Biswanath pal

 170 total views

কবিতার রূপ আর রূপান্তর( ২)
–বিশ্বনাথ পাল


কবিতা হ ওয়া আর না হওয়ার মধ্যে তফাতটা আসলে কি?একই উপকরণ নিয়ে পাকা রাঁধুনি একই হেঁসেলে সুস্বাদু রান্না করেন কিন্তু অন্যজন তা পুড়িয়ে ফেলেন। আসল রান্না শিখেও কেউ কেউ নুনের মাত্রা ঠিকমতো না জানলে রান্নার বাহারি সুনাম থেকে ছিটকে যান।সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য আবেদন রক্ষার মঞ্চে লালনের “সবলোকে কয় লালন কি জাত সংসারে ” গানটা যেমন জমে।কিম্বা নজরুলের একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসরমান।

যতটা জমে যদু মধুর লেখা ততটা জমে না।পাঠক ভাববেন আমার বোধহয় মাথার ঠিক নেই।কবিতার কথা বলতে গিয়ে গানের প্রসঙ্গে চলে এসেছি। পাড়ায় ছেড়ে আখড়ায় এসেছি! আসলে ভাল কবিতা না হলে ভাল গান তো হতে পারে না।দিনের ভালো তরকারি রাতেও চালিয়ে নেওয়া যায় কিন্ত সেই তরকারী তরকারিই না হলে তাকে চালানোর দায় কে নেবে?

অচল পয়সা যেমন নিয়ন আলোতে অচল লম্ফের আলোতেও অচল।অর্থাৎ না কবিতা না গানের দলে পড়ে থাকে।লোডশেডিংয়ের সময় কেউ যদি অচল পয়সা সচল করতে চান তবে দিনের আলো ফুটলেই তা অচল বলে সাব্যস্ত হয়।কবিতা রচয়িতার ব্যক্তিগত প্রভাব বা যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে নামী পত্রিকা কিম্বা কাব্য সংকলনে কবিতা ছাপা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।


কবিতার প্রাণ কবিতার সর্বস্ব সম্পদ ।কিন্তু এই প্রাণ কবিতার ঠিক কোনখানে থাকে ,কি করে বুঝব?
কবিতার প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন কবির মুন্সিয়ানা প্রয়োজন ঠিক তেমনি কবিতার প্রাণ আবিষ্কারের জন্য পরিশীলিত পাঠকের রসবোধ প্রয়োজন।কবিতাকে রসুনের খোসার মতো ছাড়িয়ে নির্মল আনন্দ পাওয়ার ব্যাপারটা সকলের পক্ষে সহজসাধ্য কাজ নয়।রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ সুধীন্দ্রনাথ কিম্বা বিষ্ণুদের কবিতা এ ব্যাপারে সাধারণ পাঠককে সে অর্থে অনেকটাই হতাশ করে বৈ কী।


কবিতার পরতে পরতে আনন্দ পেতে হলে পাঠককে একটু এগোতেই হবে
নইলে কবিতা ঠিক বোঝা যাবে না।বোঝা যাবে না কবিতার মর্মবাণী।
কবিতা কবির স্বতস্ফূর্ত ভাবাবেগের ফসল।মহা মহা পণ্ডিতের দল রসকে কাব্যের আত্মা বলে গেছেন।নিরস বা রসহীন কবিতা পড়তে কার ভালো লাগে? দানায়দানায় রস না থাকলে যেমন সে বেদানা নয়।তেমনি ছত্রে ছত্রে রস না থাকলে তা কবিতাই না।


অনেকের ধারনা কবিতার প্রাণ আলাদা একটা কিছু।যা ছন্দে মিশে থাকে।কেউ বা ভাবেন অলঙ্কারেই প্রাণ থাকে।কেউ ভাবেন ভাষার চয়নে কেউ ভাবেন ভাবের বাঁধনে।কেউ বলেন লেখার স্টাইল বা রচনা শৈলীর মধ্যে। কেউ বলেন শিরোনামে কেউ বলেন অন্তিম চরণে।মাথায় না চরণে কোনখানে কবিতার প্রাণ ভ্রমরা গুণ গুণ করে কানে খাটো লোকেদের পক্ষে তার মালুম পাওয়া সত্যিই কষ্টের।


আমাদের শরীরে নাক কান গলার মতো পৃথক করে প্রাণ নেই।সমগ্র শরীরের মূল চাবিকাঠি প্রাণ যা না থাকলে এই শরীর মুহূর্তেই মৃত।কেউ ছোঁবে না।প্রাণ ধারনের মোদ্দা কথার মধ্যেই বেঁচে থাকা–এটা আমরা অনেক সময় খেয়ালে রাখতেই ভুলে যাই।


কবিতা তো শব্দ বাক্য অক্ষরের যোগসাজসে অনুভূতি প্রবণ কলমচির খেয়ালি সৃষ্টি।তাই কবিতা কবিতা কিনা তা জানাতে পারেন রসজ্ঞ পাঠক।তেমন কবির দুটি একটি শব্দের সমষ্টির অভিনবত্ব পাঠকের রসনায় লেগে থাকে ।যেমন পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতাসেন।


কিম্বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘এখানে গাভীর মতো মেঘ চরে’
জয় গোস্বামীর ‘আমি তখন নবম শ্রেণী ,আমি তখন শাড়ি ‘/দেখা হল বেণীমাধব সুলেখাদের বাড়ি ।’
কত সহজ সরল আর প্রাঞ্জল।আমি তখন নবম শ্রেণীতে পড়ি এবং তখন শাড়ি পরি সেই সময় সুলেখাদের বাড়িতে তোমার সঙ্গে দেখা হল –মোদ্দা কথাটা গদ্যকরে পাঠককে গেলালেও পাঠকের কাছে তা তেঁতো লাগবে।আমার মতে কবিতা আর ক্যাপসুল একই।দুটোর ক্ষেত্রেই মোড়ক থাকে। ক্যাপসুলের মোড়ক ওষুধের কটুভাব লুকিয়ে রাখে আর কবিতার মোড়ক মিষ্টতাকে আড়াল করে।

অনুসন্ধিৎসু পাঠক তার আগ্রহের দাঁত দিয়ে একটু একটু করে ছিঁড়ে তারিয়ে তারিয়ে সেই মাধুর্য উপভোগ করেন।কি বোঝা যাচ্ছে না ?শুনুন তাহলে আমরা যখন একা একা বাদাম খাই তখন হাম হাম করে খাই অর্থাৎ বেশি বেশি করে খাই যাতে প্যাকেট তাড়াতাড়ি শেষ হয়।

কিন্ত যখন বাদাম শেষ হয়ে আসে তত ই একটা বাদাম খেতে যা সময় লাগে আগের চার পাঁচটা বাদাম খাওয়ার সময়ের সমান।অর্থাৎ প্রথম দিকের একটা বাদামের তুলনায় শেষের দিকে একটা বাদামের উপযোগিতা অনেক অনেক বেশি।ধীরে সুস্থ পড়লে আপাত দুর্বোধ্য কবিতা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে এক সময় ধরা দেয় বৈকী।


কবিতার রূপের দিকে যদি তাকাই তবে দেখব সেখানে সরলতা সহজতা ছন্দ ভাব রস উপমা এগুলো থাকবেই।এগুলো ছাড়া কবিতা হবে না।ছন্দের ওপরে কবিত্বের স্থান পাকা একথা ভেবেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ।তিনি ছন্দের জাদুকর হিসাবেই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন।


কেউ কেউ ভাবপ্রধান কেউবা ভাষা প্রধান আবার কেউ বা বক্তব্য প্রধান শ্লোগান ধর্মী কবিতা লেখার মধ্যদিয়ে তারিফ কুড়িয়ে চলেছেন।চা বানাতে গেলে চা চিনি আর জলের একটা নির্দিষ্ট মাত্রা বা অনুপাতকে মানবেন নিশ্চয়ই যার ওপরে বা নীচে গেলে লোকে চা কে চা- ই না বলে বসবেন।

কবিতার ক্ষেত্রে সব রকম উপকরণের মধ্যে একটা সমন্বয়বোধের রেশ বা মাত্রা থাকতেই হবে।সকল উপকরণের সঠিক প্রয়োগে কবিতার রূপ অর্থাৎ সৌন্দর্য চন্দ্রিমার মতো পাঠকের বোধের মধ্যে দীর্ঘ দিন জেগে থাকে। মরমের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখেন কাব্যের জয়গান।


(ক্রমশঃ )

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *