আলো্চনা

পরম প্রজ্ঞার সমীপে নিবেদনগুচ্ছ – তৈমুর খান

 3 total views

মধুমঙ্গল বিশ্বাস এমন একজন কবি তিনি বরাবরই নিজেকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন। আঠারোটি কবিতার বই প্রকাশ করেও যশ-খ্যাতির জন্য কখনো তাঁরমধ্যে কাঙালপনা প্রকাশ পায়নি। ১৯তম কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘অনাদি দোহার'(২০২১)। পূর্ব প্রকাশিত কাব্যগুলি থেকে এটির ভিন্নতা পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন।

‘অনাদি দোহারে’র অর্থ হলো অন্তহীন সহগায়ক। ঈশ্বর এই ভুবন সৃষ্টি করেছেন। ভুবনের বহুবিচিত্র সৃষ্টিকেই ঈশ্বরের গান বলা যায়। ‘ভূমা’র মধ্য দিয়েই যার প্রকাশ। সুতরাং প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই ঈশ্বরের অবস্থান বা প্রতিটি সৃষ্টিতেই ঈশ্বরের অংশ। ঋগ্বেদের একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে: ‘একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি’। অর্থাৎ সত্য ব্রহ্ম এক, বিপ্রগণ বা জ্ঞানীগণ তাঁকে বহুনামে অবহিত করেন। বহু পরিচয়ে শিল্পী তাঁর পরিচয় পান। এই ‘অনাদি দোহার’ সেই মহাজীবনেরই কম্পন। শব্দজীবীর ক্রিয়ামানতায় উপলব্ধির নানা দরজা খুলে গেছে। কাব্যের পঞ্চাশটি কবিতায় কোথাও আবেগের অপরিমিত প্রকাশ নেই। দৃশ্য পরম্পরায় এক জাগতিক ক্রিয়ার অভিব্যক্তি যা অভিজ্ঞতারই সঞ্চার বলা চলে। অনুভূতি, ধারণা ও বোধের নির্বিকল্প প্রকাশে কবিতাগুলি ‘ভূমা’র-ই বহুমুখী পর্যায়। কবি একইসঙ্গে স্রষ্টা ও দ্রষ্টা। পরম প্রজ্ঞার সমীপে তাঁর নিবেদনগুচ্ছ এভাবে উপস্থাপিত করেছেন:

“মায়াবন্দরের আলো ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসে

এই সৌরস্টেশানগুলি বুকের সৌরভ থেকে হাঁড়, পাঁজরের সুধী নির্মাণ

খুবলে খুবলে তুলে নিয়ে যায়, কীভাবে বোঝাব অনন্ত!

অনন্ত, অনন্ত, তোমার হিমেল স্রোতে টান দাও

টান দাও জাফরি জোয়াল

আমার মাটির বুক ফুটিফাটা, আমার ফাগুনদিন দিশাহারা

আমার পৃথিবী জুড়ে হো হো হাসি প্রেতনাচ ভ্রুকুটি কুটিল

আলো ফিরে গেছে, ফেরার সদ্ভাব আর সম্ভাবনা নিয়ে

এই দীন মাধুকরী অথবা অকথ্য বিবমিষা

কার কাছে মুক্ত করি মানসবক্তৃতা”

(দেখা)

যে অনন্তের টানে বুকের মায়াবন্দরের আলো ক্ষীণ হয়ে যায়, এই জন্মের সৌরস্টেশানগুলিতেও বুকের পাঁজর সুধী নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ক্রমশ মুছে যেতে থাকে মোহ। তখন শুধু অনন্তের কাছে প্রাজ্ঞ সমর্পণ এক দার্শনিক প্রত্যয় নিয়ে উপলব্ধি করেন: ‘এই দীন মাধুকরী অথবা অকথ্য বিবমিষা’। মানসবক্তৃতা এভাবেই একান্ত অভিনিবেশে তার ব্যাপ্তির সমীহ সাজায়। নিউইয়র্ক এর জনপ্রিয় কবি জর্জ স্টারলিং(১৮৬৯-১৯২৬) তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন:

“O Space and Time and stars at strife,

How dreadful your infinity!

Shrined by your termless trinity,

How strange, how terrible, is life!”

(The Testimony of the Suns)

George Sterling, The Thirst of Satan: Poems of Fantasy and Terror.

অর্থাৎ ও মহাকাশ ও সময় এবং ঝগড়ুটে তারা, তোমাদের অনন্ত কত ভয়ংকর! তোমাদের অসীম চিরস্থায়ী ত্রিত্ব দ্বারা নির্বৃত্ত। কত বিস্ময়কর, কত ভয়ানক জীবন! সেই মহাকাশেরই সৌরস্টেশান কবির কাছে বিধৃত, নিবিষ্ট এবং নির্মিত হয় যা সত্যিই রহস্যময়।

এই রহস্যময়ের কাছেই জীবনের পৌঁছানোর অবিরাম কৌশল কবির। চেতনা জুড়ে তাই নিষিক্ত কল্পনার মহিমাও। দুঃখ-ক্লেশের মধ্যে বসবাস করেও এবং সংসারে থেকেও কবি সংসার বিবাগী গৃহসন্ন্যাসীর মতো। নিজেও জানেন না কোথায় চলেছেন। অথচ কবির সেই ‘ঈশ্বর’ যিনি ক্ষমা করতেও ভুলে যান। নিরাবয়ব,পদ্মপাতার জল হয়েও নিষিদ্ধ তরণি। আবার আটপৌরে খোলা মঞ্চে বৃষ্টি পড়ার গান। জীবন-সংসারে তাঁর উপস্থিতি কিন্তু:

“কেউ জানি না কেউ বুঝি না

কোথাকার পথ কেমনভাবে ঢুকে আছে কোন পথেরই মধ্যে

হাঁটছি কেবল, ছুটছি, এবং

অনন্ত এই পথের খোঁজে অতিবাহিত জীবন”

(ঈশ্বরবিষয়ক ধর্ষণ)

অনন্তের পথের কি কোনো শেষ আছে? না, কবিও তার শেষ দেখতে পাননি। হয়তো মৃত্যুই সেই শেষপ্রান্ত। জীবনযুদ্ধে কখনো হেরে যাওয়ার মধ্যেও এর উপসংহার স্পষ্ট। হয়তো এসবই ঈশ্বরের লীলা। জীবননাটকের নিয়ন্ত্রণও। তবু ‘অমৃতস্য পুত্রা’ কথাটি মনেরেখেই এগোতে হয়। কেননা ঈশ্বর মানুষ হন না কখনো।

‘অলখে কাহার বীণা’ বাজে স্বয়ংক্রিয় অভিমানের ভেতর ‘সুদূরে সন্ন্যাসে’ জীবনপ্রবাহের ভাসমানতা উপলব্ধি করেন। ইহজীবনের নান্দিকতা ভেঙে মহাজীবনের সাংকেতিকতায় বারবার কবি ডুবে যান। তখনই ‘ভূমা’র দোহারকে চেনা যায়। নিসর্গ ও মানব শরীর, শার্লক হোমস ও ফ্যাতাড়ু, মৃত্যু ও সংরাগ, রানু ও সুপর্ণা, শ্রোণি ও একতারা, বুলবুলি ও বাউল একাকার হয়ে যায় সমূহ চৈতন্য জুড়ে। আর প্রতীকায়িত চিত্রলেখায় কবির প্রকাশ এভাবেই:

“ভেঙে গেলেও

ধূলিস্যাৎ হলেও

হারিয়ে যায় না একতারা”

(শীতের কবিতা)

কবির বেঁচেথাকাও:

“সঙ্গম অতৃপ্ত রেখে

নিঃশেষিত আয়ুর অফুরানে

এভাবেও বেঁচে থাকা যায়—”

(যাপন)

সর্বত্রই এক বৈপরীত্যের খেলা চলতে থাকে। শূন্য যেমন এক নির্মাণ, স্পেস বা মহাকাশও এক বিস্ময় যাপনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। তাই একতারা না বাজলেও বাজে। আয়ু নিঃশেষ হলেও অফুরান হয়ে যায়। অনন্তের কাছে কোনো কিছু হারিয়ে যায় না। জার্মান কবি ঔপন্যাসিক রাইনার মারিয়া রিলকে(১৮৭৫-১৯২৬) একটি কবিতায় লিখেছেন:

“Whoever you are, go out into the evening,

leaving your room, of which you know every bit;

your house is the last before the infinite,

whoever you are.”

(Initiation : Rainer Maria Rilke)

তুমি যে হবে হও, সন্ধ্যাবেলায় বেরোও, নিজের ঘরটি ছেড়ে, যার সম্পর্কে তুমি কিছুটা জানো; তোমার বাড়ি অসীমের আগে সর্বশেষে, তুমি যেই হও। অর্থাৎ শেষ আশ্রয়, শেষ ঠিকানা যে অসীম তা বলাই বাহুল্য। আর এই কারণেই কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাসও শেষ আশ্রয়কে ‘সম্ভাবনা’ শব্দটি দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন। সম্ভাবনা বারবার এসেছে সহজিয়া বোধের আস্তিক্যবাদ থেকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কবি লিখেছেন:

“একদিকে ফাঁকা জমি

একধারে সম্ভাবনা, আলো”

(আশ্রয়)

এই আলোই ঘোরেফেরে। ধৈর্য ও সময়ের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। ভালোবাসা ঝুঁকে আসে দিগন্ত দাওয়ায়। হয়তো এভাবেই বাঁচার আকাঙ্ক্ষা বিলি করে। কবি তখন আবার লেখেন:

“আলোয় আলোয় বেজে উঠুক অন্তরাত্মা”

যদিও সব লেখা এপিটাফ তবুতো বিশ্বাস আছে, বিশ্বাসেই বোঝা যায়:

“তোমার মধ্যে একটা গ্রাম আছে

গ্রামে পুকুর আছে

শ্যাওলা ও সাঁতারের সম্ভাবনা আছে”

(অপেক্ষা)

এখানেও সেই ‘সম্ভাবনা’। সম্ভবনাই তো ক্রিয়াগুলিকে এগিয়ে দেয়। জৈবিক প্রক্রিয়াগুলি সচল রাখে। চুম্বন, অপেক্ষা, স্বপ্ন, ভালোবাসা শব্দগুলি ফিরে আসে। মানবিক উচ্ছ্বাস জেগে ওঠে:

“প্রতিরাতে ভেঙে যায় নির্জন নাবিক

জৈবিক নৌকা ভাসে অভ্যাসের যৌন মায়া ছেড়ে”

অথবা,

“আলোর স্নিগ্ধতা নিয়ে অন্য এক তৃষ্ণা জেগে ওঠে”

আর তখন কবিও ‘আমার ভিতরে অন্যতর আমি’ অন্য খেলার টের পান। যা অনিবার্য পাখির ডাক হয়ে কুয়াশাদেয়াল ভেদ করে। আলো তখন প্রত্ন সম্মোহনে মায়ের মুখেও পতিত হয়।

কিন্তু যে শূন্যতার ভেতর শূন্যতার সম্ভোগ আসক্তি তা থেকে কিছুতেই বিচ্যুত হন না কবি। তার স্থিতি স্থাপকতার কেহই টের পায় না। এই শূন্যতাই এই কাব্যের মূল উচ্চারণ। সফর সন্ধিহান হোক, কবি নিজেকে প্রতি মুহূর্তেই নতুন করে আবিষ্কার করেন:

“প্রতিদিন আবিষ্কার করি

প্রতিটি সফর নবরসায়নে

আমাকেও আবিষ্কার করে

বুঝি কোনও নব্য রসিক”

(সফর)

তমসাচ্ছন্ন ঋতু থেকে ক্রতুভুক আলোর সম্মোহনে, বরাভবে পত্র জাগা নিষিদ্ধ মরশুমেও কবির বোধ আত্মস্থ বিন্যাসের নিরাময়ে কথিত হয়ে ওঠে। সাংকেতিকতায়, ভাযায়, অলংকারে কাব্যগ্রন্থটির অনন্যতা বাংলা কবিতার কবিদের কাছে এক নতুন পরামর্শ। সময় চেতনাকে অবক্ষয়ী পুঁজিবাদের গভীর দ্যোতক করে তুলেছেন। মানুষের বিদ্রুপ পরোয়া না করলেও না-মানুষের বিদ্রুপ আমরা এড়াতে পারি না। বেবুক মানুষ, নার্সিংহোমের ছোবল, শ্যামার বোধন, মায়াবী কষ্ট, বেহুলা নারীর মতো সুখ যে জোৎস্নার আলো তা এই প্রথম জানতে পারি। তরুণ কবির স্পর্ধা, প্রাজ্ঞ কবির দীপ্তি হয়ে উঠেছে এই কাব্যখানি।

story and article

অনাদি দোহার: মধুমঙ্গল বিশ্বাস, দৌড় প্রকাশন, মিলনপল্লি, হৃদয়পুর, কলকাতা-১২৭, দাম:১০০ টাকা।

বুক রিভিউ

 1 total views

 1 total views সারল্যতায় ভরা থাক জীবন ❤️ ‘মিনার হোসেনের ঘর উঠোন'(২০১২) আজ থেকে ৯ বছর …

বুক রিভিউ Read More »

বুক রিভিউ

 2 total views

 2 total views মানবসভ্যতার কবিতা তৈমুর খান ‘মৃত্যুর দরজা ঠেলে'(প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২১) কবি শুভঙ্কর দাসের …

বুক রিভিউ Read More »