Joy Narayan Sarkar

 138 total views

বিষণ্ণ সন্ধ্যা // জয়নারায়ণ সরকার

পাড়ায় সবাই ওকে বুবাই নামেই চেনে। দেবদত্ত রায় বাবার দেওয়া নাম কিন্তু সে বুবাই নামেই পরিচিত বেশি। ভীষণ মেধাবী। ক্লাস ওয়ান থেকেই ফার্স্ট বয়ের স্ট‍্যাম্প পড়েছে তার গায়ে। তারপর আবৃত্তি আর গানেও তুখোড়। এলাকায় যে কোনও অনুষ্ঠানেই ডাক পড়ে তার। ছোটোবেলায় মায়ের হাত ধরেই স্টেজে উঠতো। যখন সে একটু বড়ো তখন ডিবেট আর ক‍্যুইজেও অংশ নিত। সেখানেও সে ফার্স্ট । তার জীবনে সেকেন্ড হওয়া ছিল দূর অস্ত। খেলাধূলায় সেরকম হতে পারেনি। তবে তাকে কোনওদিন আফশোস করতে দেখেনি বন্ধুরা। হয়তো পাড়ার ফুটবল টিমে ওর জায়গা হয়নি। সাইড লাইনের ধারে বসে আর সবার মতো নিজের টিমের জন‍্য গলাও ফাটিয়েছে। তখনই হয়তো সে বুঝে গিয়েছিল সব কিছু সবার জন‍্য নয়। সুমন, রাজীব আর বুবাই-এর মধ‍্যে অন‍্যান‍্যদের তুলনায় বন্ধুত্ব বেশি ছিল।
***
সুমন একটা অনুষ্ঠান কভার করতে গিয়েছিল জীবনানন্দ সভাঘরে। কিছুতেই যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু ওপরওয়ালার নির্দেশ। এ ধরনের অনুষ্ঠান একঘেয়ে লাগে। তবুও নিজেকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে হাজির হয়। উদ‍্যোক্তারা বেশ খাতির-যত্নও করে। কিন্তু সুমনের কিছুতেই ভাল লাগছে না। কেন যে এইসব বিটে পাঠায়! মনে মনে নিজেই বিরক্ত হয়। কবিতাপাঠ শুরু হলে সে যেন অন‍্য কিছু ভাবতে থাকে। পনেরো জন নবীন কবি কবিতা পড়বেন। একে একে উঠছেন নবীন কবিরা। সুমন চোখ বুঁজে থাকে, যাতে মনে হয় গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে। আসলে একটু ঘুমিয়ে নিতে চাইছিল। প্রায় শেষের দিকে তন্দ্রা ছুটে গেল। কবিতাটা কানে যেতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। সাথে সাথে চোখ মেলে দেখে, রোগা পাতলা, একমুখ দাড়ি, অনেক দিন না কাচা জামা পরে এক কবি কবিতা পড়ছেন। গলাটাও চেনা লাগে তার। ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে সে। খুব ভাল একটা কবিতা শুনল সুমন। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বেরিয়ে আতিপাতি করে গোটা চত্বর খুঁজল সে। কিন্তু সেই কবির দেখা পাওয়া গেল না।
এদিকে ওপরওয়ালার ফোনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তড়িঘড়ি অফিসে ফিরে কপিটা জমা দিতে হবে। কিছুই যেন ভাল লাগছে না। সুমনের মনের ভেতরটা তোলপাড় করে তুলেছে একটাই নাম, দেবদত্ত রায়। সে ভাবে, ছোটবেলার সেই বুবাই আজকের দেবদত্ত নয়তো!
ফেসবুকে দেবদত্ত রায় ও বুবাই রায় নামে অনেক সার্চ করেছে। ওই নামের অনেকেই এসেছে, শুধুমাত্র সে ছাড়া। পরদিন অফিসে গিয়ে ওই অনুষ্ঠানের উদ‍্যোক্তার ফোন নাম্বার জোগাড় করে। ফোন করায় দেবদত্ত রায়ের পুরো ঠিকানা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেয়। ঠিকানা দেখে নিশ্চিত হয়ে যায় সুমন। কবি দেবদত্ত রায় ওরফে বুবাই। অন্যদিকে সেদিনের অনুষ্ঠানের রিপোর্টে দেবদত্তর কবিতার ভূয়সী প্রশংসা বেরিয়েছে।
***
সুমন কাজে কাজে পুরো ব‍্যাপারটাই ভুলে গিয়েছিল। এক সময় ভেবেছিল বুবাইয়ের খোঁজে ছেড়ে আসা জায়গায় যাবে। তারপর নিজেই নিজেকে বলেছে, পেছনদিকে কেন তাকাবো। কোনও বন্ধু তো চলে আসার পর সম্পর্ক রাখেনি। সে-ই বা কেন রাখবে। ওইদিন বুবাই তো এসে কথা বলতে পারত। সুমনের মনেও অভিমানের কালো মেঘ জমে। এসব নিয়ে আর মাথা ঘামায় না সুমন। ছুটির পর অফিস থেকে বেরিয়ে উল্টো ফুটপাথের চায়ের দোকানে যেতেই কানে এলো, আপনি সুমনবাবু তো! ঘুরে দেখে সেই না কাচা জামা আর জিনসের প‍্যান্ট, মুখে রাত জাগার ক্লান্তি, একমুখ দাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই কবি। কাছে এসে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সুমন তার হাত ধরে বলে, বুবাই!
দেবদত্ত সাথে সাথে বলে, সেদিন তোকে চিনেছিলাম। কিন্তু সংকোচে কথা বলতে পারিনি।
সুমন এবার দু-ভাঁড় চা দিতে বলে। দেবদত্ত তখনও উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে সুমনের দিকে। তারপর বলে, তোকে ধন‍্যবাদ জানাবো বলে বেশ কয়েক দিন ধরে অফিসের গেটের পাশে অপেক্ষা করেছি।
সুমন বলে, এতে ধন‍্যবাদ দেওয়ার কী আছে। ওটা তো আমার কাজ।
বুবাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, জীবনে ঠিক ঠিক কাজ ক’জন করতে পারে? বল!
আবহাওয়াটা গুরুগম্ভীর হচ্ছে দেখে সুমন হেসে বলে, কাকু, কাকিমা কেমন আছেন?
আরো গলা খাদে নামিয়ে বুবাই বলে, ওই আছে আর কী। বয়েস হয়েছে, রোগভোগ লেগেই আছে। তবে তোর লেখাটা দেখিয়েছি। দুজনেই খুশি হয়েছেন। তবে মায়ের চোখ জলে ভিজে উঠেছিল।
সুমন কিছুক্ষণ চুপ করে বলে, তুই এখন কী করছিস?
বুবাইয়ের গলায় হতাশার সুর ভেসে ওঠে, ওই, মাঝেমধ‍্যে একটু-আধটু কবিতা লিখি।
চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক দিয়ে বুবাই বলে, এবার আমাকে যেতে হবে। অনেকদিন পরে তোকে দেখে খুব ভাল লাগল।
বলেই ফুটপাথ দিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে যায় কবি দেবদত্ত। সুমন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্যাখে বিকেলের পড়ন্ত আলোয় মিশে যাচ্ছে কবি। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল বুঝতে পারেনি। সেলফোন বেজে উঠতেই চমকে ওঠে। দ‍্যাখে সেই অনুষ্ঠানের একজন আয়োজক ফোন করেছে। হ‍্যালো বলে সুমন।
ওপার থেকে বলতে থাকে জীবনানন্দ সভাগৃহে একটা শোকসভার আয়োজন করা হয়েছে কবি দেবদত্ত রায়ের স্মরণে। আগামি…
সেলফোনটা সুমনের হাত থেকে ফুটপাথে আছড়ে পড়ে। তখনও কেউ বলে চলেছে… জীবনে ঠিক ঠিক কাজ ক’জন করতে পারে…

# শেষ #

1 thought on “Joy Narayan Sarkar”

  1. Joy Narayan Sarkar

    নামকরণটা পাল্টাতে চাই। নামকরণ হবে “বিষণ্ণ সন্ধ্যা”। দয়া করে পাল্টে দিলে বাধিত থাকব।
    ভাল থাকবেন।
    জয়নারায়ণ সরকার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *