, যারা আইন প্রণয়ন করছেন তারা সবাই নারী, তাই তারা এ ধরনের একপেশে আইন রায় দিচ্ছেন অথবা তাদের স্ত্রী দের দ্বারা অনৈতিক ভাবে প্রভাবিত হয়ে এই রায় দিচ্ছেন?
অনেকে বলেছেন যে যৌন সুখ নাকি স্ত্রী পুরুষ সকলেই সমান ভাবে উপভোগ করেন, তাই যদি হয় তাহলে বৈবাহিক ধর্ষণ কথাটি এসেছে কেন? নাকি ওটাও মিথ্যা মন গড়া কথা।
অনেকেই বলেছেন স্ত্রী দ্বারা যৌন ভাবে পুরুষ রাও শোষিত হন! হতে পারে, কারণ ” এভরিথিং ইজ পসিবল ইন দিস হোরাশিও! ” তবে কজন পুরুষ মানুষ বিয়ের পর স্ত্রীর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছিন্নভিন্ন যৌনাঙ্গ নিয়ে, একটু পরিসংখ্যান দিন।
অনেকেই বলেন, মেয়েদের মেয়েরা যদি অর্থ নৈতিক ভাবে স্বাধীন হয়, তবে সে সন্তানের দায়িত্ব নিজেই নিতে পারবে, তার জন্য স্বামীর কাছে খোরপোষ চাইতে হবে না। ঠিক কথা? দারুন কথা। স্বামী ইচ্ছে মত ভোগ করবে, তার পর ইচ্ছে হলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে সন্তান সহ। তখন সে মহিলা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ব্যবহার করে নিজের এবং সন্তানের দায় বহন করবে। আর পুরুষ গায়ে হাওয়া লাগিয়ে, ঝাড়া হাত পা হয়ে ঘুরে বেড়াবে! কারণ মেয়েটি স্বাধীন সব দিক দিয়ে।
আর সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা বা টান অনেক বেশি সে কে না জানে। তাই মা হয়ে সন্তান কে ছুঁড়ে যে ফেলে দেবে না, সে তো বলাই বাহুল্য।
সব শেষে একটা কথা। অনেকেই বলেন, মেয়েরা যদি অত ই সমানাধিকার চায় তাহলে চাকরি করা মেয়েরা কেন বেকার ছেলে কে বিয়ে করে না। কে বলেছে করে না বা করবে না। অনেক মেয়েই আছে বেকার ছেলে বিয়ে করে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে ছেলেটি কি একজন হাউস ওয়াইফের মত সব সাংসারিক দায়িত্ব নেয়? সন্তান ধারণ না হয় বাদ ই দিলাম, কারণ সেক্ষেত্রে তার কিছু করার নেই, কিন্তু একজন গৃহবধূর মত সে কি খুশি মনে সব করে স্ত্রী কে শুধু চাকরির জন্য ছেড়ে দেবে?
আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু উল্টো কথা বলে। বেকার ছেলেটি পায়ে পা তুলে বসে থাকে, হীনমন্যতায় ভোগে, প্রতি মুহূর্তে স্ত্রী কে নানাভাবে অপদস্থ করে, যেন স্ত্রীর কারণেই সে বেকার এবং তার সঙ্গে সঙ্গে দোষারোপ তো আছেই।
পরিণতি, হয় ডিভোর্স নয় তো চাকুরিরতা মেয়েটি সংসারের স্বার্থে সব মেনে নেয়। এ কিন্তু আমার নিজের চোখে দেখা পরিণতি।
তাই আমাদের ভাবতে হবে যে সমস্যা কিন্তু গোড়ায়। ছেলে মেয়ে নয় আসুন আমরা মানুষ তৈরি করি, তাদের বোঝাই শারীরিক গঠন বাদে ছেলে মেয়ে তে কোনো বিভেদ নেই, তা হলে হয়তো একশো বছর বাদে পরিস্থিতি বদলালেও বদলাতে পারে।

গুপ্তজীবন – সুদীপ ঘোষাল

 

‘বংশবদন তৈল মিলের,’ মালিকের চাকর আমাদের বন্ধুদের আড্ডার মধ্যে আসে মাঝে মাঝে।সে এলেই আমরা তার মালিকের বাড়ির গল্প মাঝে মাঝে শুনতে পাই। বিচিত্র সব কাহিনী। শুনলে হাসি পায়। বংশবদন তেলকলের মালিকের চাকর এর নাম হরেন। হরেন একদিন দার্শনিকের মতো বললো, এই যে প্রাচীন যুগ থেকে যে সমস্ত নিয়ম চলে আসছে তার সবগুলোই কি সঠিক? সেগুলো কি সত্যি সত্যিই সব সময় মানা উচিত ।

আমাদের বন্ধুদের সদস্য অনিল বললো, না তা কেন, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুরই তো একটা পরিবর্তন ঘটে। আর পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রবক।

হরেন বলল আমাদের মালিকের দুই ছেলে। কর্তাবাবুর দুই ছেলেরই বিয়ে হয়েছে। একজনের বিয়ে দুবছর আগে হয়েছে।আর একজনের বিয়ে হয়েছে এক বছর আগে। আর আমার ঘর দুই দাদাবাবুর মাঝখানের ঘরে। সেটা একটি ছোট ঘর। আর দুই ঘরের দরজাতেই একটি করে ছোট ফুটো আছে। সেই ফুটো দিয়ে ঘরের সমস্ত কিছু দেখা যায়। আমি দিনের বেলায় ন্যাকড়া দিয়ে ফুটো দুটো বন্ধ করে রাখি। কেউ দেখতে পায় না ফুটো দুটি।
আমাদের বন্ধু রতন বললো, তুই কি নিশাচর নাকি যে রাতের বেলায় ঘরের মধ্যে সবকিছু দেখতে পারিস?
হরেন বলল, না জিরো পাওয়ার লাইট জ্বলে ঘরে।কিন্তু লাইট এতটাই উজ্জ্বল যে সবকিছু দেখা যায়।
তখন বড় হারু বলল বল, বল। গল্প কি? যেটা বলার সেটা বল। ভূমিকা অনেক হল।

হরেন বলল,তেলকল এর মালিক এরা। খুব বড়লোক। তেলকল থাকে যাদের, তারা তো বড়লোক হবেই, এটা নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু এরা একটু অন্যরকম, এদের ঠাটবাট একদম আল্ট্রামডার্ন। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো ঘর। দুই ছেলে পালা করে দোকানে বসে। তাদের বাবা যায় যখন কলকাতায়, তখন বড় ছেলে দোকানে বসে। বড় ছেলে যখন কলকাতা যায় তখন ছোট ছেলে ওর কাজ করে।
হারু বললো একবার বলছিস তেলের মিল আছে একবার বলছিস দোকান, ঠিক করে বল আসলে কি ?
হরেন লজ্জিত হয়ে বললো আজ্ঞে, আমি অত শিক্ষিত নয়। আমি মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ। একটু বুঝে নিতে হবে। এটা মিলই বটে, তেলের দোকান নয় ওরা তেল হোলসেল করে। হোলসেল মাল বিক্রি হয়, বড় বড় লরি আসে আর ছোট হাতি গাড়িও আসে। সেইসব মালের চালান বানাতে হয়। ওই আমাদের বাবুরাই চালান তৈরি করে। তাছাড়া লোড করা আনলোড করার জন্য লোকজনও আছে।
এমন সময় একজন ডাকল,এই হরেন এখানে বসে আছিস? মালিক ডাকছে।
সে বলে হ্যাঁ যাই। তাহলে বাকি গল্প পরে হবে, এই বলে সে দৌড়ে চলে গেল।

রতন বললো, বেশির ভাগ বাড়ির গোপন কথা ফাঁস হয় বাড়ির পরিবেশের কারণে। এরা ভালবাসতেও জানে, জান দিয়ে।
হারু বললো, তা বললে হবে না। হরেন কিন্তু একটা কথা ঠিক বলেছে। যেটা যুগ যুগ ধরে প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে সেই প্রথা কি একইভাবে চলে আসা নিয়ম না তার ভাঙচুর করা যায়।
রতন বলল, হ্যাঁ এই কথাটা ঠিক। মানে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সবকিছুই পরিবর্তিত হয়। নবাব থেকে রাজা, রাজা থেকে জমিদার,, জমিদার থেকে প্রধান হয়েছে।

তারপর চার পাঁচ দিন পরে আবার আমাদের বন্ধুদের আড্ডা বসল পন্ডিত- জি র, চায়ের দোকানে। সেখানে আমরা সকলে উপস্থিত হলাম। কয়েকদিন ধরেই হরেনের দেখা পাচ্ছি না। তারপর কয়েক দিন পরে হরেন রাত্রিবেলায় একদিন এলো আমাদের আড্ডার মাঝে।

ছোট হারু, হরেনকে বলল, বল তোর বাকি গল্পটা বল কি দেখেছিস ঘরে রাতের বেলা?
তখন হরেন বলল কাউকে বলো না যেন, তোমাদের বিশ্বাস করে বলছি, ছোট দাদাবাবু র ঘরে দুটো খাট। একটা ছোট দাদা বাবু শোয় আর একটাতে ছোট বাবুর বৌকে ঘরে শুতে দেখি।
রতন বলে, বলিস কি? বর বৌ আলাদা শোয়?
হারু বলে, আগে শোন গল্পটা। তারপর কথা বলবি।
হরেন বলল,বড়দাদাবাবুর ঘরে একটাই খাট একসঙ্গে শোয় ওরা উলঙ্গ হয়ে।
নীরেন বলে, শালা এ কি রে। এ তো চটি গল্প।
হরেন বলে, শোন আগে, তারপর কথা বলবে। পন্ডিত জি বলে উঠল, আরে হরেন তুমি গল্প বলিয়ে যাও। হমলোগ চুপচাপ শুনি।
হরেন বলল, রাতে দেখি আমি সেই দরজার গোপন ফুটো দিয়ে গোপন দৃশ্য। আমি একবার বড়দার ঘরে দেখি আর একবার ছোড়দার ঘরে দেখি।
রতন বলল, কি দেখতে পেলি বল?

হরেন বলল, ছোট বাবুর ঘরে দেখলাম দুজন আলাদা ঘরে শুয়ে আছে। নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।
রতন বলল, তাদের মধ্যে তাহলে শুভ সম্পর্ক নেই নাকি? সেক্স করে না রাতে কোনদিন।
হরেন বলল, আমিও এটাই ভাবলাম। আবার এদিকে বড়দা আর বড়দার বৌ দুজনেই দেখলাম শুয়ে আছে উলঙ্গ হয়ে।
আর বড়দা মর্তমান কলার মত জিনিসটা কোথায় যে ঢুকিয়ে দিলো সেটা আর দেখতে পেলাম না। বাবারে বৌদির জবাব নেই।তারপর
গভীর রাতে বড় বউ বলল, বিরক্ত করো না আর। বেশি রাতে ঘুম না হলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে। সব সময় স্বামী স্ত্রীর দেহের সম্পর্ক ভাল লাগে না। এবার ঘুমোও।বড়দা তবু বৌদির ওপর চেপে বসে, মটর সাইকেলের মত দুটো হ্যান্ডেল ধরে।বৌদি বিরক্ত হয় তবুও বড়দা শোনে না।

তারপর সকালবেলা হয়। সকালবেলায় দেখি ছোট দাদাবাবু আর ছোট দাদাবাবুর বৌ ছুটির দিনে বুদ্ধি করে ফাঁক পেলেই ছাদে চলে যায়। ছাদে গিয়ে তারা যৌন সম্পর্কে মজা পায়। ছোট বৌ বলে, লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম করার মত মজা আর কোথাও নেই, আমি তৃপ্ত। তারপর ছাদের দরজা লাগিয়ে তারা গল্প করে।
রতন বলে, এটা দেখলি কি করে?
হরেন বলে, একবার চা দিতে গিয়ে ছাদে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি এই কান্ড। তখন থেকে দিনেও নুন শো দেখি। একদম উদোম, বিন্দাস।
রতন বলল,সাবধানে থাকিস হরেন। ফাঁদে পা দিস না। বিঘে বিঘে জমি ঢুকে যায় ওই ছোট গর্তে।
হরেন বলে সে আবার কি? ভেঙে বলো বন্ধু।

রতন বলে, নারীর সৌন্দর্যে নারী সিক্ত হয়ে পুরুষেরই মতো চঞ্চল হলেও সেখানে জন্ম নেয় ঈর্ষা! এই ঈর্ষা থেকেই তারা চাপাস্বরে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে- ‘… এত রূপ পাপি ছাড়া কোন নারী বা পুরুষ কাউকে দেন না।’ ফলে তারা বলে যে, এমন সুন্দরী পাপিষ্ঠা বা পাপী পুরুষ যে কোনো বয়সের, যে কোনো সম্পর্কের পুরুষ বা নারীকে কামের ইশারা জানিয়ে বাঁকা পথে টেনে নিতে পারে। নর নারীদের এই ধারণায় সায় দেয় সকলে। হয়তো নিজেদের জীবনের গোপন অভিজ্ঞতা থেকেই তারা জানে যে, এমন সুন্দরী বা সুন্দর নারী, পুরুষ যদি চায় তবে তার জীবনে কামাচারির অভাব হয় না। সুতরাং আর যাই হোক, কোনো চাকর বা ঝি বা ড্রাইভারকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার প্রয়োজন পরে তাদের।আর কামুক নর বা নারীর এটা করা কোন ব্যাপারই নয়। অতৃপ্ত কাম থেকেও নারীরা অন্য পুরুষে আকৃষ্ট হয়ে থাকে।

হরেন বলে, তাহলে মন্দ হয় না বলো হারুদা।
হারু বলে, ফালতু কথা ছেড়ে য দেখেছিস সেটাই বল খুলে।
হরেন একটু থেমে বলে, ছোড়দারা কিন্তু রাত্রিবেলায় আলাদা শুয়ে খুব ভালোভাবে ঘুমিয়ে নেয় আরাম করে। ছোট বউ খুব শান্ত মেজাজের। তার খিটখিটে স্বভাব নয়। সে সারাদিন সুন্দরভাবে কাজ করে আর বড়দা র বউ সব সময় ঝগড়া করে দুজনে। হারু বলে, তারা রাতে ঘুমায় না, ফলে মেজাজ খিটখিটে থাকে। সারাদিন ঝগড়া করতে থাকে আর ছোট বউয়ের মেজাজ ফুরফুরে থাকে সফল যৌন মিলনের ফলে।
হরেন বলে, অতশত বুঝি না। একদিন বড় দাদা বাবুর ঘরে উঁকি মেরে দেখি দাদাবাবুর লিঙ্গ ছোট থেকে বড় হল। বড়বৌ বলে, শালা ঘুমোনোর কোন তাড়া নাই।শুধু দেহ মিলনের চিন্তা। তুমি প্রত্যেকদিন রাত্রিবেলায় অশান্তি কর। কোনরাতেই ঠিকমতো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হয় না। ঘুমোলে আমি ভাল থাকি। তা না করে তুমি সবসময় ঠ্যাঙ চাপিয়ে দাও পাছার উপর। আমার ভালো লাগে না। বড়দার বৌ বলে, না রাত্রিবেলা আমাকে বিরক্ত করবে না আমি কিন্তু তাহলে মেঝেতে শোব। আমি কাপড় খুলব না। বড়দা একদিন বৌকে রাতে একচড় মারল। তারপর তাদের একমাস কথা বন্ধ। একমাস তারা ঘুরে শুত। দিনেও কথা বলত না তারা পরস্পর।
রতন বলে ওরা বোকার মত এইভাবে দুজনে সারা রাতে ঝগড়া করতে থাকে, প্রায়ই একই ঘটনা হয়,তাই না হরেন?
হরেন বলে, হুম। কিন্তু ছোড়দা রাতে চুপচাপ থাকে। ফলে তারা দিনেও নিশ্চিন্তে থাকে। ছুটির দিনে অবসরে তারা মিলিত হয়। তিনতলা বাড়ি তো ফাঁকা থাকে। অনেকগুলো ঘর, মিলনের বাধা নেই ছোড়দার। নানা জায়গায় নানা কৌশলে তারা মিলিত হয়। আড়াল থেকে সব দেখেছি আমি।
রতন বলে, তুমি তো একটা সেয়ানা মাল। কোনদিন বৌদির ঘাড়ে চেপে বোসো না শালা। চাকরি যাবে তা হলে।

হারু বলে, এটা অসম্ভব কিছু নয়। প্রেমে পড়লে আবেগতাড়িত হয়ে প্রেমলীলায় মত্ত হয়নি এরকম জুটি খুঁজে পাওয়া যায় না । প্রেমেতে মজিলে আজি কিবা চাকর কিবা ঝি। অনেক সময়ই নিজের আবেগের চেয়ে বড় হয়ে দাড়ায় প্রেমিককে ধরে রাখার প্রচেষ্টা। তার আবেদনে সাড়া না দিলে সে ছেড়ে চলে যেতে পারে, এই ধারণা থেকে অনেক সময়ই অনিচ্ছা থাকলেও মিলনে রাজী হন। ।অনেক মহিলাই ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও পরপুরুষদের আবেদনে সাড়া দেন। আবার কোন পুরুষের সম্পর্কে চিড় ধরিয়ে সেই পুরুষটিকে তাঁর দিকে আকর্ষিত করতে উলঙ্গ হয় কখনও সখনও।যৌনকর্ম করে ঠিকই কিন্তু একজন মেয়ে মাসের পর মাস যৌনকর্ম না করে থাকতে পারে, কোন সমস্যা ছাড়া। মেয়েরা কথাবার্তা, কামুক কাজকর্ম, যৌনকর্ম চেয়ে অনেক বেশী পছন্দ করে।বেশীর ভাগ মেয়ে গল্পগুজব হৈ হুল্লোর করে যৌনকর্মর থেকে বেশী আনন্দ পায়। মেয়েরা তৃপ্ত হয় ভগাংকুরের মাধ্যমে, মেয়েদের কোন বীর্যরস বের হয় না।নারীরা যৌন মিলনে ইচ্ছুক হলে তাঁদের ঠোঁট লাল হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি লাল হয়ে যায় ঠোঁট।নারীদের গালেও লাল লাল ছোপ দেখা দেয় উত্তেজনায়। অনেকে ঘামেন, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। যৌন উত্তেজিত হলে শরীর খুবই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।পুরুষের সামান্য স্পর্শেই শিহরিত হয়ে উঠবেন তিনি।যতই লাজুক স্বভাবের মেয়ে হোক না কেন, মিলনে আগ্রহী হলে তিনি নিজেই তোমার কাছে আসবে। হয়তো সরাসরি কিছু না বললেও। তোমার কাছে এসে বসবে, আলতো স্পর্শ করবে, চুমু খাবেন, চোখের ইশারায় কথা বলবেন।প্রবল উত্তেজনার সময় যৌন মিলন কালে আঁচড়ে কামড়ে দেয় কামুক মেয়েরা।
রতন বলে, তাছাড়া, কামড় বসাতে পারে, গলায় কানে ইত্যাদি স্থানে। কামড় দেবে উত্তেজনায়।এছাড়াও মিলনের সময় মুখে আওয়াজ করবে। অনেকেই জোরে আওয়াজ করেন না, কিন্তু একটা মৃদু আওয়াজ হবেই।যদি স্ত্রী তার সাথে যৌন মিলনে আগ্রহ না দেখান, তাহলে হতে পারে সেটা তাঁর লজ্জার কারণে। বিষয়টি লজ্জার কারণে হলেও আপনি সেটা বুঝতে পারবেন।আপনি স্পর্শ করলে তিনি শিহরিত হবে, যোনি পিচ্ছিল হয়ে যৌন মিলনের জন্য প্রস্তুত হবে, তিনি আপনাকে বাধা দেবেন না মিলনে। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখবেন, যৌন মিলনে আগ্রহ না দেখানো এবং অনীহা প্রকাশ করা, দুটি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।

হরেন বলে, হে হে, ওসব বলতে নাই। তবে বড় বৌদি আমার সঙ্গে গল্প করে, মুচকি হাসে।ওসব কথা পরে হবে। এখন আমার প্রশ্ন হল যে, বিয়ের পরে স্বামী স্ত্রী এক জায়গায় শোওয়ার যে নিয়ম সেটা কি ঠিক না বেঠিক? এইসব কান্ড দেখে এইসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরঘুর করছে।

পন্ডিত জি বলল,বড়িয়া প্রশ্ন। এটা ভেবে দেখার মত বাত হলো।
রতন বলে, সবই পরিবর্তন হয়। যার যেমন সুযোগ থাকে কাজে লাগায়। রাতে শুয়ে সারারাত বিরক্ত করা কারও উচিত নয়।
হারু বলে, রাতে কিন্তু গার্হস্থ্য অপরাধ বেশি হয় বিরক্ত করার কারণে। সেটা ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন?

তখন রতন বলল, যা তোর কাছে যা গল্প শুনলাম, সেটা বিয়ের পরে শোওয়ার সংজ্ঞা পাল্টে দেবে, উল্টে দেবে খোলনলচে। এখন আমাদের চিন্তা করতে হবে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক….

হরেনকে প্রায় একমাস পরে আবার দেখলাম আড্ডায়। আজ ও আর একটা গল্প শোনাবে। বড় বৌদি ওকে নাকি খুব ভালবাসে। তারপর ও মুচকি হাসিতে চায়ে চুমুক দিল।

ভালবাসার জল – প্রকাশ চন্দ্র রায়

পূজার ছুটিতে প্রাণীসম্পদ অফিসের কম্পাউন্ডার যতীনদা বলল,
:-চলো দাদা, আমার গ্রামের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসি।
ওর বাড়ী গাইবান্ধার সাদুল্ল্যাপুরে, এককথায় রাজী হয়ে গেলাম। আমিতো ঝাড়া হাত-পা এক প্রাণী। মা একাই সংসার দেখা-শুনা করেন, আমি ডিপ্লোমা পাশ করে সবেমাত্র হোমিওপ্যাথিক চেম্বার খুলে বসেছি থানা শহরে।

কিসের ডাক্তারী করা কিসের কি? সারাদিন শুধু টো টো করে ঘুরে বেড়ান আর এর ওর সাথে আড্ডাবাজীতে মেতে থাকাই আমার কাজ। ছোট্ট থানা শহরের প্রায় সকল অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারীগণ আমার বন্ধু। তাছাড়া এলাকার সাহিত্য, সঙ্গীত বিষয়ক সংগঠন গুলোর সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে চাঁদা আদায় করতে হয় প্রায় প্রতিটি অফিস থেকে, বিধায় আমাকে চিনতে আর বেশী দেরী হয় না তাঁদের।

পরদিন বিকালে পৌঁছলাম যতীনদার বাড়ীতে। আমার চেহারা-সুরত আর ঠাট-বাট দেখে তো পাড়ার মহিলা পুরুষের ভীড় জমে গেল ওদের আঙ্গিনায়।
২৩ বছরের টগবগে যুবক আমি, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, চোস্ত পাজামার উপর কলারওয়ালা লিনেনের পাঞ্জাবী-গলায় বুকে নকশা কাটা তার। হাতে ওমেক্স ঘড়ি, দু’সেট গগলস- একসেট সানগ্লাস, অন্য সেট হোয়াইট। কাঁধে ঝুলানো ইয়া বড় ইয়াসিকা ক্যামেরা, পায়ে চেইনবুট। আরও আছে ট্র্যাভেল ব্যাগে ফটো এ্যালবাম, তিনসেট শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি-লুঙ্গি গামছা,নেইল কাটার আর প্রসাধন সামগ্রী।

মানিব্যাগে হাজার তিনেক টাকা। জমায়েত লোকজনের মধ্যে যুবতী মেয়েরা আড়চোখে তাকাতে তাকাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। যা হোক- রাতে পোষা হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় যতীনদার মায়ের আকুলি-বিকুলি অনুরোধ, :-বাবা, আমি মুখ্যসুখ্য মানুষ, রান্না-বান্না ভালো জানি না, মনে কিছু নিও না বাপ।

খাওয়ার পরে খোল, করতাল আর হারমোনিয়াম সহযোগে কীর্তনের আসরেও মাত করে দিলাম নানা ঢঙের কীর্তন গেয়ে গেয়ে। পরদিন পূজোর নারকেলের নাড়ু, দই চিড়া, গুড় মুড়ি, আরো হরেক রকমের নাস্তা সেরে চললাম যতীনদার মামার বাড়ী, মাইল তিনেক দূরে, কামার পাড়া স্টেশন এর কাছে।

আকাশী-নীল রঙের ক্যারোলিন শার্ট, অফ হোয়াইট গ্যাবাডিনের প্যান্ট আর চকলেট কালারের চেইন বুট পড়েছি আমি, অ্যাশ কালারের সানগ্লাসটা মাথায় গোঁজা। দুজনের বাহন একটা ইন্ডিয়ান হিরো বাই-সাইকেল। যতীনদা চালক আর আমি ক্যারিয়ারে হোন্ডার যাত্রীর মত দু’দিকে দু’পা দিয়ে মাস্তানী স্টাইলে বসা যাত্রী।

যেতে যেতে যতীনদা ফিসফিস করে বলল, :-দাদা, আমার মামার একটিই মাত্র মেয়ে, নাম চম্পা। বেশকিছু সম্পত্তির মালিক হবে সে,মামা মারা গেলে। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই, সেজন্যই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি ভাই, ভালমত দেখেশুনে তুমি কিন্ত রায় দিবে। হাসতে হাসতে বললাম, :-তাহলে আমার জন্যেও ওখানে একটা ম্যানেজ করে দাও না কেন! দুজনে এক গ্রামেই শুভকাজটা সেরে ফেলি।

যতীনদা মজা পেয়ে বলল,
:- আছে-আছে, তোমার জন্য টপ সুন্দরী একটা মেয়ে আছে, নাম সৌদা-সৌদামিনী। মামার বাড়ীর পাশের বাড়ীতেই, কিন্তু ওরা খুবই গরীব, গাভীর দুধ বিক্রি করে সংসার চলে-কিচ্ছু দিতে পারবে না ওরা।

আমি উৎসাহী হয়ে বললাম,
:-আরে ধ্যেৎ, কিচ্ছু লাগবে না, দরকার পড়লে আমিই ওদের যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবো।
ওর মামার বাড়ীতে পৌঁছার সাথে সাথে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো, পাড়ার ছেলেমেয়েরা এসে ঘিরে ধরলো আমাদেরকে। দর্শকদের মধ্যে সৌদামিনীও ছিল, চম্পা পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরে সেই আমাদের ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে ঘরে রাখলো। গ্রাম্য সুন্দরী,বেশ চটুল স্বভাবের মেয়ে, ক্লাশ নাইনে পড়ে মাত্র। চঞ্চল বিধায় সেই প্রথমে কথা বলল,
:-দাদা আপনারা কি খুব ধনী মানুষ?

বললাম
:-নাতো, কেন ?
:- আপনাকে দেখে তাই মনে হচ্ছে তো!
চা-নাস্তার পরে যতীনদা বলল,
:-যা সৌদা, দাদাকে তোদের বাড়ীতে নিয়ে যা।
সঙ্গে সঙ্গেই সৌদামিনী আমার হাত ধরে টানতে লাগল। গেলাম ওদের বাড়ী।
সৌদার ঘরের বেড়া নানাপ্রকার অঙ্কনচিত্রে ভর্তি।

বললাম
:-এসব কি।
ওর মা বললেন,
:-সৌদামিনী পড়াশুনার চেয়ে ছবি আঁকতেই সময় কাটায় বেশী, এসকল তারই নিদর্শন।আরও বললেন,
:-তাই ওর বিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত চলছে, কালকে লোকজন আসবে ওকে দেখতে।
কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
বললাম,
:-মাত্র তো ক্লাশ নাইনে পড়ছে।

পরদিন বিকেলে বাড়ী ফেরার জন্য সাজগোজ করছি। রাতে চম্পাদের বাড়ীতেই ছিলাম যতীনদাসহ। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন সৌদামিনীর মা, বললেন,
:-বাবা-তোমাকে একটু আমাদের বাড়ীতে আসতে হবে।
:-কি ব্যাপার কাকীমা!
কাকীমা বললেন,
:-গিয়ে দ্যাখো সৌদামিনী কেমন পাগলামী শুরু করেছে।
চটজলদি ছুটে গেলাম ওদের বাড়ীতে,গিয়ে দেখি- সৌদাকে দেখতে ছেলে নিজেই এসেছে কয়েকজন বন্ধুসহ, বাইরে ঘরে তারা চা-নাস্তা করছে আর সৌদামিনী তার ঘরে কপাট বন্ধ করে হু-হু করে কান্না জুড়ে দিয়েছে, কারো কথাতেই সে আর কপাট খুলছে না।
কপাটে ধাক্কা মারতে মারতে আমি ডাকলাম,

:-সৌদা, কপাট খোলো।
কান্না থামিয়ে সে কপাট খুললো বটে কিন্ত আমি ভিতরে প্রবেশ করামাত্রই আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো-
:-আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকেও বিয়ে করবো না। না-না-না।
আমি হতভম্ব হয়ে পিছন ফিরে দেখি ওর বাবা মা’সহ পাড়ার বেশকিছু কৌতুহলী মহিলা ও বাচ্চারা জটলা করে আমাদের দুজনের কান্ডকীর্তি দেখছে আর সৌদামিনীর মা পরণের শাড়ীর আঁচল দিয়ে তার নিজের দু’চোখের জল মুছছে।

বিশ বছর পরে বেড়াতে গেলাম লালমণির’হাটে। আমার ওয়াইফ সেখানে একটা এনজিও’তে চাকুরীরত। বিকালে সে বলল,
:-চলো তো পাশের গ্রামে যাই, কয়েকজনের কাছে কিস্তির টাকা তুলতে হবে।

গেলাম ওর সাথে ওই গ্রামে, আমাদের ছেলেটাও সাথে গেল। ছেলে গোল্ডেন ফাইভ পেয়ে কেবল এস,এস,সি পাশ করেছে। গ্রামের প্রথম বাড়ীটাতে ঢুকতেই খুব সুন্দরী এক মহিলা আমাদেরকে বসতে দিয়ে, বিস্ফোরিত চোখে আমাকে দেখতে লাগলো! ব্যাপারটা বেশ দৃষ্টিকটু হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আমি অধঃমুখে বসে থাকলাম। পরক্ষণেই মহিলাটি প্রায় ছুটে গিয়ে তাদের ঘরে ঢুকলো এবং কিছুক্ষণ পরেই বেরিয়ে এলো,হাতে তার পুরনো একখানা বি,টু সাইজের সাদাকালো লেমিনেটেড ফটো। ফটোটা আমার হাতে দিয়ে বললেন,
:-দেখো তো, চিনতে পারো কি-না!
আমার ছেলে ছবিটা কেড়ে নিয়ে দেখে দেখে চিনতে না পেরে, ওর মায়ের হাতে দিলো, ছবিটা দেখেই ওর মা বলে উঠলো,
:- এটাতো তোমার বাবা’র ছবি বাবা!

আমি চমকে উঠলাম!
:-মানে!
মানেটা মহিলাটিই ভেঙ্গে দিল-আমাদের ছেলেটিকে কাছে টেনে নিয়েই বলল,
:বাপধন, আমিই তোমার প্রথম মা।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত ছেলে কিচ্ছু বুঝলো না, আমিও না! ছেলেকে আদর করতে করতে মহিলা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
:-দাদা-আমি সেই সৌদামিনী, বিশ বছর আগে যাকে এই ছবিটা দিয়েছিলে তুমি। আমি এখনো তোমাকেই ভালবাসি-ভালবাসি।
চমকে উঠে চোখ তুলে দেখি-আবেগে আপ্লুত সৌদামিনীর দু’চোখের কোণে জমে উঠেছে ভালবাসার জল।

ডিএনএ গল্পকার – অভিষেক সাহা

” দেখ নির্মল, তোকে একটা কথা বলি কিছু মনে করিস না, তোর একটা ডিএনএ টেস্ট করিয়ে নিস !” বেশ গম্ভীরভাবে নির্মলকে কথাগুলো বলল ওর ছোটবেলার বন্ধু তমাল।
” হঠাৎ একথা বলছিস কেন? আমি খামোখা ডিএনএ টেস্ট করাতে যাব কেন ?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল নির্মল।
” না মানে, আমি তো তোকে সেই নেংটু বেলা থেকে চিনি। এখন আমাদের পঁয়ত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেল, আমি তো তোকে শুধু ডাল-ডালে চিনি না, পাতায় পাতায়, শিরায়, উপশিরায় চিনি। সত্যি বলতে কী, তোর মত ভালো মানুষ আমি  এখন পর্যন্ত আর একজনও দেখিনি। ছোটবেলা থেকেই তুই পড়াশোনায় ভালো, মাঝেমাঝে ফার্স্ট- সেকেন্ডও হয়েছিস। তাছাড়া কত সুন্দর ছবি আঁকতিস, ক্রিকেটও খেলতিস। কিন্তু এসব নিয়ে তোকে কোনো দিন গর্ব করতে শুনিনি। বড় হয়েও একই নম্র- ভদ্র আছিস। কেউ কেউ একটা কেরানির চাকরি করে নিজেকে হনু ভাবে। সেখানে তুই সরকারি হাইস্কুল টিচার। কিন্তু এটা নিয়েও কোনদিন হামবড়া ভাব দেখাস না ।” একটু থামল তমাল।
” সে তো সব বুঝলাম, কিন্তু এর সাথে ডিএনএ টেস্টের সম্পর্ক কী ?” প্রশ্ন করল নির্মল।
” উফ্, এখনও কথা শেষ হয়নি, পুরোটা শোন। তোর বৌ চুমকিও বেশ লক্ষ্মীমন্ত। ঘরে তোর সঙ্গে যাই করুক, বাইরে কিন্তু খুব শান্ত। জানিস তো, স্কুলে থাকাকালীন আমার বাবা আমাকে তোর উদাহরণ দিয়ে বলতেন নির্মলের মত হ। আর এখন আমার বৌকে তোর বৌ-এর উদাহরণ দেয়…” এবার তমালকে থামিয়ে নির্মল কিছুটা বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল ” তুই কী শুরু করলি বলত সকাল সকাল। কী বলতে চাস সোজাসুজি বল না ভাই, আর নেওয়া যাচ্ছে না ।”
” তোর ছেলেটা এমন হল কেন রে?” হতাশা মেশানো গলায়  তমাল জানতে চাইল।
” মানে ! কী বলতে চাইছিস ?” নির্মল বিস্ফারিত চোখে বলল।
” তুই জানিস তোর ছেলে কী করে? সবে তো ক্লাস এইট, এখনই এতো। কী স্কুলে, কী পাড়ায়।  সবার সাথে মারামারি করে , ঝগড়া করে, টিচার না থাকলে বেঞ্চের উপরও উঠে পড়ে। খেলতে গিয়ে রোজ কারুর না কারুর  সাথে হয় মুখোমুখি ,নয়ত হাতাহাতি করে। চিৎকার করে কথা বলে। কারুর কথা শোনে না, শুধু নিজে  বলবে। আমার ছেলেটা তো ভয়ে ওর ছায়ার সামনেও যায় না। তোরা দু’জনে এত শান্ত, আর তোর ছেলেটা এত দুর্দান্ত তো, তাই ডিএনএ টেস্টের কথা বলছিলাম।” তমাল মন খুলে সব কথা বলল।
 মুচকি হেসে শান্তভাবে নির্মল বলল ” দেখ তমাল, এই যুগে শান্ত- ভদ্র লোকেদের মানুষ বোকা ভাবে। দুর্দান্তদের জয়জয়কার। দুর্দান্ত না হলে বড় কিছুর কথা বাদ দে, মিডিয়ার টক শোতেও কেউ চট করে ডাকবে না !”

আমরা কি পিছু হাঁটছি? শম্পা সাহা

সমকামিতা সম্পর্কিত একটি লেখা ভালো লাগায় ফেসবুকে আমি সেটা ভালো লেগেছে জানিয়ে কমেন্ট করি, তাতে একজন আমায় প্রশ্ন করেন, “দিদি, আপনি কি সমকামিতা কে সমর্থন করেন? ” তাকে আমি যে উত্তর টা দিয়েছিলাম সেটা হল,
“আমি ব্যক্তি স্বাধীনতা কে সমর্থন করি”।

আমরা মানুষ সমস্যায় পড়লে তাকে সাহায্য করার মত সময় দিতে পারিনা, কোনো মানুষ একাকীত্বের কারণে ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনের দিকে চলে যায়। শেষে হয়তো জীবন টাও শেষ করে দেয়। তাকে দু মিনিট কথা বলে তার একাকীত্ব কাটাতে সাহায্য করতে পারি না।

রাস্তায় কেউ অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে পড়ে থাকলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার মত সময় আমাদের হাতে নেই।

বৃদ্ধ বাবা মাকে দেখাশোনা করতে হবে ভয়ে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসি কারণ আমরা ভীষণ ব্যস্ত! আমরা ব্যস্ততার অজুহাতে সম্পর্ক গুলোর গলাটিপে ধরি।

অথচ কে কাকে চুমু খাচ্ছে, কে মেয়ে হয়ে মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, কে কার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক রাখে এ বিষয়ে ভীষণ তৎপরতা দেখাই।

সেখানে সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে, বিরোধিতা করতে ভীষণ ভালোবাসি।

আমাদের সরকার সমকামিতা কে স্বীকৃতি দেবে না কারণ তা সন্তান উৎপাদন কে সম্ভাব্য করে না, কিন্তু এতে করে যে নিঃসন্তান দম্পতিদের বৈবাহিক স্বীকৃতিও কেড়ে নেওয়া হলো, না তাই নয় কি?

আমরা কি আবার সেই “পুত্রার্থে কৃয়তে ভার্যা”, তে ফিরে যাচ্ছি?
আমরা কি, live and let live”, ভুলে যাচ্ছি, আর শুধু নাক গলাতে শিখছি সব ব্যাপারে?

নিরাপদ ভালোবাসা – প্রদীপ দে

আবেগ প্রেরণা’কে ধরে ফেলে। প্রেরণা হতবুদ্ধি আজ। যা ভাবার বাইরে ছিল তাই ঘটে গেল। নিয়তি কাকে বলে?

প্রেরণার মা আজ সকালেই ছাদে কাপড় মিলতে গিয়ে ছাদ প্যারাপাড বিহীন থাকায় আচমকা নীচে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়।

একমাত্র কন্যা হওয়ায় ওই মুখাগ্নি করে এবং শোকাতুর হয়ে পড়ে। দৌড়ে চিতার সামনে থেকে সরে যেতে গিয়ে শাড়ির আঁচল আটিকে যায়। বিপদ হতে পারতো। আবেগ তৈরী ছিল, প্রেরণাকে ধরে সান্তনা দেয়।

কপাল একেই বলে! একা প্রেরণা যখন একেবারেই একা শুধু আবেগ ওকে আগলে রেখেছিল ঠিক তখনই মাস খানেকও হয়নি,বছর খানেক আগের দেওয়া ব্যাঙ্ক সার্ভিস পরীক্ষার ফলে ও উর্ত্তীর্ণ হওয়ার খবর আসে এবং আরো মাস দুয়েকের মধ্যেই ওর চাকরি পাওয়া হয়ে যায়।

প্রেরণা’র মন নেচে ওঠে। পুরানো স্মৃতি সে ভুলে যেতে চায়। চায় নতুন করে জীবন গড়তে যেখানে সে একাই সকল সিদ্ধান্ত নেবে। আবেগের দায়িত্ব থেকে সে নিজেকে বের করে নিতে চায়। অতীতকে
অস্বীকার করে নতুনভাবে বাঁচতে চায়।

প্রেরণা আবেগ ‘কে সব জানায়। ওকে মুক্তি দিতে চায়। ওর মনে হয় আমি ওর বোঝা হয়ে পড়েছিলাম।

আজ সে চলে যাচ্ছে নতুন জায়গায় নতুন চাকরির পোষ্টিং নিয়ে।
আবেগের মন খারাপ। তবুও হেসে মেনে নেয় তার এই যাওয়া।

হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরবে প্রেরণা। আবেগ সঙ্গে যায়। মেদিনীপুর লোকাল। ভীড়ে ভীড়। প্রেরণা ট্রেনে উঠতে গিয়ে আচমকাই হাত ফস্কে পড়ে যায় – আবেগ ছুটে এসে প্রেরনাকে ধরে ফেলে। ট্রেন ততোক্ষনে গড়িয়ে চলেছে। প্রেরণা হতবুদ্ধি হয়ে যায়, মায়ের দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। ভয়ে চোখ বুঁজে ফেলে। আবেগ ততোক্ষনে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে ফেলেছে।

ট্রেন এবার নিজের গতি বাড়িয়ে প্ল্যাটফর্ম ছাড়ে। চতুর্দিকের প্রচন্ড কোলাহল নিমেষে স্তব্দ হয়ে যায়।
বাহ্যিক সমস্ত ইচ্ছা অনিচ্ছা হারিয়ে ফেলে প্রেরণা। আবেগকে ভালোবেসে জাপটে ধরে রাখে।

প্রেরণা নিজেকে নিরাপদ ভাবে…….
চোখের জলে আবেগের বুক ভিজে যায়……
আজ ভালোবাসা তার নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে…….

কবিতা সমগ্র – ১

শহুরে প্রেম 

 শ্রী রাজীব দত্ত 

শহুরে প্রেম শ্রী রাজীব দত্ত

 

সুন্দরী তিলোত্তমা
উত্তর থেকে দক্ষিণ।
তোমার অপরূপ সৌন্দর্য
বেস্ততা ট্রাম লাইন, বড় বড় হোডিং ।
পুরনো ঐতিহ্য উত্তর দিক
নতুনের ছোঁয়ায় দক্ষিণ।
টানা রিক্সা, হকারদের হইচই
ব্যস্ত থেকে ব্যস্ততম প্রতিটা ক্ষন, প্রতিটা দিন।
বই পাড়া তে বইয়ের গন্ধ
কফি হাউসের আড্ডা।
দক্ষিণেতে বড় বড় শপিং মল
ঝকমক আলোতে সুসজ্জিত সন্ধ্যা।
ময়দানেতে শীতল বাতাস
মনুমেন্ট, ভিক্টোরিয়া।
কাবলি ছোলা, বাদাম ভাজা
নতুন প্রেমের ছন্দের মন প্রিয়া।
শহরটা জুরে কেবলই স্মৃতি আর আশা
তিলোত্তমা কলকাতা তুমি আমার ভালোবাসা।

অভিনব সূত্র  -  রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

অভিনব সূত্র  –  রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

চারদিকে জটিল চোখে তাকিয়ে আছে
জটিলা কুটিলার জটিল সংসার
অতএব একমুঠো জল মানে , মুঠো মুঠো জটিল অঙ্ক
গাণিতিক নিয়মে এক্স ওয়াই ধরে জল ভেঙে
প্রকৃত সূর্যোদয়ে‌ পৌঁছনোর কোনো পথ নেই
বরং ভেতরে গঙ্গা গীতা স্পর্শ করে
দক্ষিণ হস্তের পাঁচটি আঙ্গুলকে
চোখ বুজে পঞ্চপাণ্ডব রূপে ভেবে নিতে পারো
তারপর বুকের ওমে উষ্ণ করো মুঠি
বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে সেই মুষ্ঠিবদ্ধ হাত –
কৌরবনাশী ছন্দে অনায়াসে ছুঁতে পারে
ধর্মযুদ্ধের জয় পতাকা ……

এই অভিনব সূত্র‌ ধরেই প্রতিদিন দৃঢ় হই
মুঠো মুঠো অঙ্ক ভেঙে
যাপনের পাতায় লিখি উত্তরণের কবিতা ।

দশটি অন্তমিল

দশটি অন্তমিল

কলম-শম্পা সাহা

১) মুখোশ পরতে ভয় কি?
মুখোশই তো পরে আছি, নয় কি?

২) মরুভূমি হবে নদী
তুই ছুঁয়ে দিস যদি।

৩) তোর আঁচলে আমার আকাশ শাড়ির ভাঁজে নদী
শুনতে পেতিস জলের আওয়াজ আমি হতিস যদি।

৪) একটা চুমু ঠোঁটেতে খাই আর একটা তোর চোখে
অন্য একটা কপালে খাই বলুক যা খুশি লোকে।

৫) ঘামের গন্ধে বড্ড বমি পায়
শ্রমজীবী তবু দল বেঁধে আজও “উই শ্যাল ওভার” গায়।

৬) বেকারত্বের রেললাইনে রক্ত মাখানো রুটি
গ্রানাইটে পড়ে বেওয়ারিশ লাশ গণতন্ত্রের ছুটি।

৭) ঠোঁটের কোণে সিগারেট আর চোখের কোণে হাসি
তোর ই দ্ব্যর্থ রূপকে আমি বড্ড ভালবাসি।

৮) নামী কিংবা অনামী
সব স্বপ্নেরা দামি।

৯) লাশ টেনে নিয়ে যায় হূঁকে বুক ঠুকে
গণতন্ত্র অগ্ৰসর সামনে একটু ঝুঁকে।

১০) অশ্লীলতা পোশাকে নয় অশ্লীলতা চোখে
কেউ কেউ তাই শিশু শরীরেও যৌনতাই দেখে।

 

 

কবির বাসর মহীতোষ গায়েন

কবির বাসর –  মহীতোষ গায়েন

 

কবির মৃত্যু হলেও কবিতার কোন মৃত্যু হয় না,
কবিতার অনন্ত উড়ান চলে যায় অবলীলায়…
কবি আসে,কবি যায়,কবির নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে
বিলীন হয়,কবিতা অমরত্ব পায় সংসার চরাচরে।

কবিতা লিখতে লিখতে কখন যে কবি হয়ে ওঠা
কবি নিজেও জানে না,জানে সমূহ সমাজ,জানে
লতাপাতা,ফুল পাখি ও নদী আর জানে ব‍্যথাদীর্ণ
মানুষ,সময়-অসময়,কাল-অবেলার নারী পুরুষ।

কবি মরে,কবি পোড়ে,কবি ডোবে,কবিতা থেকে
যায় সংগ্রামে,আন্দোলনে,একদিন প্রতিদিন সৃষ্টি
হয় ইতিহাস,কবি হাসে,কবি কাঁদে,প্রেমে বাঁচে,ও
প্রেমে মরে,বাসরে অম্লান কবি ও কবিতার ফুল।

পাঁচালী গান –– সুমিত মোদক

পাঁচালী গান  – সুমিত মোদক

 

আমাদের গ্রামে আজও শোনা যায় পাঁচালী গান ;
আশেপাশের পাড়া থেকে মা বোনেরা আসে
গান শুনতে ;
পাঁচালী গান …
সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে ফি বছর
শীতলার পূজার দিন  ভর দুপুরে গান বসে ;
পাঁচালী গান : শীতলার গান …
কি মনে হল , বহু দিন পর শুনতে গেলাম  ;
সেই চেনা ছন্দে , চেনা ভঙ্গিতে অভিনয় করতে করতে গেয়ে চলেছে মঙ্গলকাব্য কথা ;
তাদের মতো করে ;
আমার দক্ষিণবঙ্গের মতো করে ;
আগে দেখতাম আশেপাশের গ্রামে পাঁচালী গানের দল থাকতো ;
এখন আর দেখতে পাই না ;
এখন সেই লাট অঞ্চল থেকে , সেই  সুন্দরবন এলাকা থেকে
পাঁচালী দল ভাড়া করে আনতে হয় ;
এলাকার তপসিলি মানুষ গুলো আজও ধরে রেখেছে তাদের নিজস্ব পরম্পরা , সংস্কৃতি ;
পাড়া ঝেটিয়ে সকলে এসে হাজির হয় পূজা প্রাঙ্গণে ,
পাঁচালী গান শুনতে ;
বছর বছর ধরে একই গান , একই সুর , একই আছে ;
কেবল বদলেছে সংসারের চালচ্চিত্র , সুখ-দুঃখ …
কেবল বদলায়নি গ্রাম্য সংস্কৃতি ;
সেই ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি
আজও ,
পাঁচালী গানে সকল নারী চরিত্র গুলো আভিনয় করে ছেলেরাই ;
পাঁচালী দলের কম বয়সী মেয়েলী ছেলেটার বেশি কদর ;
সে সাজে শীতলা ;
মেয়েলী কন্ঠে কথা বলে , গান করে ,
পাঁচালী গান …
গানের শেষ সেই ছেলেটার সঙ্গে কথা হচ্ছিল ;
অভিনয়ের কথা , জীবনের কথা ,
সমাজের কথা ;
ধীরে ধীরে মেয়ে হয়ে ওঠার কথা …
কথা যেন আর শেষ হয় না ;
সে যেন আরেক পাঁচালী , আরেক পরম্পরা ।।

চৈতি চাঁদে

চৈতি চাঁদে – সুকান্ত মজুমদার

দূরত্বই যেন অপ্রকাশিত তুমি,

তোমার সম্মুখীন আমি, কিছুক্ষণ
এক অনবদ্য দীগন্তের শূণ্যতা।
মুষ্টিবদ্ধ আবেগ উড়িয়েছি
দৃশ্যমান অনুরাগের আকাশে
যেখানে তোমার শীতল মুখ স্থিত,
এক টুকরো সাক্ষাত জীর্ণতা হয়ে
অপ্র‌য়োজনীয় মুহুর্তের দিবালোকে
বসন্তের পরাকাষ্ঠায় তাচ্ছিল্যের ধুলো –
তারা ঝরে ঝরে পড়ছে
তোমার প্রত্যাগমনের উদাস দুপুরে
কথিত প্রেমের পলাশ পুরে,
দেখি একমনে নিমগ্নে রিক্তের উদ্যানে
তোমার নুপুর পরা পায়ের কাঞ্চন
তোমার চুলে উথলী কৃষ্ণচূড়া
ওষ্ঠাগত আবেশভরা আম্র মকুল,
সবাই সেই তেমনি ভালো আছে –
তাদের সাথে আমিও জড় বিন্যাসে
চৈতি চাঁদের আলে পথিক হয়ে

তোমার দূরত্ব মাপি সারারাত,অভ্যাসে।

জাগিও না ২২/০২/২০২১ রণেশ রায়

জাগিও না  -রণেশ রায়

এই কি সেই ঘুম চেয়েছিল সে !

উঠবে না আর, সে আজ চির শয়নে

ঘুমিয়ে থাকে চিরতরে আনন্দ লোকে,

শস্য খেতে শিরীষ এর মুখে

শিশির সিক্ত বোবা হয়ে তাকিয়ে,

সূর্য কন্যা মুখ লুকিয়ে চোখ মোছে

পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার আলো আঁধারে,

সখ তার হয়েছিল বিদায় নেবার

তাই বুঝি  আনন্দ লোকে

আজের এই অস্তাচলে

আনন্দ বিহার তার

ঘুমায় এবার চিরতরে।

আশা ছিল ভরসা ছিল

ছিল তার সখ

ছিল বাঁচার সাধ

ছিল তার প্রিয়জন সব,

তাও কাল বৈশাখীর ঝড়ে

আমের মুকুল ঝরে পড়ে

শীতের ঠান্ডায় রাত ভোরে

গাছের পাতা ঝরে,

সে ঘুমায় আনন্দ লোকে

আজের এই অস্তাচলে

আনন্দ বিহার তার

জাগবে না আর

গভীর ঘুম তার চিরতরে।

এ কুঞ্জ বনে সেদিন রাতে

গুটিগুটি পায়ে পেঁচা এক

এসেছিল নীরবকে সাক্ষী করে

চাঁদ ফেরার অমাবস্যার রাতে

গাছের পাতার দোলায় সে দুলেছিল

ফুলের গন্ধে বাতাসের মিষ্ট সুবাসে

কার হাতের হিমস্পর্শে

ঘুমিয়ে পড়ে সে চিরতরে

আনন্দ লোকে

আজের এই অস্তাচলে

আনন্দ বিহার তার

আর জাগবে না সে।

সেদিন সুকন্যা ডেকেছিল তাকে

গভীর অন্ধকারে বিজনে বিহনে

যাবার ইচ্ছা হয় নি তার,

সুকন্যা ফিরে গেছে,

সেদিন ডেকেছিল তাকে  বার বার

এই কি ইচ্ছা ছিল তার

কোনোদিন উঠবে না আর

ঘুমিয়ে পড়ে চিরতরে

আনন্দ লোকে

আজের এই অস্তাচলে

আনন্দ বিহার তার

জাগবে না আর

গভীর ঘুম তার চিরতরে।

ঝাউ গাছের নিচে

বিশ্রামে শুয়ে ছিল সে

উট এসেছিল সেখানে

বাড়িয়ে দিয়েছিল পিঠ তার

তাও ওঠে নি সে

শুয়ে ছিল সেখানে

ঘুমিয়ে পড়েছে চিরতরে

আনন্দ লোকে

আজের এই অস্তাচলে

আনন্দ বিহার তার ।

সেদিন গ্রীষ্মের দহনে

নগ্ন শরীরে উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল মাঠে

তিনদিন অভুক্ত খায় নি কিছু

তৃষ্ণার্ত খোলা চোখ তার

তাকিয়েছিল আকাশ পানে

মেঘ অশ্রু হয়ে নেমেছিল

দিয়েছিল জল তৃষ্ণা মেটাতে

তৃষ্ণা মেটেনি তার

সে শুয়ে ছিল মাঠে ওঠেনি আর

ঘুমায় সে আজ চির তরে আনন্দ লোকে

শান্তিতে ঘুমাক জাগিও না তাকে

আনন্দ বিহার তার

আজের এই অস্তাচলে।

বৃষ্টির পরবর্তী বৃত্তান্ত রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

বৃষ্টির পরবর্তী বৃত্তান্ত  – রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

বৃষ্টি হলেই দৌড়ে যাই তোমার প্রেক্ষাপটে
ঢলে পড়া সূর্যের চোখে তখন ভাতঘুম
নয়ত বা সূর্যাস্ত খুনে সন্ধ্যার প্রস্তুতি
কিম্বা এলোচুলে ছড়িয়ে পড়ে মহামায়া কালি
বৃষ্টি হলেই দৌড়ে যাই তোমাকে ভেজাতে
তোমার কর্ণ চির জাগ্রত শিক্ষক…..

বৃষ্টি হলেই দৌড়ে যাই তোমাকে ভেজাতে
ভেজাতে এসে দেখি, ডুবে আছো পৈতৃক টাটে
নিত্তি ধরে বয়ে যাচ্ছো বিকি কিনির পাতায়
কাঙ্খিত রোদে ভর্তি করছো কাঙ্খিত কলম
তোমাকে ভেজাতে এসে আমিই ভিজে যাই
তোমার যাপনের কীর্তনে…..

নির্মাণের ক্লাসে দ্ব্যর্থক তুমি সার্থক অলঙ্কার
জাত শিল্পী তুমি জাত রাঁধুনি
তোমার যে হাত যন্ত্র থেকে যন্ত্রাংশ চেনে
সেই হাতে কলমও কথা বলে অফুরন্ত রোদ্দুর
ভেতরে ভেতরে কাত হয়ে থাকলেও কেয়াবাত
ভাঙা-গড়ার নৈপুণ্যতায় তুমিও একটা নদী…..

প্রতিনিয়ত আমিও ভাঙতে ভাঙতে ছুটি
তথাপি জলের ভাঙা অলংকারগুলোকে
ঠিক তোমার মতো করে গালিয়ে পিটিয়ে ছাঁচে ফেলে
অসাধারণ কোনো নবজন্ম দিতে পারিনা
জল ভাঙতে ভাঙতে বিনা সিজারেই
বাচ্ছা দেয় আমার পোয়াতি কলম …..

একমাত্র অনাবৃষ্টির দিনগুলোতে
হাড়ে হাড়ে টের পাই বেহাল চাতকদশা
হালের পানি খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়ি
আল্লা মেঘ দে , পানি দে আখড়ায়
বৃষ্টি হলেই দৌড়ে যাই তোমার প্রেক্ষাপটে
নাইট্রিকের হলুদ ইতিহাসে নিখাদ হবো বলে ……।

আবার দেখা হবে চ‍্যাটার্জী অমল

 

আবার দেখা হবে  -চ‍্যাটার্জী অমল

হ্যাঁ, বন্ধুূ দেখা নিশ্চয়ই হবে,
সকালে ভিজে হাওয়ার তীক্ষ্ণ শীসের সাথে
চড়াই উৎরাই ভেঙে ধীরগতিতে এগিয়ে যাওয়া অজানা
কোনো পথের বাঁকে বা মাথার উপর জ্বলন্ত সূর্য রেখে
আকাশ ও দিগন্তের মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায়,
যেখানে থাকবে উচ্ছ্বাস ঝাপানো সবুজ ক্ষেত বা মস্ত
বড় ময়দান । সূর্য ডোবার শেষ সাক্ষী হতে তুমিও এসো
বন্ধু, দেখা হবে।

ক্রীতদাস প্রেমের অবশিষ্ট আর কিছু হলুদ স্মৃতির
বোঝা কাঁধে আমি থাকবো সেখানে বুনো দীর্ঘশ্বাস
ফেলে।যে বিশ্বাস আমি কপাল ঠুকে খেয়েছিলাম,
বদহজমের বন্ধুত্তে তার মাটি হয়েছে অনুর্বর । সময়
তার পদচিহ্ন এঁকে গেছে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে।
শরনার্থীর মতো ভিড় করে আছে আমি কখনো দেখতে
চাইনি সেইসব স্বপ্নের টুকরো টুকরো কোলাজ। তাদের
মাঝে থেকো বন্ধু, নিবিড়ভাবে খুঁজলে পাবে নানান
অজানা কথার পটভূমি।

হ্যাঁ, সেদিন থাকবেনা বাহারি আয়োজনে স্মরণের
পিছুটান। সেদিন নতুন পাতায় ভালোবাসা বা বারুদের
নতুন অধ্যায়ে হবে হয়তো আর একটি গল্পের অধিবাস।
পৃথিবী যখন গোল তোমার সাথে আমার আবার দেখা
হবেই হবে বন্ধু পৃথিবীর যেকোনো ময়দানে ।

রোজনামচা মো: হাবিবুর রহমান খাবারটা পোড়া পোড়া, হাঁস না মুরগী মরা বুঝা যায় না, হলের জীবন শুরু পরাণটা দুরুদুরু ভাতে মজা পায় না। একটি রুটি ভাজা, রানটা তাজাতাজা, ছালাত তো দেখা যায় না, বোতল দেখছি কিছু তব সামনে পিছু, চেহারা চেনা যায় না। বিদেশের মাটিতে বাসায় বা গাড়িতে ব্যস্ত হাউসফুল ফেসবুকের পৃষ্ঠায় ইচ্ছা অনিচ্ছায় পোষ্ট করি ভুল-নির্ভুল। ফেসবুকের উছিলায় আজকের এ দুনিয়ায় যুক্ত থাকি যত পারি ভার্সুয়াল কানেকশন দূর হয় টেনশন ভালবাসি সন্দেহ ছাড়ি। আছেন ভাই বা ভাবীজান সামনে এগিয়ে যান দূরীভূত হোক অবিশ্বাস যে যেখানেই থাকি দিই না মনেরে ফাঁকি রাখি পরস্পরে বিশ্বাস। রচনাকাল: ২ মার্চ ২০২১ স্থান : আপনালয়, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা।

রোজনামচা – মো: হাবিবুর রহমান

 

খাবারটা পোড়া পোড়া,

হাঁস না মুরগী মরা

বুঝা যায় না,

হলের জীবন শুরু

পরাণটা দুরুদুরু

ভাতে মজা পায় না।

 

একটি রুটি ভাজা,

রানটা তাজাতাজা,

ছালাত তো দেখা যায় না,

বোতল দেখছি কিছু

তব সামনে পিছু,

চেহারা চেনা যায় না।

 

বিদেশের মাটিতে

বাসায় বা গাড়িতে

ব্যস্ত হাউসফুল

ফেসবুকের পৃষ্ঠায়

ইচ্ছা অনিচ্ছায়

পোষ্ট করি ভুল-নির্ভুল।

 

ফেসবুকের উছিলায়

আজকের এ দুনিয়ায়

যুক্ত থাকি যত পারি

ভার্সুয়াল কানেকশন

দূর হয় টেনশন

ভালবাসি সন্দেহ ছাড়ি।

 

আছেন ভাই বা ভাবীজান

সামনে এগিয়ে যান

দূরীভূত হোক অবিশ্বাস

যে যেখানেই থাকি

দিই না মনেরে ফাঁকি

রাখি পরস্পরে বিশ্বাস।

 

রচনাকাল: ২ মার্চ ২০২১

স্থান : আপনালয়, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা।

গোপনসঞ্চারী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

গোপনসঞ্চারী  – মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

নগ্ন হাতের তালুতে
মিহি রোদের অনন্য হাসির রঙলেপা
সুখের উঠোন,
ছিলো একমাত্র অন্ধকার বন্যতা
চায়না রাণীর বিনম্র অপলক চোখে

কহর পড়া ভবিষ্যৎকাল নিয়ে
রচনা লিখেছি নিতাই পণ্ডিতের স্কুলে
নড়বড়ে বেঞ্চে বসে

কাঁদানেগ্যাস দিয়ে ঠেকাতে ঠেকাতে একদিন
শ্যাওড়াতলার পাবলিক বাসের মতো ভূতটা
গায়েবী বাণিজ্যের সুটকেস খুলেছে

স্টীমরোলারে রুটিরুজি,
চাপা পড়া কারখানার
বিদ্রোহী চাকার দায়বদ্ধ শরীর
অপারেশন টেবিলে কোটিটাকার ডাক্তারি
দেখে স্বপ্নবাজ চায়না রাণী

শ্বেতকবুতর কই,আমার শ্বেতকবুতর–
ধূসর বেলার সর্বশেষ মৃতফুলটা
নিয়ে যাও

কবিতা-খেলাঘর কলমে-নিবেদিতা চক্রবর্তী

কবিতা-খেলাঘর –  কলমে-নিবেদিতা চক্রবর্তী

 

সংসারের এই খেলাঘরে

মাটি পুতুলখেলায়

দুঃখে সুখে আনন্দেতে

ভাসি জীবন ভেলায়।

দায়িত্ব আর ভালোবাসায়

গড়ি যতন ভরে

সংসার সাজিয়ে তুলি

স্বার্থকে ত্যাগ করে।

সুখে যেন থাকে সবে

তারই প্রচেষ্টাতে

ব্যস্ত থাকি নিজের কথা

আসেনা ভাবনাতে।

ক্রমে ক্রমে বয়স বাড়ে

ক্লান্ত ও হই শ্রমে

দেবার সাথে সাথে কিছু

না পাবার খেদ জমে।

অভিমানে মাঝে মাঝে

অনেক কষ্ট পাই

ভাবি মনে সংসারে কি

আমার দামটি নাই?

যখন দেখি সুখে সবে

আছে হাসি মুখে

অপার তৃপ্তি পাই আমি

আমার সৃষ্টি সুখে।

কী দিলাম আর কী বা পেলাম

লাভ কী হিসেব কষে

জীবন সায়াহ্নে আজ

ভাবি তা-ই বসে।

সুখে থাকুক প্রিয় জনে

অন্তর তো সেটাই চায়

খেলা শেষে ফিরতে হবে

এবার আপন কুলায়।

মাথা উঁচু রাখো রতন বসাক

মাথা উঁচু রাখো – রতন বসাক
ভাবছো কেনো সবাই সমান
এই সমাজের বুকে,
বুঝতে পারবে আসলটা কি
একটু দেখো ঢুকে।
এমন কাজটা করার জন্য
ভাবো নিজে মন্দ,
তার কারণেই তোমার মনে
চলতে থাকে দ্বন্দ্ব।
নারী তুমি তোমার শ্রমটা
করো কারো জন্য,
মনে রেখো সেই অর্থতেই
হচ্ছে তারা ধন্য।
লজ্জা ঘৃণা অার করো না
মাথা উঁচু রাখো,
নিজের কাজে গর্ব করেই
নির্ভয়েতে থাকো।
মানুষ তুমি নারীর রূপেই
চিন্তা ফেলে হাসো,
নিজেকে তাই একটু বেশি
আগে ভালোবাসো।

পুঁটি আর কড়াইশুঁটি

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

ঠিক বারোয় পড়েছি তখন | ঐ বয়সেই একটা নয় বছরের মেয়ে জুটলো আমার | দুর্দান্ত | দুরন্ত | কিম্ভুত সাজপোশাক | কোনোদিন যদি ঘেরওয়ালা ফ্রকের সাথে একটি পকেটওয়ালা খোকাপ্যান্ট পড়লো তো আরেকদিন কেশহীন মুন্ডুতে বাঁধলো একটি চকরাবকরা রিবন | পাড়ার খুড়িপিসিদের বলতো —মা ছাড়াই মামা মাসীদের কাছে মানুষ হচ্ছে অভাগী |

মা কোথায় গেলো , আবার কোনোদিন ফিরবে কিনা,মা ছাড়া সে মেয়ে কতটা দুখ বয়ে বেড়ায় এসবে একছটাকও কৌতুহল না দেখিয়ে প্রথম দিনই ঠিক করে নিলাম এ মেয়ের মা হবো আমি | নাম দিলাম পুঁটি | সে হলো আমার পুঁটি মেয়ে |

পুঁটি মেয়েকে লালন করা কিন্তু সোজা হয়নি আমার পক্ষে | প্রথম কথা বারো বছরের মা আর নয় বছরের মেয়ে | আমি যদি তার ইজেরের ইলাস্টিক টেনেটুনে ঠিক করে দি তো সে তৎক্ষণাৎ আমার ঘটিহাতা ছোট্ট ব্লাউসটার টিপ বোতাম লাগিয়ে দেবে | আমি যদি তাকে কদবেল জারিয়ে খাওয়াই তো সে আমায় দলা পাকিয়ে গেলাবে সরস্বতীপুজোর চালমাখা | কাঁচা চাল ভেজা -, মুগডাল যত ফালতু জিনিষ গিলে মরো এবার |

দ্বিতীয় কথা হলো তার মা যে নেই এবং বাকিদের মা যে আছে , এই থাকা না থাকার গ্যাপটাই ধরতে পারছিল না সে | শোকতাপের বালাই তো নেইই –দিনরাত রাক্ষসী হাসি হেসেই চলেছে | আহা রে মা নেই —কোনোরকমে এরকম একটা অনুভুতি তৈরি করে যখনি তার মাথায় বিলি কাটতে গেছি ফিনফিনে চুল দুলিয়ে ছুট লাগিয়েছে পুঁটি মেয়ে |

দুদিনের মধ্যে আর এলোই না মোটে আমার কাছে | মায়ের আদরে তার এমনি অনীহা যেদিন আদর আদর বাই চাপতো আমার , বিনাবাক্যে সে আমায় মারতো এক চড় | ব্যাস এবার তার বারো বছরের মাও মারপিটে নেমে পড়লো |

পারছিলাম না | পারছিলাম না | কিছুতেই মা হওয়ার খেলায় জিততে আর পারছিলাম না | এরই মাঝে বড় মাঠে দুধেল গাই মরল | পুঁটি মেয়ের বায়না মরা গরুর চোখ কেমন খুলে থাকে তাই দেখবে | বলাবাহুল্য পুঁটিমেয়ের এইসব বিদিকিচ্ছিরি আবদারে পরের দিকে আর তেমন অবাক হতাম না | মাকে লুকিয়ে দুজনে মিলে গেলাম মরা গাই ঘাঁটতে | হাতপা ছড়িয়ে কাঁদছে গরুর পালক | হিহি করে হাসছে রাক্ষসী পুঁটি | মুখ চেপে ধরে আছি শয়তান মেয়েটার |

হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে সে দৌড় দিলো অনেকটা দূরে একা ঘুরতে থাকা একটা বাছুরের দিকে | হাঁ করে দেখলো খানিক | তারপর টেপফ্রক তুলে গোল্লা পাকিয়ে বানালো এক ঘেরাটোপ | ছোট্ট মুণ্ডু ঢুকিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলো | কত করে বোঝাতে লাগলো সবাই , বাছুরটা মৃত গাভীর নয় | এর মা বেঁচে আছে | তবুও কাঁদল পুঁটি | চোখ খোলা মরা মায়ের পাশে যে কোনো এক বাচ্চার একা হয়ে থাকাটাই কাঁদালো তাকে | কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেলো তার | শিকনি বেরিয়ে গেলো ফতফত করে |সেদিন আমার পুঁটিমেয়ে মাঠের মাঝেই দুম করে চড়ে বসলো তার পুঁটিমায়ের কোলে | মাঠের মাঝেই দিকবিদিক ভুললো পুঁটিমা |

কড়াইশুটির ছাড়ার তলে
সবুজ মটর খেলে |
সে কত্ত |

ক্লিক করুন
ফেসবুক পেজ লিঙ্ক

https://www.facebook.com/storyandarticle/posts/174490701144906


লেখাটি পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ

গল্পের সন্ধানে রাত জাগা – দীপঙ্কর বেরা

সমস্ত বিকেল ধরে গল্পের সন্ধান করে চলেছি
পাতায় পাতায় ছায়ায় ছায়ায়
কোথাও পাই নি তোমার মুখের সন্ধান ।
আমি জানি তোমার মুখই আমাকে খুঁজে দেবে আমার মনের মনিকোঠায় সজানো সরল মানবতার গল্প ।
অলৌকিক কোনো রাজপুত্তুর বা রাজারানী নয়
একেবারে তোমার আমার গল্প ।
আমি জানলা দিয়ে আকাশটাকে ধরার আপ্রান চেষ্টা করেও
তোমার জন্য থমকে যাব দু-এক মুহুর্ত ।
তুমি মুখটি তুলে হাজার বার বলতে থাকবে
এই তো , তোমারই-মনে আঁকা গল্পের ডালি ।
তবুও আমার অবাক দৃষ্টি প্রেম খুঁজে বেড়াবে
সারা দিগন্তের সীমানায় ।
এমনি করে বিকেল থেকে রাত কেটে যাবে রাতের গভীরে
তারারা মিছিল করে আনাগোনা করবে আম কাঁঠালের বনে বনে
উজ্জ্বল কোনো দিনের খোঁজে সূর্য হয়ে যাবে মগ্ন তাপস
আদুরে গলায় তখনও তুমি আমার জন্য খুলে দেবে আগল
আমি রাত জাগা পাখির মত নিঝুম ডাকতে ডাকতে
হয়তো ঘুমিয়ে পড়ব , হয়তো বা উঠব জেগে
গল্পের জন্য কবিতাকে জড় করে
আমি আকাশ দেখব আর তোমার মুখের মধ্যে
মুখ রেখে আমি অঝোরে কাঁদবো আর
দূর অজানার সম্মুখ বাস্তব গল্প লিখবো ।
তুমি বলবে – পাগল ! গল্প কি এমন হয় ?
আমি সাধ্যের অকুলানে অসাধ্য অবস্থানে
তোমাকে জানিয়ে যাবই – আমি সত্যি গল্প লিখেছি গো
একেবারে তোমার আমার জীবনের মত সত্যি ।
তুমি একটিবার পড়ো ,
তাহলে বুঝতে পারবে গল্প কি করে কবিতা হয়
কবিতা কিভাবে সত্যি সত্যি আস্ত একটা গল্প হয়ে যায় ।

কাজের মেয়ে – জিল্লুর রহমান

আজ আলতা ঢাকা যাবে। মিয়া বাড়ির ছোট মেয়ে রুমা ঢাকায় থাকে, তার একমাত্র মেয়ে সবেমাত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটতে শিখেছে, তার সাথে খেলা করার জন্য, তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য আর রুমার সাংসারিক কাজে একটু-আধটু হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আলতার ডাক পড়েছে।

মিয়া সাহেব অনেক বড় মনের মানুষ, এই চরের মানুষের যেকোন বিপদে-আপদে সবার আগে মিয়া সাহেব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কারো মেয়ের বিয়েতে ডিমাণ্ড, কারো বুভুক্ষ মুখে ভাত তুলে দেয়া, এমনকি কারো অসুখ-বিসুখে নিজস্ব নৌকায় বিনা পয়সায় হাসপাতালে আনা-নেওয়ার কাজ। মিয়া সাহেবের দয়ার শেষ নেই। তাই মিয়া সাহেবের কথায় সাধারনত কেউ-ই না করে না। বরং মিয়া বাড়িতে কিংবা মিয়া সাহেবের কোন আজ্ঞা পাওয়া অনেকের কাছে সৌভাগ্যের ব্যাপার তো বটেই।

সেই মিয়া সাহেব ক’দিন আগে বাইরে দাঁড়িয়ে আয়নাল বাড়িতে আছ নাকি? বলে ডাকতে ডাকতে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। আয়নাল তখন বাড়িতে ছিল না, বড় মেয়ে আলতা রান্নাঘরে বসে মায়ের সাথে শাক কুটছিল আর ছোট মেয়ে আদূরি এইমাত্র স্কুল থেকে এসে বই-খাতা ঘরে রেখে সেও মায়ের সাথে কাজে যোগ দিল।
তছিরন শাড়ির ছেঁড়া আঁচল তাড়াতাড়ি মাথায় টেনে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, জি না, ওতো বাড়িতে নেই, মিয়া সাহেব বাড়িতে আসেন।
মিয়া সাহেব এলেন না, বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় গেছে?

ক্ষেতে।
কখন আসবে?
আপনি বাড়িতে আসেন, আমি এখন আসতে বলে পাঠাচ্ছি।
মিয়া সাহেব বাড়িতে ঢুকলেন। তছিরন উঠানে একটা পাটি বিছিয়ে দিতে দিতে বলল, আপনি বড় মানুষ আপনাকে কোথায় যে বসতে দিই? আমাদের ঘরে তো এই একটা ছেঁড়া পাটি ছাড়া আর কিছু নেই।
না, না এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই আমি তোমাদেরই মানুষ, এই পাটি কেন মোড়াতেও বসতে পারবো, বলে মিয়া সাহেব চটের উপর বসলেন।
তছিরন আদূরিকে ঘরে ডেকে নিয়ে হাতে টাকা গুঁজে দিতে দিতে ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল, যাতো মা, এই টাকাটা নিয়ে যা, বিস্কুট-চানাচুর আর চা-পাতা নিয়ে আয়, এতবড় মানুষ আমাদের বাড়িতে এসেছে, আমি এখন কী দিয়ে যে আপ্যায়ন করি।

আর চিনি? আদূরি জিজ্ঞেস করল।
চিনি আছে মা, তুই তাড়াতাড়ি যা, যাওয়ার সময় তোর বাবাকে বলে যাবি, আমাদের বাড়িতে মিয়া সাহেব এসেছে।
আচ্ছা, বলে আদূরি চলে গেল।
তছিরন ঘরের বাইরে এলো।
মিয়া সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ছেলেমেয়ে ক’জন যেন?
ছেলে নেই, শুধু দু’টা মেয়ে, তছিরন মলিন মুখে বলল।
এই মেয়েটাই বড় ?
জি, এটা বড় আর যেটা বাইরে গেল ও ছোট।
ছেলের আশায় যেন সংসারটাকে আর বড় করো না।
তছিরনের গলার স্বর কিছুটা করুণ হয়ে এলো, একটা ছেলে না হলে কী হয় মিয়া সাহেব?
এমনসময় আয়নাল বাড়িতে ঢুকে মিয়া সাহেবকে সালাম দিল, আসসালামুয়ালায়কুম মিয়া সাহেব।
ওয়ালেকুম আসসালাম, কী খবর আয়নাল? কেমন আছ?
জি ভালো, আপনি ভালো আছেন মিয়া সাহেব?
হুঁম ভালো।

আয়নালের বাড়িতে মিয়া সাহেবের আগমনে সে যারপর নেই খুশি হয়েছে, সে খুশিতে কণ্ঠে বলল, মিয়া আপনি আমাদের বাড়িতে? কী মনে করে?
আসলাম এমনিতেই তো মনে মনে একটা চিন্তা নিয়ে ঘুরছি।
চিন্তা আপনার? আপনার আবার কীসের চিন্তা?
আছে? সব মানুষেরই চিন্তা আছে, তো একেকজনের চিন্তা একেকরকম, একেকজনের সমস্যাও একেকরকম।
জি আপনি ঠিকই বলেছেন।
আদূরি বাজার থেকে এসেছে, তছিরন একটা প্লেট-এ বিস্কুট, চানাচুর দিতে দিতে বলল, মিয়া সাহেবের আবার কীসের সমস্যা ?
মিয়া সাহেব একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে বললেন, সমস্যাটা আমার না, আমার ছোট মেয়ে রুমার।
রুমা আপার? তছিরন জিজ্ঞেস করল।

মিয়া সাহেব কৃত্রিম রাগের সুরে বললেন, রুমা আপা না, রুমা তোমার চেয়ে অনেক ছোট।
ঐ হলো, আমরা গরীব মানুষ, গরীব মানুষ কখনো বড় হয় মিয়া সাহেব?
মিয়া সাহেব একবার রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, মেয়েটা আমার একেবারে একা, ছোটবেলা থেকে তো কোন কাজ করেনি, এখন সংসারের কাজ আর মেয়ের দেখাশুনা করতে গিয়ে একেবারে হিমশিম খাচ্ছে।
আয়নাল এবং তছিরন মিয়া সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

মিয়া সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন, ওর বাসার জন্য একটা মেয়ে দরকার, এই ওর ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে একটু খেলাধুলা করবে আর রুমাকে রান্নার কাজে একটু সাহায্যে করবে আর কি।
তছিরনের বুকটা কেঁপে উঠল, মুখ শুকিয়ে গেল। তার মনের মধ্যে যেন একটা আশংকা দেখা দিল, এই বুঝি মিয়া সাহেব এখনি বলবে তার একটা মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার কথা।
মিয়া সাহেব একবার আয়নাল এবং একবার তছিরনের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনের অবস্থা বুঝে কিছুটা সান্ত্বনার সুরে বললেন, না কোন অসুবিধা নেই, জামাই নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে, থাকার কোন অসুবিধা নেই। বাসায় টি.ভি আছে সবাই সবসময় আনন্দ ফুর্তিতেই থাকে। রুমাকে তো চেনোই, খুব ভালো মেয়ে তার কাছে থাকলে মেয়েটা ভালোই থাকবে, সে নিজের মেয়ের মতোই দেখবে।
তছিরনের আর বুঝতে বাকি নেই তবু মনকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য একটা যুক্তি দাঁড় করালো, মিয়া সাহেব তো অন্য কারো মেয়ের কথা বলতে পারে।
তছিরন শুষ্কমুখে বলল, আপনি কার কথা বলছেন মিয়া সাহেব?
একথার উত্তরে মিয়া সাহেব আলতাকে কাছে ডেকে নিলেন, এসো তো মা, তোমার নাম কী যেন?

আলতা।
বাহ্‌ সুন্দর নাম তো, বলে আলতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, আমি বলছিলাম আলাতাকে তোমরা যদি দিতে তো রুমা খুব খুশি হতো।
তছিরনের দু’চোখ ছল ছল করে উঠল, তার বুক চিরে একটা কথা বের হলো, এটা আপনি কী….
না তার কথা শেষ হতে দিল না আয়নাল, সে কিছুটা ধমকের সুরে বলল, তছিরন থামো তো, যাও চা নিয়ে আসো।
তছিরন চা তৈরি করতে গেল।
মিয়া সাহেব কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন তারপর বললেন, আয়নাল তোমাদের যদি কোন আপত্তি থাকে তো লাগবে না, আমি বরং অন্য কোথাও…
আয়নাল মিয়া সাহেবের কথায় বাধা দিয়ে বলল, না মিয়া সাহেব, না। আপনি এনিয়ে চিন্তা করবেন না, আমি এখন ওকে বুঝিয়ে বলব।

সেদিনের পর থেকে তছিরনের চোখে ঘুম নেই। ঠিক আলতার মতো বয়সে তার জীবনে এক অভিশাপ এলো, তো ঠিক আলতার মতো না, তার ওপর ঝড়টা ছিল একটু ভিন্ন। কাজের প্রস্তাব না, তার এলো বিয়ের প্রস্তাব, আয়নালের সঙ্গে। আয়নাল তখন টগবগে যুবক, লম্বা, ফর্সা, রোদে পুড়ে গায়ের ফর্সা রংটা একটু তামাটে হয়ে গেছে, সুঠাম দেহ। তাহোক সারাদিন মাঠে কাজ করে এই চরের জমিতে সে যেন সত্যিকারের সোনা ফলায়, প্রতি বছর কিছু না কিছু জমি কেনে। বাপের একমাত্র ছেলে, কয়েক বিঘা জমি আছে, সারা বছরের খাবার নিজের জমির আবাদ করা ধান থেকেই আসে। কোদালকাটির চরে সে তখন বিয়ের পাত্র হিসেবে আকর্ষণীয়। তখন আয়ানালেরও প্রতিদিন কোন না কোন বিয়ের প্রস্তাব আসছিল।

চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে তছিরন প্রথম। সামান্য জমি নিয়ে তছিরনের বাবার এতবড় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তছিরন প্রতিদিন স্কুলে যায় কিন্তু তার পড়ালেখার প্রতি কারো তেমন গুরুত্ব নেই। কোনদিন গেল কী না তারই কোন খেয়াল নেই, এমনদিনে তছিরনের এক দূরসম্পর্কের এক দুলাভাই আয়নালের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো। এমন সুপাত্রের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাবে যৌতুকের পরিমান একটু বেশি হলেও তার বাবা স্বীকার করল, পরে অবশ্য সেই যৌতুকের দায় মেটাতে তার বাবার আরো এক বিঘা জমি হাতছাড়া হলো। কিন্তু মেয়ের সুখের কথা ভেবে সবাই যেন হাসিমুখে মেনে নিল।

শুরু হলো তছিরনের দাম্পত্য জীবন। জীবনের শুরুটা ভালোই ছিল, দিনে দিনে সংসারের উন্নতি হতে লাগল। কিন্তু এই সুখ, এই স্বাচ্ছন্দ্য বেশিদিন টিকল না। ব্রম্মপুত্রের করাল গ্রাস তাদের প্রায় জমিজমা সব রাতারাতি কেড়ে নিয়ে গেল। চরের জমি এমনই, আজ যে জমিদার কাল সে পথের ভিখারী। শুধু তাদের জমি না, আরো অনেকের জমি নদীগর্ভে বিলীন হলো। কেউ কেউ এই চর ছেড়ে রৌমারী-রাজিবপুর রাস্তার ওপর আশ্রয় নিল, কেউবা মিয়া সাহেবের কাছে অনেক অনুনয় বিনয় করে ঘর করে থাকার, এমনকি দু’য়েক বিঘা আবাদী জমিও বর্গা নিল।

আয়ানালের বাবার সঙ্গে মিয়া সাহেবের বেশ শখ্যতা ছিল সেই সুবাদে মিয়া বাড়িতে আয়নালের যাতায়াত দীর্ঘদিনের। আয়নালের বাবার মৃত্যুর পরও তার যাতায়াতে তেমন বাধা পড়েনি। আয়নালের এই দুর্দিনে মিয়া সাহেব এগিয়ে এলেন, বাড়ি করার জায়গা দিলেন, বর্গা চাষের জন্য তিন বিঘা জমি দিলেন। এসব তছিরনের নিজের চোখে দেখা। এতকিছুর বিনিময়ে মিয়া সাহেব কোনদিন কিছু চাননি, আজ তিনি অনেক আশা নিয়ে এসেছেন, তাকেই বা তছিরন আর আয়নাল নিরাশ করবে কীভাবে?

কিন্তু আলতাকে নিয়ে তছিরনের অনেক স্বপ্ন। তছিরন নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল কিন্তু তা সে স্বপ্ন সফল হয়নি তাই এখন সে আলতার মাঝে তার স্বপ্ন দেখছে অথচ আজ মিয়া সাহেব যে প্রস্তাব দিলেন তাতে তার স্বপ্ন যেন ভেঙ্গে মুচড়ে যেতে বসেছে। তছিরন আয়নালকে মৃদু কণ্ঠে ডাক দিল, এই শুনছ?
পর পর দু’বার ডাক দেয়ার পর আয়নাল সাড়া দিল, উঁ।

তুমি কি আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে?
বলো?
তুমি যে মিয়া সাহেবের কথায় রাজি হয়ে গেলে, এখন কী হবে?
কী হবে মানে?
আমি আলতাকে লেখাপড়া শেখাবো, ওকে আমি অনেক বড় করবো। তুমি দেখোনা ও কোনদিন ক্লাসে সেকেণ্ড হয়নি, আমার এমন মেয়েটার লেখাপড়া বাদ দিয়ে আমি ঢাকা পাঠাবো কাজের মেয়ের কাজ করতে?
কিন্তু মিয়া সাহেব? আমি যে মিয়া সাহেবকে কথা দিয়েছি, এখন যদি কথার বরখেলাপ করি..
কী করবে মিয়া সাহেব?
মিয়া সাহেব যদি তার সব জমিজমা নিয়ে নেয়, যদি তার ভিটেমাটি থেকে আমাদের তাড়িয়ে দেয়?

করবে তো করবে, তছিরন জোর গলায় বলল।
তুমি যত সহজে বলছ, কাজটা তত সহজ না, মিয়া সাহেব যদি তার জমিজমা নিয়ে নেয়, ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেয় তবে তখন আমরা খাবো কী? সংসার চালাবো কী করে?
তছিরন বিছানায় উঠে বসে আয়নালের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা আমি তোমাকে একটা কথা বলি? রাখবে?
বলো?
তুমি মিয়া সাহেবকে একবার বুঝিয়ে দেখো, যদি ..
আয়নাল কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলল, তছিরন তুমি মিয়া সাহেবকে জানো না, মিয়া সাহেব একবার যেটা বলে সেটা আর উল্টায় না।

তবু একবার চেষ্টা করতে অসুবিধা কি? যদি…….
আচ্ছা তুমি যখন বলছ তো চেষ্টা করবো কিন্তু আমার মনে হয় কোন লাভ হবে না। এখন ঘুমাও চিন্তা করে লাভ নেই কপালে যা আছে তাই হবে।

পরদিন সকালবেলা আয়নাল মিয়া বাড়ি গেল অনেক আশা নিয়ে, এ যেন এক অন্য রকমের আশা, নিজের মেয়েকে অন্যের কাছ থেকে ফিরে পাওয়ার আশা। আয়নাল অল্প শিক্ষিত মানুষ, মিয়া সাহেবের প্রতি তার শ্রদ্ধা অগাধ, সেই সঙ্গে মনের মধ্যে আতংকও কম নয়। আয়নালের বাড়ি থেকে মিয়া বাড়ি প্রায় এক কিলোমিটার পথ, মাঝখানে অনেকটা অংশ জুড়ে পাট ক্ষেত, পাটক্ষেতের মাঝে একসময়ের মেঠোপথ একটু প্রশস্থ হয়েছে। কিন্তু এ রাস্তায় তেমন চলাচল নেই। আয়নাল পথে যেতে যেতে কীভাবে মিয়া সাহেবকে তার মনের কথা বলবে, তার নিজের কথা বলবে নাকি তছিরনের কথা বলবে, নাকি আলতার কথাই বলবে সেকথা ভাবছিল আর আপনমনে বিড়বিড় করছিল।
মিয়া সাহেব বাড়িতেই ছিলেন, আয়নালকে দেখে সহাস্যে বললেন, এই যে আয়নাল, আসো আসো।

আয়নাল বরাবরের মতো মাথা নত করে বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিল, আসসালামুয়ালায়কুম মিয়া সাহেব।
মিয়া সাহেব সালামের জবাব দিয়ে কয়েকমুহূর্ত আয়নালের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আয়নাল মিয়া সাহেব বলে কথা বলতে শুরু করতে যাচ্ছিল কিন্তু মিয়া সাহেব থামিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করলেন, আয়নাল কাল আবার রুমার সঙ্গে কথা বললাম, ও তোমার খুব প্রশংসা করল, তোমাকে তো ও বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করে, তোমার নাম শুনেই বলল ও আয়নাল ভাই’র মেয়ে তো, আয়নাল ভাইকে আমার কথা বলবেন, দেখবেন না করবে না।

আয়নাল মাথা নত করে শুনছিল। মিয়া সাহেবের কথা বলা শেষ হতেই আবার বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মিয়া সাহেব আবার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি তো জানো, আমি আমার বিষয়-সম্পত্তি ছেলেমেয়েদের নামে ভাগ করে দিয়েছি, তুমি যে জমিটা বর্গা চাষ করো সেই জমিটা দিয়েছি রুমার নামে, ওর নামে আরো জমি আছে, ও আগামীকাল ঢাকা থেকে আসবে, ও আসলে আমি ওর ভাগের আরো এক বিঘা জমি তোমাকে দিতে বলব, তুমি দেখো ও না করবে না।
আয়নালের রাস্তায় আসতে আসতে সব সাজানো কথা যেন এলোমেলো হয়ে গেল। সে বলল, কিন্তু আলতার মায়ে বলছিল..
আয়নালের কথা শেষ হওয়ার আগেই মিয়া সাহেবের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল, তিনি রাগান্বিত স্বরে বললেন, কী বলছিল? বাড়ির মেয়েছেলে মানুষ এত কথা বলে কেন?
আয়নাল আর কথা বলতে পারল না, মিয়া সাহেবের মুখের দিকে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।

মিয়া সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, তুমি কী বলতে এসেছ আমি বুঝতে পেরেছি আয়নাল, আগামীকাল রুমা আসবে দু’দিন বাদেই আবার ঢাকা চলে যাবে, যাওয়ার সময় আলতাকে নিয়ে যাবে আর যদি-
আয়নাল কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ঠিক আছে মিয়া সাহেব, সব ঠিক আছে, আপনি কিছু চিন্তা করবেন না।
আয়নাল বাড়িতে ফিরল তার মুখের দিকে তাকিয়ে তছিরনের মুখ শুকিয়ে গেল। সে কোনকিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আয়নাল উঠানে একটা মোড়ার ওপর ধপাস করে বসে মিয়া সাহেবের সঙ্গে তার কথাবার্তার সারমর্মটুকু বলল। সবকিছু শুনে তছিরনের কণ্ঠস্বর বুজে এলো, ঠোঁট দু’টো সামান্য ফাঁকা হয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে একটা কষ্ট বেরিয়ে এলো, শেষ পর্যন্ত.., বলেই অসমাপ্ত কথার সমাপ্তি টানল।

কয়েকদিন হলো রুমা কোদালকাটি এসেছে। গতকাল মিয়া সাহেব লোক পাঠিয়ে রুমার আজ ঢাকা যাওয়ার কথা বলে আলতাকে তৈরি থাকতে বলেছে। কিন্তু তছিরনের মন কিছুতেই মানছে না। শেষ চেষ্টা হিসেবে সে একবার তার আকাংখার কথা রুমাকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর সে উদ্দেশ্যে রুমাকে এবাড়িতে একবার আসারও অনুরোধ করে এসেছে আয়নাল। আজ সকালে রুমা এসে আলতাকে মিয়া বাড়িতে নিয়ে যাবে তারপর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে আজ রাতের কোচ-এ।
রুমা এলো সঙ্গে তার হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ানো মেয়েটি। মেয়ে তো নয় যেন পুতুল, গায়ের রংটাও যেন টুকটুকে লাল, যেন একটু টোকা দিলেই রক্ত বেরিয়ে পড়বে। রুমা বাড়িতে এসেই জিজ্ঞেস করল, তছিরন আপা কেমন আছেন?

তছিরনের দু’চোখ ছলছল করে উঠল। তার বুক ভেঙ্গে একটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল, এই বুঝি তার আলতা, তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, যা কয়েকমুহূর্ত পরই ভেঙ্গে যেতে বসেছে। সে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, জি আপা ভালো, আপনি?
হুম ভালো। কই আপনার বাড়ির আর ছেলেমেয়েরা কে কোথায়? রুমা জিজ্ঞেস করল।
ছোট মেয়েটা স্কুলে গেছে আপা, আর আলতা বাড়িতে আছে, বলে তছিরন আলতা বলে একটা ডাক দিতেই ঘর থেকে আলতা বেরিয়ে এলো। আলতার পরনে একটা মলিন জীর্ণ কামিজ, চুলগুলো উসকো-খুসকো, গণ্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া কান্নার ছাপ এখনো লেগেই আছে।
রুমা স্নেহের সুরে আলতাকে ডাক দিল, এদিকে আসো তো মা।

আলতা রুমার কাছে গেল। ওমা তুমি তো খুব সুন্দর হয়েছ, বলে রুমা একটা জামা বের করে আলতার হাতে দিয়ে বলল, যাও তো মা এই জামাটা পরে আসো তো।
আলতা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল, সে একবার রুমার দিকে আর একবার তার মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। রুমা একরকম জোর করে তার হাতে জামাটা গুঁজে দিল।
রুমা তার ব্যাগ থেকে একটা শাড়ি বের করে তছিরনের হাতে দিয়ে বলল, এটা আপনার জন্য আর বলে একটা লুঙ্গি বের করে দিয়ে বলল, আয়নাল ভাই এটা আপনার জন্য।
তছিরন চোখ মুছতে মুছতে বলল, এগুলো থাক আপা, আমাদের গরীবের বাড়িতে আগে নাস্তা খান, গল্প-সল্প করি, তারপর হবে এখন।
আচ্ছা রাখো তো, বলে রুমা উঠানে বিছানো পাটিতে রেখে দিল।

তছিরন নাস্তা এনে দিল। রুমা উঠানে পাটিতে বসেছে আর আয়নাল বসেছে আঙ্গিনায় একটা মোড়ায়। চা-নাস্তা খেতে খেতে রুমা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক কথাই জিজ্ঞেস করল। ততক্ষণে আলতা নতুন জামা-কাপড় পরে এসেছে, আলতাকে কাছে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে রুমা বলল, বাহ্‌ তোমাকে তো সুন্দর মানিয়েছে।
আলতা একটা শুষ্ক হাসি হাসল।
তছিরন কয়েকমুহূর্ত রুমার মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল তারপর কিছুটা সংকোচের সুরে বলল, আপা আপনি যদি কিছু মনে না করেন তো একটা কথা বলি?
বলেন আপা, এত সংকোচ করছেন কেন? আমি আপনার চেয়ে ছোট না?

হঠাৎ করেই তছিরন যেন উদাস হয়ে গেল, আপা আমি যখন শংকর মাধবপুর প্রাইমারি স্কুল থেকে ক্লাস ফাইভ পাস করলাম তখন আমার বিয়ে হলো, আর লেখাপড়া করা হলো না, আমার ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবো। কিন্তু হতে পারিনি, আলতা আমাদের প্রথম মেয়ে, আলতার জন্মের পর থেকে ওর মাঝে আমি আমার স্বপ্ন দেখতাম, অনেক আশা ছিল আলতা একদিন অনেক বড় হবে, আমি যা হতে পারিনি আলতা তা-ই হবে। এই চরে জন্ম গ্রহণ করে সে একদিন বড় ডাক্তার হবে, জজ হবে, ডি.সি হবে, সবাই তাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। আল্লাহ ওর মাথায় অনেক বুদ্ধি দিয়েছে, ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত সে সবসময় ফার্স্ট হয়েছে, ও যদি লেখাপড়া করতো তবে একদিন সত্যি সত্যি সে অনেক বড় কিছু হতে পারতো, বলতে বলতে তছিরনের দু’চোখ সজল হয়ে উঠল। কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
রুমা কিছু বুঝতে পারল না। সে তছিরনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তছিরন আবার বলতে শুরু করল, সেদিন মিয়া সাহেব আমাদের বাড়িতে আসলেন, আলতাকে আপনার নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন। আমরা মিয়া সাহেবের জমিতে ঘর করে থাকি, মিয়া সাহেবের জমি আবাদ করে খাই, মিয়া সাহেবের কথা না করি কীভাবে? এটা যে নেমকহারামি করা হবে আপা, আর আলতাকে না দিলে মিয়া সাহেব যদি আমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, তবে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? যদি বর্গার সব জমি নিয়ে নেয় তো আমরা কী আবাদ করে খাবো? তখন যে আমাদের শুধু আলতাই নয় সব যাবে আপা, বলে তছিরন আলতাকে কাছে টেনে নিয়ে তার মুখটা উঁচু করে ধরে বলল, একবার আমার লক্ষ্মী সোনার মুখটার দিকে তাকান আপা, দেখেন চোখ দু’টা কী জ্বলজ্বল করছে, আমার মেয়েটা যদি লেখাপড়া করে তো সত্যি সত্যি ও একদিন অনেক বড় হবে, আর যদি কাজের মেয়ে হয়.., বলে কথাটা শেষ করতে পারল না তছিরন, তার গণ্ডদেশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, গলার স্বর বুজে এলো।

ততক্ষণে আয়নালের চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। রুমার দু’চোখ পানিতে ছলছল করছে, তার গলার স্বর বুজে এলো, সে আলতাকে আবার কাছে টেনে নিল, তার মুখটা উঁচু করে ধরে বলল, তোমাকে আমি নিয়ে যাবো না মা, আমি বাবাকে বলবো, বাবা যেন তোমাদের জমি ছাড়িয়ে না নেয়, তুমি লেখাপড়া করো, অনেক বড় হও, লেখাপড়া শিখে এই চরের মানুষের মুখ উজ্জ্বল করো, আমার বাসার কাজের মেয়ে নয়, আমার বাসার পরিচারিকা নয়, শুধু আমার আর আমার এই ছোট্ট মেয়েটির সেবা নয় বড় হয়ে তুমি একদিন সারা দেশের মানুষের সেবা করো, তুমি একদিন সত্যিকারের ’’কাজের মেয়ে হও’’।


সমাপ্ত

 

ফেসবুকে প্রকাশিত লেখার লিঙ্ক –

https://www.facebook.com/storyandarticle/posts/174241347836508

 

সংগ্রাম – দীপঙ্কর বেরা

যে চায়ের দোকানে কাপ ধুচ্ছে
ভালো করে ঝাট দিচ্ছে,
যে দূরে মাঠে কাজ করছে
কাদা করছে ধান রুইছে আগাছা তুলছে
পাকা ফসল কেটে গোলায় ভরছে
রোদে ওর পিঠ তেতে উঠছে,
যে সব্জির পসরা নিয়ে বাজারে বসেছে
খরিদ্দার হাঁকতে হাঁকতে গলা শুকিয়ে গেল
বাড়ি ফিরে এক বাটি পান্তা আর বেগুন পোড়া।
সেই ছেলেটা আমি নয় নিশ্চিত জেনে
ওরা বলল – তুই কি করে বুঝবি ওদের কষ্ট?

আমি আমার শিশুবেলার সেই সব আর মনে না করে
এই পাঁচতারা জীবন জিজ্ঞাসায় বসে আছি।

কুকুর বলে কি মানুষ না? শম্পা সাহা

কি জানি? ঠিকঠাক প্রেম টা পারতাম কিনা আমরা?

কালু, ভুলু, জিমি, রাম্বো সবাই একজোট হয়েছে দিঘির পুকুর পাড়ে। ওদের আজ এখানে একটা মিটিং আছে। আর সেই মিটিং এর নেতা হল বাজার পাড়ার বিল্টু। কি ভাবছ, এরা কারা? এরা নেড়ী।যাদের আমরা হর হামেশাই দেখি। কারো লোম উঠে গেছে, কারো লেজ ঘিয়ে ভাজা, কারো গা আবার ঘায়ে ভরা! তো তারা কেউ নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা রাখে না।

তাই নেতা বাজার পাড়ার বিল্টু, কারণ ওর ই মাংসের ছাট্ টাট্ খেয়ে বেশ গত্তি হয়েছে। ‘জোড় যার , মুলুক তার’, এটা শুধু মানব সমাজেই নয়, সারমেয় সমাজে ও সমান সত্যি। তো সে যাই হোক, সুকান্তদের বাড়ির সামনের রকে উঠে বিল্টু বক্তৃতা শুরু করল। তার বক্তব্য শুরুর আগে সকল সারমেয়কুল সমস্বরে একবার ঘেউউউ… করে অভিবাদন জানাল তাদের উঠতি নেতা কে।

     বিল্টু উঠেই একেবারে আক্রমনাত্মক মেজাজে শুরু করল–“বন্ধুগন, মানুষের এই অত্যাচার তো আর সহ্য করা যায় না। ওদের বাড়ি পাহারা দেব আমরা, চোর আসলে চেঁচিয়ে জানান দেব আমরা, ওদের বাচ্চাদের টিডন্যাপ্ হলে…. ” “ওটা টিডন্যাপ্ নয় কিডন্যাপ্। ” ভুল শুধরে দিল লালি। কারণ ও, যে বাড়িতে খেতে যায়, সে বাড়ির মেয়ে টেঁপি ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়ে, তার একটা সম্মান আছে না?

    বিল্টু গলা খাঁকারি দিয়ে সামলে নেয়, “হ্যাঁ, তো যা বলছিলাম, বাচ্চা কিডন্যাপ হলে ক্লু দেব আমরা ,আর ওরা আমাদের ই দূর্ দূর্ করে তাড়াবে? বিনিময়ে আমরা কি চাই? কি চাই? কিচ্ছু না। শুধু এঁটো কাঁটা, পচা, বাসী, তাও পাজী মানুষ গুলো দিতে চায় না! ” সকলে সমস্বরে ঘেউ ঘেউ করে তাদের সমর্থন জানাল। বিল্টু আবার শুরু করল” ওদের বাচ্চাগুলো পর্যন্ত আমাদের কি জ্বালান জ্বালায়!

খালি অকারণ ঢিল মারে, কাঠি দিয়ে খোঁচায়, আমাদের অতিষ্ট করে তোলে! “কালিয়া জোড়ে চেঁচিয়ে বলল “একবার কালিপূজোর সময় আমার লেজে কালিপটকা বেঁধে দিয়েছিল। আমার তো হার্ট অ্যাটাক হবার জোগাড়।” রাম্বো সঙ্গে সঙ্গে বলল “আর একবার ঐ বদমাশ টুবাইটা আমার গায়ে স্পিরিট ঢেলে দিয়েছিল। কি জ্বলুনি, কি জ্বলুনি! শেষে ধোপাদের নাদায় ডুবে একটু আরাম পাই”।

 ” এর একটা প্রতিবিধান হতে হবে”। জোড়ালো গলায় বলে উঠল বিল্টু। “আজ থেকে আমাদের ধর্মঘট, আমরা চোর দেখলেও চেঁচাব না, অন্য পাড়ার কুকুর এ পাড়ায় ঢুকে, এ পাড়ার ছেলেমেয়েদের কামড়ালেও, আমরা তেড়ে যাব না। একেবারে নন্ কো-অপারেশন ।” “হ্যাঁ, হ্যাঁ নন্ কো-অপারেশন, নন্ কো-অপারেশন”। সবাই সমস্বরে সমর্থন জানাল।

বিল্টু আরো বলল, ” তাহলে, আজ থেকে আগামী পনের দিন ,আমাদের এই কর্মসূচি জারি থাকবে। ওদের ও বুঝতে হবে, আমাদের মূল্য। আমাদের কি কোন মান সম্মান নেই? ”

    বিল্টুর এই মতামতের সমর্থন জানিয়ে, দিঘির পুকুর পাড়ের সারমেয়কুল সমস্বরে ঘেউ ঘেউ শব্দে তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচির শুভ সূচনা ঘোষণা করল।

লবনাক্ত নীল … প্রকাশ চন্দ্র রায়

তোমার জলেই আপাদমস্তক
ডুবেছিলাম,,
ডুবতে ডুবতে অবশেষে,
মোহন সাঁতার শিখেছিলাম ।
চিৎ সাঁতারে বুক সাঁতারে,
জলক্রীড়া’র ষোলকলায়,
ক্রমেই যখন দক্ষ হলাম-
তখন তুমি আমাকে ফেলে,
মিশে গেলে সাগর জলে ।
অবাক হয়ে চেয়ে দেখি,
বদলে গেছে তোমার রঙ
বদল গেছে তোমার ঢঙ;
এখন তুমি অপেয় অপাঙক্তেয়,
লবনাক্ত নীল-
ঝিলমিল মরীচিকার মত,
নাচো অন্য বুকে ।
আমাকে ছেড়ে আছো কি
বিশেষ সুখে ? @

লবনাক্ত নীল * কবিতার ভাবার্থ, গঠন ও ধারা পর্য্যালোচনাঃ-

উক্ত কবিতায় নায়িকাকে নদী এবং তার প্রেমকে জল রূপে কল্পনা করে রূপক “চিত্রকল্প” গঠন করা হয়েছে।* নায়ক প্রেম সম্পর্কে একদম আনাড়ী ছিল,নায়িকার প্ররোচনায় ও সহযোগীতায় যাবতীয় কলাকৌশল শিখে নিয়ে, প্রেমে পরিপক্কতা ও দক্ষতা অর্জন করে কিন্তু নায়িকা অতি লোভে, উন্নত সোসাইটির একজনের সঙ্গে প্রেমে মত্ত হয়ে মান সম্মান হারিয়ে,কলঙ্কিত হয়ে পড়ে। সমাজে ঘৃণার পাত্রী হয়ে যায়। উন্নত সমাজকে সাগর এবং কলুষিত চরিত্রকে অপেয়, অপাঙক্তেয় এবং নবনাক্ত বলা হয়েছে।

কবিতাটিতে চৌদ্দটি পংক্তি বা লাইন আছে। প্রতিটি সম্পূর্ণ বাক্যকে পংক্তি বলা হয়। প্রতিটি শব্দ যেমন ২ মাত্রায় গঠিত, প্রতিটি পংক্তি আবার জোড়ায় জোড়ায় শব্দ নিয়ে”শব্দবৃত্ত” তৈরী করেছে যেমনঃ(তোমার+জলে)+(আপাদ +মস্তক) +(ডুবে+ছিলাম) ।

* যেহেতু কবিতায় প্রিয়া, প্রেয়সী, প্রেম. বিরহ,বা ভালবাসা শব্দগুলো প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহৃত হয়নি শুধু নদী ও তার জলকে প্রতীক করে রচিত হয়েছে, সেহেতু রূপকধর্মী বা প্রতীকধর্মী বলা হয়েছে।*কবিতায় প্রেম.. আনন্দের সংগে স্থায়ী রূপ লাভ করেনি,বিধায় বিরহপ্রধান বলা হয়েছে।

গঠনঃ- উক্ত কবিতায়টিকে পাঁচটি চরণ বা স্তবকে ভাগ করা হয়েছে।

চরণ হলোঃ-কবির বক্তব্য যে কয় পংক্তি বা লাইনে গিয়ে শেষ হয় বা”।” বসে। চরণকে স্তবক ও বলা যায়। এই কবিতায় পাঁচটি চরণ বসেছে।

মাত্রাঃ- প্রতিটি একক শব্দ  দুই মাত্রাযোগে
১+১=২টি মাত্রা এবং প্রতিটি যৌথ শব্দ ৪ মাত্রায় গঠিত হয়েছে। (তো+মার), জলে= (জ+লে)। (আ+পাদ)+(মস্+তক)= আপাদমস্তক।

 ( ডু+ বে)+(ছি+লাম)=ডুবেছিলাম। (পা+তায়)=পাতায়। অপাঙক্তেয়=(অ+ পাঙক)+(তে +য়)। লবনাক্ত=(ল+ব)+(না+অক্ত)।★

একটা গল্প – অভিষেক সাহা

এই করেছ ভালো

” তুই আমার জন্য কী করতে পারিস ?” প্রেমমাখা চোখে প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে প্রেমিকা জানতে চাইল । লেকের জলের পাশে সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চে ওরা দু’জন বসে। মুখোমুখি। মাঝেমাঝে দুষ্টু হাওয়া জল থেকে উঠে এসে ওদের চুমু দিয়ে যাচ্ছে।

” আকাশের চাঁদ আনতে পারি, মঙ্গল গ্রহে জমি কিনতে পারি, তোকে নিয়ে সাবমেরিনে চড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বুক চিড়ে গিয়ে পিকনিক করতে পারি, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের আগুনে সিগারেট ধরাতে পারি, তোকে নিয়ে ডলফিনের পিঠে চড়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড় করতে পারি…. ” প্রেমিকে থামিয়ে ফিসফিসিয়ে অবাক হয়ে প্রেমিকা বলল ” আর বলিস না। আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। শরীরে শীত শীত লাগছে ! তুই আমার জন্য এসব কিছু করতে পারিস ? সত্যি!” ” মিথ্যা! আগের সবকটা পারির পিছনে একটা করে না জুড়ে নে। তোর কী মাথা খারাপ।

তোর মনে হয় একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে, তাও এখনও পার্মানেন্ট হইনি, আমি এতকিছু করতে পারি ! এইজন্য তোরা ঠকে যাস!” প্রেমিক একটু গম্ভীর হয়ে বলল । ” আমি জানি তো তুই এসব কিছুই করতে পারবি না। কিন্তু তুই যখন মিষ্টি করে কথাগুলো বলছিলি তখনই আমি মনে মনে তোর সাথে ওসব জায়গায় ঘুরছিলাম। আমি অতটাও বোকা নই!” প্রেমিকা একটু সিরিয়াস হল।

তারপর বলল ” এখন কী ওই যে লোকটা আসছে, ওর কাছ থেকে কফি খাওয়াতে পারবি ।তোর বকবক শুনে মাথাটা পুরো ধরে গেল !” প্রেমিকাকে আদর করে কাছে টেনে নিয়ে প্রেমিক বলল ” এখন ওই লোকটার কাছ থেকে তোকে কফি খাওয়াতে পারব, এখান থেকে বেরিয়ে চিকেন রোল খাওয়াতে পারব, তোর সাথে সম্পর্কটা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট রাখতে পারব, আর একটা কাজও করতে পারব, তোর – আমার প্রেম নিয়ে একটা মিষ্টি প্রেমের গল্প লিখতে পারব।”

Scroll to Top