M. Jakaria Ahmed

 12 total views

সভ্যতার ভীড়ে রথ বদল করেছে মায়েদের ভালোবাসা বহিঃপ্রকাশের ধরন!

~~ এম. জাকারিয়া আহমেদ

একটি হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আজও খুঁজি আমি! কিন্তু কোথাও পাইনা তা এখন! সভ্যতার ছোঁয়ায় আজ বিলিন হয়ে গেছে সেই পুরনো আমলের মায়েদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের ধরণ! সবাই অবাক হচ্ছেন তাইনা?
তাহলে চলুন আসল কথায় আসি।

বহুদিন আগের কথা আমি তখন কৌতূহলি এক হাফপেন্ট পড়া বালক! খেলা-ধূলা আর সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানো ছিল তখন আমার প্রধান কাজ! মাঠ-ঘাট, গাছ -পালা, বিল -ঝিল সব জায়গায় ছিল সমান বিচরণ এই আমার! খুবই চঞ্চল ছিলাম আমি। লাফালাফি করতে ও বালিতে বসে মুচরা মুচরি করতে আমার ভালো লাগতো! গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো দেখতাম খুব সকালেই হাল নিয়ে ক্ষেত খামারে ছোটতো পান্তা আর কাচা মরিচ ঢলে খেয়ে! সবাই ছিল খুব দরিদ্র! এদের মধ্যে যারা একটু স্বচ্ছল তারাই কেবল দুই বেলা কিংবা একবেলা খেয়ে দিন পার করতেন। গ্রাম থেকে হাতে গুনা কিছু মানুষ প্রবাসে পারি জমাতেন পেটের দায় গুছাতে, একটু স্বচ্ছলতার আশায়! সেটাকে তখন বলতো বিলেত! কারো বাড়ি থেকে কোন ছেলে বিদেশে গেলে বলতো ছেলে আমার বিলেতে গেছে! তখন ছিলনা কোন মুবাইল ফোন, শহরে ছিল টেলিফোন তাও আবার সবার বাড়িতে না! তখন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। কতইনা আশা আগ্রহ নিয়ে চেয়ে থাকতো ডাক পিয়নের দিকে কখন জানি কার চিঠি চলে
আসে! মা ছেলের হাল অবস্থা জানতে চিঠির জন্য তাকিয়ে থাকতো বাড়ীর মেইন ফটকে সেই সাইকেল ওয়ালা পিয়ন কখন আসবে তার খোকার চিঠি নিয়ে! কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও কান দুটো থাকতো পিয়নের বেইলের ক্রিং ক্রিং শব্দের আশায়! বোন অপেক্ষা করতো ভাইয়ের খবরের জন্য স্ত্রী স্বামীর জন্য! একটি চিঠি আসলে আশ পরশী সবাই চলে আসতো জানতে কার চিঠি এলো কিইবা লিখেছে তাতে কি কৌতূহলইনা ছিল সবার মনে? গ্রামে তখন লেখা পড়া জানা মানুষের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য! হাতে গুনা কিছু মানুষছিল দুই এক কলম লেখা পড়া জানা, ভাঙ্গা ভাঙ্গা বানানে তারা পড়তো। তখন চিঠি আসলে লেখা পড়া জানা ব্যাক্তিদের কাছে যেয়ে চিঠি পড়িয়ে শুনতো! তখন মায়েরা চিঠি নিয়ে তাদের কাছে যেয়ে খুব মনযোগ দিয়ে শুনতো কি লিখেছে তার ছেলে! ছেলে ভালো আছে জেনে চোখে মুখে আনন্দের অশ্রু নিয়ে চিঠিটা ভাঁজ করে আঁচলে গিঁট দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া করতো আর চিঠিটায় কতযে চুমো খেত তার কোন অন্ত নেই! স্ত্রীর কাছে আসা চিঠি সে কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা, নিজেও পড়তে জানেনা আর চুখে মুখে লাজুকতার ছাপ কি জানি লিখেছে তাতে তার প্রিয়তম! লুকিয়ে কোন ননদিনি বা ভাবিদের দেখাতো ভাঙ্গা বানানে তারা পড়ে শুনাতো স্ত্রীরাও কি লাজুকভাবে হাসতো! কি অদ্ভূত এক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশগুলো সভ্যতার ছোঁয়ায় আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে! ছেলে বিলেত থেকে ফিরলে মায়ের খুশি দেখে কে? বাড়িতে নানান আয়োজন হতো ছেলের পছন্দের সব রান্না হতো ছেলে কত বছর পর আসবে বলে কথা! তার ফাঁকে ঘরের এক কোণায় মেজেতে নামাজের জায়গায় শীতল পাটিটি বিছিয়ে মহান প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করে ছেলে যাতে সহি সালামতে ফিরে আসে! বাড়িতে ফিরতেই এলাকা বাসির ভিড় অমুকের ছেলে বিলেত থেকে ফিরেছে! তাকে দেখতে সবার হুমড়ি খেয়ে পড়া! মা ছেলের দেখা হওয়া মাত্রই জড়িয়ে ধরে বুক ফাঁটা সুখের কান্না! যেন সহস্র বছর পর তার হারানো মানিক খুঁজে পেয়েছেন ! আজও আমার চোখ ছলছল করে তা ভাবলেই! কোথায় হারিয়ে গেল সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ? তার পর বিলেত ফেরত ব্যাক্তির চেনা অচেনা সবার সাথে কূশল বিনিময়। অনেকে বুড়ো হয়ে গেছে কেউ বড় হয়ে গেছে, কেউবা অচেনা তারা বিলেত যাওয়ার পর জন্মেছে তাই, বন্ধু বান্ধরা জড়িয়ে ধরে এক সাথে আলিঙ্গন শত সহস্র প্রহর পর! কি একটা দারুন ভালোবাসার বন্ধন ছিল তখন। তার পর সবাইকে মিষ্টি মুখ করিয়ে বিদায় দেয়া। সভ্যতার ছোঁয়ায় চিঠির পর আসলো টেলিগ্রাম, তারপর ফেক্স ইন্টারনেট, মুবাইল ইত্যাদি। আর এখনতো সারাবিশ্ব হাতের মুঠয় এসেছে ছেলে বিদেশ গেলে বলেনা আর বিলেতে গেছে! কারন সবাই এখন অবগত হয়ে গেছে দেশের নাম জেনে। ফোনে কথা হয় অহরহ। ভিডিও কল, ইমু, হোয়াটস আপ, ভাইবার, ইত্যাদি আরো কত কিছু তাই মায়েদের আর আগের মতো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে হয়না! সভ্যতার ছোঁয়ায় বিলিন হয়ে যাওয়া সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আমি আজও খুঁজি গ্রাম পল্লীর পরতে পরতে কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনা তার স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি!!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *