Joy Narayan Sarkar

 8 total views

লড়াই // জয়নারায়ণ সরকার

সেলফি তোলা এখন নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে অদ্রিজার। যে কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে ফোন হাতে। সেটা কোনো মল হোক বা ফুটপাথ। অদ্রিজার মুখ বেঁকিয়ে ছবি দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগে শান্তনুর। তবুও মুখে কোনওদিন বিরক্তি প্রকাশ করে না। শুধু বলে, ওভাবে মুখ বেঁকিয়ে ফটো তোলো কেন?
অদ্রিজা মৃদু হেসে বলে, তুমি কিছুই জানো না। ওটাকে “পাউট” বলে। তুমি সেই আদ‍্যিকালেই পড়ে রইলে।
শান্তনু ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বলে, আমার আদ‍্যিকালই ভাল।

কোনও অনুষ্ঠানে বিশেষ করে বিয়েবাড়িতে ঢুকলেই শান্তনু হয়ে যায় ফোটোগ্রাফার। একটার পর একটা পোজে ব‍্যাঙ্কোয়েট হলের চারিদিকে ঘুরতে থাকে অদ্রিজা। শান্তনুও মোবাইল হাতে পেছন পেছন। পেটে ইঁদুরদৌড় শুরু হলেও কিছু বলে না, জানে অদ্রিজা নাছোড়।

বাড়ি ফিরেই হ‍্যান্ডব‍্যাগটা সোফার এক কোণে ছুঁড়ে দিয়ে মোবাইল নিয়ে বসে ফোটো বাছতে থাকে। শান্তনু ততক্ষণে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানার দিকে এগোয়। অদ্রিজার বাছাই-পর্ব শেষ হলে আপলোড করে ফেসবুকে। ছবিগুলোর ক‍্যাপশন দেয় ‘ওয়েডিং মোমেন্টস’। পোস্ট করার সাথে সাথে লাইক আসতে শুরু করে। ফ্রেশ হয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে খাটে গিয়ে বসে। এর মধ‍্যেই লাইক হাফ সেঞ্চুরি পার হয়ে গেছে। এখনও সৌন্দর্য ধরে রাখতে পেরেছে বলে মনে মনে গর্ব অনুভব করে সে। থাকতে না পেরে শান্তনুকে ডাকে। সে তখন গভীর ঘুমে শরীর এলিয়ে দিয়েছে।
***
অদ্রিজা যে সমস্ত সেলফি পোস্ট করে তাকে দেখার থেকেও আশেপাশের লোকদের দেখে শান্তনু। ওই সময়ে কে কীভাবে থাকে সেটা দেখতে ভাল লাগে তার। একদিন বাজার করতে গিয়ে সেলফি তুলে পোস্ট করেছিল অদ্রিজা। শান্তনু অফিসে বসেই পেছনে থাকা শাক বিক্রি করা মাসির মুখটা দেখে চমকে উঠেছিল। কত লড়াইয়ের চিহ্ন ফুটে উঠেছে মুখের রেখায় রেখায়। যদিও অদ্রিজার এই সেলফি সেলফি খেলার ব‍্যাপারে যথেষ্ট বিরক্ত সে। কিন্তু আজকের এই ছবিটা দেখে আর থাকতে পারে না। সাথে সাথে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফোন করে শান্তনু।

ওপার থেকে অদ্রিজা বলে, হ‍্যাঁ, বলো।
সে খানিকটা গম্ভীর হয়ে বলে, আজ যে সেলফিটা পোস্ট করেছো, সেটা কোন বাজারে তোলা।
অদ্রিজা বিজ্ঞের মতো বলে, কেন, পাড়ার বাজারে।
এবার শান্তনু বলে, তোমার পেছনে থাকা শাক বিক্রি করা মাসিকে আমি তো কখনও দেখিনি।
অদ্রিজা গর্বের সুরে বলে, চোখ থাকতে হয় মশাই!

প্রতিদিনই চার-পাঁচটা সেলফি তুলে ফেসবুকে দেয় অদ্রিজা। শান্তনু অফিস থেকে ফিরে এলে সন্ধের চা দিয়েই পাশে বসে পড়ে। এবার মোবাইল থেকে কমেন্টগুলো পড়ে শোনায়। কোনও কোনও দিন ভাল না লাগলেও মুখে কিছু বলে না শান্তনু। সবগুলো প্রশংসাসূচক হওয়ায় ওর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসে অদ্রিজা।

তবে সেদিনের ওই শাক-মাসির মুখটা কিছুতেই ভুলতে পারে না। ওই একটা ছবি বাদ দিয়ে অদ্রিজার সেলফিগুলো বড্ড মেকি মনে হয়।

আগে অফিস থেকে ফিরে দুজনে হাঁটতে বেরোতো। এখন আর শান্তনু যেতে চায় না। হাঁটার বদলে জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে মোবাইলটা ওপরদিকে তোলে। এক সন্ধ্যায় শান্তনু মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। অদ্রিজার হাত থেকে এক টানে নিয়ে নিয়েছিল ফোনটা।

অদ্রিজা প্রথমে হতচকিত হয়ে যায়। তারপর ধাতস্থ হয়ে লোকজনের মধ‍্যে শান্তনুকে অনেক কথা শোনায়। ঝগড়া থেকে স্বস্তি ভাল মনে রেখে আর কোনওদিন ওর সাথে হাঁটতে বের হয় না।

