Joy Narayan Sarkar

 8 total views

তারা
জয়নারায়ণ সরকার

সদানন্দের জীবনে যেন পরিশ্রমই মূলমন্ত্র। পড়াশোনা করার ইচ্ছে থাকলেও বেশিদূর এগোতে পারেনি। বারো ক্লাশ দিয়ে থেমে যেতে হয়। সাত ভাইবোনের সংসারে অভাব ছিল নিত‍্যসঙ্গী। দাদা ও দিদির পরেই সদানন্দ। বাবা এলাকার একটা জামাকাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। হা-মুখ বের করা সংসার সে দেখে আসছে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে।

এক বন্ধুর বাবার চেষ্টায় ওষুধের ডিস্ট্রিবিউটরের অফিসে চাকরি জোটে। মাইনের চেয়ে খাটনি অনেক বেশি। তা হোক, সংসারের হা-মুখ তো কিছুটা বন্ধ হবে। তাই সে আর না করেনি। রোজ সকাল হলেই সেদ্ধ ভাত নুন দিয়ে খেয়ে রওনা হত। তবে যেদিন মাইনে পেত, সদানন্দ খেয়াল করেছে যে বাড়ির সবাই তার দিকে তাকিয়ে থাকত। এরমধ‍্যে বাবাকেও হারাতে হয়েছে।

মালিক শহরে দুই জায়গায় অফিস করায় রোজই তাকে ছুটতে হয়। বাস-ট্রামের পয়সা পেলেও সে হেঁটেই সব কাজ সারে। বাড়তি টাকাটা সে সযত্নে মায়ের হাতে তুলে দিত মাসের শেষে। এদিকে অন‍্যান‍্য ভাইদের কেউ কেউ ইট-বালির ব‍্যবসা শুরু করলে সংসারে একটু একটু করে স্বাচ্ছন্দ‍্য ফিরতে থাকে।

কিন্তু সদানন্দের খাটনি যেন দিন দিন বেড়েই চলে। অফিসের শম্ভুবাবু একদিন ডেকে বলে, এভাবে খাটলে তো দু-দিনে সব শেষ হয়ে যাবি রে সদা।
সদানন্দ মুখ নিচু করে বলে, কী আর করা যাবে! এখন না খাটলে পরে তো খেতে পাব না।
শম্ভুবাবু হেসে বলে, তা ঠিক। তবে শরীরটাকে তো দেখতে হবে। শোন, আজ ছুটির পর আমি আর তুই এক জায়গায় যাব। সেখানে গেলে শরীর আর মন দুটোই ভাল হয়ে যাবে। খাটনিকে আর খাটনি বলে মনে হবে না।

ট্রাম রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়ে একটা গলির মধ‍্যে ঢুকে যায় দুজনে। আধো আলো-আধো অন্ধকার রাস্তার পাশে চট দিয়ে একটা ঘেরা জায়গায় ঢুকে যায় শম্ভুবাবু। সদানন্দ বাইরে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে থাকে। মুহূর্তে হাত ধরে টেনে ভেতরের বেঞ্চে নিয়ে বসিয়ে দেয়। তারপর অর্ডার দেয় দু-গ্লাসের। সদানন্দের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। শম্ভুবাবু এবার ধমক দিয়ে বলে, এক চুমুকে সাবাড় করে দে। দেখবি সব খাটনি ভ‍্যানিশ।

সদানন্দ চিন্তা না করে চোখ বুঁজে চো-চো করে শেষ করে গ্লাসটা। মুহূর্তে খালি গ্লাসটা বেঞ্চের পাশে নামিয়ে রাখে। শম্ভুবাবু সাথে সাথে হাতে ছোলা আর চানাচুর দেয়। সেটাও একবারে মুখে পুরে ফেলে সে। শম্ভুবাবু আরও এক গ্লাস অর্ডার করে।

বাড়ি ফেরার সময় সমস্ত ক্লান্তি কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। একটা ফাঁকা বাসে উঠে জানলার ধারে বসে। ধেয়ে আসা বাতাসে সে যেন কোথাও হারিয়ে যায়। রোজ এভাবে বাড়ি ফিরলেও কেউ কিছু বলে না। একমাত্র মাসের পয়লা তারিখে সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

***
চারচাকা গাড়িটা আজ ডেলিভারি দিয়েছে কোম্পানি। একটা থালায় নারকেল, ফুল আর ধূপকাঠি জ্বালিয়ে নিয়ে এক সুবেশী এসে দাঁড়ায়। তারপর রাহুলের হাতে নারকেলটা দিয়ে বলে, সামনের বাঁদিকের চাকার সামনে ফাটিয়ে জলটা পুরো গাড়িতে ছিটিয়ে দিন। সেটা করার পর ফুল ছুঁড়ে দেয় স্টিয়ারিংয়ের দিকে। তারপর বনেট খুলে ধূপকাঠি ঘোরাতে থাকে ইঞ্জিনের চারপাশে। কোম্পানির ড্রাইভার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বখশিস নিয়ে যায়।

উঠোনে গাড়ি রাখামাত্র আশেপাশের বাড়ি থেকে উঁকিঝুঁকি দিতে দেখা যায়। রাহুলের আর তর সয় না। এক বন্ধুকে নিয়ে গাড়ি চালানো শিখতে বেরিয়ে যায়। রাহুলের এভাবে চালানোটা ভালভাবে নেয়নি মা। সাথে সাথে ফোন করে বলে, এখনই ফিরে এসো। ভোরবেলায় রাস্তা ফাঁকা থাকে সেই সময় শিখবে। তাছাড়া বাবা বাড়ি ফিরে আগে দেখুক।
রাহুল মায়ের কথামতো তাড়াতাড়ি ফিরে আসে।

সেদিন অফিস ছুটির পর গিয়ে একটু বেশি খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফেরার সময় কিছুতেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিল না সদানন্দ। মোড়ের মাথায় বাস থেকে নেমে একটা রিকশা নেয়। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হওয়ায় রিকশা থেকে নেমে সোজা ঘরে ঢুকে যায় সে।

সদানন্দকে দেখে বউ বলে ওঠে, উঠোনে রাখা গাড়িটা দেখলে? কালারটা কী সুন্দর! রাহুলের তো আনন্দ ধরছে না।
সদানন্দ ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে থাকে মুখে কিছু বলে না।

***
সময় যেন দ্রুত চলে যায়। এখন তো ভাইয়েরা সবাই বাবার জমির ভাগ পেয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। কিন্তু সদানন্দ একইরকম আছে। বিয়ের পর থেকেই একটু একটু করে বদল দেখতে পায় সে। প্রথম প্রথম বউয়ের কাছে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। তবে সে কথায় তার কোনো বদল হয়নি। সে জানে রাতে দু-পাত্তর না খেলে কাজ করতে পারবে না। তবে সংসারের হাল ধরে রাখে বউ নিজে। সে তো সামান‍্য ক’টা টাকা হাতে তুলে দিয়েই খালাস। অবশ্য সংসারের যে কোনও কাজে তার মতামতের অপেক্ষা করে না কেউ।

রাহুল একটা বিপিও কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ায় সংসারের দৈন‍্যতা ঢাকা পড়েছে। রাহুল তার মায়ের সিদ্ধান্তের ওপর ভর করেই দিন পার করে সদানন্দ।

গাড়ি নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানোটা সদানন্দের একেবারেই পছন্দের নয়। দু-একবার রাহুলকে সে বলেওছে। বউ সে কথা শুনে সদানন্দকে বলে, ও তোমার কী ক্ষতি করেছে। এখন কি আর আমাদের আগের মতো অবস্থা আছে? তুমি তো সেই আদ্যিকালেই পড়ে আছো।

সবার মাঝে থাকলেও নিঃসঙ্গ লাগে সদানন্দের। কেউ তো কোনও দিন তার কথা শুনতে চাইল না। তার তো এখন অখণ্ড অবসর। তবুও সে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কথা ভুলতে পারে না।

অফিস থেকে যেটুকু টাকা পাওয়া গেছে সবটুকু বউয়ের হাতে তুলে দিয়েছে সদানন্দ। সারাদিন কোনওভাবে কাটিয়ে সন্ধেবেলায় গিয়ে হাজির হয় ওই চট ঘেরা জায়গায়। এক পাত্তর গলায় ঢেলে দেয় চটপট। তারপর দুই-তিন… বলতে না পারা কথাগুলো ভেতরে কিলবিলিয়ে ওঠে।
টিমটিম করে জ্বলে থাকা আকাশের তারাগুলো বড্ড আপন মনে হয় তার। সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলেও মাথা তুলে বিড়বিড় করেই চলে সদানন্দ…

# শেষ #

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *