ASHIM KUMAR CHATTOPADHYAY

 19 total views

গল্প – প্রত্যাবর্তন /
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

মাধ্যমিক পরীক্ষাটা খুব খারাপ হয়েছিল অরিত্রর । পরীক্ষার আগে খেলার মাত্রা গেছিল বেড়ে । সেভাবে পড়াশুনো হয় নি । তার ওপর নতুন মোবাইল ফোন পেয়ে দিনের বেশি সময়টা কেটে যেত ইউরো কাপ খেলা দেখায় । খুব দুশ্চিন্তায় ছিল সে । পরীক্ষা যে খারাপ হয়েছে সে কথা অরিত্র বলে নি তার বাবাকে । যা কিছু কথা সব মায়ের সাথে । অথচ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে পুরো এক সপ্তাহ অরিত্রর সাথে পরীক্ষা হলে গেছেন মৃগাঙ্ক বাবু । সব সময় নজর ছেলের যেন এত টুকু অসুবিধে না হয় । বন্ধুর মতন মেশেন ছেলের সাথে । তবু অরিত্র ভয় পায় তার বাবাকে । কোন মতে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করলো । এবার কি নিয়ে পড়বে ? ভর্তি বা হবে কোথায় ? অনেক ছোটা ছুটি করে মৃগাঙ্ক বাবু ছেলেকে ক্লাস ইলেভেনে ভর্তি করলেন একটা অনামী স্কুলে । সাবজেক্ট গুলো পছন্দসই হল না । কিছু করার নেই । যে স্কুলে যা সিস্টেম । তুলনা মূলক ভাবে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল ভালো হয়েছে ।
এবার কি নিয়ে পড়বে ?
মৃগাঙ্ক বাবুই সমাধা করলেন ।
আইন নিয়ে পড়ার পরামর্শ দিলেন ।
বললেন , চাকরির বাজার খুব খারাপ । এমন কিছু নিয়ে পড়তে হবে যাতে দু পয়সা রোজগার করতে পার । ভর্তি করে দিলেন ল কলেজে ।
বাবার মুখ রেখেছে ছেলে । শিক্ষা সমাপ্ত করে দু বছর শিক্ষানবিস হিসাবে কাজ করেছে একজন সিনিয়র এডভোকেটের অধীনে । মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেত কিন্তু কাজ করতে হত ১২ ঘন্টা । প্রথম দিকে ওই এডভোকেট ভদ্রলোক অরিত্রর সাথে চাকর- বাকরের মত ব্যবহার করতেন । পরের দিকে একটু ভালো । অরিত্র অসম্ভব অপমানিত বোধ করত । প্রতিদিন ভাবতো সব ছেড়ে ছুড়ে বাড়ি বসে থাকবে । কিন্তু তাতে তো সমস্যার সমাধান হবে না । বাধ্য হয়ে মুখ বুজে সমস্ত অপমান হজম করে কাজ করে গেছে ।
দুবছর বাদে অনেক কষ্ট করে বার কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করিয়েছে । স্বাধীনভাবে কাজ করবে সে । বললেই তো হল না । তাকে কে চেনে যে তার কাছে আসবে ? সকলেই ভালো উকিল খুঁজে বেড়ায় । যারা দীর্ঘ দিনের পুরনো এবং যথেষ্ট পসার করেছেন ,তাদের কোন অসুবিধা হয় না । কিন্তু অরিত্রর মত যারা নতুন সমস্যা তাদের । প্রচুর দালাল ঘুরে বেড়াচ্ছে আদালত চত্বরে । পার্টি দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে । কাড়াকাড়ি চলে । দেখে মনে হয় সবার ঘরেই অভাব । হাঁড়ি চলে না । একটা কেস পেলে ভাগ বাটোয়ারা করে যে কটা টাকা পকেটে ঢুকবে তাই দিয়ে যেন বাড়ি ফেরার পথে চাল ডাল কিনে নিয়ে যাবে ।
এত কিছুর মাঝেও দু চার জন ভালো মানুষ থাকেন । ভগবানের দূত । পরের উপকার করার জন্য ই এদের জন্ম । এরকম একজন হলেন শ্রীধর ব্যানার্জি । খুব ভালো মানুষ । প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলেন অরিত্র কে । নিজের চেম্বারের একপাশে চেয়ার টেবিল পেতে অরিত্রর বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন । সব রকম ভাবেই সাহায্য করতেন অরিত্র কে । দুর্ভাগ্যের বিষয় এই সব ভালো মানুষদের কপালে খুব একটা কেস জোটে না । যাও বা জোটে , পয়সাকড়ি তেমন পাওয়া যায় না । এদের নিজেদেরই চলে না | অন্য কে পার্টি দিয়ে সাহায্য করবেন কিভাবে ?
দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল । অরিত্রর রোজগারপাতি শূন্য । নেহাত বাড়িতে বাবা আছে । সংসার বাবাই দেখে । এখনো অরিত্র পকেট খরচ নেয় বাবার থেকে । সন্তান বলে কথা । বড্ড দুর্বল জায়গা । না বলেন কিভাবে ? মৃগাঙ্ক বাবু নিজেও জানেন লড়াইটা সহজ নয় । এক ইঞ্চি জমি কেউ ছেড়ে দেবে না । মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে । ময়দান ছেড়ে চলে গেলে মানে হেরে গেলে । প্রতি মুহূর্তে ছেলেকে উৎসাহ দিয়ে যান ।
বলেন , সব সময় মনে রাখবে পৃথিবীতে কোন মানুষ সহজে বিখ্যাত হয় নি । প্রচুর পরিশ্রমের ফল পরবর্তীকালে তারা পেয়েছেন । বিখ্যাত খেলোয়াড়রাও বহু বছর মাঠের বাইরে বসে কাটিয়েছেন । একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন । কেউ জানে না সুযোগ কবে কখন আসবে । আসবে তো বটেই ।তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে ।চিনে নিতে হবে সুযোগকে । বার বার সুযোগ আসবে না । আবার হতাশ ও হবে না । মনে বিশ্বাস রাখবে । দেখবে একদিন কেস ঠিক তোমার কাছে হেঁটে হেঁটে চলে আসবে ।
বাবার সাথে কথা বলতে এখন খুব ভালো লাগে অরিত্রর । দারুন চার্জড হওয়া যায় । বাবা খুব পজিটিভ । সবচেয়ে বড় কথা বাবা সব সময় উৎসাহ দেয় ।কখনো বলে না এত বড় হয়েছ এবার টাকা ফেল সংসারে । উল্টে বলে , আমাদের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না । তুমি দেখ কিভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পার ।
অরিত্রর মা অনেকদিন ধরে ছেলেকে বলছেন একবার তারাপীঠে যাবার জন্য । মৃগাঙ্ক বাবুর সময় নেই । অরিত্রর কাজ নেই বললেই চলে । ছেলের জন্য তিনি তারাপীঠে মায়ের কাছে পূজো দিতে চান । এক শনিবার সকালের ট্রেন ধরে অরিত্র তার মা কে নিয়ে চলে গেল তারাপীঠ । মন্দিরের কাছাকাছি পেয়ে গেল একটা হোটেল । ভালোভাবেই পূজো দেওয়া হল । পরের দিন দুপুরে ফেরার ট্রেন । সকাল বেলায় মা কে নিয়ে বেরিয়েছে একটু ঘুরে দেখার জন্য । শ্মশানের ঠিক আগে রাস্তার ওপর মানুষের জটলা । ভিড় দেখে মনে হয় মাদারির খেলা হচ্ছে । ভিড়ের ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে নেই । পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল । কয়েকজনের কথা ভেসে এলো কানে । বুড়ি মানুষ একা একা এখন কি করবেন ? বাড়ি ফিরে যাবেন কিভাবে ? এইসব ছেলেকে পিছমোড়া করে জল বিচুটি দিয়ে মারা উচিত । ছেলে তো নয় , কুলাঙ্গার ।

অরিত্র তার মা কে বলল , কি সব বলছে গো , দেখি তো একবার উঁকি মেরে ? তুমি এক কাজ কর , এই দোকানটায় বস । যদি কিছু কিনতে হয় কেনো । আমি দেখেই চলে আসছি ।
বেশ কিছুক্ষন বাদে ফিরে এলো অরিত্র । সাথে একজন বৃদ্ধা মহিলা । অরিত্রর মা তো অবাক !
বললেন , ইনি কে ?
অরিত্র বলল , মা , এই ভদ্রমহিলা উনার ছেলে আর ছেলের বৌয়ের সাথে তারাপীঠে এসেছিলেন মায়ের পূজো দিতে । উনাকে এখানে বসিয়ে উনার ছেলে আর তার বৌ গেছে পূজোর ডালি আনতে । কালকে এসেছেন জলপাইগুড়ি থেকে । আজ সকালে পূজো দেবার নাম করে উনাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ছেলে আর তার বৌ চলে গেছে । বলে গেছে তুমি লাইনে দাঁড়াও আমরা পূজোর ডালি কিনে আনি আর একজন পান্ডার সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করছি যাতে লাইনে বেশিক্ষন দাঁড়াতে না হয় । সে যে গেছে তো গেছে আর পাত্তা নেই । প্রায় ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে থেকে উনার মাথা ঝিম ঝিম করছে । উনি লাইন থেকে সরে এসে সিঁড়ির ওপর অনেক্ষন বসে ছিলেন । তারপর কাঁদতে কাঁদতে সেই হোটেলের দিকে চলেছেন যেখানে গতকাল রাত্রে উনারা ছিলেন । মুশকিল হল উনি ওই হোটেলের নামও জানেন না ,আবার রাস্তাও চেনেন না । তাই রাস্তায় বসে বসে কাঁদছেন । এরকম একজন ঠাকুমার বয়সী মানুষকে ফেলে চলে যাই কি করে ?
অরিত্রর মা বললেন , কি ভয়ঙ্কর ছেলে আর তার বৌ । কি করবি এখন ?
উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম । বলছেন উনাদের বাড়ি জলপাইগুড়ির বামন পাড়ায় । কিন্তু উনি তো একা যেতে পারবেন না ।তাছাড়া উনার কাছে কোন টাকা পয়সা নেই । যাবেনই বা কীভাবে?
তুই এক কাজ কর । তুই উনাকে উনার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয় ।
ভিড় করে মজা দেখতে আসা কিছু উৎসাহী মানুষ বলে উঠলেন ,
হ্যাঁ দাদা, সেটাই ভালো । আপনি ঠাকুমার সাথে গিয়ে ঠাকুমাকে পৌঁছে দিয়ে আসুন ।
এতক্ষনে অরিত্রর মায়ের খেয়াল হল যে তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন । বেলা বাড়ছে । সূর্যের তাপ বেড়েছে ।
ছেলেকে বললেন , আগে হোটেলে ফিরে চল । সেখানে বসে ঠান্ডা মাথায় সব ঠিক করা যাবে ।
ঠাকুমা আমাদের সাথে যাবে তো ?
অবশ্যই যাবেন ।
হোটেলে ফিরে অরিত্র ফোন করল বাবাকে । মৃগাঙ্ক বাবু সব শুনে বললেন , তোমরা এক কাজ কর । ব্যাপারটা যতটা সহজ ভাবছো তা কিন্তু নয় । যদি উনার আপত্তি না থাকে তাহলে উনাকে নিয়ে একটা ট্যাক্সি করে সোজা বাড়ি চলে এসো । সব দিক ভেবে কাজ করতে হবে ।
একটা ট্যাক্সি করে ওই বৃদ্ধা মহিলাকে নিয়ে অরিত্র আর তার মা বাড়ি ফিরে এলো । ভদ্রমহিলার সাথে কথা বলে জানা গেল যে উনার নাম বনলতা দেবী । জলপাইগুড়ির বামন পাড়ায় বাড়ি । স্বামী ছিলেন স্কুল শিক্ষক । প্রভিডেন্টফাণ্ডের টাকা তুলে আর উনার গয়না বিক্রি করে ছয় কাঠা জমির ওপরে বাড়ি কিনেছিলেন । চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর উনার স্বামী বাড়ির সামনের দিকের ফাঁকা জমিতে করেছিলেন সুন্দর একটা বাগান । বাগানটা ছিল উনার প্রাণ । এছাড়া , গরীব ছেলে মে1\1য়েদের বিনা পয়সায় পড়াতেন ।
একটাই ছেলে । অনেক চেষ্টা করেছিলন কিন্তু মানুষ হয় নি । অসৎ সঙ্গে পড়ে নেশা ভাঙ করতো । ব্যবসা করার নামে প্রচুর টাকা জলে ঢেলেছে । বিয়ে করেছে নিজের পছন্দ মত । ওদের একটা মেয়ে । বাজারে প্রচুর দেনা করেছিল ছেলে । কেন করেছে উনি তা জানেন না । সেই টাকা শোধ করা নিয়ে বাবার ওপর চাপ দিত ছেলে আর ছেলের বৌ ।অবসরের সময় যত টাকা পেয়েছিলেন প্রায় সবটাই একপ্রকার কেড়ে নিয়েছিল ওরা দুজনে ।
ওর বাবা ছিলেন চাপা স্বভাবের মানুষ । ভেতরের কষ্ট বাইরে কাউকে বুঝতে দিতেন না । অসুস্থ হয়ে পড়লেন । ভালো ডাক্তার না দেখিয়ে উনাকে স্থানীয় একটি সেবা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করলো ছেলে । দিন সাতেক বেঁচে ছিলেন । তারপরে মারা যান । স্বামী মারা যাবার পর থেকে ভদ্রমহিলার ওপর চাপ সৃষ্টি হয় । ছেলে আর তার বৌ দুজনে মিলে অসম্ভব খারাপ ব্যবহার করা শুরু করে । নিজের পেটের ছেলে যে এত খারাপ হতে পারে তা ছিল তার ধারণার অতীত । বাইরের থেকে লোকজন আসতো । মদ খেত । অনেক রাত পর্যন্ত হৈ হুল্লোড় হত ।উনি প্রতিবাদ করেছিলেন । ক্ষেপে গেল ছেলে আর ছেলের বৌ । তখনি অভিসন্ধি করে উনাকে বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে । সুযোগ পাচ্ছিল না । তারপর হঠাৎ দুজনে খুব ভালো হয়ে গেল । সারাদিন মা মা করে ডাক । সেবা যত্ন করা । ভদ্রমহিলা বুঝতে পারেন নি ওদের দুরভিসন্ধি । মায়ের মন | সব সত্যি ভেবেছিলেন । তারপর ঠিক করে সবাই মিলে তারাপীঠ যাবে । ছেলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন । কিন্তু তখন তো জানেন না যে তারাপীঠের নাম করে তাকে বাড়ির বাইরে বের করে আনার ছক করেছিল । তাই মন্দিরে পুজোর লাইনে উনাকে দাঁড় করিয়ে ছেলে আর তার বৌ পালিয়ে যায় ।
সমস্ত ঘটনা শুনে মৃগাঙ্ক বাবু অনেক্ষন চুপ করে থাকলেন ।তারপরে বললেন ,
অরিত্র , আমার মনে হয় তোর দিন শুরু হচ্ছে ।
মানে ? বুঝলাম না ঠিক ।
তুমি ল ইয়ার । তোমার তো বোঝা উচিত । তারাপীঠে মায়ের কাছে পুজো দেওয়ার ফল তুমি হাতে হাতে পেয়ে গেছ ।
শোন আমার কথা । ভদ্রমহিলাকে নিয়ে তুমি সোজা জলপাইগুড়ি যাবে । যদি সহজেই উনাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে নেয় তো ল্যাঠা চুকে গেল । কিন্তু আমার মন বলছে ওরা উনাকে ঢুকতে দেবে না । এরপর যাবে স্থানীয় থানায় । নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলবে । দেখ পুলিশ কি করে ?
সেখানেও যদি কোন রকম সাহায্য না পাও তাহলে তোমার জন্য বেস্ট জায়গা তোমার আদালত । আদালতের মাধ্যমে উনাকে উনার বাড়ির অধিকার ফিরিয়ে দেবে ।
এবার ভদ্র মহিলা বললেন , ওদের সাথে আমি এক বাড়িতে থাকবো না । কারন এর পরে ওরা আরো ভয়ানক কিছু করবে । আমাকে মেরেও ফেলতে পারে । সম্পত্তির লোভে কোন কিছুই ওদের কাছে অসম্ভব নয়
মৃগাঙ্ক বাবু বললেন , কিন্তু তাই বলে আপনি নিজের বাড়ি ছেড়ে বাকি জীবনটা একা একা কোথায় থাকবেন ? বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেও প্রচুর টাকা লাগে । অত টাকা আপনি কোথায় পাবেন ?
ভদ্রমহিলা বললেন , আমি বলতে চাইছি আমি আমার বাড়িতেই থাকবো কিন্তু ছেলে আর ছেলের বৌ আমার সাথে ওখানে থাকতে পারবে না । যেখানে খুশি যাক আমার দেখার দরকার নেই ।
কিন্তু আদালতে একটা কেস ফয়সালা হতে অনেক দিন সময় লাগে । ততদিন আপনি কোথায় থাকবেন ?
অরিত্র বলল , ঠাকুমা এখানেই থাকুক আমাদের বাড়িতে ।
অরিত্রর মা বললেন , উনি যখন যেতে চাইছেন না তখন আমাদের এখানেই থাকুন । অরিত্র মামলা করুক । মামলার ফয়সালা হলেই উনি নিজের বাড়িতে ফিরে যাবেন ।
কেঁদে ফেললেন ভদ্রমহিলা । অরিত্রর মায়ের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন , ভগবান তোমাদের মঙ্গল করবে মা । তোমরা যে আমার মত একজন অসহায় বৃদ্ধা কে এইভাবে থাকতে দেবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি । তারাপীঠে আসা আমার একদিক দিয়ে স্বার্থক হয়েছে । তোমাদের পেলাম । আমার জীবনে এত বড় পাওনা মায়ের আশীর্বাদ ছাড়া সম্ভব হত না ।
অরিত্রর জীবনে প্রথম কেস । একটু নার্ভাস তবে যথেষ্ট উত্তেজিত । শ্রীধরদার সাথে আলোচনায় বসলো । অসম্ভব ভালো মানুষ শ্রীধরদা । সব রকম ভাবে সাহায্য করলেন অরিত্র কে ।
বললেন , পুরো ব্যাপারটা সাজিয়ে নাও । এরপরে চাই সাক্ষী সাবুদ । ভদ্রমহিলা নিজেই সাক্ষী দেবেন । তবু আরো কিছু তথ্যের প্রয়োজন । আমি তোমার কাছে একটি ছেলে পাঠিয়ে দেবো । এক্সপার্ট ছেলে । সে জলপাইগুড়ি থেকে খবর সংগ্ৰহ করে আনবে । তারপর ব্রিফ তৈরী করবে ।
প্রচুর পরিশ্রম করে নিজেকে প্রস্তুত করলো অরিত্র । জিততে তাকে হবেই । যদিও সে জানে যে আইন তার ক্লায়েন্ট বনলতা দেবীর পক্ষে তবুও আদালত বলে কথা ।
আদালতে ছেলে এবং ছেলের বৌয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন বনলতা দেবী । অসাধারন দক্ষতার পরিচয় দিল অরিত্র । প্রথম দিকে ভদ্রমহিলার ছেলে এবং তার বৌ অস্বীকার করলেও অরিত্রর কথার প্যাচে একদম বেকায়দায় পড়লো দুজনে । ভুল স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল । কিন্তু ওদের ক্ষমা করবেন না বনলতা দেবী । তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড় ।
কাঠগোড়ায় দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বিচারককে বললেন তার চরম অপমানের কথা । কিভাবে তার ওপর তার ছেলে এবং ছেলের বৌ অত্যাচার করেছে দিনের পর দিন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বললেন সে সব কথা । তারা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে ছিল । মা শুধু সন্তানের অত্যাচার সহ্য করতে পৃথিবীতে আসে নি । আদর ,ভালোবাসা ,স্নেহ ,মমতায় ঢাকা থাকে তার একটা মন । সেই মনে কেউ নিষ্ঠুর ভাবে আঘাত করলে মন তো রূঢ় হবেই । আমার সন্তান দেখুক তার মায়ের কঠোরতা । মা যেমন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারে ,ঠিক সেই রকম কুলাঙ্গার পুত্রকে স্নেহের বন্ধন থেকে মুক্ত করতেও পারে । বাড়ি ছাড়তে হবে তার ছেলে এবং ছেলের বৌকে । তাদের তিনি বিশ্বাস করেন না একফোঁটা ।ওরা থাকলে তিনি নিরাপত্তার অভাব বোধ করবেন । যে কোন মুহূর্তে তার প্রাণ সংশয় হতে পারে । জীবনের শেষ কটা দিন শান্তি চান তিনি । কোনরকম প্রাত্যহিক বাক বিতণ্ডায় যেতে চান না । এই বয়সে এত মানসিক চাপ সহ্য করার মত শক্তি তার নেই । কারোর দয়ায় তিনি বাঁচতে চান না । এক বেলা খেয়ে হোক , না খেয়ে হোক নিজের বাড়িতে উনি থাকবেন ।
সমস্ত কিছু বিবেচনা করে মাননীয় বিচারক জানিয়ে দিলেন যে এখন থেকে বনলতা দেবী তার নিজের বাড়িতে একা থাকবেন । তার ছেলে এবং ছেলের বৌয়ের ওই বাড়িতে থাকার কোন অধিকার থাকবে না । এই প্রসঙ্গে তিনি ভারতীয় সংবিধানে উল্লেখিত ২১ নম্বর ধারার কথা উল্লেখ করেন । যেহেতু বাড়ির মালিক বনলতা দেবী তার ছেলে এবং ছেলের বৌয়ের সাথে এক বাড়িতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন না ,তাই তার অনুরোধকে মান্যতা দিয়ে আদালত এই আদেশ জারী করছে যে বনলতা দেবীর ছেলে এবং ছেলের বৌ ” লাইসেনসিস ” হিসাবে ছিলেন বনলতাদেবীর বাড়িতে । এখন তাদের লাইসেন্সের মেয়াদ ফুরিয়েছে । সুতরাং বাড়ি খালি করে তাদের চলে যেতে হবে । তিনি পুলিশকে এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন এই ব্যাপারে আদালতের আদেশ মেনে বনলতা দেবীর ছেলে এবং ছেলের বৌকে বনলতা দেবীর বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন ।
বিচারকের রায় দান শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বনলতা দেবী জড়িয়ে ধরলেন অরিত্র কে । বাড়িতে ফিরে অরিত্রর মা কে বললেন ,
বৌমা , আজ যা কিছু পেলাম তা সব তোমাদের জন্যে । তোমরাই আমার সত্যিকারের আত্মীয় । শুধু আর একবার তোমাদের একটু কষ্ট দেবো । আমরা সবাই মিলে যাবো আমার বাড়ি । উকিল মশাইকে মানে আমার অরিত্র দাদুভাইকে মামলার ফিজ দেওয়া হয় নি । আমার অবর্তমানে আমার পুরো সম্পত্তি আমার দাদু ভাইকে দিয়ে যাবো । তার জন্য যা যা করণীয় সবই করতে হবে আমার দাদু ভাইকে । জীবনে অনেক পুণ্য করে ছিলাম বলে তোমাদের সাথে দেখা হয়েছিল । আমি বেঁচে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারলাম । সব কিছু তোমাদের জন্য সম্ভব হয়েছে ।
পরের রবিবার আদালতের রায়ের কপি হাতে নিয়ে স্থানীয় পুলিশকে সঙ্গে করে সবাই মিলে ঢুকলেন বনলতা দেবীর বাড়িতে ।

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *