Joy Narayan Sarkar

 157 total views

বন্ধু তুই // জয়নারায়ণ সরকার

বর্ষার দিনগুলির কথা মনে আছে তোর? একটু বৃষ্টি পড়লেই বল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম মাঠে। জল আর কাদায় কিম্ভূত হয়ে উঠতাম সবাই। তখন সে কী উন্মাদনা! জলে বল আটকে গেলে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। সবাই চেষ্টা করত জলকে ডিঙিয়ে গোলের দিকে শট নিতে। তবে তুই এ ব‍্যাপারে পারদর্শী ছিলি। পায়ের চেটো দিয়ে বলটাকে তুলে কখনও হাফ ভলি, কখনও আবার দুরন্ত শটে গোলপোস্টের ভিতর দিয়ে লক্ষ‍্যভেদ করত আর আমরা সবাই গো-ও-ও-ল বলে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠে জলের মধ‍্যে ডিগবাজি খেতাম। আমাদের এই খেলায় হয়তো কোনও দর্শক থাকত না। তাতে আর কী! আমরা খেলোয়াড় আবার আমরাই দর্শক।

মনে আছে তোর, সেবার পাশের পাড়ার সাথে ম‍্যাচ ছিল। ওই দলটা ছিল বেশ পাকাপোক্ত। মাঠে জল জমে থাকায় তুই ছিলি আমাদের ভরসা। অবশ‍্য কথার খেলাপ করিসনি। সেই ম‍্যাচে প্রতিপক্ষকে একা নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলি। খেলার শেষে আমরা বিজয় উৎসবে মেতে উঠেছিলাম কিন্তু তুই তোর স্বভাবমতো নিস্পৃহ হয়ে রয়ে গেলি।
সেসব দিনের কথা কি আজও মনে পড়ে তোর? শুধু খেলা কেন? অন‍্যান‍্য যেকোনও কাজে তুই তো একনিষ্ঠ কর্মী।

এ রকম কত কথা যে ভেসে ওঠে মনের অন্দরে, তা বলে বোঝানো যাবে না। সময় বদলে যায়, সেই সাথে দিনও বদলায়। আজ আর কোনো খোঁজ পাই না। তোর নিস্পৃহতা, না আমার যোগাযোগ রাখার ব‍্যর্থতা তা নিয়ে মাঝে মাঝে চুলচেরা বিশ্লেষণ করলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি না। মেঘলা আকাশ, অঝোরে বারিধারা বা সূর্যের গনগনে তাপে আজও তোকে খুঁজে চলি।

***
ব‍্যস্ততার শেষ নেই। অফিস-বাড়ি করতে করতে জীবন বয়ে যায়। ফুরসত পাওয়া বড় কঠিন আজ। কিন্তু সেসময় অফুরন্ত সময়কে বয়ে নিয়ে বেরিয়েছি আমরা। কেমন অবাক লাগে!

এই তো সেদিনও আমরা কেউ সংসারের গুরুদায়িত্ব নিয়ে কখনও মাথা ঘামাতাম না। কিন্তু আমরা কি জানতাম সংসার নামক যাঁতাকল শুধু পিষেই যেতে হবে! বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে দিন থেকে রাত চিন্তায় মশগুল থাকার আর এক নাম হয়তো সংসার।

যে যা হতে চেয়েছিল তারা তাই হতে পেরেছি কি? এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

তবে যতটুকু জানি, তুই ওই জল-কাদা ভরা মাঠে খেলার মতোই জীবনটাকে কি এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিস? তোর সেই পারদর্শিতায় সহজে কি হার মেনেছে সংসারের জটিলতা?

জানিস, গোলপোস্টের নীচে যে দাঁড়াত বরাবর। নামটা এখন আর মনে করতে পারি না। ওদের সংসার ছিল অনেক বড়। কোনওমতে দিন চলত ওদের। তবুও গোলপোস্টের নীচে দাঁড়াত রাজার মতো। ওকে ফাঁকি দিয়ে গোল করার উপায় ছিল না। ও একা রুখে দিত পরাজয়ের গ্লানি। কিন্তু জীবনে ও নিজের গ্লানি কতটা মুছতে পারল? জানতে বড্ড ইচ্ছে করে।

মনে আছে তোর, রাইট উইং দিয়ে সেন্টার ভাসিয়ে দিলে লম্বা ছেলেটা লাফিয়ে মাথা ছুঁয়ে তিন কাঠির মধ‍্যে ঠেলে দিত। আমরা ওর জন‍্য কত সহজে ছিনিয়ে এনেছি জয়। ওকে তো লম্বু বলেই ডাকতাম। সেই উচ্চতা কাজে লাগিয়ে এখন জীবনের জয় ছিনিয়ে আনতে পারল কি? জানতে বড্ড ইচ্ছে করে।

আর ওই যে রোগা, ল্যাকপ্যাকে ছেলেটা। যার ছিল অসীম সাহস, ডিফেন্সে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়তো। একজনও ওকে ড্রিবিল করে টপকে যেতে পারত না। সেই ছেলেটির সাহস কি আজও অটুট আছে? জীবনে ও কি এখনও বুক চিতিয়ে লড়াই করে?

মনে আছে তোর, ওই যে ছেলেটা লেফট উইংয়ে খেলত। তার বাঁ-পা ছিল জাদুকরের মতো। অনায়াসে দু-তিনজনকে পাশ কাটিয়ে ডিফেন্স চেরা থ্রু বাড়াত। ওকে তো ল‍্যাটা বলেই ডাকতাম আমরা। সে কি আজও ওভাবে জাদু দেখায়? জীবনের এই গতিপথে কতজনকে পাশ কাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ‍্যে থ্রু বাড়াতে সক্ষম হল। তাও জানতে ইচ্ছে করে।

খেলা শেষে মাঠের মধ‍্যে গোল হয়ে বসে খেলার বিশ্লেষণের মাঝে মাঝে হাসি-মশকরা চলত অনায়াসে। এই সংসারের খেলায় এখনও সবাই কি হাসি-মশকরা করে? এসব জানার জন‍্য মনটা কেমন অস্থির হয় মাঝে মাঝে।

***
পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া মাঠের পাশ দিয়ে যেতে যেতে এখন কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসে। আমাদের মাঠটা তো ছিল খোলামেলা। মেলামেশার মধ‍্যেও ছিল উদারতা।

এখন ওই ঘেরা মাঠে মাঝে-সাঝে খেলে একদল ছেলে। তাদের মধ‍্যে আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট! বেঁধে দেওয়া জায়গায় মনটাও ওদের বাঁধা পড়ে আছে।

সংসার নামক মাঠে তুই, আমি, গোলপোস্টের নীচে দাঁড়ানো ছেলেটা, লম্বু ও ল‍্যাটা দৌড়েই চলেছি। দৌড়তে দৌড়তে কারও কারও জিভ বেরিয়ে পড়ছে। তবুও হাল ছাড়ছে না কেউ। সমানে লড়ে যাচ্ছি। বদ্ধমাঠের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার জন‍্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি আমরা। হাতে-হাত রেখে হার না মানা মনোভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠছি ক্রমশ।
ঘড়ির কাটা দ্রুতগতিতে সরে সরে যাচ্ছে।

আমরা একে একে ছিটকে পড়ছি মাঠের বাইরে নানা প্রান্তে। ক্ষীণ সূর্যের আলোয় ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠছে মুখগুলো।

# শেষ #

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *