Joy Narayan Sarkar

 8 total views

ভরসা // জয়নারায়ণ সরকার

অ্যাই টিঙ্কু, একটু পাঁচফোড়ন এনে দিবি। মাঠের পাশের বাড়ি থেকে কুমকুমকাকিমা চিৎকার করে বলে। শীতের সকালে যেন ক্রিকেটে মজে আছে সারা পাড়া। টিঙ্কুও উদ্দীপনাতে যেন ভাসছে। একদৌড়ে এসে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে টাকা নিয়ে দৌড় দেয় দোকানের দিকে। দোকান থেকে ফিরে পাঁচফোড়নের ঠোঙাটা জানলা দিয়ে গলিয়ে দিয়ে আবার খেলায় মেতে ওঠে।
এই তো কয়েক বছরের আগের কথা। সেই টিঙ্কু আজ বেঙ্গালুরুতে চাকরিসূত্রে থাকে।

তবে আজ আর মাঠে সেভাবে কাউকে দেখা যায় না। আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ‍্যে মোবাইল নিয়ে ব‍্যস্ততা চোখে পড়ে। এই তো সেদিন জানলার ধারে বসে সেইসব দিনের কথা মনে পড়ছিল কুমকুমকাকিমার।

জানলাটা ঠিক যেন প্রেসবক্স। সারা মাঠের ছবি ধরা পড়ত। অঝোর বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা হলে মজার কাণ্ড দেখে হাসির রোল উঠত আবার প্রচণ্ড গরমে ঘেমেনেয়ে খেলার পর এই জানলা দিয়েই জলের জগ বাড়িয়ে দেওয়া হত। তাতেই পিপাসা মেটাতো ছেলেগুলো। আবার কেউ আহত হলে ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে এই জানলা দিয়েই দেওয়া হত।

এ রকম নানা কথা কুমকুমকাকিমার মনে দোল খেলে যায়। সেই সময় বিকেল হলেই এক দঙ্গল ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়ত মাঠে। পুরো পাড়াটাই ছিল একটা সংসার।

টুকরো টুকরো ঘটনার কথা স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কুমকুমকাকিমার।
পাড়ার কেউ অসুস্থ হলে পাড়ার ছেলেরাই নিয়ে যেত হাসপাতালে। অবস্থা যতক্ষণ না স্থিতিশীল হত, ততক্ষণ তারাই পালা করে দিনে-রাতে থাকত সেখানে। যে কোনও কাজে ওদের উৎসাহ ছিল দেখার মতো। সেই সময়ে অনেকেই নির্ভর করত তাদের ওপর। তবে ওদের দুষ্টুমিও ধরা পড়ত কখনও কখনও। তখন পাড়ার কোনো গুরুজন বকা-ঝকা করলে ওরা কেমন গুটিয়ে যেত।

ছেলেগুলোর রান্নাঘর অবধি যাতায়াত ছিল। সঞ্জয় নামের ছেলেটার কথা মনে পড়ছে বারবার। ওই ছেলেটা ছিল ভীষণ লুচি প্রিয়। যতবারই বাড়িতে লুচি হয়েছে সে গন্ধ পেয়ে হাজির হয়েছে। একথা-সেকথা বলার পর লুচি খাওয়ার প্রসঙ্গ তুলতো। তখন তাকে একটা জলখাবারের প্লেটে সাজিয়ে দেওয়া হত লুচি-তরকারি।
শুধুমাত্র একটা বাড়ি নয়, যে বাড়ি থেকে গন্ধ পেত সেখানেই হাজির হত। সেই কারণে তাকে বন্ধুরা লুচি সঞ্জয় বলে ডাকত।

কুমকুমকাকিমার আরও মনে পড়ে। এক বছর ব্রাজিলের পেলে কলকাতায় খেলতে এসেছিলেন। পেলের গায়ের রং কালো মিশমিশে। এই মাঠেও একটা ছেলে খেলতো যার গায়ের রং ছিল অনেকটা পেলের মতো। তাই তার নাম হয়ে গেল কেলে।
এবার নিজে নিজেই হেসে ওঠেন।

আজ যে কী হল, পুরনো দিনের কথা ভিড় করে আসছে মনে। আজও তো ছেলেরা ভিড় করে মাঠে। কিন্তু এদের সাথে সেই রকম সম্পর্ক গড়ে উঠল না। সেই দায় কার ওপর বর্তাবে? নিজেকেও অপরাধী মনে হয় তাঁর!

আজকাল স্মৃতি রোমন্থন করতে বেশ লাগে কুমকুমকাকিমার। ওই ছেলেগুলোর মধ‍্যে একজন যার চুলটা ছিল মিঠুন চক্রবর্তীর স্টাইলে। সে খানিকটা মিঠুনের মতোই হাবভাব করত। নাম প্রদীপ্ত। যে কোনও কাজে সে-ই মাতব্বরি দেখাত। তবে সবাই ওর কথাও শুনতো। তাই বন্ধুরা ওকে বলত ক‍্যাপ্টেন। তবে এই নামটা প্রদীপ্তর একেবারেই পছন্দের নয়। কেউ বললে বেশ রেগেও যেত। একদিন এই নাম নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে যায়। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে গিয়েছিল পাড়ার বয়স্করা। কুমকুমকাকিমাও হাজির হয়েছিল সেখানে। তারপর থেকে ওকে বন্ধুরা ক‍্যাপ্টেন বলত ঠিকই, তবে আড়ালে।

ইদানিং সেই প্রদীপ্তের হাত ধরেই অনেক পুরনো বাড়ি ভেঙে প্রমোটিং হয়েছে। বহুতল ছেয়ে ফেলেছে চারদিক। তবে এখন প্রকাশ‍্যে প্রদীপ্তকে সবাই বস বলেই ডাকে। তাতে ও এখন বেশ গর্ববোধ করে, বেশ বুঝতে পারে কুমকুমকাকিমা।

***
মাঠের পশ্চিম ধার ঘেঁষে বসুদের বাড়িটা ভেঙে বহুতল হয়েছে। সেখানে শুধুমাত্র বসুরা নয়, অচেনা অনেক পরিবার বাস করে। সেদিন দুপুরবেলায় পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায় ওই ফ্ল‍্যাটের সামনে। প্রেসবক্সের জানলা দিয়ে দেখে তড়িঘড়ি ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ে কুমকুমকাকিমা।

ওই ফ্ল‍্যাটের সামনে পাড়ার কিছু মানুষের জটলা। আস্তে আস্তে গিয়ে দাঁড়ায় তাদের মধ‍্যে। একজন বৃদ্ধা থাকতেন তিনতলার একটি ফ্ল‍্যাটে। বেশিদিন হয়নি এ ফ্ল্যাটে এসেছেন। কয়েকদিন বাইরে দেখা যায়নি। আজ সকাল থেকেই দুর্গন্ধে ভাসে গোটা ফ্ল‍্যাট।

কুমকুমকাকিমাও গন্ধটা পেয়েছিল। সে বাড়ির চারধারে ফিনাইল-জল ঢেলে দিয়েছিল। ভেবেছিল, মরে যাওয়া কোনও পশু-পাখির থেকে গন্ধটা আসছে। একটু বেলা বাড়লে গন্ধটাও তীব্র হতে থাকে।
পুলিশ এসে দেহটা বার করে নিয়ে যায়। ছেলে বিদেশে থাকায় একাই থাকতেন ওই মহিলা।

কুমকুমকাকিমা ধীর পায়ে ফিরতে থাকে। সেও তো এখন একা । ছেলে থাকে ক‍্যালিফোর্নিয়ায়। হাতে ধরা ফোনটা নিয়ে তড়িঘড়ি ডায়াল করে ছেলেকে। রিং হয়ে হয়ে কেটে যায়।

মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় পা আর চলতে চাইছিল না কুমকুমকাকিমার।
লুচি সঞ্জয়, ক‍্যাপ্টেন, কেলে, মামা, খ‍্যাষ্টা, নাটা, ল‍্যাটা কানু, গুলুকচু—- এ রকম ভরসার নামগুলো তাঁর মনের ভেতরে তোলপাড় করতে থাকে…

# শেষ #

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *