Joy Narayan Sarkar

 4 total views

লাঠি // জয়নারায়ণ সরকার

সকালে বিছানা ছেড়ে ট্রাকসুট আর গেঞ্জি পরে বেরিয়ে পড়েন ভূপেনবাবু। পার্কে গিয়ে কয়েক পাক চক্কর দিয়ে বাড়ি ফিরেই উঠোনে শুরু হয় যোগব‍্যায়াম। এটা তাঁর অনেক দিনের অভ‍্যেস। ঝড়-জল যাইহোক এক দিনের জন‍্যও বাদ দেন না। অফিস থাকাকালীন তো বাইরেটা একটু ফরসা হলেই বেরিয়ে পড়ত।

আর এখন রিটায়ার লাইফ। অঢেল সময়। একাকীত্ব যাতে জাপটে না ধরে সেইজন‍্য বই পড়েন, গানও শোনেন। নিঃসন্তান ভূপেনবাবু একা থাকতেই ভালবাসেন।

ব্যায়াম শেষ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। তারপর চা খেয়ে ব‍্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বাজারে। একজনের বাজার করতে আর কত সময় লাগে! মাছের দোকান লাগোয়া চায়ের দোকানে বসে আবার চা খেয়ে, মাছ কিনে আসার সময় শাক-সবজি নিয়ে নেন।

বুড়ির মা রোজ ঠিক এগারোটার সময় এসে হাজির হয়। ঝাড় দিয়ে ঘর মুছে এঁটো বাসন ধুয়ে তারপর শুরু করে রান্না। ওই সময়টা ভূপেনবাবু খবরের কাগজটা আদ‍্যোপান্ত পড়েন। মাস মাইনে তো আছেই তাছাড়াও বুড়ির মাকে প্রতিদিন খাবার দিতে হয়। তাতে কিছু মনে করেন না। যা পেনশন পান তাতে ওঁনার ভালভাবে চলে যায়।
অনেকেই তাকে বাড়ি বিক্রি করে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। উনি কোনো কথা কানে তোলেন না। বাড়ির কথা উঠলেই সরলার মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাড়ি করার সময় সরলার মধ‍্যে উত্তেজনার আঁচ তিনি অনুভব করেছেন

ব‍্যালকনি করার সময় ঠা ঠা রোদ্দুরে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছিল। নতুন বাড়িতে এসে দুজনেই বুক ভরে স্বস্তির শ্বাস নিয়েছিল। আসলে বিয়ের পর থেকেই ভাড়াবাড়িতে কাটিয়েছে সরলা। এবার তার সাধ পূরণ।

পাঁচ কাঠার ওপরে বাড়িটা। অফিস কলিগ সোমেন বলেছিল, ভূপেনদা, বড় বাড়ি করে কী লাভ। থাকবেন তো দুজন।
সরলা ওই কথা শুনে বলেছিল, বড় বা ছোট বলে কোনও কথা নেই, বাড়িতে শান্তিটাই তো আসল।

***
এলাকায় এখনও তেমন লোকজন আসেনি। বেশ ফাঁকা ফাঁকা। শান্ত, নিঝুম জায়গাটা বেছে ছিল সরলা। ভূপতিবাবু প্রথমে আপত্তি করলেও সরলার একটু খোলামেলা থাকার ইচ্ছেকে সম্মান জানাতেই সম্মতি দিতে হয়।

নিজের প্রতি যত না যত্ন নিত, বাড়ির যত্নে একটুও এদিক-ওদিক হত না সরলার। ব‍্যালকনিতে টব ঝুলিয়ে কত রকমের গাছ লাগিয়েছিল। পেছনে একটুখানি ফাঁকা জমিতে কত রকম গাছ লাগিয়েছিল তার মধ‍্যে নারকেল গাছও ছিল।

অফিস থেকে ফিরে ব‍্যালকনিতে দুজনে বসে কত রকম গল্প হত। সাথে চা, পকোরা। সরলা মাঝে মাঝে বলত, তোমার চাকরি শেষ হলে উপরে একটা বড় রিডিং রুম বানাবো। বইয়ে ঠাসা থাকবে ঘরটা। সব কাজ শেষ করে দুজনে মগ্ন থাকব বইতে। আর মিউজিক সিস্টেমে চলবে রবি ঠাকুরের গান।
ভূপেনবাবু কথাগুলো শুনে শুধুই হাসতেন।

কখনও সরলাকে কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেননি। কারওর ওপর রাগ করলেও সামনে কিছু প্রকাশ করত না। সকাল থেকে রান্নাবান্না আর ঘর গোছগাছ করতেই সময় চলে যেত সরলার।
সন্ধেবেলায় সামনের ঘরে বসত ক্লাশরুম। ছাত্রছাত্রীদের মধ‍্যে ছিল কাজের মাসির মেয়ে বুড়ি, ছেলে শঙ্কর আর ওদেরই প্রতিবেশী মায়া। ভূপেনবাবু অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরে রোজ টিভি দেখেই সময় কাটান। সেই সময় সরলা ব্যস্ত থাকত ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে।

ভূপেনবাবু এক এক সময় বলতেন, তুমি ওদের জন‍্য এত পরিশ্রম করছো, দেখো শেষে পণ্ডশ্রম না হয়ে যায়।
সরলা হেসে বলত, ওদের আমি শিক্ষিত করবই। শঙ্কর ছেলেটার ব্রেনটা ভাল, একটু লেগে থাকলে ও ভাল রেজাল্ট করবেই।

ভূপেনবাবু শুধু শ্রোতা হয়েই থাকতেন। কোনও বাধা দিতেন না। ছেলেমেয়ে থাকলে তাদেরও তো পড়াতে হত। সরলা না হয় কয়েকটা দুঃস্থ পরিবারের ছেলেমেয়েকে যদি স্বাবলম্বী করতে পারে, এর চেয়ে আর ভাল কিছু আছে! পড়ানোর চাপে সরলাকে ছেড়ে অনেকদিন ভূপেনবাবুকে ব‍্যালকনিতে একা একা বসতে হয়েছে। সরলাকে চা আর অমলেট দিয়েই সামনের ঘরে ঢুকে যেতে হয়েছে।

এলাকায় আস্তে আস্তে ফাঁকা জমিগুলো হাতবদল হয়ে বড় বড় বাড়ি উঠতে থাকে। লোকজনের ভিড়ও বাড়ে। আগে ছিল মাটির রাস্তা আর এখন সেটা ঢালাইয়ের হয়েছে। শুধুমাত্র রিকশা ছাড়া যাতায়াতের কিছুই ছিল না। রাত একটু গভীর হলেই শুনশান হয়ে পড়ত এলাকা। একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করত। সেই নিস্তব্ধতায় নিজেকে জড়িয়ে নিত সরলা। তার চোখে-মুখে প্রশান্তি খেলে যেত।

চটজলদি পরিবর্তন দেখে একদিন সরলা বলে, অশান্তির কালো মেঘ ঘনাচ্ছে মনে। শান্ত-ধীর এলাকা এবার অশান্ত হয়ে উঠবে। কত নতুন নতুন লোক আসবে। তারপর প্রোমোটার থাবা বসাবে।
ভূপেনবাবু বলেন, অত চিন্তা করলে চলবে। তোমার শান্তির জন‍্য কি উন্নয়ন পিছিয়ে থাকবে? নিজের শান্তি নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।

***
অফিস থেকে ফিরে ভূপেনবাবু দেখে সরলা সামনের ঘরে যথারীতি পড়াতে ব‍্যস্ত। সোজা ঘরে ঢুকে আসেন। তবে পড়ার ঘরের পাশ দিয়ে আসার সময় সরলার হাসিখুশি মুখটা দেখতে পান ভূপেনবাবু। জামাটা ঘামে ভিজে যাওয়ায় খুলে ফেলেন। এরমধ‍্যে সরলা খানিকটা নাচের ছন্দে সামনে এসে দাঁড়ান।

ভূপেনবাবু তাকাতেই বলেন, জানো, আজ শঙ্করের রেজাল্ট বেরিয়েছে।
ভূপেনবাবু ভ্রূ কুঁচকে বলে, কোন ক্লাসে উঠল?
সরলা হো হো করে হেসে বলে, আরে ও তো মাধ‍্যমিক দিয়েছিল। চারটে বিষয়ে লেটার পেয়েছে। আমি সায়েন্স নিতে বলেছি।
কথাটা শেষ করেই আবদারের সুরে বলে, ওর টিউশন খরচ কিন্তু আমরা দেব!
এবার ভূপেনবাবু সম্মতির হাসি হেসে বাথরুমের দিকে চলে যান।

এদিকে বুড়ি পড়াশোনা ছেড়ে কিছু বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে। সরলা বারণ করেছিল।
একদিন ওর বাবা এসে বলেছিল, শঙ্কর পড়াশোনা করছে বলে কাজ করতে পারে না। এদিকে সংসারে খরচ বেড়েই যাচ্ছে। তাই বুড়িকে কাজ করতে হবে। না হলে উপোস করে দিন কাটাতে হবে।

কথাগুলো শোনার পর সরলার মুখটা হতাশায় ভেঙে পড়ে। মেয়ে বলে পড়াশোনা করতে নেই! দু-একবার বোঝানোর চেষ্টা করে বিফল হয়ে চুপ করে চোখটা উপরের দিকে তুলে বসে থাকে। কখন যে বুড়ির বাবা চলে গেছে টের পায়নি।

প্রত‍্যেক মাসে শঙ্করের টিউশন ফি বুড়ির মায়ের হাতে দিয়ে দেয় সরলা। এখন থেকে ভূপেনবাবুকে সংসার খরচের সাথে ওই টাকাটাও পয়লা তারিখে দিয়ে দেন সরলার হাতে। শঙ্করও মাঝে মাঝে এসে দেখা করে যায় তার সঙ্গে। ওকে দেখলে সরলার মুখটা প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।

কয়েকদিন ধরে সরলার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। সন্ধে হলেই গা-টা বেশ গরম হয়। প‍্যারাসিটামল খেলে স্বাভাবিক হয় তাপমাত্রা। গভীর রাতে আবার জ্বরে গা পুড়ে যায়। স্থানীয় ডাক্তার দেখালেও কিছুতেই কমে না। বাধ‍্য হয়ে ভূপতিবাবু বাইপাসের ধারে একটা নার্সিংহোমে ভর্তি করে দেন। পরদিন অজানা জ্বরে চিরতরে হারাতে হয় সরলাকে।

***
এখন ভূপেনবাবুর খোঁজখবর নিতে রোজ আসে ভাইপো। ওদের মতলব বুঝতে পারলেও ভূপেনবাবু খারাপ ব‍্যবহার করে না। কাকিমা বেঁচে থাকতে একদিনের জন‍্যও কখনও আসেনি। এর মাঝে একদিন সরলার লাগানো গাছথেকে নারকেল পেড়ে নিয়ে যায় ভাইপো। দুটো নারকেল দিয়েছিল ভূপতিবাবুকে। পছন্দ না হলেও মুখে কিছু বলেননি।

শঙ্কর ছুটির দিনগুলোতে এসে ভূপেনবাবুর সাথে অনেকক্ষণ কাটিয়ে যায়। ও আসলে ভূপেনবাবু বেশ খুশি থাকেন। শঙ্কর এখন ভাল চাকরিও পেয়েছে। দুজনে বসে রাজনীতি থেকে অফিসের খবর নিয়ে আলোচনা চলে। দুপুরে খেয়ে যেতে বললেও ও রাজি হয় না।

একদিন সকাল-সকাল ভাইপো এসে হাজির হয়। ভূপেনবাবু তাকে দেখে বিরক্ত প্রকাশ করে। তবুও সে সামনের ঘরের সোফায় বসে থাকে। একটু পরেই যথারীতি শঙ্কর আসলে ভাইপো ঘর থেকে বেরিয়ে বলে, কী চাই এখানে?
শঙ্কর থতমত খেয়ে কিছু বলতে যেতেই ভাইপো দ্বিগুণ জোরে বলে, এখানে তোমার কিছু নেই। পড়াশোনা শিখে চাকরি পেয়ে গেছো। আর যেন এ বাড়িতে না দেখি।

শঙ্কর অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। চোখের কোণটা চকচক করে ওঠে। ঘরের কোণে রাখা লাঠিটা তুলে ভাইপোর দিকে এগিয়ে যেতেই শঙ্কর তড়িঘড়ি এসে ভূপেনবাবুকে জাপটে ধরে।
ভূপেনবাবু রাগে চিৎকার করে ওঠেন। শঙ্কর জলভরা চোখে সরলা দিদিমণির ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে।

# শেষ #

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *