Fahmida reea

 70 total views

#গল্প
#মাতৃত্ব…..
ফাহমিদা রিআ

ড্রয়িং রুমের পর্দার ফাঁক গলিয়ে টুকুকে টিভির রিমোট হাতে সোফায় বসে থাকতে দেখে নিপার মুখটা শুকিয়ে গেলো।
হাতের প্লেটগুলো ডাইনিং টেবিলে রেখে দ্রুত পা চালিয়ে টুকুর সামনে এসে দাঁড়ালো।
টুকু কিছু বুঝবার আগেই রিমোটটা টিপে টিভি অফ করে ওর হাতটা ধরে টেনে নিয়ে এলো সোজা রান্নাঘরে।
কোনে রাখা মোড়াটা ঠেলে এক ঝটকায় বসিয়ে দিয়ে চাপা স্বরে বলে উঠলো নিপা,
—–চুপচাপ বসে থাক এখানে। আর যদি টিভির সামনে দেখেছি। আর কত ছোট করবি আমাকে বলতো? তোর জন্য আর কত কথা শুনতে হবে আমায়? আমার ঘাড়ে চেপেছিস, বেশ করেছিস। অন্যদের চোখের বালি হতে যাস কেন?

—– বৌমা, আর কত দেরি তোমার দুটো ভাত বাড়তে বলোতো? তাগাদা না দিলে কি একটি দিনও ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি  করা যায় না?
কান্না লুকিয়ে গলা বাড়িয়ে জবাব দেয় নিপা,
—– এই যে মা, আসুন টেবিল রেডি করেছি

ছোট দেবর জাহিদ আর নিপার স্বামী জাফরও এসে বসলো মায়ের দুপাশে চেয়ার টেনে, প্রতিদিনের মত।

জাহিদ চারপাশে চোখ বুলিয়ে প্লেটে ভাত নিতে নিতে বললো,
—– ভাবী, টুকুকে দেখছি না যে।

জাফর গম্ভীর মুখ করে বললো,
—– তার কি কাজের শেষ আছে? ঘরের দেয়ালতো আঁকিবুকিতে ভরিয়ে ফেলেছে। পরের বাড়িতেই যখন থাকবে  তখন এসব শিখে পড়ে পাঠানো উচিত ছিলো।
নিপার শাশুড়ি  চশমাটা নাকের উপরে তুলতে তুলতে বললেন,
—– এখানেই থেকে যাবে? কই আমিতো এসবের কিছুই জানি না।

নিপা আমতা আমতা করে বললো,
—– না মানে,বাবার সেই কলিগকে ফোন দিয়েছি, উনিই নিয়ে যাবে বলেছেন।
শাশুড়ি খাওয়া থামিয়ে তাকালেন নিপার দিকে,
তোমার বাবার আপন জনরা বাড়তি দায় নেবে না হয়তো, কিন্তু  ওর মায়ের কুলের কারো বাসায় গেলেইতো পারতো?

নিপা মাথা নীচু করে খালি গ্লাসগুলোতে পানি ঢালতে থাকে। ভরে আসে নিজের দু’ চোখও। যদিও ও ভালোভাবেই জানে, শাশুড়ি মা এই কথাগুলি ওকে নয়, ওর বাবাকেই তাচ্ছিল্য করে বলছেন। বাবার ওপর এমন রাগ অভিমানে ওরও দশ বছর কেটেছে যোগাযোগহীন হয়ে। কিন্ত দিন পনেরো আগে আননোন নাম্বার থেকে যখন কল এলো,নিপা হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
—–  সিরাজ সাহেবের মেয়ে নিপা বলছেন?
—– জ্বি বলছি।
—– আমি আপনার বাবার কলিগ মুনির হোসেন। খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছি  আপনার বাবার কথা রাখতে।  উনার স্ত্রীর স্পট ডেথ হলেও রোড একসিডেন্টের ধকলটা সয়ে দুদিন বেঁচে ছিলেন আপনার বাবা। তখন দেখতে গেলে আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, আপনার সাথে দেখা করে বিষয়টা….
নিপা আবেগহীন কন্ঠে  কথার মাঝেই বললো,
—– জানিতো।  পাঁচ মাস আগের ঘটনা এখন নতুন করে বলার মানে কি?
—– মানে আছে বলেইতো ফোন করেছি।
তারপর যা শুনলো নিপা, পায়ের নীচের মাটি যেন  দুলে ওঠলো। সদ্য পিতৃমাতৃহীন টুপুর সব দায়িত্ব এখন থেকে বড় বোন হিসেবে নিপার উপরই বর্তায়। তাই টুপুকে রাখতে এসেছেন তিনি নিপার কাছে।

টুপুর মা বাবা মারা যাবার পর মুনির সাহেব নিপার শ্বশুরবাড়িতে ফোনে খবরও দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন নিপা পৈতৃক ভিটাতে ছুটে যাবে শোকাচ্ছন্ন হয়ে। অসহায় টুকুকে সেই অপেক্ষায় নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। মানবিকতার দিক দিয়ে দেখলে,এছাড়া উপায়ও ছিলো না। এড়িয়ে চলা স্বজনরা ততদিনে পুরোই লা পাত্তা। কদিনের জ্বরে নিজেও খানিকটা অসুস্হ হয়ে পড়েছিলেন মুনির সাহেব। জ্বরের ঘোরে বড্ড মানসিক অস্হিরতায় ভুগেছেন কটা দিন।টুকুর দায়টা তৎক্ষণাৎ  নিলেও  আসল দায়িত্বটা পালন করতে দেরি হয়ে যাওয়ার চিন্তায়। তাই কিছুটা সেরে ওঠতেই টুকুর প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড়, দুচারটে বই খাতা ছোট্ট ব্যাগে ভরে আর আলমারীর ড্রয়ার থেকে সিরাজ সাহেবের ফাইলটা সংগে নিয়ে টুকুর হাত ধরে ঢাকাগামী ট্রেনে ওঠে বসলেন।
স্টেশন থেকে নিপার মোবাইলে ফোন করে বাড়ির ঠিকানাটা জেনে পৌঁছেও দিয়ে এলেন আর বললেন,
—– সিরাজ সাহেব মুমুর্ষ অবস্হায় দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর রেখে যাওয়া তিন সম্পদকে এক জায়গায় যেন করে দেই।
নিপা দাঁতে দা্ত চেপে ধীর কন্ঠে উচ্চারন করে,
—– তিন সম্পদ?
—– জ্বি এমনটিই বলে গেছেন সিরাজ সাহেব। এক কন্যা, এক পুত্র আর নিজ হাতে গড়া ভিটে বাড়ি। সর্বস্ব মিলে তাঁর তিন সম্পদ।

ফাইলের উপর নিজের যোগাযোগ নাম্বার আর টুপুকে নিপার হাতে গছিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন মুনির সাহেব।

এমনিতেই সে শ্বশুরবাড়িতে কোনঠাসা হয়ে জীবন যাপন করছে ক’ বছর থেকে। প্রথম কটা বছর সব চলছিলো ঠিকঠাক মতই। বাবা মা তাঁদের একমাত্র সন্তানকে পাত্রস্হ করেছেন তাঁদের অর্ধেক রাজত্ব সহ রাজকন্যাকে দান করে। আশা ছিলো, বাকি রাজত্ব মানে বিশাল পৈতৃক বাড়িটিও অদূর ভবিষ্যতে পুত্রবধূ নিপারই হবে।
কিন্তু নিপার শ্বশুরবাড়ির লোকদের আশায় জল ঢেলে দিলো উদ্ভুত পরিস্হিতির ঘনঘটা। অকস্মাৎ মায়ের মৃতু্্যর মাস দুয়েক যেতে না যেতে বাবার আবার বিয়ে করা নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে এত বেশি সমালোচনা হতে শুরু করলো আর ওর মনটাও বাবার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞায় ভরে ওঠলো। ফলাফলে বাবা কন্যার দেখা সাক্ষাত বছরকে বছর বিরতি পড়তে থাকলো। স্বামী  কিংবা দেবর অথবা আত্মীয় স্বজন মারফত খবরও উড়ে আসতে লাগলো মুখরোচক হয়ে। টুকু জন্মানোর খবর, ঘটা করে টুকুর আকীকার অনুষ্ঠানের খবর, স্কুলে হাতেখড়ির খবর। এমনি করেই সেদিন সকালে রান্নাঘরে পরোটা ভাজতে ভাজতে কানে এসেছিলো বাবা এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর রোড একসিডেন্টের খবর।
মুহুর্তেই ঝাপসা চোখ দুটি মুছে অন্তরে পালিত অভিমানে মনকে শক্ত করে ফেললো নিপা, না কাঁদবে না সে,  কিছুতেই কাঁদবে না। তার কাছ থেকে বাবাতো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে সে বাবা মা দুজনকেই হারিয়ে ফেলেছে সেই কবে। আজ আর নতুন করে দুঃখ পেয়ে কি হবে?
অবাধ্য অশ্রুকে নিপা সারাটা রাত সবার আড়ালে আবডালে বশ মানিয়েছে হৃদয় এফোঁড়ওফোঁড় তুলে।
নিপা নিজেকেই গুটিয়ে নিয়েছিলো, স্বার্থপর বাবার কন্যা পরিচয়ের হীনমন্যতায়। অথচ ওর যখন বিয়ে হয়, বাবার একমাত্র সন্তান হিসেবে শ্বশুরবাড়িতে ও বাড়ির ঢেউটা ছুঁয়ে দিয়ে বাবা বলেছিলেন,
—–আমার একমাত্র সন্তানটিকে যতটুকু পেরেছি আদর যত্নে বড় করেছি, এতটুকু কষ্টের আঁচড় লাগতে দেইনি। ভুল ভ্রান্তিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে শিখিয়ে পড়িয়ে নিবেন আমার আদরের মেয়েটিকে।
শ্বশুরবাড়িতে স্বাভাবিকভাবেই কাটছিলো দিন। তিনবছরে দুটো সন্তানের মাও হলো নিপা। কিন্তু ততদিনে তার মায়ের ধরা পড়লো দুরারোগ্য ব্যাধি। দীর্ঘ দুটো বছর মায়ের চিকিৎসার পিছে ছুটে চললেন বাবা। আজ ঢাকাতো,কাল সিরাজগঞ্জ। শেষ পর্যন্ত দেশের সীমানা ডিঙিয়ে প্রথমে চেন্নাই, পরে সিঙ্গাপুর।  শেষ রক্ষা হলো না তবুও। চলে গেলেন মা। নিঃস্ব রিক্ত বাবা শুন্য বাড়িতে না থাকতে পেরে ছুটে এলেন মেয়ের কাছে। তিনটে মাসের ছুটি কাটাতে গিয়ে  মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সবার স্বরূপটা বুঝে ফেললেন বাবা।
স্ত্রীর ব্যয়বহুল চিকিৎসায় সব বিক্রি করে জামাইয়ের কাঁধে ভর দিয়ে উনি বুঝি আজীবনের মত জেঁকে বসলেন, ওদের এই ধারনাটা বুঝতে পেরে হুট করেই চলে গেলেন নিজের শুন্য বাড়িটায়। ছুটি শেষ না হতেই  যোগ দিলেন চাকুরিতে।

তারপর তাঁর বিয়ের খবরটা যখন নিপার শ্বশুরবাড়িতে এসে পৌঁছুলো, ফিসফাস করে কথা শুরু হলেও পরবর্তীতে উচ্চবাচ্যেই চলতে থাকলো। নতুন উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবনাও।

আর হলোও তাই। বছর ঘুরতেই টুপুর জন্মের খবরটা চাউর হয়ে গেলো মহাসমারোহে। নিপার  স্বামী জাফর চিবিয়ে চিবিয়ে শুধু বললেন,
—— বুড়ো বয়সে পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছেন। মেয়েকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবার মোক্ষম অস্ত্র। অথচ সঁপে দেয়ার সময় কত দরদ, আদরের মেয়েকে কষ্টের আঁচড় লাগতে দেন নি। আর এখন? মেয়ে খুব আনন্দে আছে মায়ের জায়গায় আর একজনকে দেখে? যত্তোসব।

নিপা সবই শুনে, মুখে কিছু বলে না। আর বলবেই বা কি। মা চলে যাওয়ার শুন্যতাটা বাবার সাথে ভাগাভাগি করে স্বান্তনা পেতে চেয়েছিলো। কিন্তু ভাবনার সম্পুর্ন  বিপরীতে গিয়ে বাবাকেই ভুলবার জন্য মন কঠিন হয়ে গেলো। সবই নিয়তি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিপা একান্তে।
শাশুড়িকে খাবার টেবিলে তখন মিথ্যে বলেছে নিপা। মুনির সাহেবকে ফোন করেনি সে, টুপুকে কেউ নিতে আসবে না।
কেনইবা নিবে,টুপুরতো কেউ হয় না মনির সাহেবের। পিতৃ পরিচয়ের দাবীতে তাইতো নিপার কাছে গছিয়ে দিয়ে গেছে টুপুকে।
হঠাৎই  মনটা ভীষন ফুঁসে ওঠে নিপার। যাকে একটা দিনের জন্য দেখেনি, মন থেকে মেনে নেয় নি একটা মুহুর্তের জন্যও। অথচ শ্বশুরবাড়িতে অহরহ হাসি কান্নার বিব্রতকর পরিস্হিতির স্বীকার হতে হচ্ছে, তার দায় সে এভাবে বইতে পারবে না আজীবন। মুনির সাহেব এত বড় দায় একতরফাভাবে চাপিয়ে দেবার কে?
ত্বরিত গতিতে আলমারীটা খুলে এক ঝটকায় মনির সাহেবের দেয়া ফাইলটা বের করে নিপা।
লেখা নাম্বারগুলো দেখে দেখে দ্রুত আঙুল ছুঁয়ে কল দেয় নিপা। ওপাশে বার বার এনগেজড শোনায়। অপেক্ষা করে নিপা। একটা বিহিত করেই ছাড়বে আজ।
নীল সুতোয় বাঁধা ফাইলটায় চোখ বুলাতে গিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে বাবার নামটা চোখের উপর ভেসে ওঠে বাবারই হস্তাক্ষরে লেখা।
কৌতুহলে ফাইলের ফিতা খুলতেই সাজানো দলিলগুলো চোখে পড়ে। বেরিয়ে পড়ে বাবার হাতের লেখার আত্মকথনের একটি পাতা।

মনটা হঠাৎই ব্যাকুলতায় ভিজে ওঠে নিপার। প্রায় দশ বছর অদর্শন আর যোগাযোগহীন থেকে নিজ জন্মদাতার জন্য হাহাকার করে ওঠে মন।
আকুল হয়ে পরম মমতায় হাত বুলায় বাবার হস্তাক্ষর সম্বলিত লেখাগুলিতে। অনুভব করে কখনও কোন একলা দুপুর কিংবা ঘুম না আসা গভীর রাত বা আলো আঁধারীর মৌন ভোরবেলাতে অশ্রুসিক্ত বাবার ভাবনাগুলোকে, ভালোবাসাগুলোকে।

মুনির সাহেবকে আর ফোন করা হয় না। পরম যত্নে আবার তুলে রাখে ফাইলটা। যেন কানে বাজতে থাকে বাবার ভাবনাগুলো।  মুখে স্বীকার না করলেও  টুপুর আপনজনতো এ পৃথিবীতে এখন একজনই। রক্তের বাঁধনে বাঁধা আইনেও। টুপুর সব দায় যেমন নিপার, নিপারও সকল ক্ষমতায়ন টুপুর প্রতি। এ জগতে আঙুল তুলে সবাই শুধু দোষ খোঁজে কিন্তু এক বেলা না খেয়ে থাকলে বা অসুখে ভুগলে তপ্ত কপালে মমতার হাত রাখার কাউকে পাওয়া যায় না। তাই সবকিছু উপেক্ষা করে নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী চলতে হয়, হয়েছে। নিজেকে ভালো রাখার নিজ তাগাদাতেই।  এ সমাজে অসহায় নারী বা পুরুষ মর্যাদা পায় না। অসহায়কে অসহায়ের কাতারেই করুণা ভিক্ষা করতে হয়।

জাফরের হাক ডাকে ফাইল দেখা অসম্পুর্ণ রেখেই বেরিয়ে এলো নিপা ঘর থেকে।
নিশ্চয়ই  টুপুর কোন কর্মকান্ডের অভিযোগ করবে জাফর।
কিন্ত নিপা কিছু বলার আগেই
জাফর নিপাকে দেখে গলা বাড়িয়ে বললো,
—— কোথায় ছিলে এতক্ষন? মার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে এসো টুপুর রাজ্যজয়।
নিপা ঢোক গিলে বললো,
—– মা- নে?
—– মানেটা তুমিই নিজেই জেনে এসো।
কপট গাম্ভীর্যে টিভির খবরে মন দিলেন জাফর।

গ্রীস্মের ছুটিতে স্কুল হোষ্টেল থেকে কদিন হলো বাড়িতে এসেছে নিপার দুই ছেলে। নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই, বেলা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুম, দুপুরের খাবারে টেবিলে সকালের ডিম পরোটার আবদার,  দুপুরের ভাত খেতে রাজ্যের বিরক্তি। এটা ওটা ভুল ধরা, জেদ করা আরও কত কি। জাফর বাড়িতে থাকলে  ড্রয়িং রুমে টিভি দেখতে যায় না টুপু। তাইতো মাউইমার ঘরের টিভিতে উঁকি দিতে দিতে ফাঁক বুঝে  মোড়া টেনে নিয়ে এক কোনে বসে কার্টুন দেখে। কিন্তু  ঐ দুইভাই আসার পর সব লন্ডভন্ড। সবগুলো চ্যানেল এলোমেলো করে কার্টুনগুলো কোথায় যে হারিয়ে দিয়েছে, টুপু ভারী বিরক্ত ওদের ওপর।

আজও নিপা আপু ওকে রান্নাঘরের টুলে বসিয়েই মাছ বেছে খাইয়ে দিয়ে যখন ডাইনিং এ বড়দের খাবার দিতে গেছে, সে তখন  প্রতিদিনের মত  নিরিবিলিতে ঘরের মোড়ায় বসে টিভির রিমোট টিপতে  টিপতে হাত ব্যাথা করে ফেলেছে একটা কার্টুন চ্যানেলও পাচ্ছে না। দুই ভাই মিটিমিটি হেসে ওকে নিয়ে মশকরা করেছে।
নিপার শাশুড়ি ঘরে ঢুকে টুপুকে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখে বললেন,
—— কি ব্যাপার সাহেবের কি অকাম করা হয়েছে? গোমড়া মুখে চুপচাপ যে।
—— খুব রাগ করেছি।
—– তাতো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কেন?
—– ছেলে দুটো খুব দুষ্টু।
—– কেন? কি করেছে আমার দাদাভাইরা?
—— ওদের একদম আদর করবে না। খুব দুষ্টু ওরা।কার্টুন চ্যানেলগুলো সব এলোমেলো করে দিয়েছে। ওদের এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলবে। আগের মত থাকবে ওরা।
—– ওরাতো ওদের মায়ের কাছে কটা দিনের ছুটিতে এসেছে। চলে যেতে বলা কি যায়? যাবেইবা কেন?
—– আমিওতো তোমার কাছে বসে চুপ করে বসে টিভি দেখি। ওরা কেন আমাকে  চলে যেতে বলেছে?
শাশুড়িমা হাসলেন একটু মুখ টিপে,
—– তাই বুঝি? কিন্তু আমিতো তোমার কেউ নই। চলে যেতে বলতেই পারে।
টুপু হুট করে শাশুড়ি মার হাতটা নিজের মাথায় চেপে ধরে বলে ওঠে,
—–তোমাকে আজ থেকে আমি আর মাউইমা ডাকবো না। নিপা আপুর মত শুধু মা বলবো। তাহলেতো আমাকেও ওরা মায়ের কাছ থেকে চলে যেতে বলবে না। টিভি এলোমেলো করে দিবে না।

নিপা নিজের ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টিতে দেখলো, আলগা গাম্ভীর্যের আবরণটা মুহুর্তেই সরে গেলো শাশুড়িমার মুখাবয়ব থেকে। কিছুক্ষন আগের শুকনো চোখদুটি টুইটম্বুর হলো লোনা পানিতে।
পরম স্নেহে নিজের বুকে টেনে নিলেন টুপুকে, মাতৃত্বের চিরায়ত ধর্মকে মেনে।

———————

———————-

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *