Biswanath pal

 146 total views

কবিতার রূপ আর রূপান্তর
—-বিশ্বনাথ পাল
অনেকের বিশেষত টিনএজার দের ধারণা পৃথিবীর মধ্যে সহজ সাধ্য কাজ কবিতা লেখা।ভগবানের সঙ্গে অপমান কিম্বা সাবান দিলে বেশ কবিতা হয়ে যায় ।আন এর সঙ্গে মান ,ধান এর সঙ্গে টান কিম্বা চান এর সঙ্গে খান –জম্পেস কবিতার উপকরণ।এই দেখে একজন কবি তো একবার লিখেই ফেললেন:
ভগবান তুমি তো সাবান
ধরতে গেলেই পিছলে যাও।
আর একজন লিখলেন একেবারে হাল আমলের আধুনিক কবিতা
আকাশে উঠেছে চাঁদ
গাছে উঠেছে গরু
তোমার কাস্তেটাকে কেড়ে নেব
দেখি, তুমি দাড়ি কামাবে কি দিয়ে?
এসব দেখে গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পঞ্চুবাবুর মনে সাধ জাগল কবি হবার।
কবিদের সম্মেলনে কবিতার উৎসবে স্বরচিত কবিতা পাঠ করার জন্য কলম হাতে কাগজ টেনে বসে পড়লেন।
বউ বিন্তি এসে বলল আজ আপিস —
—একেবারে হাপিস।
আপিসের সঙ্গে হাপিসের মিলটা বড় ধরনের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দিল।মোবাইল বন্ধ করে সকাল সকাল কবিতা লিখতে বসে সাত তাড়াতাড়ি একটা লাইন ও খচ খচ করে লিখে ফেললেন
–দশরথ নামে এক ছিল মহারাজ।
পঞ্চুর প্রশংসাশোনার মতলবে এই ধারনাটাই চাগাড় দিয়েছে
মহাকাব্যের ছত্র ছাড়া মহাকবি হবার অন্য কোন গতি নেই।
চা ফেরত এলো।খাবার সময় নেই।দুপুর গড়িয়ে গেল চিন্তিত মুখে বিন্তি ঢু মারল কবির চৌকাঠে ।না, কবি দিবা নিদ্রায় বিভোর হন নি।পেটে তো ছুঁচোর কেত্তন।কবি আজ করেন নি কোন খাদ্যই গ্রহণ।
বিন্তি শুরু করলে ইনিংস–এই বয়সে কি প্রেম পত্তর লেখা শুরু করলে?
পঞ্চুর কবি হবার বাসনা তলানিতে।এতক্ষণ না খেয়ে পেট চোঁ চাঁ।বললে জানো গিন্নি আজ একটু কবিতা লেখার প্যাকটিস করছিলাম।একটা লাইনের পর কে যেন লাইগেশন করে দিল।আর লাইন আসছে না।
বিন্তি বলে শোনাও:তোমার লাইন।আমি মিলিয়ে দেব ফাইন।
অগত্যা ঢোক গিলে পঞ্চু পড়ে তার সেই ঐতিহাসিক লাইন
দশরথ নামে এক ছিল মহারাজ ।
বিন্তি তাড়াতাড়ি বলে উঠল চলো চলো মুড়ি খাবে ভেজেছি
পেঁয়াজ ।।
কি সুন্দর সমাপতন।
যুগলের যুগলচেষ্টায় কবি খ্যাতি বেশিদূর এগোয় নি যদিও তবুও বিন্তি আর পঞ্চু প্রধানদের ধারনা, টেনেটুনে ছন্দ মেলালেই কবিতার জন্ম হতে বাধ্য।কবিতার সারা গায়ে যত বেশি অলঙ্কার পরানো যাবে কবিতা তত দামী হবে।কবিতার হাল হয়ে যাবে একেবারে ভারিক্কি।এর সঙ্গে একটু দুর্বোধ্যতা কোনমতে মেশালেই একেবারে কেল্লাফতে!তাই নয় আর চেনা গতে।উপমা শ্লেষ ছন্দ আর অলঙ্কার ভরে দাও কবিতার গাঁটে গাঁটে ।দামী কবিতাকে মনফকিরা পাঠক ঠিক খুঁজে নেবে।
কিন্তু এই ধরণের কবি শুধু কবিতার শরীর দেখেন।স্বাস্থ্য দেখেন।মেদাসক্তির কাছে মেধাশক্তির পরাভব ঘটে।তাঁরা কবিতার শরীরের ভিতরে আসলে প্রাণ বলে কোন বস্তু আছে কিনা তার হদিশ পেতে ভুলে যান।অনেকের কাছে কবিতা ক্লীব লিঙ্গ ।মৃত্যুর পরে মৃতার শরীরে যারা গয়নার প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেন তারা চোর ডাকাতের মনের আদলে মন গড়তেই পারেন সাধারণ গৃহস্থ মানুষের সুখদুঃখ আশা ভালবাসার দুলুনিটা বোঝেন না।বুঝতে পারেন না।অনেকে আবার কবিতাকে অপ্রাণীবাচক।প্রাণহীন।শুধু মাত্র আনন্দের খোরাক বলে জাহির করেন।
তাই কবিতার নিষ্প্রাণ আর নিষ্প্রভ শরীরের জৌলুসের পাশে বেশিদিন থাকতে পারেন না।মৃতদেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু:করলে পাঠক আর কবি দুজনেই আটকে পড়ার ভয়ে চোঁ চাঁ দৌড় লাগান।
আসলে কবির প্রধান কাজ হল পাঠকের সুখ দুঃখ আনন্দ হতাশা আর বেদনাকে চুরি করে বলে দেওয়া ।মরমী কবির কবিতায় তার ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে।
আর কবির ক্ষেত্রে ভাষা ছন্দ অলঙ্কার আঙ্গিকের চেয়ে ও দামী জিনিস হচ্ছে কবিতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা । যত সহজে এটা বলা যায় ব্যাপারটা আদৌ অতটা সহজ নয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রেলগাড়ির কামরায় সেই “হঠাৎ দেখা “কবিতার কথা মনে আছে নিশ্চয়। চেনা মানুষকে অচেনা গাম্ভীর্যে আমরা রোজ তো দেখি ই কিম্বা রবীন্দ্রনাথের আর একটি কবিতা “হারিয়ে যাওয়া”মনে পড়ছে নিশ্চয়।সাধারণ বর্ননা।
আমার আপনার যদু মধু সক্কলের জীবনেই ঘটে ।এখানে নতুন কিছু নেই ।একেবারে সাদা মাঠা ব্যাপার দ্বিতীয় কবিতাতেও একটি ছোট্ট মেয়ে বামী সঙ্গিনীদের ডাকশুনে প্রদীপের শিখাটিকে সযত্নে আড়াল করে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল। হঠাৎ প্রদীপ নিভে গেলে বামী কেঁদে ওঠে।কারণ জানতে চাইলে বাবাকে সে বলে ‘হারিয়ে গেছি আমি।’
প্রথম কবিতার শেষের দিকে
‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে।”
আর দ্বিতীয় কবিতার শেষে
তারায় ভরা চৈতমাসের রাতে ফিরে গিয়ে ছাতে কবির যে অনুভূতির যে প্রকাশ
“নিবত যদি আলো,যদি হঠাৎ যেত থামি,
আকাশ ভরে উঠত কেঁদে,’হারিয়ে গেছি আমি!’
–এতেই কবিতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হল।বাক্য বা শব্দ বন্ধের যোগ সাজসে একটি করে সম্পূর্ণ কবিতার জন্ম হল।
(ক্রমশঃ )

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *