Amit Kumar Jana

 4 total views

বিভাগ: প্রবন্ধ
শিরোনাম: জলের প্রয়োজনীয়তা এবং জলসংকট
কলমে: অমিত কুমার জানা

জল ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও বাঁচতে পারি না। তাই বলা হয় জলের অপর নাম জীবন।(Water is life.)
পরীক্ষাগারে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন গ্যাসের মিশ্রনে তড়িৎ স্ফুলিঙ্গ চালনা করে রাসায়নিক পদ্ধতিতে জল উৎপন্ন করা হয়। এর আণবিক সংকেত H2o এবং রাসায়নিক নাম হাইড্রোজেন মনোক্সাইড। এর আণবিক ওজন ১৮।

জলের উৎস: পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় শতকরা পঁচাত্তর ভাগ জলে ঢাকা। এর মধ্যে শতকরা সাতানব্বই ভাগ সমুদ্রের জল এবং শতকরা তিনভাগ মিষ্টি জল। এই মিষ্টি জল বা পানের উপযোগী জলের শতকরা প্রায় আটষট্টি ভাগ হিমবাহ ও বরফ থেকে সৃষ্ট এবং অবশিষ্ট অংশ নদী, জলাভূমি ও হ্রদের জল।
যদিও পৃথিবীর শতকরা পঁচাত্তর ভাগ জল তবুও পৃথিবীর জলের মাত্র ০.৩৭% জল পানের উপযোগী। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে আমরা খাতা কলমে যতই তিনভাগ জল একভাগ স্থল বলে গলা ফাটাই না কেন পানীয় জলের পরিমাণ বেশ কম।

জলের প্রয়োজনীয়তা: জলের প্রয়োজনীয়তা এমনই অপরিসীম যে ব্যাখ্যা করে শেষ করা যায় না। প্রায় প্রত্যেকটি প্রক্রিয়া এবং কাজে জলের প্রয়োজন আছে। বেশিরভাগ কঠিন, তরল এবং গ্যাসীয় দ্রাব জলে দ্রবীভূত হয়, তাই জলকে বলা হয় সার্বজনীন দ্রাবক। (Universal solvent)
প্রায় প্রতিটি রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত করতে জলের প্রয়োজন, আবার বেশীরভাগ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জল উৎপন্ন হয়। আমাদের দেহের বেশীরভাগ অংশই জল।
গৃহীত খাদ্য পরিপাক এবং বিপাকে জলের প্রয়োজন, শরীরের উষ্ণতার ভারসাম্য বজায় রাখতে জলের প্রয়োজন, রক্তকে তরল রাখতে জলের প্রয়োজন।
দেহের উষ্ণতা বেড়ে গেলে (জ্বর হলে) তা কমানোর জন্য জলের পটি দেওয়া হয়, কারণ জলের আপেক্ষিক তাপ সর্বাধিক, অর্থাৎ এক গ্ৰাম জলের উষ্ণতা এক ডিগ্ৰি বৃদ্ধি করতে এক ক্যালরি তাপের প্রয়োজন যা সর্বাধিক আপেক্ষিক তাপ। এই কারণে শীতলীকরণে জল ব‍্যবহৃত হয়।

এছাড়াও রান্নাবান্না করা, জামাকাপড় পরিষ্কার করা, তৃষ্ণায় জল পান করা, স্নান করা, দৈনন্দিন অসংখ্য কাজকর্মে জল ব্যবহৃত হয়। যে কোন চাষাবাদে জল আবশ্যিক প্রয়োজন, শিল্প, কলকারখানায় উৎপাদনের কাজে জল প্রয়োজন।

জলজ প্রাণীদের বেঁচে থাকার একমাত্র স্থান জল।
সমগ্ৰ উদ্ভিদজগের সালোকসংশ্লেষের আবশ্যিক কাঁচামাল এই জল। আবার এই সালোকসংশ্লেষের ফলে উৎপন্ন কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য সমগ্ৰ জীবজগতের খাদ্যের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উৎস।

জল সংকট ও এর প্রতিকার: বর্তমান সময়ে সর্বাধিক উদ্বিগজনক ঘটনা হলো জলসংকট।
ভূ-গর্ভস্থ কৈশিক জলের স্তর সংকট সীমার নীচে নেমে গেছে। ইতিমধ্যে রাজস্থান, কেরালা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং চেন্নাইতে পানীয় জলের মারাত্মক অভাব দেখা যাচ্ছে। জলকষ্টে মানুষ কীটপতঙ্গের মতো মারা পড়ছে কোথাও কোথাও।

জলসংকটের প্রধান কারণ হলো অবিবেচকের মতো জল অপচয় করা। সজলধারা বা টাইমকলের মুখ দায়িত্ব জ্ঞানহীনভাবে খোলা রেখে দেওয়া হয়, ফলে প্রচুর পরিমাণ জল নষ্ট হয়। নলকূপের পানীয় জলে যথেচ্ছভাবে স্নান করা, জামাকাপড় পরিষ্কার করা হয়, ফলে পানীয় জল নষ্ট হয়। বর্তমান সময়ে মাত্রাতিরিক্ত চাষবাস করা হচ্ছে, কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলিতে বছরে তিনবার ধান চাষ করা হচ্ছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অমূল্য কৈশিক জল নষ্ট হচ্ছে।

জলসংকট প্রতিকারের প্রয়াস: যেভাবে জল অপচয় হচ্ছে,সেভাবে জল সংরক্ষণের প্রয়াস করা হচ্ছে না বলেই মনে হয়। সবচেয়ে বড় কথা কোন রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনও এ বিষয়ে নির্বিকার।
ইতিমধ্যে তৎপরতার সঙ্গে জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করলে অদূর ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা অবশ্যম্ভাবী।
বিশেষ করে বর্ষার অতিরিক্ত জল ধারণ করে রাখার ব্যবস্থা করতেই হবে। নতুন নতুন পুকুর বা জলাধার নির্মাণ করে তাদের পাড় বাঁধিয়ে জলধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বন্যার অতিরিক্ত জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাকে কৃষিকাজে লাগাতে হবে।
বর্ষাকালে অরণ্যসপ্তাহ পালনের মধ্য দিয়ে বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দিতে হবে। গ্ৰামে, শহরে,স্কুল-কলেজে, জেলায় জেলায় সর্বত্র জল সচেতনতা শিবির গড়ে তুলতে হবে। বিশেষত, জল অপচয়ের মারাত্মক এবং ভয়াবহ কুফল সম্বন্ধে পোস্টার,ব্যানার এবং প্রচারের মাধ্যমে মানবসমাজকে অবগত করতেই হবে। অন্যথায় আর মাত্র দু দশকের মধ্যে পানীয় জলের অভাবে মানুষ জন মারা পড়তে থাকবে।

————-

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *