Horror thriller story – Katha Chatterjee

 [post-views]

রক্তের সন্ধানে….

 

রক্তের সন্ধানে....

 
কথা চ্যাটার্জী
(১)
 
শীতের রাত খুব গভীর আর নিস্তব্ধ হয়। হালকা চাঁদের আলো আর কুয়াশা ঢাকা রাস্তা যেন অশরীরির অস্তিত্বের প্রমান দেয়। অনেকেই এই দৃশ্যকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলে থাকে কারণ তাদের চোখ এই ভাবে, ভাবেই না।
 
দিনেরবেলা এই দিকটা লোক দেখা যায় বটে, তবে খুব কম। আর রাতেরবেলা ঠিক যেন মৃত্যুপুরীতে ঢুকে পড়েছি। সন্ধে হতে না হতেই এক নিঝঝুম অন্ধকার ঝুপ করে চারপাশটাকে গিলে ফেলে।
 
আমার বাড়িটা শহর থেকে কিছুটা দূরে। আশেপাশে তেমন একটা জনবসতি নেই…তবে ছাদে উঠলে কিছুটা দূরে একটা বাড়ির ছাদ দেখা যায়।
যদিও জনবসতি কম বলেই,আর শহর থেকে দূরে বলেই বাড়িটা কিনেছিলাম।
 
এত শান্তি, যেন সকল ঈশ্বরের সৃষ্টি প্রাণ একসাথে গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ছাদে উঠলে যত দূর দেখি শুধু সবুজ আর সবুজ…আর মাথার উপর খোলা আকাশ।
 
দিনেরবেলা, ছায়াদি এসে সব কাজ করে দিয়ে যায়। সন্ধের পরে ও থাকতেই চায় না, ও বলে এইজায়গাটা ভালো নয় তাই ও সন্ধ্যের পর থাকতে চায় না।
আমার তাতে কোনো অসুবিধে নেই কারণ দুপুরেই রাতের খাবার করে ফ্রিজে রেখে দিয়ে যায়।
 
          রাতে, খাবার গরম করে নিয়ে সোজা ঘরে। 
 
একা থাকি, লকডাউনের আগে স্কুলে যেতাম, শিক্ষক হিসাবে সবে মাত্র যোগ দিয়েছিলাম। 
এখন শুধু সকালের দিকে অনলাইন ক্লাস নি, আর বাকি সময় টা বই পরেই কাটাই মাঝে মাঝে সিনেমা দেখি। সত্যি বলতে কি খুব একটা Phone ঘাটতে ভালোবাসি না।
 
আজ সকালে….
ছায়া দি আসেনি,সব কাজ আমাকেই করতে হয়েছে। যদিও আমি ছেলে বলে যে খুব অগোছালো তা নয়।
সারাদিন বাদে সন্ধেবেলায় একটু বিশ্রাম নেব বলে শুয়েছি।
 
 হাতে একটা paranormal activity-র উপর বই। পড়তে পড়তে কখন ঘড়িতে ৬:৩০ বেজে গেছে তা বুঝতেই পারিনি। একেই শীতের রাত অন্ধকার নামলেই, মনে হয় রাত হয়ে গেছে। 
 
শোয়ার ঘরে ঢোকার দরজার দিকে রাখা খাটটা। খাটের পাশেই আলমারি, বুকশেলফ আর একটা ছোট্ট টেবিল। দরজা বরাবর ঠিক খাটের উল্টোদিকে একটি ড্রেসিং টেবিলটা এমনভাবেই রাখা যে, কেউ বিছানায় শুলে তার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট ফুটে উঠবে কাচে।
বইয়ের পাতা শেষ করে, উঠে গেলাম চা করতে।       
         
     (২)
 
এসে আবার শুয়ে বইটা হাতে নিয়ে পড়ায় মন দিলাম, সঙ্গে চায়ের কাপে এক লম্বা চুমুক। কিছুটা পড়ার পর, আমার কেমন যেন অদ্ভুত অস্বস্তি হতে লাগলো।বারবার কারোর উপস্তিতি টের পাচ্ছিলাম ঘরের মধ্যে। কেউ যেন খুব জোরে জোরে নিঃশাস ফেলছে, বোধয় তার উপস্থিতির কথা জানানর জন্যই।
 
আমি বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে, সারাঘরে একবার বুলিয়ে নিলাম চোখটা। তারপর কিছুটা আশস্ত হয়ে আবার পড়ে মন দিলাম।
 
এইবার,এক অদ্ভুত বিশ্রী গন্ধ নাকে এলো,কিছুটা সোঁদা-সোঁদা একটা বোটকা গন্ধ নাকে আসতেই গা টা গুলিয়ে উঠলো। 
আমি আমার হৃদপিণ্ড স্পন্দনের শব্দ এতটাই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি যেন, সেটা আমার কানের কাছেই ধুকপুক করছে। ভয় গলা শুকিয়ে গেল, যদিও আমি ভুতে বিশ্বাসী নয় তবুও কেমন যেন,বারবার তাদের কথাই মনে পড়ছে। 
 
বইয়ের পাতায় মন বসাতে পারছিনা কিছুতেই ; হঠাৎ আমার চোখ দরজার উপরের সিলিং-এর কোন গিয়ে পড়লো, একটা বাদুড় উল্টো হয়ে ঝুলে আছে। আমার বাড়িতে বাদুড় আগে কখনোই আসেনি। কি বীভৎস লাল চোখ আর এমন ভাবে দাঁত খিচিয়ে রয়েছে যেন আমার দিকে চেয়ে খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসছে।
 
বাদুড়ে বড় ঘেন্না লাগে আমার,হঠাৎ বাদুড় দর্শনে বুকের মধ্যে ছ্যাত করে উঠলো।
 
আমি উঠে একটা লাঠি আনতে গেলাম এটাকে মারবো বলে…কিন্তু এসে তার অনুপস্থিতি দেখে কিছুটা আশস্ত হলাম, কিন্তু আদেও কি আশস্ত হতে পারলাম? কেন জানিনা বারবার মনে হচ্ছিল সে বুঝি আমার মনের কথা বুঝতে পেরেছে তাই সরে পড়েছে।
 
সেদিনকার মতো ওই বিশ্রী জিনিস টাকে আর দেখতে হয় নি, তবে ভয় বারম্বার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল এই ভেবেই যেন কিছু একটা আসেপাশেই রয়েছে।
 
সকালবেলা উঠতে যাবো,সেই জোরই পাচ্ছিনা শরীরে….কেমন একটা ঝিম লেগেছে,বড় দুর্বল লাগছে নিজেকে। 
ছায়া দি এসে বললো, “কি গো দাদাবাবু এমন ঝিমচ্ছ কেন?”
“শরীর টা ভালো নেই টা ছায়াদি।”
 
“কি জানি বাপু, এই তোমার মতো অবস্থা কয়েক ঘরেই হয়েছে, তবে রাতেরবেলা সবাই নাকি দিব্বি সুস্থ ছিল”-ছায়াদি বেশ ভয় পেয়েই বললো কথাটা।
আমি ওর ভয় কাটাতে বললাম,”কোনো ভাইরাল জ্বর হবে হয়তো,ছাড়ো!” বললাম বটে ওকে তবে আমার মনই মানতে চাইছিল না।কালকের ঘটনাটা বারবার মাথার মধ্যে ঘুরছিল। 
 
দিনের পর দিন শরীর খুব খারাপ হতে লাগলো,ওষুধে কোনো কাজ হচ্ছিল না;
আর ছায়াদিও আসা ছেড়ে দিলো,ভাবলো না জানি কি রোগ হয়েছে এই ভেবে। 
 
(৩)
 
একদিন সন্ধেবেলা…
দরজায় কড়াঘাতের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়, ওঠার ইচ্ছা ছিল না তবে কড়াঘাতের শব্দের তীব্রতা আমায় তিস্টতে দিলো না। 
উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম। দেখি একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক, বেঁটে-খাটো চেহারা, গায়ের রং কালো।
 
গায়ে কি বিশ্রী গন্ধ,দরজা খোলা থেকেই গন্ধে গা গুলিয়ে উঠলো। ওনার সঙ্গে একজন মহিলা(ওনার স্ত্রী) ও একটি বাচ্চাও এসেছে।
 
এই শরীরের অবস্থা,এখন অতিথি দেখে বড় বিরক্ত হলাম,তবে তার ভাব মুখে ফুটতে দিইনি। কিন্তু,উনি অদ্ভুত ভাবে আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে খসখসে গলায় বললো-“বিরক্ত হলেন বুঝি?”এবং কেমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলেন।
 
এত বাজে ভাবে কেউ হাসতে পারে ঠিক যেন বাদুড়।
নিজেকে সামলে নিয়ে,বললাম, না না আসুন ভেতরে আসুন।
 
আপনার বাড়ি থেকে একটু দূরে এক বাড়ি আছে না,সেখানে ভাড়া এসেছি গত ১৫ই ডিসেম্বর। শরীর খারাপ হলেও দিন টা আমার মাথায় স্পষ্ট যেদিন ওই বাদুড়ের ঘটনাটা ঘটেছিল। লোকটি আবার বিশ্রী ভাবে হেসে উঠে বললেন-“কিছু ভাবছেন, ভাববেন না অতো, জানেন তো গভীর ভাবে ঘুমাবার আগে,মন হালকা রাখতে হয়। নয়তো,আমাদের মতো সারা রাত জেগে জেগে কাটাতে হবে। আর রাত জাগা খুব কষ্টের….
রাতে ঝুপ করে কারো বাড়িতে ঢুকতে পারবেন না সব জেলা দরজা আঁটা থাকেতো।
আমি ওনাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবো, তার আগেই ওনার স্ত্রী বলে উঠলেন-“শরীর ভালো তো?ভাগ্যই আগে এসে দেখা করে গেলাম। না জানি কখন কি হয়?”
এনার কথা শুনে বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠলো। এতক্ষন এত কথা হচ্ছে এর মধ্যে ওদের সাথে আসা বাচ্চাটা একবারের জন্যেও নড়লো না যেন প্রাণহীন কোনো মানবদেহ। এদের হাবভাব মোটেও সুবিধের ঠেকছে না আমার। লোকটি আমার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে বললো ও আমার ছেলে,বড় অসুস্থ অনেক রক্তের প্রয়োজন,এসে থেকেই রক্ত জোগাড় করে চলেছি। আমি কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম-“এসে থেকেই”
ওনার স্ত্রী তাড়াতাড়ি করে বলে উঠলেন একটু জল হবে আসলে শরীরে খুব জ্বালা, থেকে থেকেই জল তেষ্টা পায়ে। আমি ভয় পেয়েছি দেখে মহিলাটি আবার বললেন,”ভয় পেলেন বুঝি?”….
আবার সেই বিশ্রী হাসি,যেন উল্লাস করে হাসছে,যেন বুঝতে পেরেছে মৃত্যু আসন্ন…..ঠিক যেমন রক্তচোষা বাদুরগুলো হাসে…ঠিক তেমন ভাবেই হাসতে হাসতে বললো-আহা ভয় পাবেন কেন, সেদিন ওনার স্যার ঘরে সিলিং থেকে ঝুলছিলাম যখন,উনি দিব্বি লাঠি নিয়ে তেড়ে এলেন তাই তো রাতে চুপি চুপি আসতে হলো ওনার গরম রক্তে নিজের গলা ভেজাতে…দেখো দেখো কেমন দাঁতের দাগটা দগদগে হয়ে আছে ওনার ঘাড়ে…. হে হে হে।।
 
 
 
                                                  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top