***
রবিবার শান্তনু একটু বেলা করেই বিছানা ছাড়ে। এই অভ‍্যেস তার অনেক দিনের। কিন্তু এই রবিবারে ভোর হতে না হতেই উঠে পড়ে। নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে চা বানায়। একটা কাপে চা ঢালে। বাকিটা ফ্লাস্কে ভরে রেখে বেরিয়ে পড়ে বাজারের উদ্দেশে।
সকালের সূর্যটা চারিদিকে নরম আলোর পরশ মাখাচ্ছে। বিভিন্ন পাখির ডাকে ভরে উঠছে চারিদিক। এখন হাঁটতে বেশ ভাল লাগছে। উপভোগ করার জন‍্য আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে। কখন যে বাজারের সামনে এসে গেছে টের পায়নি। বাজারে ঢোকার মুখে চায়ের দোকানে ভিড় দেখে সে বুঝতে পারে যে সে তার গন্তব‍্যে পৌঁছে গেছে। তাড়াতাড়ি এক ভাঁড় চায়ের অর্ডার দেয়।

অদ্রিজা যেখানে ফটোটা তুলেছিল সে জায়গাটা এখনও ফাঁকা। তার পাশেই বাবলুদার আলুর দোকান। সেই দোকান থেকে নিয়মিত কেনে শান্তনু। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সে ভাবতে থাকে বাবলুদাকে জিজ্ঞেস করি। আবার পরক্ষণেই ভাবে, না তার দরকার নেই। আজ না হোক সামনের রবিবারে হলেও কোনও ক্ষতি নেই। এসব ভেবে দু-পা এগিয়ে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়ায়। মনের ভেতরে খোঁচা দেয় কেউ।
সটান ঘুরে শাক-মাসির বসার ফাঁকা জায়গাটার পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আর বাজারে আসা লোকজনদের দেখতে থাকে সে। দ্রব‍্যমূল‍্য বৃদ্ধির কোনও আঁচ বাজার করতে থাকা বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে সেভাবে দেখতে পায় না শান্তনু।

হঠাৎ করেই তার পায়ের সামনে ধপাস করে একটা বস্তা পড়ে। সে ঘাবড়ে গিয়ে দু-পা পিছিয়ে যায়। মুখ তুলে তাকাতেই সেই মাসিকে দেখতে পায়। মুখের রেখাগুলো যেন জীবন্ত। শান্তনু বলে, দু-আঁটি কলমি শাক নেব বলে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। শাক-মাসি সাথে সাথে বলে, আজ ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হল তারপর ট্রেন আসল দেরিতে। তাই…
শান্তনু একদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক আছে। আগে ঠিক করে গুছিয়ে নাও, তারপর দিয়ো।

আঁচলটা কোমরে গুঁজে একটা পলিথিন মাটিতে পেতে দেয়। তারপর বস্তা থেকে এক-এক করে বিভিন্ন ধরনের শাক সাজিয়ে রাখে। বয়সের ভারে শরীরটাও কেমন একটু ঝুঁকে পড়েছে। পরণের শাড়িটা অনেকদিন কাচা হয়নি বোঝা যাচ্ছে। মাথায় চুল নেই বললেই হয়। তবে যে কয়েকটা আছে, তা সবই সাদা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শান্তনু লক্ষ্য করছিল।
শাক-মাসির দোকান সাজানোর পর
শান্তনু বলে, তোমার বাড়ি কোথায়?

শাক-মাসি দোকান গোছাতে গোছাতে বলে, ঝিকরা গ্রামে।
শান্তনু মাথা নেড়ে বলে, সে তো অনেক দূর। তুমি রোজ যাতায়াত করো।
শাক-মাসি হেসে ফেলে। শান্তনু খেয়াল করে মাত্র কয়েকটা দাঁত অবশিষ্ট আছে।
ফোকলা মুখে বলে, কী আর করব।না হলে না খেয়ে মরতে হবে। তবে বিশুর বাবা যতদিন বেঁচেছিল ততদিন কিছুই করতে হয়নি। ভ‍্যানরিকশা চালাত। দিনের শেষে ভাল টাকা আনত। কিন্তু দেশী খেয়ে খেয়ে শরীরটাকে শেষ করল। তারপর থেকেই শাক-পাতা তুলে এই বাজারে বসি। তাতে যা হয়, আমাদের চলে যায়।

শান্তনু কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে, বিশু তো সাহায্য করতে পারে তোমাকে?
শাক-মাসি তড়িঘড়ি বলে, ওর যে পড়া আছে।
শান্তনু আশ্বস্ত হয়ে বলে, তোমার বিশু কোন ক্লাসে পড়ে?
এবার তড়িঘড়ি করে বলে, ওসব জানি না বাপু।

শান্তনু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে
শাক-মাসির দিকে। মুখের এঁকেবেঁকে যাওয়া রেখাগুলো স্পষ্ট দেখতে পায়। এই প্রথম অদ্রিজার সেলফিকে বাহবা দেয় মনে মনে। আজও মানুষ লড়াই করে বাঁচতে জানে। এটা ভেবে বুক চওড়া করে হাঁটতে শুরু করে শান্তনু।

# শেষ #

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *