গুপ্তজীবন – সুদীপ ঘোষাল

 3 total views

মায়া অল্প বয়সে বিধবা হয়ে গেল। সে বিধবা হওয়ার পরও নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। পড়াশোনায় সে খুব ভাল ছিল না। কিন্তু তার চেষ্টা তাকে মনোযোগী করে তুলেছে। সে সাইকেল চালাতে জানতো না। সাইকেল চালানো শিখেছে এবং পড়াশোনা করে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করে, এসএসকে স্কুল আবেদন করেছে। শেষে এস এস কে স্কুলে চাকরি পেয়েছে এখন তো আর মাসে দশ হাজার টাকা ইনকাম করে। তার মাকে নিয়ে এসে এখন সুখেই আছে।

মানুষ চেষ্টা করলে সব কিছুই পারে। মানুষ হল অসীম শক্তির অধিকারী। সে পৃথিবীর দেবতা। পৃথিবীতে আবার দৈত্যও সে।
মায়া ছাত্রদের বলে, অতএব চেষ্টা করতে হবে চেষ্টা করলেই সফল হওয়া যায়।
এখন নিজেই সাইকেল চালিয়ে স্কুলে চলে যায়। অপরের উপকার করে। সে ইনজেকশন দিতে জানে, ওষুধপত্র সম্বন্ধে তার জ্ঞান আছে। সে দরিদ্রের সেবা করে এবং মানুষের উপকার করার চেষ্টা করে যায়।
মহিলারা এখন সব দিক দিয়ে এগিয়ে আছে। তারা প্লেন চালায়। তারা জাহাজ চালায় তারা গাড়ি চালায়। তারা সংসারের সমস্ত কাজ করে বাইরের অফিসের কাজ করে। স্কুলে মাস্টারি করে তাদের আর পিছিয়ে যাওয়ার কোন কথাই নাই। তারা এগিয়ে চলেছে এগিয়ে চলেছে পৃথিবীর উন্নতির তালে তালে। নারীদের উন্নতি হলেই দেশের উন্নতি তথা পৃথিবীর উন্নতি।

এবার মায়া পড়ল সহিসের মায়াজালে। সহিস বলল,আমি দুরন্ত ঘোড়াকে বশ করতে জানি। আমাকে সুযোগ দাও আমি তোমার অতৃপ্ত ঘোড়াকে লাগাম পরিয়ে বশ করব।
মায়া ভাবে, উপোসী ছারপোকাগুলো রক্ত খাওয়ার বাসনায় ছটফপট করছে সহিসের বদান্যতায়। তবু তার সমাজের আর আত্মীয়স্বজনের ভয়। কুসংস্কারের বোঝা মেয়েদের গলায় ফাঁস হয়ে বসে আছে। এ ফাঁস মেয়েদের ছিঁড়তেই হবে নিজেকে।
স্বামী মরে যাওয়ার আগে মায়াকে একটি কন্যাসন্তান উপহার দিয়ে গেছেন। তাই মায়া সহিসকে বিয়ে করল সমাজের নিন্দাকে উপেক্ষা করে। সেদিন জোছনার আদরে আলোয় ভরে গেল মায়ার দেহ, মন, সংসারের শূণ্যস্থান। সহিসের শক্তির কাছে বশ মানল মায়ার দুরন্ত সাহসি দুপুর ঘোড়া।

মায়ার মেয়ে লুকিয়ে ঘোড়াকে বশ করতে দেখেছে অনেকদিন ধরে । প্রায় কুড়িবছর পরে সেও নারী হল। প্রত্যেক দুরন্ত যুবতী ঘোড়ার সহিসের প্রয়োজন হয়। মায়ার মেয়ে ছায়া ভাবল, মায়ের সোহাগি সহিসকেই উত্তেজিত করে তুলতে হবে রূপের বাণে বিদ্ধ করে । কি করে সহিস কামুক ঘোড়াকে পোষ মানায় ছোট থেকে সে দেখে এসেছে। একটা দুরন্ত ছুটন্ত ঘোড়ার সহিসের কামুক ছবি তার নয়নের মণি হয়ে উঠল। কিন্তু পথে অনেক বাধা। কি করে সব বাধা পেরিয়ে সহিসকে পাবে চিন্তা করতে শুরু করল। প্রকৃতি প্রেমিকা ছায়া সহিসের বিরহে পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠল। ছায়া দেখে, ভরা ভাদরে দূর থেকে ভেসে আসছে ভাদুগানের সুর । ছুটে গিয়ে দেখলাম জ্যোৎস্না রঙের শাড়ি জড়ানো বালিকা ভাদু বসে আছে । আর একটি পুরুষ, মেয়ের সাজে ঘুরে ঘুরে কোমর নাচিয়ে গান করছে , “ভাদু আমার ছোটো ছেলে কাপড়় পর়তে জানে না” ।অবাক হয়ে গিলে যায় এই নাচের দৃশ্য অসংখ্য অপু দুর্গার বিস্মিত চোখ । এর পরে ঝাপানের সময় ঝাঁপি থেকে ফণা তোলা সাপ নাচিয়ে যায় চিরকালের চেনা সুরে স্বপন দাদা ।স্বপন দাদা ঝাপান এলেই সাপ গলায় জড়িয়ে গান ধরে,”আলে আলে যায় রে কেলে , জলকে করে ঘোলা । কি ক্ষণে কালিনাগ বাসরেতে ঢোকে রে, লখিন্দরের বিধি হলো বাম ” । আমাদের এই গ্রাম্য সভ্যতার সুর ধরে চলে সুখদুখের বাঁকা নদী ।
ছায়া সহিসের সঙ্গে গল্প করত আর পুরোনো দিনের কথা বলত। সে বলত, কিশোরবেলায় একটা রঙীন বাক্স ছিলাে পড়ার ঘরে। তার ভিতরে দুটি রবীন্দ্রনাথ একটা জীবনানন্দ আর কয়েকটা বাল্যকালের খেলনা ছিল। মন খারাপ হলেই পুরী থেকে আনা, নকশা কাটা পেন ও হলুদ কাশীরাম দাস বের করতাম বাক্স থেকে ।তখনই প্রভাতী সূর্যের ভালবাসা দখল করত আমার মন। তারপর বন্যা এলো, মাটির বাড়ি ভেঙ্গে পড়ল। জীবনের তোয়াক্কা না করে আমি ভেসে যাওয়া বাক্স ধরার চেষ্টায় বিফল হলাম। ভেসে চলে গেলে আমার স্বপ্ন। বাবা আমার কান্না দেখে নতুন বাক্স কিনে দিলেন। তারপর বড় হলাম। চাকরি পেলাম। আরও নতুন বাক্স কিনলাম। কিন্তু হায় সেই প্রভাতী সূর্যের ভালোবাসা আর পেলাম না।
সহিস হাসত আর আশা দিত ছায়াকে। সে বলত, আমি তোমাকে আবার প্রভাতী সূর্যের ভালবাসা দেব। মায়ার আড়ালে ছায়া বাঁধা পড়ে গেল সহিসের অবৈধ বাঁধভাঙ্গা প্রেমে। সহিস চতুর। সে তাড়াহুড়ো করে না আনাড়ির মত। ছায়ার ছটফটানি তাকে আরও উত্তেজিত করে তোলে। সুযোগের অপেক্ষায় সহিস প্রহর গোণে।

একটা ঘোড়া কিভাবে নীতার সংসার ভেঙে দিল দুরন্ত ঝড়ের নির্মমতায়। ঘোড়া এল বুনো স্বভাব নিয়ে। তারপর বাহাদুর সহিস এল। নীতার স্বামী হৃদরোগে স্বভাবিক জীবনে অক্ষম হল।সহিস ঘোড়া পোষ মানায় সাহসি খোলামেলা হৃদয়ে। নীতার জীবনে যে নদী অপেক্ষায় ছিল সে আজ স্রোতে পাগল হল। নদী ভেসে গেলো ঢেউয়ের তালে। নেচে নেচে উদ্দাম হল নদী। নীতার মেয়ে সব বুঝেও নদীর নাচ দেখত।তারও নদীর মত নাচতে ইচ্ছে হল। উদ্দাম ঢেউ তো বাধা মানে না। ছোটনদী পাড় হয়ে মোহনায় মিলিত হল বড়নদীর বিশাল উদ্দামতায়। প্রকৃতির নিয়মে চিরদিন চলে নদীর একপাড়ে ভাঙ্গা ও অপরপাড়ে গড়ার পালা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *