Joy Narayan Sarkar

 6 total views

নাম্বার ওয়ান // জয়নারায়ণ সরকার

কাকিমা, ও কাকিমা। দরজার ওপার থেকে মানার গলা ভেসে আসে। ঠাকুরঘরে ব‍্যস্ত থাকার কারণে উত্তর দিতে পারেনি। তবে ওর গলার স্বরে উত্তেজনা লক্ষ করেছিল সান্ত্বনা। মনে মনে সেও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মানার বাবা মানে ভাসুরের আবার শরীর খারাপ হল নাকি! সেই দুশ্চিন্তা নিয়েই তড়িঘড়ি পুজো শেষ করে।

শোওয়ার ঘরে এসে কাপড় বদলিয়ে মানাকে ফোন করে। একবার রিং হতেই মানা চেঁচিয়ে বলতে থাকে, জানো কাকি, সামনের রবিবার নবীন সঙ্ঘে টিভির একটা রিয়ালিটি শো-এর অডিশন হবে।
সেই শুনে সান্ত্বনা বলে, অত হাঁপাচ্ছিস কেন, তা অডিশন হবে তাতে আমি কী করব।

মানা যেন আরও উত্তেজিত হয়ে বলে, ওমা, এটা তো মেয়েদের প্রোগ্রাম। তোমাকে নাম দিতেই হবে।
সান্ত্বনা এবার মৃদু ধমকের সুরে বলে, আর পাগলামি করিস নাতো। ওসবে আমি নেই। তোর ছোটকাকু জানলে রাগ করবে। তুই এসব ছাড়, আমার এখন অনেক কাজ। সংসারের কাজ করেই পারছি না তার ওপর অডিশন।
একথা বলার পরে লাইনটা কেটে দেয়।

এরই মধ‍্যে স্বপন বাজার নিয়ে ঘরে ঢোকে। এক কাপ চা দিয়ে রান্নার বন্দোবস্ত করতে ব‍্যস্ত হয়ে পড়ে সান্ত্বনা।
স্বপন অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর খবরের কাগজটা নিয়ে বসে সান্ত্বনা। এই অভ‍্যেস অনেক দিনের। পাতা ওল্টাতেই একটা খবরে চোখ আটকে যায়। পরকীয়ায় জড়িয়ে পরে আত্মহত্যা যুগলের। খবরটা পড়ার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সান্ত্বনা।

এর পরেই আবার মানার ডাক শুনতে পায়। তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খোলে। মানা এবার ঘরে ঢুকেই আবদার করতে থাকে, ও কাকিমা, চলো না, তোমার নামটা লিখিয়ে দিয়ে আসি। ছোটকাকু কিছু বললে আমার কথা বলবে। আমি তাঁকে বোঝাবো।
সান্ত্বনা ঠোঁটের কোণে হাসি জড়িয়ে বলে, নারে মানা, ওসব আমার দ্বারা হবে না। তাছাড়া ঘরের অনেক কাজ বাকি।

মানা এবার নাছোড় হয়ে বলে, ঠিক আছে, তাহলে তোমার আধার কার্ডটা আমাকে দাও। আমি না হয় নামটা লিখিয়ে দিয়ে আসি।
সান্ত্বনা বলে, আধার কার্ড তো তোর কাকুর কাছে। ওসব আমি রাখি না।
একথা শুনে মানা ব‍্যাজার মুখ করে চলে যায়।

সান্ত্বনা এবার মনে মনে বলে, এ কী করলাম! ছোট্ট মেয়েটার আশায় জল ঢেলে দিলাম, তাও মিথ‍্যে বলে! অনুশোচনায় ভুগতে থাকে সে।

আবার স্বপনকে না বললে যদি অশান্তি করে। দোটানায় পড়ে সান্ত্বনা অস্থির বোধ করতে থাকে। তারপর ঠিক করে, আগে স্বপনকে ফোন করে জানিয়ে রাখি। তারপর মানাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে নাম লেখাবো। এসব চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করে স্বপনকে। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পরে সে ধরে। কিছু বলার আগেই কর্কশ গলায় বলে, কী হয়েছে। এখন প্রচণ্ড কাজের চাপে আছি। বলেই ফোনটা কেটে দেয়।

ফোনটা হাতে ধরে আনমনা হয় সান্ত্বনা। গলার মধ‍্যে কী যেন দলা পাকিয়ে উঠছে। ইদানিং যখনই স্বপনের সঙ্গে কথা বলতে গেছে, কোনো না কোনোভাবে অপমান করেছে। তাই এখন নিজেই যতটুকু দরকার ততটুকুই বলে।

***
দুপুরের খাওয়ার পর গল্পের বই নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে তা জানে না। হঠাৎই ধড়মড় করে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে পাঁচটা বাজে।

তাড়াতাড়ি করে শাড়ি পরে ঠাকুরের সন্ধে সারে। তারপর আলমারি খুলে স্বপনের ফোলিও ব‍্যাগ থেকে আধার কার্ড নিয়ে পাশেই মানাদের বাড়িতে যায়। তখন মানার গানের দিদিমণি এসে যাওয়ায় সে সাথে যেতে পারে না।

সে নিজেই যায় নাম নথিভুক্ত করতে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আলমারি ঘেঁটে বের করে তার বিয়ের আগের গানের খাতা। এছাড়াও বিয়ের প্রথম বছরে কলকাতা বইমেলায় স্বপনের সঙ্গে গিয়ে কিনে আনা রবিঠাকুরের গানের বই।

এবার বসে পড়ে রিহার্সালে। যদি ওখানে গান বা আবৃত্তি করতে বলে! বহুদিন রেওয়াজ না করায় গলায় ঠিক সুর ওঠে না। সে মনে মনে ভাবে, সারা রাত পড়ে রয়েছে, ঠিক তুলে নেব। মাঝে আয়নার সামনে গিয়ে ক‍্যাটওয়াকও করে।

তারপর মনে হয়, ধুর, এসব যদি না বলে অন‍্য কিছু জিজ্ঞাসা করে! এসব ভাবনাচিন্তার মধ‍্যেই অনিন্দিতাদির কথা মনে পড়ে। সে ছিল কলেজে তার সিনিয়ার। অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন। মাস ছয় আগে একটা বিয়ে বাড়িতে দেখা। উনি প্রথমে চিনতে পারেননি। সান্ত্বনা কলেজের কয়েকটি ঘটনা বলার পর মনে পড়ে তার। ওই ঘটনাগুলোর সময় সান্ত্বনা খুব কাছে এসেছিল তাঁর। পরিচয় পেয়ে অনিন্দিতাদি জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। তারপর নিয়মিত যোগাযোগ রাখার জন‍্য দুজনেই ফোন নাম্বার বিনিময় করে। তবে দুজনেই এর মাঝে দু-একবার কথাও বলেছে।

অনিন্দিতাদি ফোনে একদিন জানিয়েছিল টিভিতে এই রিয়ালিটি শোতে চান্স পেয়েছে। অবশ‍্য সেই এপিসোডটা মনোযোগ দিয়ে দেখেছিল সান্ত্বনা। একথা মনে পড়তেই ফোন করে অডিশনের কথা জানায়।ওপার থেকে অনিন্দিতাদি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা ক‍্যারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস দেখতে চায়। আর জানতে চায়, কেন নাম্বার ওয়ান হতে চাও?

একথা শোনার পর সান্ত্বনা চুপ করে থাকে। অনিন্দিতাদি বলে, আমার জীবনে বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। তোদের সমীরদা সব সময় আমাকে নিপীড়ন আর বঞ্চনায় জর্জরিত করে রেখেছিল। আমি সেই অন্ধকার দিনগুলোকে পেছনে ফেলে যাবতীয় সম্পর্ক ছেড়ে নিজেই শাড়ির ব‍্যবসা শুরু করি। তখন নিজের বাড়ি বলতে কিছুই ছিল না। বাপের বাড়ি বলতেও কেউ নেই। দুই ভাই তখন আলাদা হয়ে যে যার মতো। প্রথম প্রথম ছোট ভাইয়ের বাড়িতে থেকেই ব‍্যবসা শুরু করি। তারপর ব‍্যবসা একটু দাঁড়াতেই নিজেই একটা ফ্ল‍্যাট কিনে নিই। এখন আমার এখানে দু’জন মেয়ে চাকরি করে। কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে অনিন্দিতাদি।
সান্ত্বনা এবার গভীরভাবে ভাবতে থাকে।

***
মাঝে মাঝে কাজের চাপ থাকলে অফিসেই থেকে যায় স্বপন। অবশ‍্য সেদিন ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল। ফিরেই ড্রেসিংটেবিলের ওপর সান্ত্বনার আধার কার্ড পড়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে, এখানে আধার কার্ড কেন?

সান্ত্বনা আস্তে আস্তে সারাদিনের ঘটনা বলে। শোনার পর স্বপনের চোখ কুঁচকে ওঠে। বলে, রিয়ালিটি শো, এসব এ বাড়িতে থেকে করতে পারবে না। সংসারের কাজই ঠিকমতো হয় না। এসব ছেনালিপনা আবার কেন? বলেই স্বপন ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দেয়। সান্ত্বনা নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কুড়ি বছরে স্বপন যেন আলাদা মানুষে পরিণত হয়েছে।

কয়েক দিন ধরে কিছুই ভাল লাগছে না সান্ত্বনার। দু’দিন ধরে মানারও পাত্তা নেই। সে ছোট হলে কী হবে, অনেক ম‍্যাচিওরড। ওর সাথে গল্প করতে ভাল লাগে তার। স্বপন যেদিন বাড়ি ফেরে না, রাতে তো মানাই সঙ্গী হয়।

আজও স্বপন ফিরবে না। মানার খোঁজে গিয়ে দেখে তার ধুম জ্বর। দুদিন ধরে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। এখানকার এক ডাক্তারবাবুকে দেখানো হয়েছে। আজকাল কত রকম জ্বর হচ্ছে। কাগজে রোজই এরকম খবর থাকে। কাউকে কিছু না বলে বাড়ি চলে আসে। তারপর মনে পড়ে স্বপনের এক বন্ধু বড় ডাক্তার। সাথে সাথে স্বপনকে ফোন করে সে। তখন সন্ধে গড়িয়ে গেছে। ফোনটা বেজে যায়, ধরে না স্বপন। ফোনটা রেখে রান্নাঘরের দিকে যায়। এরই মধ‍্যে ফোনটা আবার বাজতে থাকে। এক দৌড়ে এসে তুলে দ‍্যাখে অনিন্দিতাদি। ওপার থেকে বলে, কেমন আছিস। আজ বিকেলে নিউ মার্কেটে স্বপনদাকে দেখলাম। সঙ্গে একজন মহিলা ছিলেন। আমি ভাবলাম তুই, তারপর কাছে যেতেই দেখি অন‍্য কেউ।

কথাটা শোনার পর থরথর করে কাঁপতে থাকে সান্ত্বনা। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। নিজেই ফোনটা কেটে দেয়।

***
রবিবার সকাল থেকেই ব‍্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। যেভাবেই হোক দুপুর বারোটার মধ‍্যে নবীন সঙ্ঘে পৌঁছতেই হবে। কলিংবেল বেজে ওঠে। দরজা খুলতেই দেখে স্বপন দাঁড়িয়ে। চোখে রাত জাগার ক্লান্তি। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সান্ত্বনার নাকে মদের ভ্যাপসা গন্ধ আসে। সে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারে না। এবার স্বপনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, রাতে কোথায় ছিলে? অফিস না অন্য কোথাও?

স্বপন কোনো কথা না বলে ঘর থেকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দরজাও বন্ধ করে দেয়। সান্ত্বনা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। আস্তে আস্তে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চোয়াল দুটো ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠছে তার। বুঝতে পারে সান্ত্বনা।

ওদিকে নবীন সঙ্ঘে শুরু হয়েছে অডিশন। ঘর থেকেই লক্ষ করেছে পাড়ার অন‍্য মেয়ে-বউরা দল বেঁধে যাচ্ছে আর আসছে। সবাই যায় যাক। সে যাবে না। একদিনের নাম্বার ওয়ান হয়ে কী লাভ?
বিকেল গড়িয়ে সবে সন্ধে নামতে শুরু করেছে। আকাশের দিকে তাকাতে দ্যাখে নীল আকাশে সূর্যের স্তিমিত আলোর মধ্যেও দু-একটা তারা জ্বলজ্বল করছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সান্ত্বনা।

# শেষ #

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *